একসময়ে ছিল বিনিময় বাণিজ্য (বার্টার ট্রেড)। ধীরে ধীরে তা উঠে গিয়ে প্রচলন ঘটল আধো বিনিময় বাণিজ্য, আধো ক্যাশ বাণিজ্য। মোটামুটি মুক্ত বাজারই। কালের বিবর্তনে এল মিশ্র অর্থনীতি (মিক্সড ইকোনমি)। এতে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করত কিছু খাত ও শিল্প, বাকিটা ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে অর্থাৎ বেসরকারি খাতে। চলল অনেক দিন, বলা যায় আমাদের ক্ষেত্রে পুরো পাকিস্তান আমল (১৯৪৭-১৯৭১)। বলা বাহুল্য, কেউ তাতে সন্তুষ্ট ছিল না। দাবি, অর্থনীতির পুরোটা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে রাষ্ট্রকে। ব্যাংক, বীমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, আমদানি-রফতানি, বড় ব্যবসা—এ সবই থাকতে হবে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে। বাকি ছোট ও মাঝারি খাতের ব্যবসা করবেন বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীরা।
লোকমনে ধারণা ছিল, এতে অর্থনৈতিক শোষণের সুযোগ কমবে। বলা যায়, এ দাবি এত জনপ্রিয় হয় যে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ হয় এসব দাবির ভিত্তিতে। বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা এবং ছাত্রসমাজের এগারো দফা বস্তুত এসব দাবিরই প্রতিফলন। চোখে-মুখে স্বপ্ন স্বাধীন বাংলায় সবাই ভাত-কাপড় পাবে, শিক্ষার ব্যবস্থা হবে, কেউ গৃহহীন, চিকিৎসাহীন থাকবে না। নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্তের ও গরিবের সমাজ এসব কথা শুনে তাজ্জব বনে যায়। আশায় বুক বেঁধে সবাই রাস্তায় নেমে পড়ে মিশ্র অর্থনীতির নেতা আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে, যিনি ছিলেন পাকিস্তানের লৌহ মানব (১৯৫৮-১৯৬৮)। ১৯৬৮-এর পরই ১৯৬৯ সাল। গণ-অভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধ।
স্বাধীনতার পর যে সংবিধান রচিত হয়, তাতে থাকে চার স্তম্ভ—গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। বঙ্গবন্ধু ব্যাংক, বীমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, আমদানি-রফতানি বাণিজ্য জাতীয়করণ করেন। বড় ব্যবসা সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনেন। পণ্য আমদানির জন্য ‘ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের’ (টিসিবি) জন্ম হয়। অভ্যন্তরে মানুষের মধ্যে পণ্য বণ্টনের জন্য তৈরি করা হয় ‘কনজিউমার সাপ্লাইজ করপোরেশন’ (কসকর)। তাই রফতানির জন্য থাকে দুটো সংস্থা। বস্তুত পুরো অর্থনীতিই রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু বিধি বাম। ওই সময়েই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়। মূল্যস্ফীতি উঠে যায় আকাশে। লোকমনে ধারণা সৃষ্টি করা হয় স্বাধীনতা ও জাতীয়করণের এই হচ্ছে ফল। চারদিকে অবশ্য অব্যবস্থাপনা, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির শক্তিও ছিল। সংবিধানে ‘সমবায়ের’ ব্যবস্থা ছিল। মালিকানা হবে তিন ধরনের: ‘রাষ্ট্রীয়, সমবায় এবং বেসরকারি মালিকানা।’ দুঃখের ঘটনা হলো, তিনটি ব্যবস্থায় গতি ও শৃঙ্খলা আসার আগেই মূল্যস্ফীতি এবং একশ্রেণীর উচ্ছৃঙ্খল লোকের বাড়াবাড়িতে রাষ্ট্রীয় মালিকানার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে ওঠে। ধারণা হয়, রাষ্ট্রীয় মালিকানা, জাতীয়করণ করার ফলেই এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। পুনর্দাবি, সবকিছু ‘বিরাষ্ট্রীয়করণ’ করতে হবে। তবেই শান্তি! ইত্যবসরে ঘটে যায় নারকীয় ঘটনা—১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের প্রায় সব সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। বলা যায়, এটা বিরাষ্ট্রীয়করণ বা বেসরকারীকরণের উদ্বোধন পর্যায়। বাংলাদেশ ধীরে ধীরে বাজার অর্থনীতির দিকে এগোতে থাকে। বুদ্ধিজীবী, অর্থনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক, রাজনীতিবিদদের প্রভাবশালী একটি অংশ বলতে শুরু করে রাষ্ট্র কোনো ব্যবসা করবে না, রাষ্ট্র কোনো শিল্প চালাবে না। রাষ্ট্র কোনো পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ করবে না। পণ্যের দাম ঠিক হবে বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের ভিত্তিতে। তাহলে রাষ্ট্র কী করবে? রাষ্ট্র অবকাঠামো নির্মাণ করে দেবে, যাতে ব্যবসায়ীরা নির্বিঘ্নে ব্যবসা সংগঠিত করতে পারেন এবং ব্যবসা চালাতে পারেন। আর কী করবে রাষ্ট্র? রাষ্ট্র আইন-শৃঙ্খলা দেখবে। ফলে ব্যবসায়ীরা নির্বিঘ্নে ব্যবসা করতে পারবেন। রাষ্ট্র আইন করবে, বিধি করবে এমনভাবে, যাতে বেসরকারি খাতের ব্যবসা হয় নির্বিঘ্নে।
যেই কথা সেই কাজ। ধীরে ধীরে বিরাষ্ট্রীয়করণ শুরু হলো। বেসরকারি খাতে ব্যবসা, শিক্ষা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বড় ব্যবসা, আমদানি-রফতানি সবই ছেড়ে দেয়া হলো। বেসরকারি খাত ধীরে ধীরে বড় হতে শুরু করল। দুটো ব্যবসা বেসরকারি খাতকে প্রাথমিকভাবে দারুণ সাহায্য করল পুঁজি গঠনে। একটি তৈরি পোশাক রফতানি এবং অন্যটি রেমিট্যান্স। এই দুই খাতে অর্জিত টাকা দিয়ে তারা প্রভাব বিস্তার শুরু করে। ব্যাংক, বীমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তাদের প্রবেশাধিকার হয়। পাশাপাশি ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ হিসেবে বস্ত্র কারখানা হয়। চিনি, ওষুধ কোম্পানি, সিমেন্ট, ইস্পাত, বড় বড় তৈরি পোশাক কোম্পানি ইত্যাদি দেশে তৈরি হয়। তৈরি হয় কিন্তু ব্যাংকের লোনে। বাঙালির কোনো পুঁজি ছিল না। ১৯৭৬ সালে ৫ কোটি টাকা পুঁজি দিয়ে কয়েকজন মিলে একটি ফাইন্যান্স কোম্পানি করার মতো ক্ষমতাও ছিল না। এমনকি ১৯৮২-৮৩ সালে এই পরিমাণ টাকা দিয়ে একটি বেসরকারি ব্যাংক করার ক্ষমতাও ছিল বিরল। সরকারি ব্যাংকের টাকায় এসবের যাত্রা। অথচ কথা ছিল রাষ্ট্র কোনো ব্যবসা করবে না।
কিন্তু দেখা গেল, রাষ্ট্রের টাকায় বেসরকারি ব্যবসা করা যাচ্ছে, তাতে কোনো বাধা নেই। রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধাও দিতে হবে। অবকাঠামো নয়, সুদ ভর্তুকি, ঋণ পরিশোধে অধিকতর সময় প্রদান, ভ্যাট থেকে মুক্তি, কর অবকাশ, আয়কর হ্রাস থেকে শুরু করে যা যা লাগে সবই দিতে হবে বেসরকারি খাতকে। অতএব, সুবিধা দিলে তো সরকারি খাতও লাভে ব্যবসা করতে পারত। বেসরকারি খাত এখন যেসব সুবিধা পায়, সরকারি খাত কি তা পায়? সরকারি খাত কি সুদ মওকুফ পায়? সরকারের ব্যাংকগুলোকে কি সরকারি বড় বড় ‘এলসির’ কমিশন দেয়া হয়? না দেয়া হয় না। সরকারি খাতের বিপরীতে বেসরকারি খাতকে যে সুযোগ সুবিধা দেয়া হয়, তা দিয়ে এমন একটা পরিবেশ তৈরি করা যেত, যাতে প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হতে পারত। না, তা হয়নি। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ঋণের টাকা দিয়ে দেশে সরকারি খাতকে ঠকিয়ে বিশাল বেসরকারি খাত গড়ে তোলা হয়েছে। অথচ দেখা যাচ্ছে তারা এগোতে পারছে না।
আমি কথা বলছি কভিড-১৯ পূববর্তী সময়ের। কভিড-১৯ এর আলোচনা ভিন্ন আলোচনা। করোনা-পূর্ববর্তী সময়ের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের টাকায় বিশাল প্রাইভেট সেক্টর গড়ে তোলা হয়েছে। এটা করতে গিয়ে সরকার শুধু নীতিগত সমর্থন দেয়নি, আর্থিক যত সুবিধা আছে তার সবই দিয়েছে। অথচ কথা ছিল বেসরকারি খাত তাদের নিজেদের টাকায়, নিজেদের শক্তিতে ব্যবসা করবে—সরকার অবকাঠামোগত সুবিধা দেবে এবং আইন-শৃঙ্খলা জোরদার করবে। করোনা-পূববর্তী সময়ে বিশাল বিশাল শিল্প-কারখানা, মিল ফ্যাক্টরি গড়ে তোলা হয়েছে। এখন এদের বেশির ভাগেরই এমন অবস্থা যে তারা চলতে পারে না। প্রথমত, চতুর্থ পুনঃতফসিলের ব্যবস্থা করা হলো। এতে হয় না, প্রভাবশালী ও বড় বড়দের জন্য ঋণের পুনর্গঠন (রিকনস্ট্রাকশন) সুবিধা দেয়া হলো। সুদের হার কমানো হলো। ঋণ পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানো হলো। ‘গ্রেস পিরিয়ড’ দেয়া হলো। ব্যাংক মালিকদের দেয়া হলো বহুল আলোচিত কতগুলো অনৈতিক সুবিধা। প্রশ্ন হলো, এসব সুবিধা সরকারি ব্যবসাকে দেয়া যেত না কি? তারা কি এসব সুবিধা পেয়ে ব্যবসায় টিকে থাকতে পারত না। কথা উঠল, এসব হচ্ছে ঋণের উচ্চ সুদের জন্য।
ঋণের ওপর সুদের হার বেশি বলে শিল্প মালিকরা ঋণ নিয়ে খেলাপি হচ্ছেন। এত টাকা সুদ দিয়ে শিল্প করা যায় না। উদাহরণ হিসেবে বলা হলো, এসব কারণে বেসরকরি খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে না। এ খাতে বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়েছে। এতএব, কী করতে হবে? করতে হবে সুদ হ্রাস। আসল ‘নয়-ছয়’ ধারণা। ঋণের ওপর সুদ হবে নয় ভাগ, আর আমানতের ওপর সুদের হার ছয় ভাগ। অথচ মূল্যস্ফীতিই ছয় ভাগের মতো। সঞ্চয়কে নিরুৎসাহিত করা শুরু হলো। সঞ্চয়পত্রের বিক্রির ঊর্ধ্বতম সীমা ৫০ লাখে নির্ধারণ করা হলো। সুদের হার কমানো হলো। উদ্দেশ্য ‘শিল্পায়ন’। খুবই ভালো কথা। শিল্পায়নের টাকা অন্যান্য দেশে ব্যবসায়ীরা আনেন স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে। কবে থেকে সরকার বলছে স্টক এক্সচেঞ্জে যাওয়ার জন্য।
তা তো হচ্ছেই না, বরং স্টক এক্সচেঞ্জকে মৃত্যুর পথে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। এটা করে ব্যবসায়ীরা ভর করেছেন ব্যাংকের ওপর। ব্যাংক থেকেই সব টাকা নিতে হবে। সরকারও রাজি। কভিড-১৯ এসে পরিস্থিতি আরো সহজ করে দিল। প্রথমত, করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প-কারখানা ও ব্যবসাকে অর্থ দিতে হবে—দিতে হবে কম সুদে, বাকি সুদ সরকার দেবে ভর্তুকি হিসেবে। এটা বুঝলাম, কিন্তু যে শিল্প-কারখানা করোনাপূর্ব সময় থেকেই অচল, যারা ‘ওভার ক্যাপাসিটি’ তৈরি করে বসে আছে, যার কোনো ক্যাশ ফ্লো নেই, যারা সরকারের কাছে করোনার আগেই সাবেক অর্থমন্ত্রী মুহিত সাহেবের কাছে আবেদন করেছিলেন তাদের শিল্প টেকওভার করে নিতে। তাহলে তাদের সরকারি সহযোগিতা দিয়ে কি কোনো লাভ হবে? ধরা যাক, একটি মাত্র ‘লাইফ সেভিং’ যন্ত্র আছে। রোগী দুটো। একজন অপেক্ষাকৃত বৃদ্ধ, অন্যজন তরুণ। কঠিন সিদ্ধান্ত! কাকে দেয়া হবে সেই লাইফ সেভিং মেশিনের সুবিধা? চোখ বুঝে নির্মমভাবে বাঁচানো হবে তরুণকে; যার জীবনের সবটাই বাকি। কিন্তু এখন হচ্ছে কী? করোনা-পূর্ববর্তী কালের অচল এবং করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত কারখানা সবাইকে একই কাতারে আনা হচ্ছে। আবার শিল্পায়নের জন্য যে নয়-ছয় নীতি করা হয়েছে, তাতে দেখা দিচ্ছে অন্য এক অসুবিধা। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগে স্থবিরতা। বণিক বার্তার রিপোর্টে (২৮.১০.২০) দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশীরা বিনিয়োগ করার জন্য বিদেশে যাচ্ছেন। সরকারের হিসাবে তাদের বিদেশী বিনিয়োগ মাত্র ৩০ কোটি ডলার। অথচ আন্তর্জাতিক হিসাবে তা ৩০০ কোটি ডলার। এটা কেন হচ্ছে? অনেকে বলছেন, দেশে বিনিয়োগ করার মতো ক্ষেত্র নেই। সহজ কারখানা ছিল পোশাক কারখানা। বিজিএমইএর সভাপতি বলছেন (২২.০৫.১৯), আমাদের তৈরি পোশাক খাতে ‘ওভার ক্যাপাসিটি’ তৈরি হয়েছে। একেকজন ১০০ থেকে ২০০ লাইনের কারখানা বানিয়ে বসে আছেন, ফলে প্রতিযোগিতা নিজেদের মধ্যে। এটা পোশাক শিল্পের অবস্থা।
আসা যাক বড় বড় শিল্পে। গত ৮.১২.১৮ তারিখের দৈনিক বণিক বার্তার এক খবরে দেখা যাচ্ছে সিমেন্ট, চিনি, ইস্পাত ও স্পিনিংয়ে বিশাল ‘ওভার ক্যাপাসিটি’ তৈরি হয়েছে। এসব শিল্প মোটামুটি ৫০ শতাংশ সক্ষমতা ব্যবহার করতে পারছে। এর ফল কী? এদের ‘ক্যাশ ফ্লো’ নেই। ব্যাংকের টাকা ফেরত দিতে পারে না। মেশিন অলস থাকতে থাকতে নষ্ট হচ্ছে। ব্যাংক বেয়াক্কলের মতো এবং শিল্প মালিক না বুঝে, কারখানার সক্ষমতা বাড়িয়েছেন। প্রশ্ন হলো, নয়-ছয় সুদনীতির সুবিধা নিয়ে কেউ কি এখন এসব শিল্পে বিনিয়োগ করতে সাহস করবেন? করলেও কি ব্যাংক টাকা দেবে? ব্যাংকের টাকা জোগাড় হলেও কি সেই টাকা কোনো দিন পরিশোধ হবে? বলা হচ্ছে, অনেক সিমেন্ট কারখানা বন্ধ, চিনিকল বন্ধ, গার্মেন্ট কারখানা বন্ধ। এসব ‘করোনা-পূর্ববর্তী’ ঘটনা। চট্টগ্রামের পারিবারিক অনেক ব্যবসা বন্ধ হচ্ছে (১৪.০৯.২০)। মেসার্স ইলিয়াস ব্রাদার্স, আম্বিয়া, নূর জাহান, মাওলানা ও মোস্তফা গ্রুপ—এদের অবস্থা ভালো নয়। ব্যাংকগুলো এদের জন্য ডুবছে। অথচ এসব ব্যবসায়ী থেকেই ধীরে ধীরে শিল্পপতির সৃষ্টি হয়। যদি সব পারিবারিক ব্যবসা এভাবে নষ্ট হয় তাহলে ৯ শতাংশে ঋণ নিয়ে শিল্প করবে কে? ‘নাভানা’ একটা সফল ও ভালো গ্রুপ ছিল। তারা সংকটে পড়ে সরকারকে বলেছে তাদের ‘টেক ওভার’ করতে। সে অনেক দিন আগের কথা। সরকারি খাত ও বেসরকারি খাতের বস্ত্রকলগুলোর অবস্থা খারাপ। চীনা পণ্যের প্রতিযোগিতায় তারা টিকতে পারছে না। আগোরা-মীনাবাজারের মতো শপিংমলগুলো লোকসানে চলছে। ভালো ভালো ব্যাংকের অবস্থা খুবই খারাপ। ব্র্যাক ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক ইত্যাদি বাজারের ভালো ব্যাংক। তারা করোনা-পূর্ববর্তী সময় থেকেই ভুগছে। কভিড-১৯ মহামারী পরিস্থিতিকে খারাপ করেছে। জাহাজ ভাঙা শিল্প, জাহাজ নির্মাণ শিল্প থেকে অনেক উদ্যোক্তা অন্য শিল্পে এসেছিলেন। এদের অনেকেই এখন ঋণখেলাপি। আমি উদাহরণ আর বাড়াতে চাই না। আমার মূল বক্তব্য হলো, নয়-ছয় সুদনীতি করে সঞ্চয়কারীদের বারোটা বাজানো হলো, এখন এই নীতির সুবিধা নিয়ে কারা, কখন, কী শিল্প করবে—এটাই জিজ্ঞাস্য। একসময় এফবিসিআইএর সভাপতি মাতলুব আহমদ সাহেব বলেছিলেন শিল্পের গায়ে শিল্প লাগে—মানুষ শিল্প করবে কোথায়? এ প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই। তবে এর মধ্যে আশার আলো আছে। এই আলো হলো ছোট ও মাঝারি শিল্প। কয়েক দিন আগেই একটা প্রতিবেদন দেখলাম। এর শিরোনাম: ‘হালকা প্রকৌশল শিল্পের বাজার ৩০ হাজার কোটি টাকার দুই তৃতীয়াংশই আমদানিনির্ভর’। মুশকিল হচ্ছে এসব ছোট ও মাঝারি শিল্প। এতে আমাদের উদ্যোক্তাদের নজর নেই। তাদের চোখের সামনে বিলিয়ন বিলিয়ন টাকার প্রকল্প। আমাদের দরকার ছোট ও মাঝারি শিল্প। পুঁজি কম লাগবে, লোকের কর্মসংস্থান বেশি হবে। ব্যাংকের টাকা মার যাবে কম। নয়-ছয় সুদনীতি এত বেশি প্রয়োজন হবে না।
পরিশেষে প্রশ্ন, যদি বেসরকারি খাতের লোকসান সরকারকে পুষিয়ে দিতে হয়, যদি তাদেরকে আয়কর থেকে অব্যাহতি দিতে হয়, ভ্যাট ছাড় দিতে হয়, রফতানির ক্ষেত্রে কর নামমাত্র করতে হয়, সুদ মওকুফ করতে হয়, ঋণের পরিশোধ সীমা বাড়াতে হয়, বিশ্বায়নের নামে বিদেশে বৈদেশিক মুদ্রা রাখার সুযোগ দিতে হয়, তাহলে সরকারি খাতকে সমালোচনা করলাম কেন? দেখা যাচ্ছে লাভ হলে ব্যক্তিমালিকদের, লোকসান হলে সরকারের—এই হচ্ছে অবস্থা। বাজার অর্থনীতির মাতা-পিতা আমেরিকারও একই অবস্থা। ১০-১২ বছর আগে যখন আমেরিকার ব্যবসা ডুবতে বসেছে তখন বারাক ওবামা ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার দিয়ে বেসরকারি খাত রক্ষা করেছিলেন। প্রতিবাদ করেছিল আমেরিকার সাধারণ মানুষ। আমাদের টাকা দিয়ে ব্যবসায়ীদের বাঁচানো কেন? এসব প্রশ্ন এখন অভিজ্ঞতার আলোকে বিচার করা দরকার নয় কি? ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারিদের প্রতি নজর দিলে ক্ষতি হয় কী? তাদের হাতে টাকা/ঋণ পৌঁছানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করে অন্যদের দিকে নজর দিলে দোষ কোথায়? শত হোক এতে লক্ষকোটি লোকের কর্মসংস্থান অবিলম্বে ফিরে আসে।
ড. আর এম দেবনাথ: সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়










