জীবন ও জীবিকা—এই দুই সবচেয়ে বড় সমস্যার মুখোমুখি সারা বিশ্বে। আমাদেরও একই অবস্থা। বাঁচতে চাই। বাঁচার জন্যই কাজকর্ম চাই, রোজগার চাই (ক্যাশ চাই)। বাঁচতে হলে সূর্যালোক দরকার, নির্মল বাতাস দরকার, দরকার জল। এসব আছে। কিন্তু এই ‘দেহঘড়ির’ জন্য এই তিনটি জিনিস যেমন দরকার, তেমনি দরকার আরো অনেক উপাদান; যা প্রতিদিন আমরা এই মাটি থেকে পেয়ে থাকি। চাল, ডাল, তেল, শাকসবজি, মাছ-মাংস, ডিম-দুধ—এসব ছাড়া আমরা বাঁচি না। এই বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক, চির আধুনিক স্বয়ংক্রিয় জীবন-এই দেহঘড়ি চলছে আমাদের হুকুম ছাড়া। শুধু বাইরে থেকে ‘ফুয়েল’ জোগাতে হয়। এখানেই হচ্ছে বিপদ। নভেল করোনাভাইরাস থেকে বাঁচার জন্য সারা বিশ্ব গৃহবন্দি-ঘরবন্দি। কারণ করোনা আক্রান্ত মানুষের সংস্পর্শে এলেই আক্রান্ত হতে হবে এ ভাইরাস দ্বারা। এ এক সম্পূর্ণ নতুন কথা, নতুন অভিজ্ঞতা। ডরে আমরা ঘরে ঢুকেছি। বাজারে যাই কম; যাই শুধু ওষুধের দোকানে, জরুরি প্রয়োজনে। সরকারি-বেসরকারি অফিস অধিকাংশ এখনো বন্ধ। বিচারালয় বন্ধ। দূরপাল্লার পরিবহন বন্ধ। কলকারখানা অধিকাংশ এখনো বন্ধ। আমাদের অর্থনীতির অন্যতম প্রাণবায়ু ‘গার্মেন্টস’ কারখানা খুলছে সম্প্রতি। আমদানি-রফতানি বন্ধ। বিমান চলাচলও বন্ধ। আমাদের বহির্দুনিয়ার সবকিছু বন্ধ। কেন? বাঁচতে চাই। তাই ‘লকডাউনের’ জীবন।
সমস্ত যোগাযোগ টেলিফোনে-মোবাইলে। নাতি-নাতনিদের সঙ্গে সহজ মেলামেশা বন্ধ। কারো বাড়ি-ফ্ল্যাটে যাওয়া বন্ধ। সবচেয়ে পরিতাপের বিষয়, বাবার কবরেও ছেলে যেতে পারে না। অবিশ্বাস্য রকমের ব্যবস্থা নিয়ে আমাদের সরকার, বিশ্বের সব দেশের সরকার মানুষকে বাঁচাতে চাইছে। কিন্তু প্রশ্ন, এভাবে কতদিন? কতদিন মানুষ ঘরবন্দি হয়ে থাকবে? কতদিন মানুষ কর্মহীন থাকবে? মিল-ফ্যাক্টরি, কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালত না খুললে মানুষ ‘ক্যাশ’ পাবে কোথায়? খাবে কী মানুষ? প্রাণখানি বাঁচাতে গিয়ে কি তাহলে ভাতের অভাবে মারা যেতে হবে? এ প্রশ্নের মুখোমুখি সবাই আমরা। চীন থেকে আসা এই দুর্ধর্ষ জীবাণু নভেল করোনাভাইরাসের আক্রমণ থেকেও বাঁচতে চাই, আবার ভাত-কাপড়ও চাই, স্বাভাবিক জীবনও চাই। কীভাবে তা সম্ভব? জীবাণুটির কোনো চিকিৎসা নেই। কখন কাকে কীভাবে তা আক্রমণ করে তার কোনো ঠিক নেই। অন্যান্য জীবাণুর মতোই সেও আমাদের শরীরে থাকতে চায়। তাই দরকার ‘ইমিউনিটি’। যাদের এই ক্ষমতা আছে, তারা আক্রান্ত হয়েও বেঁচে যাচ্ছেন, অনেকেই মৃত্যুকে বরণ করে নিচ্ছেন। জীবন ও জীবিকার এই যুদ্ধে ‘গোল্ডেন মিন’ বের করার কাজই এখন সবচেয়ে জরুরি।
আমাদের দরকার ক্যাশ। গরিব নিম্নবিত্ত, দোকানি, কর্মচারী, বুয়া-ড্রাইভার, পিয়ন-চাপরাশি, শ্রমিক-দিনমজুর সবারই দরকার ক্যাশ। ক্যাশ সরকার দিয়েছে, হয়তো আরো দেবে। খাদ্যও হয়তো জোগাবে। কিন্তু এর শেষ আছে। সেকথা চিন্তা করে বলা যায়, এ মুহূর্তের সবচেয়ে বেশি জরুরি কাজ হচ্ছে বোরো ফসল ঘরে তোলা। বৈশাখ শেষ হতে চলল। ধান সব পেকে গেছে। সিলেট, সুনামগঞ্জম নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের ভাটি অঞ্চলের ভয় অকালবন্যা। বন্যা হওয়ার আগেই ফসল তুলতে হবে। সারা দেশেই এখন বোরো তোলার সময়। এটা আমাদের সবচেয়ে বড় ফসল। প্রায় অর্ধেক ফসল এখানে। বাকি ফসল আসে আউশ ও আমন থেকে। বোরো তোলার প্রধান সমস্যা শ্রমিকের অভাব। এরই মধ্যে জায়গায় জায়গায় শ্রমিকের অভাব ঘটছে। সরকার যদিও কিছু ব্যবস্থা নিয়েছে। যন্ত্র পাঠানো হয়েছে। শ্রমিকও আনা হচ্ছে। কিছু ফসল ওঠে যন্ত্রের মাধ্যমে। ফসল কাটা, তা বাড়িতে নিয়ে যাওয়া, ধান আলগা করা, শুকানো থেকে শুরু করে চালে পরিণত করা পর্যন্ত আজকাল মেশিনে হয়। বড় বড় কোম্পানি যেমন এসিআই ইত্যাদি এসব যন্ত্রপাতি বিক্রি করে। সমস্যা এখন দুদিকেই। শ্রমিকের অভাব পূরণ করে উত্তরবঙ্গ। মানুষের মুভমেন্ট করতে হলে পরিবহন দরকার। লকডাউনের মধ্যে কিছু শ্রমিক নেয়া হয়েছে বটে, তবে তা যথেষ্ট নয়। অথচ বোরো আমাদের ঘরে তুলতেই হবে। এখানে এক ছটাক বোরোও নষ্ট করা যাবে না। যেমন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদি রাখা যাবে না। সামনে যে দিন আসছে, তাতে মানুষকে বাঁচাতে হলে দরকার হবে পর্যাপ্ত চাল। সরকারের হাতেও চাল থাকতে হবে। কৃষককে খেয়ে-পরে বাঁচতে হবে। যারা চাল কিনে খায়, তাদের বাঁচতে হবে। বোরো তোলার সঙ্গে সঙ্গে আউশ ফসল লাগানোর ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। আশার কথা, সরকার এক্ষেত্রে বাজেটের ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ভর্তুকি বাদেও আরো ৫ হাজার কোটি টাকার ব্যবস্থা করেছে স্বল্প সুদে। এই টাকা যাতে সাধারণ কৃষকের হাতে পৌঁছে, তার ব্যবস্থা দরকার। কয়েক দিন আগে ‘বণিক বার্তায়’ একটি রিপোর্ট দেখলাম, দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে ২ কোটি ৫ লাখ ২০ হাজার ১৩৪টি ‘প্রান্তিক’ মানুষের ‘অ্যাকাউন্ট’ আছে, এর মধ্যে কৃষকের অ্যাকাউন্ট আছে এক কোটির ওপরে। বলা বাহুল্য, সাহায্যের টাকা, ঋণের টাকা অতিসহজেই এসব অ্যাকাউন্টে দিয়ে দেয়া যায়। এতে চুরি-চামারির শঙ্কা শূন্য বলা যায়।
কৃষিকাজের ক্ষেত্রে যেমন লকডাউন ব্যবস্থায় শিথিলতা দরকার বলে মনে হয়, তেমনি রফতানিমুখী শিল্প, ওষুধ শিল্প, খাদ্যশিল্প থেকে শুরু করে বহু শিল্প আছে, যেগুলো খোলা দরকার ছিল দুই কারণে। প্রথমত, অর্থনীতি চালু করতে হলে এর বিকল্প নেই। দ্বিতীয়ত, এটি হলেই শ্রমিকের মজুরি মিলবে। এদের হাতে টাকা গেলে বাজার কিছুটা চাঙ্গা হবে। মনে রাখতে হবে ধনীদের হাতে টাকা দিলে তা বাজার সৃষ্টি করে না। গরিব, মধ্যবিত্ত, শ্রমিকশ্রেণীর মানুষের হাতে টাকা গেলে তা বাজার সৃষ্টি করবে। মনে হয় এর জন্য লকডাউন ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে ‘ফেইজ আউট’ করতে হবে। করাও হচ্ছে তা-ই। তবে সাবধানেও থাকতে হবে। সরকার প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার একটা প্রণোদনা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে, যা জিডিপির সাড়ে ৩ শতাংশ বলা হয়েছে। এর মধ্যে আছে গার্মেন্ট শ্রমিকদের তিন মাসের বেতন বাবদ ৫ হাজার কোটি টাকা, শিল্প ও সেবা খাতের ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল বাবদ ৩০ হাজার কোটি টাকা, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প খাতের ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল হিসেবে ২০ হাজার কোটি টাকা, রফতানি তহবিল থেকে ১২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা এবং প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট হিসেবে ৫ হাজার কোটি টাকা। অধিকন্তু শস্য ও ফসল খাতে ৫ হাজার কোটি টাকা, পোলট্রি খাতে ৫ হাজার কোটি টাকা। রয়েছে ডাক্তার ও নার্সদের জন্য কিছু সুবিধা। বলা বাহুল্য, বেশির ভাগ প্রণোদনার টাকা বিতরণ হবে ব্যাংকের মাধ্যমে। বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে এ সম্পর্কে গাইডলাইন জারি করেছে। এখানে একটা কথা বলে রাখতে হয়। স্বাভাবিক কাজেকর্মেই ব্যাংকের মধ্যে লাখো অনিয়ম, দুর্নীতি ঘটে। জরুরিকালীন কাজে, ক্রাশ প্রোগ্রামে এ সুযোগ বেড়ে যায়। ফান্ড সীমিত অথচ দরখাস্তকারী হবে অগণিত। এখানেই অনিয়মের সূত্রপাত। এখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কঠোর অবস্থান নিতে হবে, যাতে একটা টাকাও অপব্যয় না হয়। এখানে আরেকটা সমস্যা হতে পারে। ব্যাংকে আমানতের অভাব আছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নোট ছেপে কাজ সারতে পারে। সরকার ধার দিতে পারে ব্যাংকগুলোকে। কিন্তু দৃশ্যমান সরকারের হাতে টাকা নেই। ব্যাংকের হাতে ফান্ড কম। এ সমস্যার সমাধান দরকার। আমার প্রস্তাব আছে দুটো। এই সংকটময় মুহূর্তে আমানত বৃদ্ধির জন্য ব্যাংকগুলো ৫ শতাংশ সুদ না দিয়ে আরেকটু বেশি সুদের ব্যবস্থা করতে পারে। এতে আমানত বাড়তে পারে, সরকার কিছুটা ভর্তুকি দিয়ে ব্যাংকগুলোকে পুষিয়ে দিতে পারে। দ্বিতীয় প্রস্তাবটি সঞ্চয়পত্রবিষয়ক। সরকার বর্তমানে সঞ্চয়পত্র বিক্রি প্রায় বন্ধই করে ফেলেছে। এর বিক্রিতে নিয়মকানুনের কিছুটা শিথিলতা আনলে সরকার বেশকিছু ফান্ড পেতে পারে। বলা বাহুল্য, এসবই অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার কথা। এখানে সরকারকে বলে দিতে হবে একটা কথা। কাউকে চাকরিচ্যুত করা যাবে না। করলে জরিমানা। এটি করলে বাজারে ক্রয়ক্ষমতা অব্যাহত থাকবে। শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
বোঝাই যাচ্ছে নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের সমস্যার সমাধান হতে পারে একমাত্র টিকা-ইনজেকশন-ওষুধ দ্বারা। দীর্ঘকালীন লকডাউনের মাধ্যমে তা সম্ভব নয়। দীর্ঘকালীন লকডাউন কার্যকর রাখাও কঠিন কাজ। বাংলা নববর্ষ শুরু হয়েছে ১৪ এপ্রিল। শুরু হয়েছে পবিত্র রোজা। তারপর ঈদ। এর পরেই বার্ষিক বাজেট। এবার বাজেট নিয়ে উচ্চবাচ্য করার কিছুই নেই। এখন বড় প্রবৃদ্ধির কথা নয়। যে ক্ষতি হয়ে গেছে, তা পূরণ করতে হবে। পবিত্র রোজা যাতে মানুষ শান্তিতে পালন করতে পারে, তার ব্যবস্থা করতে হবে। এসব করতে হলে লকডাউন ব্যবস্থাকে পুনর্বিন্যস্ত করতে হবে। কখন, কোথায়, কীভাবে তা কার্যকর করা হবে, তার বিস্তারিত গাইডলাইন এখনই তৈরি করে ফেলতে হবে। ব্যবসা-বাণিজ্য-অর্থনীতি যেমন চিন্তায় থাকবে, তেমনি সামনে থাকবে মানুষের জীবনের কথা। দরকার জীবন ও জীবিকা দুয়েরই। নভেল করোনাভাইরাস থেকে উদ্ভূত সমস্যার যে আকার দেখা যাচ্ছে, তাতে বোঝাই যায় এককভাবে কোনো সরকারের পক্ষে এ সমস্যা মোকাবেলা করা সহজ নয়। কাগজে দেখলাম এক আইনজীবী সমিতি সরকারের কাছ থেকে প্রণোদনা চেয়েছে। প্রতিদিন অর্থনীতিবিদদের নানা সুপারিশ কাগজে পড়ছি। এসব গ্রহণ করতে হলে বিপুল পরিমাণ টাকার দরকার। অথচ সেই টাকা সরকারের নেই। এ অবস্থায় দেশের ধনীরা, শিল্পপতিরা বড় অবদান রাখতে পারেন। আমাদের একটি উপজেলায় কমপক্ষে ২০-২৫ জন ধনী লোক আছেন, যাদের সহায়-সম্পদ শত শত কোটি টাকা। শোনা যায়, একেকজন সংসদ সদস্য ২০-৫০-১০০ কোটি টাকা খরচ করেছেন নির্বাচনে। এ অবস্থায় তো বলাই যায়, তারা সবাই মিলে একেকটি উপজেলায় গরিবদের দুই-এক মাস খাওয়াতে পারেন। শুনি কত হাজার হাজার শত শত কোটি টাকার মালিকের কথা। দেশে নাকি রয়েছে শত শত এনজিও। এর মধ্যে বড় বেশ কয়েকটি। তারা কী করছে, এটা তো দৃশ্যমান নয়। দু-একটি এনজিও ছাড়া বাকিরা চুপ। সবাই যদি এই জাতীয় দুর্যোগে যার যার অবদান রাখি, তাহলে সমস্যা লাঘব হবে। বৈদেশিক সাহায্যের আশা করা খুব বেশি উচিত হবে না। সব দেশই ক্ষতিগ্রস্ত। সব সরকারকেই নিজ নিজ দেশের স্বার্থের প্রতি নজর দিতে হবে। এ অবস্থায় নিজের শক্তিতেই দাঁড়ানোর কথা ভাবতে হবে। মনোবল দৃঢ় রাখতে হবে।
ড. আর এম দেবনাথ: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক










