বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পানির ঘাটতি বৈশ্বিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। সমস্যাটি দেশেও ক্রমে বাড়ছে। দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোয় লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে প্রকটতর হচ্ছে নিরাপদ পানি সংকট। সেখানে লবণাক্ত খাওয়ার পানি গর্ভবতী নারীর মৃত্যু বৃদ্ধির কারণ বলে এক গবেষণায় জানা গেছে। অনেক এলাকার ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা বেশি থাকা বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হচ্ছে। সুপেয় পানির সংকট বাড়ছে উপকূলীয় ও পাহাড়ি অঞ্চলগুলোয়ও। পানি নিয়ে সমস্যা বিদ্যমান রাজধানী ঢাকাসহ অন্য বড় শহরগুলোয়ও। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। রাজধানীর অনেক এলাকার মানুষ ওয়াসার সরবরাহ করা পানি নিয়মিত পাচ্ছে না। এ অবস্থায় সুপেয় পানির উৎস রক্ষা ও সঠিক পানি ব্যবস্থাপনা জরুরি।
শ্রীলংকায়ও সুপেয় পানির সংকট রয়েছে। তবে সরকার ও বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের ফলে তারা একটি টেকসই সমাধানের দিকে ধাবমান। রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং ফোরামের অধীনে বৃষ্টির পানি ধরে রেখে তা পান করা এবং গৃহস্থালির অন্যান্য প্রয়োজনে ব্যবহারের পাশাপাশি চাষাবাদের কাজে ব্যবহারের বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। বৃষ্টির পানি ধারণের জন্য বাড়িতে বাড়িতে যেমন ট্যাংক তৈরি করা হয়েছে, তেমনি রয়েছে কমিউনিটি রেইনওয়াটার হারভেস্টিং ট্যাংক। এগুলো রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার জন্য রয়েছে এলাকাভিত্তিক ছোট ছোট দল। পাশাপাশি পানি সংরক্ষণ ও অপচয় রোধে নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মসূচিও পালিত হয়।
বৃষ্টির পানি কীভাবে ধারণ ও সংরক্ষণ করতে হয়, তার জন্য বাংলাদেশেও রয়েছে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি। তবে এর পরিধি বাড়ানো জরুরি। মনোযোগী হতে হবে সুপেয় পানির প্রাকৃতিক উৎসগুলোয় সংরক্ষণ ও পানির অপচয় রোধে। পুকুরভিত্তিক পানি শোধনাগার নির্মাণ করতে হবে। আমলে নিতে হবে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাবগুলোর কথা। সর্বোপরি নিরাপদ খাবার পানি বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। প্রতি বছর পানিসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে ও দূষিত পানি পানের কারণে লাখ লাখ মানুষ মারা যায়। জাতিসংঘের প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ টেনে পোপ ফ্রান্সিস শঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, পানির স্বল্পতা বিশ্বে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ডেকে আনতে পারে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবগুলো আমলে নিয়ে টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার দিকে গুরুত্বারোপ করা জরুরি।
আমরা জানি, সুপেয় পানি প্রাপ্তির সুযোগ বর্তমানে বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। জাতিসংঘ পানি অধিকারকে মানবাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছে। তবে ঢাকা শহরে পানি নিয়ে বস্তিবাসী বা নিম্নবিত্ত মানুষ যেমন বৈষম্যের শিকার, তেমনি গ্রাম ও শহরের মানুষের মধ্যেও এ নিয়ে বৈষম্য বিদ্যমান। অন্যদিকে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততার কারণে নিরাপদ পানির উৎস কমে যাচ্ছে, এর শিকারও হচ্ছে মূলত গরিব মানুষ। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে ২০৩০ সালের মধ্যে পানির প্রাপ্যতা, প্রবেশগম্যতা, গুণগত মান ও পানি পাওয়ার আর্থিক সক্ষমতা অর্জন করা জরুরি। আমাদের হাতে সময় আছে মাত্র নয় বছর। এ সময়ের মধ্যে আরো ৪৪ শতাংশ মানুষের জন্য নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে নীতিনির্ধারকদের প্রয়োজনীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। এ লক্ষ্যে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। গুরুত্ব দিতে হবে বহুপক্ষীয় ও সময়োপযোগী দৃষ্টিভঙ্গিকে।
উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার পাশাপাশি পানিতে আর্সেনিক একটি বড় সমস্যা। আবার শহরে পাইপলাইনের মাধ্যমে যে পানি সরবরাহ করা হয়, সেখানে ৮০ শতাংশই ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া যুক্ত। পুকুরের পানিতেও এ ব্যাকটেরিয়ার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। কিছু অঞ্চলের টিউবওয়েলের পানিতে ক্ষতিকর অণুজীবের অস্তিত্ব মিলেছে। অথচ রাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট আইন, আদালতের রায় ও সরকারের নির্দেশনার পরও শিল্প-কারখানায় বর্জ্য পরিশোধন প্লান্ট বসানো হচ্ছে না। ফলে নদী-জলাধার দূষিত হয়েই চলছে। শিল্প-কারখানার মালিকরা দূষণের এ দায় এড়াতে পারেন না। তাছাড়া ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নদী ও জলাধারগুলো ব্যাপক দখল ও দূষণের শিকার। আমাদের দেশে নদী ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সমস্যা বিদ্যমান। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবে নদী দখল ও নদীদূষণ বাড়ছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সুপেয় পানি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে।
দেশের সেচ ব্যবস্থা অনেকাংশে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। ‘আধুনিক’ চাষাবাদ পদ্ধতিতে অতিরিক্ত পানি খরচ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই পানির অপচয় হতে দেখা যায়। আবার নগর-মহানগরগুলোয়ও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর করেই সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে। অতিরিক্ত চাপের কারণে ভূগর্ভস্থ পানিতে যেমন দূষণের ঝুঁকি বাড়ছে, তেমনি তৈরি হচ্ছে ভূমিধসের আশঙ্কাও। আমাদের তাই সুপেয় পানির উৎস রক্ষার পাশাপাশি পানির অপচয় রোধ করতে হবে। মনে রাখা জরুরি, প্রাকৃতিক জলাধারের ওপর অত্যাচার তথা বাঁধ নির্মাণ, ভরাট ও গতিপথ পরিবর্তন অব্যাহত থাকলে পানিচক্রের ভারসাম্য ও ন্যায্যতা নষ্ট হয়। পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। তাই টেকসই পানিপ্রবাহ বজায় রাখতে সুষ্ঠু পানি ব্যবস্থাপনা জরুরি। নিরাপদ পানির উৎস হিসেবে জলাধার রক্ষার পাশাপাশি পরিত্যক্ত পুকুর খনন বা পুনর্খন করতে হবে। প্রয়োজন নলকূপগুলো ব্যবস্থাপনা। এক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে হবে।










