বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান এবং দেশের জনগোষ্ঠীর প্রধান খাদ্যশস্য ধান। কৃষির তিনটি মৌসুমেই কমবেশি ধান উৎপাদন হয়। খরিপ-২ মৌসুমে বোনা ও রোপা আমন আবাদ হয় এবং যা মোট ধান উৎপাদনের ৩৫ শতাংশ। তাই বোনা আমন আবাদ হয় না বললেই চলে। রোপা আমন বৃষ্টিনির্ভর ফসল। ফলে কৃষকের সেচ খরচ ও উৎপাদন খরচ খুবই কম। অন্যদিকে অসম ও অনিশ্চিত বৃষ্টিপাতের ফলে প্রতি বছরই অনেক এলাকায় রোপা আমনে খরা আক্রান্ত হতে দেখা যায়। যার ফলে খরা আক্রান্ত এলাকায় রোপা আমনের ফলন ১৫-৬০ শতাংশ কমে যায়। বাংলাদেশে মোট ২৯টি কৃষি পরিবেশ অঞ্চল (এইজেড) নিয়ে গঠিত, ফলে ভূমির প্রকৃতি ও পানি ধারণক্ষমতার ভিন্ন রূপ পরিলক্ষিত হয়। তাই কৃষকরা উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমিতে রোপা আমন আবাদ করে থাকে। ২০২২-২৩ সালে রোপা আমন আবাদ ৫৬ দশমিক ৫৭ লাখ হেক্টর এবং উৎপাদন (চাল) ১ দশমিক ৬৭ কোটি মেট্রিক টন অর্জিত হয়। ২০২৩-২৪ সালে মোট ৫৬ দশমিক ৫৯ লাখ হেক্টর জমিতে রোপা আমনের আবাদ ও ১৬৮ দশমিক ২৯ লাখ টন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা সামগ্রিক উৎপাদনে বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যাচ্ছে। অন্যদিকে রোপা আমন খরা আক্রান্ত হলে ফলন ঘাটতিতে খাদ্য পরিস্থিতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। 

যেকোনো ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি ও স্থিতিশীল রাখার জন্য সীমিত পরিমাণ বৃষ্টিপাত ফসলের স্বাভাবিক উৎপাদন বৃদ্ধিতে মাটি পর্যাপ্ত আর্দ্রতা সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়, তখন মাটির আর্দ্রতার বিরূপ প্রভাবে ফসলের উৎপাদন হ্রাস রোধকরণে যে পরিমাণ পানি জমিতে প্রদান করা হয় তাকে সম্পূরক সেচ বলা হয়, যা শুষ্ক মৌসুমে ফসলের বৃদ্ধি পর্যায়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং পানির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়ে থাকে। 

রোপা আমনের বীজতলায় বীজ বপন সম্পূর্ণ এপ্রিল (১৫ চৈত্র-১৫ বৈশাখ) এবং পরবর্তী সময়ে বীজতলা হতে চারা সংগ্রহপূর্বক ১৫ জুলাই-১৫ আগস্ট (শ্রাবণ) পর্যন্ত রোপণ করতে হয়। অন্যথায় প্রতিদিন বিলম্বে রোপণে ফলন ঘাটতি দেখা দেয়। রোপা আমন আবাদে মাটি ২০-২৫ সেমি গভীর পর্যন্ত নরম কাদার স্তর তৈরি করতে হয়। যাতে স্তর ভেদ করে পানি নিচে চলে যেতে না পারে। জমি তৈরি হতে শুরু করে ফসল কাটা পর্যন্ত আমন ধানের বাড়-বাড়তির বিভিন্ন পর্যায়ে পানির চাহিদা ভিন্ন হয়। রোপা আমনের জীবন চক্রে জমি তৈরিতে ৩-৫ সেমি, চারা রোপণকালে ২-৩ সেমি, চারা রোপণের দিন হতে পরবর্তী ১০ দিন পর্যন্ত ৩-৫ সেমি, চারা রোপণের ১১ দিন পর হতে থোড় আসার আগ পর্যন্ত ২-৩ সেমি এবং কাঁইচ থোড় থেকে দানা বাঁধা পর্যন্ত ৫-১০ সেমি পানির প্রয়োজন হয়। ফসল কাটার ১০-১৫ দিন আগে জমি থেকে পানি অপসারণ করতে হয়। রোপা আমন জমিতে পানি আটকে থাকায় আগাছা কম হয়। ফলে ইউরিয়া সারের সঙ্গে অক্সিজেনের সংযোগ হয় না। ইউরিয়া কাদা মাটির সঙ্গে মিশে অ্যামোনিয়াম অবস্থায় থাকে, যা ধান গাছ খুবই পছন্দ করে। তাছাড়া আগাছা দমন খরচও অনেক কমে যায়।

যেকোনো এলাকায় বিরাজমান স্বাভাবিক আবহাওয়ার উপাদানগুলো হলো বৃষ্টিপাত, বাতাসের আর্দ্রতা, বাষ্পীভবন, তাপমাত্রা ইত্যাদি। আবহাওয়ার হঠাৎ স্বল্পদৈর্ঘ্য সময়ের জন্য নিম্নমুখী-ঊর্ধ্বমুখী ছন্দপতনে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য মাটিতে প্রয়োজনীয় রসের ঘাটতির সৃষ্টি হলে সেই অবস্থাকে খরা বলে। খরার কারণ হলো—ক) সাময়িক অনাবৃষ্টি, খ) মাটিতে রসের অভাব, গ) প্রখর সূর্যের তাপ ও ঘ) মাটিতে আচ্ছাদনের অভাব। ওই পরিস্থিতিতে ফলনহানিসহ সার্বিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো বিপর্যস্ত হয়ে যেতে পারে।

খরাকে তিন শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়:

ক) আবহাওয়াসংশ্লিষ্ট খরা: একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য সময়ে বৃষ্টিপাতের অভাব ও শুষ্কাবস্থাকে আবহাওয়াসংশ্লিষ্ট খরা বলা হয়। আমেরিকান মেটেওরোলজিক্যাল সোসাইটির মতে, খরা একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য সময়ে বিরাজমান রুক্ষ ও শুষ্ক আবহাওয়াজনিত কারণে অস্বাভাবিক জলাভাবকে বোঝায়।

খ) ভূগর্ভস্থ জলাভাবজনিত খরা: এলাকার একটি নির্দিষ্ট সময়ে দৈনন্দিন চাহিদা পূরণের জন্য ভূপৃষ্ঠ ও ভূগর্ভের পানির ঘাটতিকে ভূগর্ভের জলাভাবজনিত খরা বলে। এখানে আবহাওয়াজনিত খরা ও ভূগর্ভের জলাভাবজনিত খরাকে পরস্পর সম্পর্ক যুক্ত খরা বলা হয়।

গ) কৃষি খরা: বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, বাতাসের আর্দ্রতা, বাষ্পীভবন ইত্যাদি আবহাওয়ার অনুঘটকগুলোর হ্রাস-বৃদ্ধিজনিত কারণে ফসলের জীবন চক্রের যেকোনো অবস্থায় পানির অভাবে জৈবিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হয়, সেই সময়কে কৃষি খরা বলা হয়। সহজভাবে কৃষি খরা বলতে বোঝায় ফসলি মৌসুমে চাষাবাদের জন্য প্রয়োজনীয় বৃষ্টিপাত ও মাটির আর্দ্রতার অভাব। খরার প্রকৃতি, তীব্রতা ও প্রভাব বিবেচনা করে খরিপ-২ খরা চার ভাগে ভাগ করা হয়। যথা অতিতীব্র, তীব্র, মাঝারি ও সামান্য খরা। যখন রোপা আমন ফসল থোড় বা দানা বাঁধা অবস্থায় থাকে, তখন খরা হলে আমন ফসলের সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ফলন কমে যেতে পারে।

আমন মৌসুমে একটানা ১০-১৫ দিন স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত না হলে তাকে খরার পূর্বাভাস ধরে নেয়া যায়। এ পরিস্থিতিতে নিচের লক্ষণগুলো পর্যবেক্ষণ করা উচিত। যেমন—ক) জমিতে পানি আছে কিনা, থাকলে কী পরিমাণ আছে, খ) চারা রোপণের পর জমিতে দাঁড়ানোর পানি না থাকলে মাটিতে পর্যাপ্ত রস আছে কিনা। জমির বিভিন্ন জায়গা হতে ১০-১৫ সেমি গভীরতার মাটি হাতে নিয়ে চাপ দিলে তা যদি ঢেলার আকৃতি গ্রহণ না করে তাহলে তা প্রারম্ভিক খরার বলে বিবেচিত হতে পারে, গ) গাছের বাড়-বাড়তি, পাতার রঙ, উজ্জ্বলতা ও আকৃতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। খরার প্রভাবে পাতার স্বাভাবিক উজ্জ্বল্য থাকবে না। পাতা বিবর্ণ ও শুকিয়ে আসবে এবং গাছের বাড়-বাড়তি কমে যাবে, ঘ) মাটির উপরিভাগ ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। চিকন ফাটল দেখা গেলেই বুঝতে হবে মাটিতে পর্যাপ্ত রস নেই এবং ঙ) থোড় অবস্থা থেকে দানা বাঁধা অবস্থায় খরা দেখা দিলে ছড়া পুরোপুরি বের হবে না, দানায় দুধ থাকবে না, দানা চিটা হবে।

খরার পূর্ববর্তী সতর্কতা ও করণীয়: খরা থেকে ফসল রক্ষার জন্য কৃষককে বিরাজমান আবহাওয়ার পর্যবেক্ষণ এবং নিম্নরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে:

ক) মাটি ভেজা এবং গাছের শিকড় যাতে গভীরে প্রবেশ করে সেজন্য জমি গভীরভাবে চাষ দেয়া; খ) সেচের ব্যবস্থা করা (সেচনালা ও সেচযন্ত্র সচল রাখা), আর্দ্রতা সংরক্ষণ ও সেচের প্রতিবন্ধকতা দূর করা; গ) মাটি ভেজা রাখার জন্য জমিতে পর্যাপ্ত জৈব সার ব্যবহার করা; ঘ) বীজতলায় মাটির কিছুটা গভীরে বীজ বপন করা; ঙ) আর্দ্রতা সংরক্ষণে আঁচড়া, নিড়ানি বা কুপিয়ে মাটির ওপরের স্তর ভেঙে দেয়া এবং আগাছা, কচুরিপানা দিয়ে ঢেকে রাখা; জ) পুকুর, ডোবা, খাল-নালা এবং জমির আইল ১০ সেমি হতে ১৫ সেমি উঁচু, শক্ত ও মেরামত করা, যাতে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা যায়; ঝ) জমির এক কোনায় মোট আয়তনের ২-৫ শতাংশ আকারের একটি গর্ত করে বর্ষা/বন্যার পানি জমা করে খরাকালে জমিতে সেচ প্রদান করা; ঙ) নাবী জাতের রোপা আমনের পরিবর্তে আগাম রোপা আমনের চাষ করা। 

খরা মোকাবেলায় সম্পূরক সেচের গুরুত্ব: রোপণ পূর্বাবস্থা (বীজতলা তৈরি) হতে ফসল পাকা সময়ের মধ্যে যেকোনো সময় খরা হলে আমন ফসলের ফলন ব্যাপকভাবে কমে যেতে পারে। তাই বীজতলায় বীজবপন হতে ফসল পাকা অবস্থা পর্যন্ত যেকোনো সময় খরা দেখা দিলে তা নিরসনের একমাত্র উপায় ফসলে সম্পূরক সেচ প্রদান। 

খরা মোকাবেলায় সম্পূরক সেচ প্রদানের উপায়গুলো:

ক) ভূপৃষ্ঠের পানির সাহায্যে সম্পূরক সেচ:

রোপা আমন বর্ষা মৌসুমে আবাদ করা হয়। তখন নদী-নালা, খাল-বিল, ডোবা, পুকুর ও জলাশয়ে প্রচুর পরিমাণে পানি থাকে। সেই পানি সম্পূরক সেচকাজে ব্যবহার করা উচিত। 

১। আইল ব্যবস্থাপনা: রোপা আমন চাষের প্রাক্কালে জমিতে আইল বেঁধে বৃষ্টি/বন্যার পানি ধরে রেখে ৭-১০ দিনের সাময়িক খরা মোকাবেলা করা সম্ভব।

২। জমিতে ক্ষুদ্রাকার জলাধার নির্মাণ: মোট আয়তনের ২-৫ শতাংশ স্থানজুড়ে ছোট জলাধার নির্মাণ করে সম্পূরক সেচ দেয়া এবং শীতকালে কুয়াশাযুক্ত গাছের ওপর রশি টেনে কিছুটা সম্পূরক সেচের উপকারিতা পাওয়া যায়।

৩। শক্তিচালিত পাম্প (এলএলপি), সনাতনি পদ্ধতি: খরাপীড়িত জমির কাছের খাল-বিল, ডোবা-নালা, পুকুর, নদী ও জলাধার হতে শক্তিচালিত পাম্প, সনাতনি পদ্ধতিতে সম্পূরক সেচ দেয়া যায়।

খ) ভূগর্ভের পানির সাহায্যে সম্পূরক সেচ প্রদান:

১। হস্তচালিত নলকূপ: ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা ট্রেডল পাম্প, রোয়ার পাম্প ও হাত পাম্প দিয়ে সম্পূরক সেচ প্রদান করতে পারেন।

২। অগভীর নলকূপ: বোরো মৌসুমের পর যেসব অগভীর নলকূপের ইঞ্জিন/মোটর বাড়িতে সংরক্ষণ করা হয়, তা খরা মোকাবেলার জন্য মাঠে ব্যবহার করে সম্পূরক সেচ প্রদান করা সম্ভব।

৩। গভীর নলকূপ: গভীর নলকূপের ইঞ্জিন/মোটর এবং পাম্পগুলো সারা বছরই মাঠে পাম্পঘরে থাকে বিধায় খরা মোকাবেলায় খুব সহজেই সম্পূরক সেচে ব্যবহার করা সম্ভব।

গ) পানির পরিবহন পদ্ধতি: সেচকাজে পানি পরিবহন একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সেচের পানির অপচয় অধিকাংশই এখানেই সংঘটিত হয়। তাই সেচনালাগুলো বারিড পাইপ, পাকা অথবা উন্নত কাঁচা সেচনালায় পরিবর্তন করে সেচের পানির অপচয় রোধ করা যায়। সেচের পানি অপচয় রোধকল্পে ফিতা পাইপ/রাবার পাইপ ব্যবহার করে পানি সাশ্রয়ী ও সহজে সম্পূরক সেচ প্রদান করা যায়। এতে আলাদাভাবে সেচনালার প্রয়োজন হয় না ফলে খরচও অনেক কম পড়ে।

সাধারণভাবে আমন ফসলে খরার প্রভাব নিম্নরূপ:

ক) রোপা আমন আবাদের সময় শ্রাবণ-অগ্রহায়ণ। এ সময়ের মধ্যে খরা দেখা দিলে আমন ফসলের রোপণ, বাড়-বাড়তি, ফুল ফোটা, দানাবাঁধা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে; খ) মৌসুমের শুরুতেই খরা দেখা দিলে আমন রোপণ বিলম্বিত হতে পারে; গ) ফসলের বাড়ন্ত অবস্থায় খরা দেখা দিলে কুঁশির সংখ্যা বৃদ্ধি ব্যাহত, গাছের বৃদ্ধিতে বাধাপ্রাপ্ত, গাছ শুকিয়ে খাদ্য গ্রহণ ও খাদ্য প্রস্তুতি বিঘ্নিত হবে। খরা দীর্ঘায়িত হলে ফসল সম্পূর্ণ বিনষ্ট হতে পারে; ঘ) রোপা আমনে খরায় থোড় বের হওয়া, ফুল ফোটা ও দানা গঠন বিঘ্নিত এবং ফলন দারুণভাবে কমে যাবে; ঙ) খরায় নোনা জমিতে লবণাক্ততা বেড়ে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে; চ) খরায় গাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং রোগবালাইয়ের আক্রমণও বৃদ্ধি পায়।

তাই আমন চাষে কৃষক/কৃষাণিদের উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে স্বল্প ব্যয় ও শ্রমে সহজলভ্য এবং পানিসাশ্রয়ী উপায়ে সেচ প্রদান করে খাদ্যে স্বয়ম্ভরতা অর্জনে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। 

‘দিলে সেচ যাবে খরা, আমন ধানে গোলা ভরা’

মো. জিয়াউল হক: প্রকৌশলী, সাবেক সদস্য পরিচালক (ক্ষুদ্র সেচ), বিএডিসি