বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২-এর সমন্বয়কৃত জনসংখ্যার চূড়ান্ত তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯৮ লাখ ২৮ হাজার ৯১১। পৃথিবীতে অসংখ্য দেশ রয়েছে, যেগুলো আয়তনে বিশাল হলেও জনসংখ্যায় আমাদের চেয়ে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশের যুবদের সংখ্যাও ইউরোপের অনেক উন্নত রাষ্ট্রের চেয়ে ঢের বেশি। অথচ মাথাপিছু আয়, সেবার মান প্রভৃতিতে বাংলাদেশের চেয়ে তারা অনেক এগিয়ে রয়েছে। এক্ষেত্রে দুর্বলতা কোথায়? মূলত তারুণ্যনির্ভর জনগোষ্ঠীকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এর জন্য দায়ী করা হচ্ছে দুর্বল শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত এবং প্রশিক্ষণের অভাবকে। আজকের এ বিশাল কর্মক্ষম ও উদ্যমী তরুণ জনশক্তিকে জনসম্পদে পরিণত করার এখনই সময়। 

বিশ্বের যেসব দেশ জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সরকারিভাবে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে তার মধ্যে চীন অন্যতম। তারা কঠোরভাবে ‘এক সন্তান নীতি’ প্রয়োগ করেছে। আবার অনেক দেশ বা অঞ্চল রয়েছে যারা চীনের মতো কঠোর পদক্ষেপ না নিয়েও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সাফল্য অর্জন করেছে। শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, ভারতের কেরালা ও পশ্চিমবঙ্গের কথা এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যায়। এক্ষেত্রে তারা যেসব পদ্ধতি অবলম্বন করেছে তার মধ্যে রয়েছে মানুষকে সুশিক্ষিত ও সচেতন করা, স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা, শিশুমৃত্যু ও মাতৃমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারা, বাল্যবিবাহ বন্ধ করা এবং জন্মনিরোধ পদ্ধতিগুলো মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা। আশার কথা, বাংলাদেশ জনসংখ্যার বৃদ্ধি কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে কমবেশি সফলতা অর্জনকারী উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এ অর্জন সত্ত্বেও বাংলাদেশে জনসংখ্যা এখনো একটি বড় সমস্যা। কেননা এখানকার জনঘনত্বের হার সবচেয়ে বেশি। জনসংখ্যাকে সম্পদে পরিণত করার ক্ষেত্রে ঘাটতি আমাদের আর্থসামাজিক জীবনে প্রভাব ফেলেছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বাড়ছে বেকারত্ব; দারিদ্র্য, অপুষ্টি ও অশিক্ষার শিকার হচ্ছে বিপুলসংখ্যক মানুষ। একটি দেশে জনসংখ্যা তখনই সম্পদে পরিণত হয়, যখন প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করা যায়। কিন্তু এ চাহিদাগুলো পূরণে এখনো বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিকল্পনার অভাবে পুরো জনসংখ্যাকে কার্যকর জনসম্পদে পরিণত করা যাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রেই স্থবিরতা দেখা দিয়েছে, দেখা দিয়েছে বৈষম্য। জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করতে হলে এ ঘাটতিগুলো পূরণ করা অপরিহার্য।

বিপুল জনগোষ্ঠীর খাদ্যনিরাপত্তা, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থানসহ মৌলিক মানবাধিকারগুলো রক্ষার চ্যালেঞ্জের দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করে। খেয়াল করা দরকার, বিশ্বের এই মোট জনসংখ্যায় আমাদের হিস্যা কিন্তু কম বড় নয়, প্রায় ২ দশমিক ২ শতাংশ জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের। অনুপাত ও সংখ্যার বিচারে বাংলাদেশ বিশ্বের অষ্টম জনবহুল দেশ। যে দেশের জনঘনত্ব পৃথিবীতে সর্বাধিক। বর্তমান জনসংখ্যার বয়সকাঠামোর বিবেচনায় দেশে প্রায় ৬৬ শতাংশ মানুষ ১৫-৬৪ বছরের মধ্যে, যারা অর্থনৈতিকভাবে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। এ জনসংখ্যাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্প্রসারণ-জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের সর্বাধিক সুবিধা নিতে পারবে আগামী ১৫-১৬ বছর পর্যন্ত। আর তার বিপরীতে এটি ডেমোগ্রাফিক বিপর্যয়েও রূপ নিতে পারে। ফলে কী নীতি ও কৌশল প্রণয়ন এবং প্রয়োগ করা হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করবে জনসংখ্যা সম্পদ না বোঝা।

বাংলাদেশে শিল্প, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের যে কর্ম সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে সেখানে উপযুক্ত দেশীয় লোকবল সংস্থান করা যাচ্ছে না। অথচ সেগুলো বিদেশীদের দিয়ে পূরণ করা হচ্ছে। বাংলাদেশ গার্মেন্ট শিল্প একটি অতি সম্ভাবনাময় শ্রমিকনির্ভর। সেখানে মধ্যপর্যায়ের বেশির ভাগ ব্যবস্থাপক, পরিচালক, নকশাকার হিসেবে নিয়োজিতরা বিদেশী। যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছে, গার্মেন্টের বায়াররা প্রতিবেশী দেশে (যারা আমাদের গার্মেন্ট শিল্পের প্রতিদ্বন্দ্বী) বসে সে দেশের লোক নিয়োগ না করলে আমাদের বাজার হারাতে হবে—এ ধরনের একটি অঘোষিত হুমকি রয়েছে। এর ফলে দেশী শিক্ষিত বেকারকে কর্মসংস্থানের চাহিদার কারণে টানাপড়েন সৃষ্টি হয় এবং চাকরি না পেয়ে বাংলাদেশে শিক্ষিত তরুণরা হতাশায় নিমজ্জিত। একই সময়ে দেশের টেকনিক্যাল শিক্ষার পরিবর্তে সাধারণ শিক্ষার জয়যাত্রা অব্যাহত থাকায় দক্ষ জনবল সরবরাহের পরিস্থিতি এমন একটি নেতিবাচক পর্যায়ে যাচ্ছে যে দীর্ঘমেয়াদে তাতে এক করুণ ও আত্মঘাতী পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। এ সহস্রাব্দের শুরু থেকে বলতে গেলে বিশেষ করে মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল বাস্তবায়ন যখন শুরু হয়, তখন থেকে বাংলাদেশে দক্ষ জনবল বা মানবসম্পদ তৈরির প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়ে নানা উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে। দাতা সংস্থার পরামর্শ ও অর্থায়নে এরই মধ্যে বেশকিছু সংস্থা, প্রকল্প, সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ গৃহীত হলেও দৃশ্যমান দক্ষ জনবল সেভাবে যে গড়ে ওঠেনি তা বিগত দেড় দশকে বাংলাদেশে কর্মসৃজন, বিদেশে দক্ষ জনবল পাঠানোর এবং এ দেশে বিদেশীদের নিয়োগসংক্রান্ত পরিসংখ্যান থেকে প্রতিভাত।

বিগত দেড় দশকে বরং দেখা গেছে, প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে ঊর্ধ্ব ও মধ্যম পর্যায়ের ব্যবস্থাপক, পরামর্শক, সংগঠন ও কর্মী এসে বাংলাদেশে গার্মেন্টসহ বিভিন্ন আর্থিক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত হয়েছে। ফলে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে দক্ষের পরিবর্তে অদক্ষ শ্রমিক পাঠানোর মাত্রা বেড়েছে। যদিও এ দেড় দশকে দেশে পরীক্ষায় পাসনির্ভর অনেক শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর উদ্ভব ঘটেছে বা শ্রমবাজারে প্রবেশ করেছে কিন্তু উঠতি বাজারের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার মতো পর্যাপ্ত ও কার্যকর জ্ঞান দিয়ে তাদের নিয়োগ করা যায়নি এ অনুযোগে যে তারা প্রতিবেশী দেশগুলোর কর্মীদের তুলনায় চটপটে, পটু, প্রায়োগিক জ্ঞানসম্পন্ন হওয়া থেকে পেছনে রয়েছে। এরূপ অদক্ষ, অর্ধশিক্ষিত জনসম্পদ বছর বছর তাদের চাকরির বয়স খুইয়ে স্থায়ী বেকারে পরিণত হচ্ছে।

দেশের আয়তন সীমিত—বিপরীতে জনসংখ্যা অনেক বেশি। জনঘনত্বের বিচারে পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এ দেশ। অর্থনীতিবিদরা অধিক জনঘনত্বের বিষয়টিকে কেউ কেউ ইতিবাচক হিসেবে দেখতে চান কিন্তু যেখানে জনগণের সেবার জন্য থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল, সেখানে জনগণের গুণগত জীবন ও মান উন্নয়নে বড় চ্যালেঞ্জ। ডেমোগ্রাফিক ট্রানজিশন মডেল অনুযায়ী বাংলাদেশ এখন তৃতীয় পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে জন্মহার ও মৃত্যুহার উভয়ই কমে এসেছে। বাংলাদেশের এখন জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের সময় পার করছে। হাতে আর ১৫-১৬ বছর সময় আছে জনমিতিক লভ্যাংশ সদ্ব্যবহারের। নীতিকৌশলে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নেয়া এবং তার যথাযথ বাস্তবায়ন প্রয়োজন। জনসংখ্যাকে মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে সুশিক্ষা-সুস্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও সুশাসন নিশ্চিত করা দরকার।

২০৪১ সালের মধ্যে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। এরই মধ্যে এ নিয়ে কাজ শুরু করেছে সরকার। দেশকে সমৃদ্ধ, উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যেতে হলে, জনসংখ্যার বিরাট বোঝাকে অভিশাপ মনে না করে আশীর্বাদ হিসেবে গণ্য করতে হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি শিক্ষার বিস্তারের কোনো বিকল্প নেই। কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণ-তরুণীরাই আমাদের অর্থনীতির চেহারাটা আরো বদলে দিতে পারে। দেশে তো বটেই, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভালো বেতনে চাকরি নিয়ে যেতে পারে তারা। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে উপযুক্ত এবং ভালো বেতনে চাকরির সুযোগ পেতে পারে তারা অনায়াসেই। এভাবে আমাদের প্রবাসী রেমিট্যান্স ধারায় বিপুল জোয়ার সৃষ্টি হতে পারে। তবে মধ্যপ্রাচ্য ছাড়াও বিশ্বের অন্যান্য দেশে নতুন নতুন শ্রমবাজার খুঁজে বের করে দক্ষ মানবসম্পদ পাঠাতে পারলে রেমিট্যান্স ভবিষ্যতে রেকর্ড গড়বে। বিদেশে গিয়ে অদক্ষ আধা দক্ষ শ্রমিক হিসেবে কম বেতনে যেন চাকরি করতে না হয়, প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে যাওয়া দক্ষ অভিজ্ঞ শ্রমিকদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি বেতনের চাকরি যাতে পেতে পারেন, তেমন যোগ্যতা নিয়ে বিদেশে যেতে হবে। দক্ষ জনশক্তি প্রেরণের মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানো সম্ভব। এ লক্ষ্যে সরকার এখন অনেকটাই মনোযোগী হয়েছে। বিদেশ গমনেচ্ছু শ্রমিকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে দক্ষ-যোগ্য-অভিজ্ঞ করে তোলার লক্ষ্যে এখন বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বিদেশগামীদের দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে রেমিট্যান্সের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে হলে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনশক্তির পাঠানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলেই ভবিষ্যতে রেমিট্যান্স বাড়বে বলে আশা করা যায়। বাংলাদেশ এখন সর্বক্ষেত্রে বিশ্বের রোল মডেল হিসেবে আবির্ভূত হতো। আর তাই এখন বেকারত্বকে সহনীয় মাত্রায় নিয়ে আসতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত জনশক্তি সৃষ্টি অত্যাবশ্যক। পাশাপাশি উন্নয়নকে টেকসই ও স্থায়ী রূপ দিতে কর্মপরিবেশের উপযোগী শ্রমশক্তি তৈরি করে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিসহ বিদেশী পুঁজির নিগূঢ় স্বীকার থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। নতুবা অর্থনৈতিক স্বাধীনতা আসবে না।