শিক্ষার মানোন্নয়ন ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ছাড়া দেশের সামগ্রিক উন্নতির কথা চিন্তা করা অনেকটা মরুভূমিতে মরীচিকার পেছনে ছোটার মতো, পুরোটাই যেন ফাঁকি। এ গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর যথাযথ তদারকি ব্যতীত দেশের অর্থনৈতিকসহ সার্বিক বিকাশ যেন আকাশকুসুম ভাবনা। কারণ মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ক্ষেত্রে শিক্ষা ব্যবস্থায় আশানুরূপ পরিবর্তন এবং এর আধুনিকায়ন আমরা ঘটাতে পারিনি। মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং এমন এক ক্ষেত্র যেখানে উন্নত প্রশিক্ষণ ও আধুনিক প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অথচ আমাদের দেশে এখনো এসবের তেমন সংস্কার ও উন্নতি ঘটেনি। ফলে একটি দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি ক্ষেত্র স্বাস্থ্য ও প্রকৌশল বিভাগের অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থীকে আমরা দেশের উন্নয়নে কাজে লাগাতে পারছি না। বাস্তবতা হলো প্রকৌশল বা মেডিকেল শিক্ষার মতো টেকনিক্যাল ডিগ্রি অর্জন করে সেই পেশায় নিয়মিত না হয়ে তরুণ সমাজ মেতে উঠেছে সরকারি মন্ত্রণালয়, পুলিশ, প্রশাসন বা ট্যাক্স ক্যাডারে ঢোকার ও অন্যান্য নন টেকনিক্যাল পেশায় যাওয়ার প্রতিযোগিতায়। কমবেশি আমরা সবাই জানি যে এসব চাকরি কেন তরুণ সমাজকে এত বেশি আকর্ষণ করছে। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম যথার্থই বলেছেন, ‘দেশে কোনো বিজ্ঞানী নেই, গবেষক নেই ,দার্শনিক নেই, যেদিকে তাকাবেন, শুধুই প্রশাসক’।
দেশের স্বাস্থ্যসেবা ও মেডিকেল শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমানের চিত্রটা কেমন সে বিষয়ে একটু কথা বলা যাক। বর্তমানে দেশের প্রায় প্রতিটা জেলায় মেডিকেল কলেজ নির্মাণের ঘোষণা এসেছে সরকারের তরফ থেকে এবং তা বাস্তবায়নের উদ্যোগও অনেক দূর এগিয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ৩৭টি পাবলিক, ৬৮টি প্রাইভেট ও ছয়টি মিলিটারি মেডিকেল কলেজ রয়েছে। এছাড়া মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় আছে পাঁচটি আর সরকারি নার্সিং কলেজ আছে সাতটি। ফলে আগের চেয়ে আরো বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থী মেডিকেলে পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন এবং যথারীতি বেড়েছে এমবিবিএস চিকিৎসকের সংখ্যা। অথচ অনেক জেলা শহর যেমন নীলফামারী, যশোর, কক্সবাজার, নোয়াখালী মেডিকেল কলেজসহ বেশ কয়েকটি সরকারি মেডিকেল কলেজের হাসপাতাল নেই। যেসব মেডিকেল কলেজের নিজস্ব হাসপাতাল নেই সেখানকার শিক্ষার্থীদের ইন্টার্ন করতে হয় সদর হাসপাতালে, যেখানে আবার নেই সব ধরনের চিকিৎসা ব্যবস্থা। ফলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা থেকে যায় অপূর্ণ। অধিকাংশ মেডিকেল কলেজে মানসম্মত ল্যাবরেটরি, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ইত্যাদিরও ঘাটতি রয়েছে। তাছাড়া সরকারি বেশির ভাগ মেডিকেল কলেজেই শিক্ষকের সংখ্যা অপর্যাপ্ত। চিকিৎসা শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোয় ৪৯ দশমিক ৭ শতাংশ সহকারী অধ্যাপকের পদ খালি রয়েছে। তাছাড়া প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় ৬৩ শতাংশ কম শিক্ষক দিয়ে চলছে আমাদের মেডিকেল শিক্ষাদান; সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই। বেশির ভাগ মেডিকেল কলেজের শিক্ষকরাও গুণগত মানসমৃদ্ধ নন। তাছাড়া দক্ষ ল্যাব পরিচালনাকারী ও অন্যান্য জনবলেও রয়েছে যথেষ্ট ঘাটতি।
মেডিকেল কলেজের সংখ্যা বাড়ানোর আগে নিশ্চিত করতে হবে যে যারা চিকিৎসকের ডিগ্রি পাচ্ছেন, তারা মানসম্পন্ন মেডিকেল শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ পেয়েই ডিগ্রিটা পাচ্ছেন। নইলে এ ব্যবস্থায় নামমাত্র মেডিকেল শিক্ষা ও ডাক্তার উভয়ই বিপজ্জনক। মেডিকেল শিক্ষা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য বিষয়ের শিক্ষাদান পদ্ধতি থেকে একেবারেই ভিন্ন প্রকৃতির। পর্যাপ্তসংখ্যক শিক্ষকের দ্বারা হাতে-কলমে পাঠদানের সুব্যবস্থা করা না হলে স্নাতক পর্যায়ের চিকিৎসক গড়ে তোলা সম্ভব নয়। মেডিকেল কলেজ স্থাপন ও পরিচালনার নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না। এ অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও বিপুলসংখ্যক বেসরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেয়া হয়েছে। ফলে দেশে মেডিকেল কলেজের সংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে এমবিবিএস শিক্ষার্থীর সংখ্যাও। কিন্তু তারা মানসম্পন্ন মেডিকেল শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ পেয়েই ডিগ্রিটা পাচ্ছেন কি? আমাদের দেশে চিকিৎসা ক্ষেত্রে গবেষণা খুব কম হয়। তাছাড়া আমাদের দেশে আধুনিক গবেষণাকাজে উৎসাহিত করার জন্য নেই কোনো প্রণোদনা। তাই স্বাস্থ্যসেবায় নেই নতুন কোনো সংযোজন। ফলে হচ্ছে না আধুনিকায়ন, বাড়ছে না চিকিৎসার মান। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ হচ্ছে, জিডিপির ৫ শতাংশের মতো অর্থ স্বাস্থ্য খাতের পরিচালনা উন্নয়নের জন্য ব্যয় করা। অথচ বাংলাদেশে যুগের পর যুগ ধরে বাজেটে জিডিপির ১ শতাংশেরও কম স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। বরাদ্দকৃত অর্থেরও সিংহভাগ (প্রায় ৭০ শতাংশ) বেতন-ভাতা ইত্যাদির মতো খাতে খরচ হয়। তার মানে বাকি অর্থ স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে ব্যবহার হওয়ার কথা, যা নিতান্তই অপ্রতুল। এছাড়া দুর্নীতি তো আছেই। দেশে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও প্রাইভেট ক্লিনিকের সংখ্যা বেড়েছে বটে, কিন্তু অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনবলের অভাব, অপর্যাপ্ত চিকিৎসা বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক বিশৃঙ্খলা, চিকিৎসা কর্মীদের অপেশাদারমূলক আচরণ, অপ্রয়োজনীয় টেস্টের নামে রোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, ভুল চিকিৎসার নামে রোগী ও তাদের আত্মীয়স্বজনকে হয়রানি করা ইত্যাদি কারণে দেশে চিকিৎসার মানের ওপর জনগণের আস্থাও কমে গেছে। এছাড়া চিকিৎসা শাস্ত্রের যতটা আধুনিকায়ন ও উন্নয়ন আশা করা হয়েছিল ঠিক ততটা করতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। অন্যদিকে সরকারি হাসপাতালে খরচ কম হলেও গরিব দুস্থ রোগীরা প্রায়ই অবহেলা ও লাঞ্ছনার শিকার হয়। বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসা খরচ আকাশচুম্বী হওয়ায় সেখানে সেবা পাওয়া নিম্নমধ্যম আয়ের জনসাধারণের সামর্থ্যের বাইরে। তাই দেশের বেশির ভাগ মানুষ এখনো বঞ্চিত হচ্ছে ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা থেকে। ভুল চিকিৎসা, চরম অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের জেরে কথায় কথায় ধনী ও সচ্ছল ব্যক্তিরা চিকিৎসাসেবার জন্য চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে। বিবিএসের এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, বিদেশে থাকা মোট বাংলাদেশী পর্যটকের ২৯ শতাংশই বিভিন্ন দেশে চিকিৎসা নিতে অর্থ ব্যয় করেছে। অথচ আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও আমাদের থেকে উন্নত ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর চিকিৎসা ব্যবস্থা রয়েছে এবং সেখানে প্রতি বছর বাংলাদেশ ছাড়াও ইরাক, মালদ্বীপ, আফগানিস্তান ও আফ্রিকান দেশগুলোর একটা বড় অংশ চিকিৎসা নিতে যায়। অথচ আমাদের দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার এমনই অবস্থা যে অন্য কেউ তো আসেই না, বরং প্রতি বছর হাজার হাজার বাংলাদেশী চিকিৎসাসেবার জন্য পাড়ি দিচ্ছে ভারতের কলকাতা ও চেন্নাইয়ে! বছর দশেক আগেও ভারতের মোট মেডিকেল পর্যটকদের একটি বিরাট অংশ আসত মালদ্বীপ থেকে, সেখানে বাংলাদেশী ছিল মাত্র ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ। অথচ বর্তমানে ভারতের মোট মেডিকেল পর্যটকের ৮০ শতাংশই বাংলাদেশী। মালদ্বীপ এ সংখ্যা কমাতে সফল হলেও আমরা পুরোপুরি ব্যর্থ! ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশীরা বিদেশে চিকিৎসার জন্য ৯ হাজার ৯৩৩ কোটি টাকা খরচ করেছে। ২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৪ লাখ ৭০ হাজার মেডিকেল পর্যটক ভারতে গেছে এবং তারা চিকিৎসা পর্যটনে ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয় করেছে। চিকিৎসা ব্যবস্থার এ অবস্থায় একদিকে যেমন দেশের টাকা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে, অন্যদিকে আমাদের দেশে চিকিৎসাশিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চিত্র যে কতটা ভয়াবহ সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। এখন প্রশ্ন হলো এত এত মেডিকেল কলেজ আর এমবিবিএস ডাক্তারদের আমরা কোনো কাজে লাগাতে পারছি না কেন? জটিল যেকোনো রোগের চিকিৎসার জন্য ভিনদেশের বিশেষজ্ঞরাই দেশের মানুষের প্রথম পছন্দ। এতটা আধুনিক ও ডিজিটাল যুগে এসেও দেশে জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য নেই প্রয়োজনীয় ও দক্ষ চিকিৎসক এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি ও পর্যাপ্ত ওষুধ।
দেশে ১৩ হাজারের মতো কমিউনিটি ক্লিনিক আছে। এছাড়া দেশের প্রতিটি উপজেলায় প্রাইমারি হাসপাতাল এবং প্রতিটি জেলায় জেলা হাসপাতাল স্থাপন করা হয়েছে। অথচ চরম অব্যবস্থাপনা ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদির অভাবে এখনো জেলা-উপজেলা পর্যায়ে বেশির ভাগ মানুষ ন্যূনতম প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। প্রত্যন্ত ও দুর্গম অঞ্চলগুলোয় চিকিৎসক শূন্যতার হার বেশি, রয়েছে প্রশিক্ষিত নার্সের অভাব। এ দেশে বড় বড় সব অনিয়ম-দুর্নীতি হয় চিকিৎসার সরঞ্জাম ও ওষুধ কেনাকাটায়। এ অনিয়ম বিশৃঙ্খলার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হলো জেলা হাসপাতাল ও কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো। তাহলে এখানকার একজন ডাক্তার তার রোগীদের যথাযথ চিকিৎসা করবেন কীভাবে? ডাক্তারদের গ্রামে না থাকার অভিযোগ বহুকালের, বহুজনের। বড় শহর থেকে দূরে মফস্বল কিংবা গ্রামাঞ্চলে পরিবার-পরিজন নিয়ে থাকার জন্য যতটুকু ব্যবস্থা থাকা দরকার তা কি করা হয়েছে? সেখানে না আছে ডাক্তারদের জন্য সুবিধাজনক থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা, যোগাযোগ ও যাতায়াত ব্যবস্থা, না আছে পর্যাপ্ত সামাজিক নিরাপত্তা। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভুগতে হয় নারী চিকিৎসকদের। কারণ সামাজিক নিরাপত্তা অবস্থা এখনো বেশ শোচনীয়, দুর্গম অঞ্চল ও ছোট শহরগুলোয়।
দেশের চিকিৎসা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে যদি যথাযথ সংস্কার অবিলম্বে না করা হয় তাহলে দেশের সামগ্রিক উন্নতি সোনার হরিণের মতো অধরাই রয়ে যাবে আজীবন। নতুন নতুন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সংখ্যা না বাড়িয়ে আধুনিক কারিকুলামের সঙ্গে যুক্ত, আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষক ও দক্ষ ল্যাব পরিচালনাকারী বাড়াতে হবে। যেহেতু এটা টেকনিক্যাল শিক্ষানির্ভর ব্যবস্থা তাই মেডিকেল কলেজগুলোয় বাড়াতে হবে ল্যাবরেটরির সংখ্যা। এছাড়া আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম ও প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সাপোর্টের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে কেউ শুধু বই মুখস্থ করে, যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়াই নামমাত্র চিকিৎসক না হন। চিকিৎসা বিষয়ে গবেষণায় আরো জোর দিতে হবে, বাড়াতে হবে প্রণোদনা। ঢাকার বাইরে জেলা শহরগুলোর মেডিকেল কলেজগুলোয় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের ওপর বিশেষ নজর রাখতে হবে, যাতে তারা অন্যদের তুলনায় পিছিয়ে না পড়েন। হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোয় শুধু চিকিৎসক নিয়োগ দিলে হবে না, বরং কর্মস্থলে তাদের ধরে রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু বেতন বাড়িয়ে চিকিৎসকদের কর্মস্থলে থাকার ব্যাপারে আকৃষ্ট করা যায় না, বরং তাদের নিরাপত্তার দিকেও নজর দিতে হবে। নারী চিকিৎসক, বিশেষ করে যারা জেলা ও ছোট শহর এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিয়োজিত তাদের আবাসিক ও কর্মস্থলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তানজিলা আমির: প্রভাষক, অর্থনীতি বিভাগ
ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি










