লকডাউন তথা করোনা ক্রান্তিকালে গৃহবন্দি মানুষ শুধু টিভিকেন্দ্রিক বিনোদনে বুঁদ হয়ে থাকছে না, তারা বইও পড়ে। সম্প্রতি ইংল্যান্ডে প্রায় এক হাজার লোকের ওপর চালানো এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, মানুষ আগের চেয়ে বেশি সময় ব্যয় করছে বই পড়ায়। এর কারণ হিসেবে কেউ বলেছেন, বই বিনোদন জোগায়; কারো মতে হাতে প্রচুর সময়ের সদ্ব্যবহার হয় এবং কেউ বলেছেন, বই নাকি কঠিন বাস্তব থেকে মন ফেরাতে সাহায্য করে। আমি নিজেকে শেষোক্ত শ্রেণীর বলে মনে করি। কারণ করোনা এখন এক কঠিন বাস্তব, যার থেকে আমি মুখ ফিরিয়ে থাকতে চাই বই পড়ে। তবে অন্যদের মতো থ্রিলার কিংবা ফিকশন আমাকে টানে না, যেমন টানে আমার নিজের পেশার বই ইকোনমিকস।

দুই. ইন্নামাল আ’মালু বিননিয়্যাত—নিয়ত দ্বারা উদ্দেশ্য সাধিত হয়। সম্প্রতি সদ্য প্রকাশিত একটা বই হাতে আসে—‘করোনাঘাতে অর্থনীতি ও শ্রমবাজার’। এর  লেখক আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার এমপ্লয়মেন্ট সেক্টরের সাবেক বিশেষ উপদেষ্টা বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ রিজওয়ানুল ইসলাম। প্রথমে সুন্দর প্রচ্ছদে মোড়ানো বইটির মলাট দেখে প্রলুব্ধ হই কিন্তু শ্রেষ্ঠত্ব যে তার ভেতরের বক্তব্যে, সেকথা একেবারে ফেলনা নয়।  বিশ্বব্যাপী চলমান ভয়াবহ সংকট—একশ বছরের ইতিহাসে গভীরতম—করোনার প্রভাব নিয়ে সম্ভবত কোনো বাংলাদেশীর লেখা প্রথম এবং বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি ও করণীয় নিয়ে নীতিনির্ধারক মহলের জন্য উপদেশ-সংবলিত বইটি সব মহলে সমাদৃত হওয়ার দাবি করতে পারে। লেখক বলছেন, ‘উল্লিখিত বিষয়গুলো নিয়ে লেখালেখি যে হচ্ছে না, তা নয়। এখানে চেষ্টা করা হয়েছে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের জন্য সহজ ভাষায়, বিশেষ করে কারিগরি বিষয়ের বিস্তারিত বর্ণনা বাদ দিয়ে প্রয়োজনীয় আলোচনা উপস্থাপিত করার। কভিড মহামারীর ফলে সৃষ্ট জীবন-জীবিকা আর অর্থনীতির ত্রিমুখী সংকট নিয়ে এ বই। সংকটের চেহারা, কর্মজগতের ওপর তার প্রভাব, সংকট কাটানোর জন্য নেয়া পদক্ষেপ এবং তাদের কার্যকারিতা, দরিদ্র এবং নিম্নবিত্ত মানুষের অবস্থা, কী করলে ভবিষ্যতে এমন অবস্থা এড়ানো যাবে—এসব প্রশ্নের আলোচনা রয়েছে এতে। সহজ ভাষায় লেখা এ বইয়ে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় উভয় পর্যায়েরই বিশ্লেষণ রয়েছে।

তিন. ‘বাতিঘর’ থেকে প্রকাশিত প্রায় ১২০ পাতার এই বইতে মোট আটটি চমত্কার অধ্যায় রয়েছে। আপাতত উল্লেখ না করলেই নয়, এমন অধ্যায়গুলো হচ্ছে সংকটে বৈশ্বিক অর্থনীতি, শ্রমবাজারে অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব, সংকটে বাংলাদেশের অর্থনীতি, বাংলাদেশের শ্রমবাজারে অর্থনৈতিক সংকটের অভিঘাত, অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন কেমন হওয়া চাই ইত্যাদি। অনেকটা গল্পের আদলে লেখা বিশ্বব্যাপী এবং বাংলাদেশে করোনার অভিঘাতের মতো খুব একটা প্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে সুলিখিত বইটি আমার মন ভরায়। লেখক দেখিয়েছেন কী প্রক্রিয়ায় প্রভাবগুলো বিভিন্ন খাত ও শ্রেণীতে সঞ্চারিত হয়ে বিশেষত দরিদ্র শ্রেণীর দুর্ভোগ বাড়ায়।

উল্লিখিত বইতে বৈশ্বিক প্রসঙ্গ ভালোভাবেই আছে। থাকবে না কেন? আমার ছাত্রছাত্রীদের বলি, করোনা এখন বিশ্বায়নের সর্বশ্রেষ্ঠ সংজ্ঞা—চীনের উহানে হাঁচি, লন্ডন ও নিউইয়র্কে কাশি। সুতরাং করোনাসংক্রান্ত আলোচনায় বৈশ্বিক অবস্থান অবধারিতভাবে এসে যায়। তবে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে বক্তব্যগুলোর ওপর দৃষ্টি দেয়া উচিত, বিশেষত অধ্যায় চার, পাঁচ ও ছয়ে। তথ্য-উপাত্তভিত্তিক প্রাঞ্জল ভাষায় বর্ণনা রয়েছে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে।

এটা বলার অবকাশ রাখে না যে করোনার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি এক গভীর খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে আছে। কয়েক দশক ধরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হারে ছেদ পড়ে যায় মহামারী থেকে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকটে, এমনকি সরকারি হিসাবেও এ হার গড়পড়তা ৫ শতাংশ। নেতিবাচক প্রভাব এসেছে চাহিদা ও সরবরাহ দুদিক থেকেই। লেখকের হিসাবে, লকডাউনের সময় মোট শ্রমশক্তির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ কর্মহীন হয়ে পড়েছিল। শুধু দেশের ভেতরে নয়, বিদেশের বিদ্যমান মন্দায় প্রবাসী শ্রমিকদের কপাল পুড়েছে। তবে সব খাতই একই রকম ঝুঁকিতে নেই কিন্তু। কৃষি খাত তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিতে এবং কম ক্ষতিগ্রস্ত আর শহরকেন্দ্রিক শিল্প-কারখানা লকডাউনে নকডডাউন। বিশেষত বিদেশী চাহিদাচালিত তৈরি পোশাক শিল্পের অবস্থা অনেকটা নড়বড়ে।

চার. লেখকের মতে, ঝুঁকি ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা বিচার করলে বিভিন্ন খাতকে কয়েকটি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়, যেমন (ক) উঁচ্চ ঝুঁকি এবং কঠিন আঘাত: শিল্প, নির্মাণ, পরিবহন, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়, হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং ব্যক্তিগত সেবা; (খ) মাঝারি ঝুঁকি এবং আঘাত: আর্থিক সেবা, রিয়েল এস্টেট, শিক্ষা; (গ) কম ঝুঁকি এবং আঘাত: কৃষি, স্বাস্থ্য, তথ্য ও যোগাযোগ। শ্রমশক্তির জরিপ থেকে পাওয়া বিভিন্ন খাতে কর্মসংস্থানের উপাত্তের ভিত্তিতে বর্তমান লেখকের হিসাব এই যে, মোট কর্মসংস্থানের ৪৯ শতাংশ উচ্চ ঝুঁকির মুখোমুখি ছিল। শহরাঞ্চলে এ অনুপাত ছিল ৬৯ শতাংশ। ২০২০ সালের লকডাউনের সময় কর্মহীনের সংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ৩৫ লাখ, যা সে সময়ের শ্রমশক্তির প্রায় ২০ শতাংশ, তৈরি পোশাক খাতে সোয়া তিন লাখ থেকে চার লাখ কর্মী কাজ হারিয়ে থাকতে পারেন।

পাঁচ. পাঠকের মনে হতে পারে এসব সনাতনী অনুসন্ধান বা অন্যদের গবেষণায় এ নিয়ে প্রচুর পর্যালোচনা আছে। তা হয়তো হবে। তবে রিজওয়ানুল ইসলাম রচিত বইতে বিভিন্ন দেশের তুলনামূলক আলোচনায় তিনটি নতুন বিষয় স্থান পেয়েছে। তিনি বলতে চেয়েছেন, ‘করোনার কারণে আয়বৈষম্য; যা আগে থেকেই বর্ধমান ছিল, তা আরো বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।’ অতীতের বড় বড় মহামারীর পরের পাঁচ বছরে আয়বৈষম্য বেড়েছে। শুধু তা-ই নয়, বিভিন্ন দেশে কোনো কোনো সরকারি পদক্ষেপ ধনীদের আয় বাড়াতে সাহায্য করেছে। কভিড-১৯ মহামারীর পরিপ্রেক্ষিতে গৃহীত অনেক সরকারি পদক্ষেপ থেকেও ধনীরাই বেশি লাভবান হচ্ছেন।’ এর পেছনে অনেক কারণ আছে, তবে দু-একটা নিম্নরূপ: এক. ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোয় নিম্ন আয়ের মানুষের বিশাল অংশগ্রহণ; সংকটকালে অর্থাৎ মন্দার সময় কম শিক্ষিতরা প্রথমে কাজ হারায়; দুই. বাড়ি থেকে কাজ করার জন্য দরিদ্রের না আছে প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, না আছে প্রণোদনা এবং তিন. পুঁজিবাজারের মাধ্যমেও আয়বৈষম্য বাড়তে পারে। লেখক মনে করেন, ‘বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও শ্রমশক্তির বৈশিষ্ট্য বৈষম্যবান্ধব, যা করোনাকালে আরো তীব্র হতে পারে।’ আয়ের মাপে সবচেয়ে নিচ থেকে ৪০ শতাংশ মানুষের অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে এবং আরো খারাপ হওয়ার আশঙ্কা আছে। তার ওপরের ২০ শতাংশ মানুষ তাদের অবস্থানে কোনো রকমে টিকে থাকার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে সবচেয়ে ওপরের দিকের ১০ শতাংশ মানুষের অবস্থার উন্নতি হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও এ ধারা বজায় থাকার সম্ভাবনা আছে। মাঝখানের ৩০ শতাংশের অবস্থায় হয়তো তেমন কোনো পরিবর্তন না-ও হতে পারে। সুতরাং সার্বিকভাবে অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ার সম্ভাবনাই বেশি। বৈষম্যের অন্য এক দিক হচ্ছে, করোনার অভিঘাত পুরুষের চেয়ে নারীর ওপর বেশি। কারণ ঝুঁকিতে থাকা খাতের কোনো কোনোটায় নারীর অংশগ্রহণ বেশি, যেমন পোশাক শিল্প, হাঁস-মুরগি এবং পশুপালন, গৃহকর্ম এবং সেবা খাতের কিছু অংশ। তাছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার ফলে মেয়েরা বাড়ির কাজে জড়িয়ে হয়তো পড়াশোনা চুকিয়ে শ্রমবাজারে দীর্ঘমেয়াদি বঞ্চনার শিকার হতে পারে। আর বাড়ি থেকে কাজ করার প্রতিবন্ধকতা তো আছেই।

ছয়. যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উপাত্ত দিয়ে লেখক দেখাতে চেয়েছেন যে নিউইয়র্ক ও লন্ডনে রোগটি বেশি ছড়িয়েছে, সেখানে যেখানে কম আয়ের মানুষের প্রাধান্য বেশি। বাংলাদেশের এক জরিপ জানায়, ঢাকা শহরের প্রায় অর্ধেক অধিবাসী করোনায় আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারে এবং বস্তি এলাকায় সেই সংখ্যা ৭৫ শতাংশ। তবে এ তথ্য নিয়ে কোনো কোনো মহলে সংশয় রয়েছে। প্রাপ্ত পরিসংখ্যান সবুদ করে না যে বাংলাদেশে মৃত্যু কিংবা আক্রান্তের হিস্যায় দরিদ্র মানুষের প্রাধান্য। আবার উল্টো প্রতিপাদ্য এই যে, দেয় পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে মৃত্যু ও আক্রান্তের হার অন্য অনেক দেশের চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম। এ দুটো হাইপোথিসিস নিয়ে প্রাথমিক তথ্যনির্ভর পর্যালোচনা বইটিকে একটা নতুন মাত্রা দিতে পারত বলে ধারণা।

সাত. কেমন করেছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন কর্মসূচিতে? প্রথমত, মহামারীতে সৃষ্ট স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির অভাব ছিল; দ্বিতীয়ত, দরিদ্রদের সহায়তা দেয়ার বেলায় শুধু দেরি হয়নি, সাহায্যের পরিমাণ কম এবং পর্যবেক্ষণে চরম দুর্বলতা ছিল; তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক সহায়তায় বড় উদ্যোক্তারা যত সহজে সাহায্য পেয়েছেন, ছোট ও মাঝারিদের বেলায় তা হয়নি; অথচ দরকার অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন।

আট. লেখকের দৃঢ় ধারণা, একদিন মেঘ কেটে যাবে, অন্ধকার চিরে আলোর রশ্মি ছড়িয়ে পড়বে। ‘অবশ্যই মহামারীর আগের স্বাস্থ্য ফিরে পেতে চাই কিন্তু তার চেয়েও ভালো কিছু দেখতে চাই তখন। আমরা চাই না যে আবার কোনো ধাক্কায় সাধারণ মানুষ এত অসহায় হয়ে পড়ুক। আমরা চাই অর্থনীতিতে এমন ব্যবস্থা থাকুক যে সাধারণ মানুষের ঘরের খুঁটি শক্ত হবে এবং তাদের সংকট মোকাবেলা করার শক্তি থাকবে।’

‘বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা,

বিপদে আমি না যেন করি ভয়।

দুঃখতাপে ব্যথিত চিতে নাই-বা দিলে সান্ত্বনা,

দুঃখে যেন করিতে পারি জয়\

 

আব্দুল বায়েস: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও অর্থনীতির অধ্যাপক

বর্তমানে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির খণ্ডকালীন শিক্ষক