দেং জিয়াও পিং (২২ আগস্ট ১৯০৪—১৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭) দীর্ঘ সময় পার্টি বা সরকারের শীর্ষপদে অধিষ্ঠিত না থাকলেও মাও সে তুংয়ের মৃত্যুর পর থেকে চীনের যাত্রাপথ নির্ধারণে তিনিই ছিলেন মুখ্য ব্যক্তি। কৃষক পরিবারের সন্তান দেং ১৯২০-এর দশকে ফ্রান্সে কাজ করার পাশাপাশি শিক্ষাজীবনের উল্লেখযোগ্য অংশ পার করেন। এখানেই মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের সঙ্গে তার পরিচয়। ১৯২৩ সালে তিনি চীনা কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেন। লংমার্চসহ পার্টির নেতৃত্বাধীন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে দেং ক্রমে নেতৃত্ব পর্যায়ে উঠে আসেন। ১৯৫০-এর দশকে পার্টির মধ্যে মাও সে তুংয়ের অন্যতম প্রধান সমর্থক ছিলেন তিনি। ষাটের দশকের শুরুতে লিউ শাও চি ও দেং জিয়াও পিং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন কর্মসূচি নেন, যা উচ্চলম্ফকালীন নীতি থেকে ভিন্ন। এসব কর্মসূচির অনেকগুলো জনপ্রিয়তাও পেতে থাকে। তবে তাদের অনুসৃত অর্থনৈতিক নীতি ও কর্মসূচির সঙ্গে মাওয়ের রাজনৈতিক মতাদর্শিক অবস্থানের পার্থক্য ক্রমেই স্পষ্ট হতে থাকে। সে কারণেই সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় তারা সমালোচনার মুখে পতিত হন এবং বিভিন্ন পদ থেকে বহিষ্কৃত হন। দেংকে সে সময় কয়েক বছর এক খামারে কাজ করতে হয়।
৭০ দশকের শুরুতে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে যখন প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই সক্রিয় ভূমিকা থেকে ধীরে ধীরে সরে যেতে থাকেন, তখন বেশ ক’বছর কোণঠাসা অবস্থায় থাকা দেং জিয়াও পিংকে আবারো সামনে নিয়ে আসা হয়। সাংস্কৃতিক বিপ্লব চলাকালে সংশোধনবাদী হিসেবেই অভিহিত হলেও ১৯৭৩ সালের মার্চে দেং উপপ্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। একের পর এক বিভিন্ন দায়িত্ব প্রাপ্তি এবং অবস্থানের পদোন্নতিতে দেং ক্রমে মাও সে তুংয়ের ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন হচ্ছেন এ রকম ধারণা তৈরি হয়। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে অসুস্থতার কারণে চৌ এন লাই যখন সক্রিয় রাজনীতি থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ সরিয়ে নিতে বাধ্য হন, তখন অবস্থানগত কারণেই দেং সরকার পরিচালনার কেন্দ্রীয় অবস্থান লাভ করেন। তিনি কার্যত তখন থেকেই সরকার ও পার্টি পরিচালনা করতে থাকেন। তাছাড়া খুবই কম সময়ের ব্যবধানে দেং একাধারে সামরিক বাহিনীর চিফ অব স্টাফ, কমিউনিস্ট পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান, কেন্দ্রীয় মিলিটারি কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান পদগুলো লাভ করেন।
ক্ষমতার কেন্দ্রে দেংয়ের এ দ্রুত আরোহণ, কার্যত পুনর্বাসন, পার্টির অনেকের জন্যই বিশেষত যারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবকালে বিভিন্ন পর্যায়ে সক্রিয় ছিলেন তাদের বিস্মিত ও হতভম্ব করে। অনেক চীন বিশেষজ্ঞ মনে করেন, চৌয়ের পরামর্শেই মাও সে তুং দেংকে এসব পদে অধিষ্ঠিত করতে সম্মত হন, কেউ কেউ মনে করেন মাও দেংকে এ পর্যায়ে নিয়ে আসেন লিন পিয়াওয়ের অনুসারীদের ক্ষমতা চূর্ণ করার উদ্দেশ্যে। এ রকম ধারণাও থাকতে পারে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের বিকাশ ও সে অনুযায়ী বিভিন্ন নীতি বাস্তবায়নে দেংকেই উপযুক্ত মনে করা হয়েছিল। কেউ কেউ এটাও মনে করেন যে ‘চার কুচক্রী’ নামে অভিহিত নেতাদের কার্যক্রম নিয়ে মাও অসন্তুষ্ট ছিলেন এবং তার কাছে মনে হয়েছিল দেং অর্থনীতির বিকাশধারার জন্য যোগ্য ও দক্ষ নেতৃত্ব দিতে সক্ষম। তবে দেংকে আত্মসমালোচনা করার আহ্বান জানানো হয়।
১৯৭৬ সালের ৮ জানুয়ারি চৌ এন লাই ক্যান্সারে মৃত্যুবরণ করেন। ১৫ জানুয়ারি দেং চৌয়ের বিদায়ী অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। পার্টির প্রবীণ নেতারা সেখানে উপস্থিত থাকলেও মাও সে তুং উপস্থিত ছিলেন না, শারীরিকভাবে তিনিও তখন দুর্বল হয়ে পড়ছেন। চৌ এন লাইয়ের মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রী পদ শূন্য হয়। এ পদের জন্য বিবদমান দুই পক্ষ তখন প্রার্থী, একদিকে ‘চার কুচক্রী’ বলে কথিত বাম লাইনের ব্যক্তিরা, অন্যদিকে ডান লাইনের অনুসারী বলে কথিত দেং জিয়াও পিং। মাও তাদের কাউকে মনোনয়ন না দিয়ে এ পদে নিযুক্ত করেন অপেক্ষাকৃত অপরিচিত হুয়া গুয়ো ফেংকে। পার্টির মধ্যে দেং জিয়াও পিংবিরোধী প্রচার সে সময় আবারো জোরদার হয়। ধারণা করা হয়, এর পেছনেও মাওয়ের সমর্থন ছিল। ১৯৭৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি পার্টির ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দেংকে অপসারণ করে পররাষ্ট্র দপ্তরে নিয়োগ দেয়া হয়। ৩ মার্চ মাও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পক্ষে বক্তব্য রাখেন এবং দেংয়ের ভূমিকার সমালোচনা করেন।
প্রকৃতপক্ষে মাওয়ের মৃত্যুর পরই শুরু হয় দেং আমল। যার ধারাবাহিকতাতেই বর্তমান চীন।
মাওয়ের
মৃত্যু ও
‘চার কুচক্রীর’
পতন
চৌ এন লাইয়ের মৃত্যুর কয়েক মাসের মধ্যেই মাও সে তুং (নতুনভাবে যার উচ্চারণ নির্দেশ করা হয় মাও জে দং) মৃত্যুবরণ করেন ১৯৭৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর। এর কয়েক মাস আগে থেকেই তিনি গুরুতর অসুস্থ ছিলেন। তিনি যখন মৃত্যুবরণ করেন, তখন পার্টি ও চীনা নেতৃত্ব নিয়ে কঠিন সংঘাতে অনিশ্চয়তা চারদিকে। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় পার্টিতে যে বিভাজন ও লড়াই শুরু হয়েছিল তা স্তিমিত হলেও তার সমাপ্তি তখনো ঘটেনি। পার্টির মধ্যে কঠিন সংগ্রামের ওঠানামার মধ্যেই দেং জিয়াও পিং পার্টি নেতৃত্বে ফিরে আসেন। সাংস্কৃতিক বিপ্লবে তিনি আক্রান্ত ছিলেন, আক্রান্ত ছিলেন চৌ এন লাইও। আগেই বলেছি, সাংস্কৃতিক বিপ্লবকালে যারা মূল কর্তৃত্বে ছিলেন তাদের প্রধান লিনপিয়াও ১৯৭০ সালেই চক্রান্তকারী হিসেবে চিহ্নিত এবং নিহত হন। এরপর অনেক কিছুই পরিবর্তিত হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্কে অবনতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি ঘটে। সোভিয়েত ইউনিয়ন অভিহিত হতে থাকে ‘সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ’ নামে, অনেক সময় তারাই হয়ে দাঁড়ায় প্রধান শত্রু। চীনের অভ্যন্তরেও নীতি ও কর্মসূচিতে অগ্রাধিকারে পরিবর্তন দেখা যায়।
চৌ এন লাইয়ের মৃত্যুর পর মাও যাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অনুমোদন করেন সেই হুয়ো গুয়ো ফেং তুলনামূলকভাবে অপরিচিত ছিলেন এবং দেং জিয়াও পিংয়ের অনুসারী ছিলেন না। কিন্তু তাকে সামনে রেখেই দেং নিজেদের প্রভাব বলয় শক্ত করতে সক্ষম হন। তার ফলে খুব গুছিয়ে বিরোধীদের দমন অভিযান চালানো সম্ভব হয় এবং মাওয়ের মৃত্যুর ২৭ দিনের মাথায় ৬ অক্টোবর ‘চার কুচক্রী’ বলে অভিহিত করে গ্রেফতার করা হয় দেংবিরোধী নেতাদের। তারা হলেন জিয়াং কিং (১৯১৩-১৯৯১), ঝাং
চুনকিয়াও (১৯১৭-২০০৫), সাহিত্য
সমালোচক ইয়াও ওয়েনইউয়ান (১৯৩১-) এবং
নিরাপত্তা কর্মকর্তা ওয়ান হং ওয়েন (১৯৩৫-১৯৯২)। গ্রেফতার করার পর তাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচার শুরু হয়। সাংস্কৃতিক বিপ্লবকালে অনেক মানুষের দুর্ভোগ, অর্থনীতির ক্ষয়ক্ষতি, বিশৃঙ্খলা এবং হতাহতের জন্য তাদের দায়ী করে বিচারের সম্মুখীন করা হয়। ১৯৮১ সালে অনুষ্ঠিত বিচারে আত্মপক্ষ সমর্থনে জিয়াং ছিলেন সবচেয়ে সরব ও প্রতিবাদী। তিনি নিজেই নিজের পক্ষে যুক্তি তথ্য উপস্থাপন করেন। তাদের মূল বক্তব্য ছিল তারা মাওয়ের নির্দেশেই সব কাজ করেছেন। কিন্তু বিচারে জিয়াং ও ঝাংকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে পরে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়, অন্য দুজনকেও দীর্ঘ মেয়াদের কারাদণ্ড দেয়া হয়। উল্লেখ্য, জিয়াং কিং ছিলেন মাও সে তুংয়ের স্ত্রী। এ সময় পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়, সাংহাইসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অনেক কর্মীকেও গ্রেফতার করা হয়। এসব বিচারের বিবরণী আর প্রকাশ করা হয়নি।
পরবর্তী সময়ে কমিউনিস্ট পার্টি আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করতে থাকে যে মাও সে তুং তার শেষ বছরে জিয়াং কিং এবং তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। সে কারণে তারা মাও সে তুংয়ের মৃত্যুর পর ক্ষমতা দখলের চক্রান্ত করে। ১৯৯১ সালে প্রকাশিত পার্টির দলিলে বলা হয়েছে, ‘৬
অক্টোবর, ১৯৭৬: পার্টি ও জনগণের ইচ্ছার প্রকাশ হিসেবে কেন্দ্রীয় কমিটির পলিট ব্যুরো, এর নিউক্লিয়াস হুও কুয়ো ফেং, ইয়ে জিয়ানইং ও লি জিয়াননিয়ান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন এবং তদন্তের জন্য জিয়াং কিং, ঝাং চুনকিয়াও, ইয়াও ওয়েনইউয়ান এবং ওয়ান হং ওয়েনকে আটক করেন। এর মধ্য দিয়ে জিয়াং কিং প্রতিবিপ্লবী চক্রের পতন ঘটে। এ পদক্ষেপ সারা দেশের জনগণের পক্ষ থেকে উষ্ণ সমর্থন পায়। সর্বত্র এ ঐতিহাসিক বিজয়কে অভিনন্দন জানানোর জন্য জনসমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্য দিয়েই ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’ যা ১০ বছর ধরে উত্তাল পরিস্থিতি সৃষ্টি করছিল তার সমাপ্তি ঘটল।’
যেহেতু এরপর পার্টির কর্তৃত্ব দেং গ্রুপ পুরোপুরি করায়ত্ত করতে সক্ষম হয়, সেহেতু ওপরের বর্ণনা তাদের দিক থেকে খুবই স্বাভাবিক। একই কারণে চীন থেকে আর কখনই এ পরিস্থিতি নিয়ে অন্য কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। তবে এ নিয়ে চীনের বাইরে মাওবাদী ও বিপ্লব সমর্থক অন্যদের লেখালেখি আছে। জিয়াং কিংদের পক্ষে এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রেমন্ড লোট্টার বই। তিনি বিভিন্ন দলিলপত্র দিয়ে বলতে চেয়েছেন কথিত চার কুচক্রী আসলে মাও সে তুংয়ের আদর্শেই কাজ করেছেন। তারা যদি চার কুচক্রী হন, তাহলে মাও হচ্ছেন পঞ্চম। ঠিক এ রকম অবস্থান গ্রহণ না করলেও চার্লস বেটেলহেইম ও উইলিয়াম হিনটন সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ বেশকিছু লেখা লিখেছেন।
দেংবিরোধী মূল শক্তির পতনের পর হুয়া গুয়ো ফেং, মার্শাল ইয়ে জিয়াইং এবং দেং জিয়াও পিং নেতৃত্বের কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত হন। ১৯৭৭ সালে গঠিত পলিট ব্যুরোতে তারাসহ চারজন মার্শাল, সাতজন জেনারেলসহ সামরিক ব্যক্তিদের অবস্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক ক্ষমতাচক্রের সঙ্গে সামরিক শক্তির যোগসূত্র নির্দেশ করে।
আনু মুহাম্মদ: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়










