আমাদের দেশে রমজান মাসে দ্রব্যমূল্য আকাশচুম্বী হয়ে যায়—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে। এজন্য ব্যবসায়ীদের দায়ী করা হলেও ব্যবসায়ীরা বলছেন ভিন্ন কথা। পণ্যমূল্য স্থিতিশীল রাখার জন্য সরকারের ভূমিকাকেও তারা প্রশ্নবিদ্ধ করছেন। বস্তুত রমজান মাস আসার আগেই রমজানের প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা যেমন বাড়তি কর অব্যাহতিসহ বিভিন্ন সুবিধা চান, তেমনি সরকারের পক্ষ থেকেও বাজার মনিটরিংয়ের প্রয়োজন রয়েছে। আবার চলতি বছর ডলার সংকটে পণ্য আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলার সংকট তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে আসন্ন রমজানে বাজার স্থিতিশীল রাখার জন্য সরকার ও ব্যবসায়ীদের সম্মিলিত ভূমিকা প্রয়োজন।

বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, রমজানে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির বদনাম থেকে ব্যবসায়ীরা বের হয়ে আসতে চান। এজন্য সরকার যদি দাম কমায় তাহলে তারাও দাম কমাবে বলে জানিয়েছেন। জিনিসপত্রের দাম একবার বাড়লে ব্যবসায়ীরা আর কমান না—এ বদনাম থেকে ব্যবসায়ীরা বের হতে চান। এবার রোজায় দাম বাড়ানো হবে না ব্যবসায়ীরা এমন ঘোষণা দিতে চেয়েছেন। লাভ কম করে হলেও মানুষের কষ্ট কমানোর চেষ্টা করবেন ব্যবসায়ীরা।

পণ্যের দাম বাড়ার অনেক কারণ থাকে। বাজার নষ্ট হওয়ার ক্ষেত্রে অনেক পক্ষ যুক্ত থাকে। তাই কোনো ব্যবসায়ীর দোষ থাকলে তাকে প্রয়োজনে শাস্তি দেয়ার কথাও উঠে এসেছে।

মূলত মানুষের চাহিদাকে পুঁজি করে রমজান মাসে এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দেন। আবার বাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে ক্রেতাদের বাড়তি কেনাকাটাকেও দায়ী করা হয়। এজন্য সরকারের পক্ষ থেকেও বাড়তি কেনাকাটা করতে নিষেধ করা 

হয়ে থাকে।

রমজান মাসে যেহেতু সারা দিন উপোস থাকা হয়, সে হিসেবে এ মাসে খাবার কম খাওয়া হবে ধরে নেয়া হলেও প্রকৃতপক্ষে রোজার সময় মানুষ বেশি আহার করে। এ কারণে ভোগ্যপণ্যের চাহিদাও বৃদ্ধি পায়। এর সুযোগ নেন ব্যবসায়ীরা। বাজারে পণ্য সরবরাহে সংকট না থাকলেও সাহরি ও ইফতারের প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের মূল্য বেড়ে যায়। সাধারণ সময়ে খাবারের যে দাম থাকে, একই দাম রোজার আগে থেকেই বাড়তে থাকে। অর্থাৎ, রোজার সময় মানুষ উচ্চমূল্যে খাবার খায়। এবং এটাই নিয়তি বলে মেনে নিতে হয়, যার কোনো সমাধান আদৌ হবে কিনা বলে সাধারণ মানুষ দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কেননা এর আগেও ব্যবসায়ীরা রমজানে পণ্যের মূল্য বাড়ানো হবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েও সেটি রক্ষা করেননি। তাই ব্যবসায়ীদের আশ্বাসে ক্রেতারা আশ্বস্ত হতে পারছেন না। 

বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম দেশের দিকে তাকালে এর নজির পাওয়া যায় না। এমনকি ইসলাম ধর্ম ছাড়া অন্যান্য ধর্মের উৎসবের সময় সে ধর্মের ব্যাপক অনুসারী রয়েছে এমন দেশগুলোয় ছাড় দেয়া হয়। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের নিয়ে এ সমালোচনা দূর করার ক্ষেত্রে এবার যে কথাগুলো বলা হয়েছে সেটির বাস্তবায়ন যদি হয় তাহলে তা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

পণ্য সরবরাহের পাইপলাইন স্বাভাবিক থাকলে বাজারে সরবরাহ ঘাটতি থাকার কথা নয়। কিন্তু তার পরও কেন রমজানে দ্রব্যমূল্য বাড়ে সেটি যাচাই করা জরুরি। এ সময় পণ্য মজুদের যে কথা বলা হয়, সেটির পাশাপাশি ক্রেতাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত কেনাকাটা থেকে বিরত থাকাও জরুরি। এর সঙ্গে সরকারের ইতিবাচক অবস্থান দরকার। ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম নির্ধারণের আগে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরকারের আলোচনার কথা বলেছেন। যেমন সরকার খোলা চিনি ১০৭ ও প্যাকেটজাত ১১২ টাকা নির্ধারণ করেছে। কিন্তু তার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কোনো কথা বলেনি বলে ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন। এক্ষেত্রে চিনির দাম কীভাবে নির্ধারণ করা হলো? এ বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। রাজধানী ঢাকার মৌলভীবাজারের পাইকারি ব্যবসায়ীরাও জানেন না কিসের ওপর ভিত্তি করে চিনির দাম বাড়ানো হচ্ছে। চিনি ১০৭-১১২ টাকার বেশি মূল্যে বিক্রি করলে তার জন্য ভোক্তা অধিকারকে জরিমানা দিতে হয়। এজন্য অনেক পাইকারি ব্যবসায়ী চিনি বিক্রি ছেড়ে দিচ্ছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীরা সরকারের কাছে অনুরোধ করেছেন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে চিনিসহ নিত্যপণ্যের দাম নির্ধারণ করতে। নয়তো আগামী দিনে খাটের নিচে চিনি পাওয়া যাবে বলেও ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। 

ব্যবসায়ী নেতারা জানিয়েছেন, রমজান ছাড়া অন্য মাসগুলোয় চিনি প্রয়োজন হয় গড়ে দেড় লাখ টন। আর রমজানে তিন লাখ টন চিনি দরকার হয়। এজন্য অপরিশোধিত চিনি আমদানির অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে রমজান উপলক্ষে আমদানি প্রক্রিয়ায় বাড়তি কর মওকুফও চেয়েছেন ব্যবসায়ীরা। গত বছরের পেঁয়াজের অভিজ্ঞতার আলোকে এবার চিনির সংকট দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ পর্যাপ্ত পরিমাণ ডলার পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে এলসি হলেও সময়মতো দেনা পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। পণ্য নিয়ে এসেও জাহাজ সাগরে ভাসছে। সেটেলমেন্ট না হওয়ায় পণ্য খালাস করা যাচ্ছে না।

এমন পরিস্থিতিতে সরকারের উদার দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। এমনিতে ডলারের দাম বাড়ায় এবার আমদানি পণ্যের দাম বাড়বে, সেই সঙ্গে পর্যাপ্ত ডলার না পেলে এলসি খোলার পরও সময়মতো সেটেলমেন্ট হবে না। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারের সময়োপযোগী পদক্ষেপ দরকার। একদিকে কৃচ্ছ্রসাধন, অন্যদিকে ভবিষ্যতের জন্য রিজার্ভ সংরক্ষণ এসব বিষয়ে গুরুত্ব দেয়ার পাশাপাশি রমজানের সময় খাদ্যদ্রব্য সরবরাহে যেন সংকট না হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। এটা বোঝা যাচ্ছে যে চিনির বাজার এবার অস্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে বাজার নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিতে হবে। এর সঙ্গে বাজারে পণ্য সরবরাহে সংকটের সুযোগে কেউ যেন একচেটিয়া ব্যবসা না করতে পারে সেটিও তদারকি করা প্রয়োজন। একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, বাজারকে অবাধে ছেড়ে দিলে সেটির ফল সাধারণ জনগণের ওপর পড়বে। তাই নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের কাছে দুর্বল হলে চলবে না। আবার দেশের অর্থনীতিতে ব্যবসায়ীদের ভূমিকা থাকায় তাদেরও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি লালন করতে হবে। সব মিলিয়ে সরকার ও ব্যবসায়ী উভয় পক্ষের আন্তরিক প্রচেষ্টার মাধ্যমেই রমজান মাসে পণ্যের মূল্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকবে, আমরা সে প্রত্যাশা করি।