হয়তো জাতীয় পর্যায়ে বিখ্যাত মানুষ নন তিনি। কিন্তু তাকে চিনেন এবং জানেন, এমন মানুষ নেহাত কম নয়। যারা তাকে জানেন, তারা নিজেদের একান্ত আপনজন হিসেবে অতি সহজে ও স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে নিয়েছিল তা ছিল বহুলাংশে তার আচার-আচরণ, কথাবার্তার কারণে। আন্তরিকভাবে তাকে ভালোবাসেন। শ্রদ্ধা করেন। আমার একজন প্রিয় মানুষ ও প্রকৃত অর্থে শুভাকাঙ্খী ছিলেন তিনি। ছিলেন নিরেট ভদ্রলোক এবং ভীষণ মানবতাবাদী। এই মানুষটির মনপ্রাণও ছিল সফেদ। 

একটা ঘটনার কথা বলি। এই তো গেল রমজান মাসের কথা। করোনায় মানুষ বিপর্যস্থ। মানুষ কাজ হারিয়েছে। ছুটে গেছেন তিনি মানুষের পাশে দাঁড়াতে। তিনি তার বাসার সবাই বলে দিয়েছেন, রমজানে কারোর জন্য কিছু কেনা হবে না। অতিরিক্ত কোনো খরচ হবে না এ মাসে। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে পেনশন, উৎসব ভাতা এবং মুক্তিযোদ্ধা ভাতা যা পেয়েছেন, সবটাই তিনি খরচ করলেন দুস্থ মানুষের কল্যাণে। গরিব-দরিদ্র ও কাজ হারানো গার্মেন্ট শ্রমিকদের এসব অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছেন। সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ছিলেন, কিন্তু তিনি চলাফেরায় ছিলেন সহজ-সরল ও নিরহংকারী। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে শক্তির মানুষ ছিলেন বলে যুদ্ধাপরাধী আলী আহসান মুজাহিদ সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ছিলেন, তখন তাকে চাকরিচ্যুত করে। পরে আবার সেই চাকরি অবশ্য ফেরত পান। কিছু মানুষ আছে, যারা অন্যের দায়-দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন, তিনি ছিলেন তেমন একজন মানুষ। তার কাছে সাহায্য সহানুভূতি চেয়ে পায় নি, এমন মানুষ কম পাওয়া যাবে। এ জীবনে বহু মানুষকে বহুভাবে তিনি সাহায্য করেছেন। সবাইকে সমান চোখে দেখতেন। যখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন, তখন ছাত্র ইউনিয়নের সাথে জড়িত ছিলেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি নোয়াখালীর বসুরহাট মুজিব কলেজে অধ্যাপনা করেছিলেন। 

তিনি নোয়াখালীর হাতিয়ার দ্বীপ উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি, সোশ্যাল আপলিফটমেন্ট সোসাইটি (সাস)-এর সভাপতি এবং ভিলেজ এডুকেশন রিসোর্স সেন্টার (ভার্ক) এর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও তিনি গ্লোবাল হিউম্যান রাইটস ডিফেন্স, হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট সেন্টারসহ প্রভৃতি উন্নয়ন সংস্থার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। একজন প্রগতিশীল ও সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ হিসেবে তিনি সাভারে উদীচি শিল্পী গোষ্ঠীর সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। ঢাকায় বা সাভারে সবসময় যেকোনো প্রগতিশীল আন্দোলনের সাথে তিনি একাত্ম প্রকাশ করেছেন। একজন আদর্শবান ও গুণী মানুষ হিসেবে মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রতিষ্ঠা এবং সংস্কৃতি বিকাশের আন্দোলনে স্থানীয় পর্যায়ে জড়িত ছিলেন। ১৯৪৯ সালের ২২ আগস্ট তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মস্থান নাটোরের আত্রাইতে।  সেখানেও বিভিন্ন সামাজিক সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের জড়িত ছিলেন। সেখানে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। হয়তো বলতে চাইছিলেন-‘ও আলোর পথযাত্রী, এ যে রাত্রি, এখানে থেমো না’। জীবনে যিনি ছিলেন আপোষহীন মুক্তিযোদ্ধা। তা আন্দোলিত হচ্ছিল লাল সবুজের পাশে তালে তালে। যে স্বপ্ন দেখে গেছেন সারাজীবন ধরে।

দুই.

আমার ফুফা তিনি, বীর মুক্তিযোদ্ধা মির্জা তারেক মো. মমতাজুর রহমান। ২৭ জুন রাত আটটায় করোনা উপসর্গ নিয়ে রাজধানীর ধানমন্ডি জেনারেল হাসপাতালে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। খুব বেদনা এবং যন্ত্রণার খবর এটা। এমন কিছু মানুষ থাকেন যাঁদের জীবনটা এতই ‘জীবন্ত’ যে, তাদের মত্যু-সংবাদ মেনে নেয়াটা অন্য দশজনের ক্ষেত্রের চেয়ে অনেক দুঃসাধ্য। এ ধরনের মানুষের জীবন ও তাদের মৃত্যুর মাঝে বৈপীরত্য বা কনট্রাস্টের ছাপটি হয় অন্যদের থেকে অনেক তীক্ষè ও তীব্র। প্রয়াত এ মানুষটিরর সম্পর্কে দু’ কথা লিখতে বসে আমার মাঝে এই অনুভবটিই সর্বাগ্রে জেগে উঠছে। চিন্তা-ভাবনায়, চলন-বলনে, কথা-বার্তায়, কাজ-কর্মে যে মানুষটির মাঝে ‘জীবনের’ দীপ্ত উচ্ছ্বাস সদা-সর্বদা বিশেষরূপ উজ্জ্বলতায় প্রতিবিস্বিত থেকেছে, মৃত্যুর হিম-শীতল নিস্তব্ধতা তার ক্ষেত্রে যেন অনেক বেশি বেমানান বলে অনুভূত হয়। তিনি ইচ্ছাপোষণ করেছিলেন তাঁর পুরো শরীরটা গবেষণা কাজের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালকে দান করে দিবেন, করোনা উপসর্গ থাকার কারণে সেটি রক্ষা করা যায় নি। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় লাল-সবুজ পতাকার পাদদেশে তিনি সাভারে সমাহিত হলেন।

কয়েকদিন আগে আমরা একটি দৈনিকে মৃত রোগীর পাশে হাতিয়ার তরুণ ডাক্তার নিজামের অসহায় ছবি দেখলাম। ফুফার যখন ডেথ সার্টিফিকেট লিখছিলেন, সেই ডিউটি ডাক্তার কেঁদে দিলেন। সকালেও তিনি নাস্তা করেছিলেন, ডাক্তারের সাথে কথা বলেছিলেন। কী আশ্চর্য, তাই না!

অসম্ভব ভালোবাসতেন আমাকে। আমি যখন অসুস্থ হতাম, যখন আমার কয়েকটা সার্জারি হয়েছিলো, তিনি ছুটে এসেছিলেন আমাকে দেখতে। আমাকে নিয়ে ঘুরতে ভালোবাসতেন। আড্ডা দিতে ভালোবাসতেন। লেখালেখির শুরুতে তেমন কেউ আমাকে প্রেরণা দিতো না। তিনি সমর্থন দেয়া শুরু করেন। আমার কোনো লেখা তাঁর চোখে পড়লে, কোথাও প্রকাশিত হতে দেখলে খুব মনোযোগ দিয়ে পড়তেন। এমন প্রাণবন্ত উৎসাহ দিতেন, তাতে আমি ভীষণ শক্তি পাই। আমার কোনো লেখা প্রকাশিত হলে সামাজিক গণমাধ্যমে শেয়ার করতেন। ১৮ জুন আমার একটা লেখা শেয়ার করে লিখেছেন : ‘বাবা ইমন, চিত্রগুলো সুন্দরভাবে বর্ণনা করার জন্য ধন্যবাদ। শুভ কামনা রইলো।’  এ মানুষটাকে সবসময় পিতা সমান দেখেছি, শ্রদ্ধা করেছি। 

কতো স্মৃতির ডানা খুলে যাচ্ছে, কোনটা রেখে কোনটা বলি।  কতো গল্প, কতো কথা তাঁর সাথে হয়েছে, দিনের পর দিন পার হয়েছে, রাত পার হয়েছে, কিন্তু কথা শেষ হয়নি। যখন কথা বলতেন, খুব আনন্দ নিয়ে কথা বলতেন। তাঁর পড়ালেখা, তার জানাও ছিলো অনেক। যেকোনো বিষয়ে তিনি পড়তেন। বলতেন, ‘বাবা, জানার তো শেষ নেই।’ ১৬ ডিসেম্বর জাতীয় স্মৃতিসৌধ থেকে ফেরার পথে সাভারে তাঁর সাথে দেখা করতে যাই। আমাকে কী যে খুশি হলেন। অনেক কথা-অনেক আড্ডা সেদিন হলো। আমি বেশিসময় থাকতে পারি নি। অনেক করে বলেছিলো, থেকে যেতে। কিন্তু তাঁর কথা শুনিনি। 

একবার কোনো এক ঈদ ফুফাদের সাথে করি। ঈদের নতুন কাপড় কেনা হবে। ফুফা আমাকে, আমার ছোট ভাই ও আমার দুই ফুফাতো ভাইকে নিয়ে একটা দোকানে নিয়ে গেলেন। কাপড় কিনলেন। একই রকমের কাপড় নিয়ে দর্জি কাছে গিয়ে জামাতে বানাতে দিলেন। কখনোই নিজের ছেলে-মেয়েদের থেকে আলাদা ভাবেন নি। তিনি মনে করতেন আমরাও তাঁর সন্তান। ফুফাতো ভাই তৌহিদ-তানভীরকে নিয়ে পড়াতে বসতেন, আমাকেও পড়াতেন তিনি। ফুফাতো ভাইদেরকে বলতেন শ্রীমান। আমাকেও বলতেন।  

সব জায়গায় তিনি খুব সম্মানের সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলতেন আমার ভাতিজা। এমন মায়া আর স্নেহ আর কোথায় পাবো! আফসোসের ব্যাপার, প্রয়োজনের সময় আমরা কেউই সেভাবে কোনো সাপোর্ট দিতে পারি নাই। এই আফসোস হয়তো আমাদের সারা জীবনেও যাবে না। একদমই নীরবের নিভৃতে চলে গেলেন ফুফা, কাউকে একটুও কষ্ট না দিয়ে! ওপারে ভালো থাকবেন ফুফা! নিরহংকার এ মানুষটি পরপারের কিনারে শান্তিধামে চলে গেলেন। দৃশ্যত চলে গেলেন বলেই আরও বেশি করে রয়ে গেলেন। কিছু নাম না জানা, জানা কিছু মানুষের হৃদয়ে মৃত্তিকার পরতে পরতে। বিনম্র শ্রদ্ধা। 

তিন.

ফুফার মৃত্যুর খবর শোনার পর আরেকটি মৃত্যু সংবাদ শুনলাম। খুবই বেদনা আর মর্মাহত দিন। 

অপ্রত্যাশিতভাবে আমার এক বড় ভাই চট্টগ্রামে ড্রাগ ইন্টারন্যাশনালের ম্যানেজার পারভেজ আহমেদ সুমন ভাইও আমাদের ছেড়ে চির বিদায় নিয়েছে। সুমন ভাই নোয়াখালী শহীদ ভুলু স্টেডিয়ামে স্থাপিত করোনা হসপিটালে করোনা আক্রান্ত অবস্থায় চিকিৎসা শেষে সুস্থ হলেন। করোনা রিপোর্ট নেগেটিভ আসলো। সবই ভালো ছিলো। তারপর কর্মস্থল চট্টগ্রাম যাওয়ার দুই একদিনের মধ্যে তার অকাল প্রয়াণ। দিব্যি একজন সুস্থ মানুষ ছিলেন। কী থেকে কী হলো, কিছুই বুঝে উঠতে পারিনি। গত ২৭ মে তাঁর ছোট ভাই সুজন ভাইও করোনা আক্রান্ত হয়ে আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছেন। এর আগে ২০১৫ সালের ৩ জুন রাতে তাদের সবার বড় ভাই চলে গেছেন। এ পরিবারের সবাই এ শোক সইবার শক্তি অর্জন করুক। এ মানুষগুলো সবসময় আমাকে নিজের আপন মনে করতেন। সুমন ভাই, সুজন ভাই আমাকে ছোট ভাইয়ের মতোই স্নেহ করেছেন। তাদের ব্যবহার ছিল অমায়িক। এমনিতে সবার সাথে হাসি মুখে কথা বলতেন। তারা খুবই মিশুক ছিলেন। কিন্তু কারো মাঝের নিচুতা, সংকীর্ণতা তারা সহ্য করতে পারতেন না। এমনি ব্যক্তিত্বপূর্ণ পরিবার তারা। 

হু হু করে বাতাস বইছে, আকাশকে কালো দেখাচ্ছে। মনের ভেতর কেমন অসহ্য যন্ত্রণা আমাকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে। আমার সামনে বোধহয় কোনো দিশা থাকছে না। চুপসে যাচ্ছি আমি। নিস্প্রভ আমি। নিরবে একই খেলা দেখছি। করোনা খেলছে আমাদের প্রিয়জনদের নিয়ে। বলা নেই, কওয়া নেই, এক এক করে আমাকে না ছুঁয়ে চলে যাচ্ছে! অন্ধকার লাগছে। ঘোর অমাবস্যাকাল। চোখের সামনে একের পর একজনের হারানো শোক এবং মর্মন্তুদবেদনা গ্রাস করছে।

অনেকটা বেদনায় কাতর আমি। নির্বাক আমি। আমার দেহ থেকে একেকটা আস্তর খসে যাচ্ছে। এ যেনো মূক বাংলাদেশের এক প্রতিচ্ছবি।

লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, ঢাকা মহানগর