১ সেপ্টেম্বর সারা দেশে সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি শুরু হয়েছে। হতদরিদ্রদের কাছে স্বল্পমূল্যে চাল বিতরণ করে তাদের খাদ্য সহায়তা প্রদান করা এ কর্মসূচির লক্ষ্য। এটি নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে দেশে বিদ্যমান হতদরিদ্র মানুষের তুলনায় কর্মসূচির আওতাভুক্ত হতদরিদ্রদের সংখ্যা অনেক কম হওয়ায় এ শ্রেণীভুক্ত অধিকাংশ মানুষ তথা পরিবার কর্মসূচির সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে। তাছাড়া দেশের বাজারে সব শ্রেণীর চালের বাজারে মূল্যস্ফীতির যে উচ্চহার বিরাজ করছে, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি তা নিয়ন্ত্রণ করে চালের দাম নিম্নমুখী করতে কতটা সহায়ক হবে, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।

২০১৬-১৭ অর্থবছরে শুরু হওয়া খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির গুরুত্ব বেড়ে যায় ২০১৯-২০ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধে দেশে করোনাভাইরাসের প্রকোপ দেখা দেয়ার পর। বাড়ানো হয়েছে খাদ্য বাজেটের বরাদ্দ। গত ৯ জুন বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল চলতি অর্থবছরে (২০২২-২৩) খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি সম্পর্কে সরকারের চিন্তা-ভাবনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সরকার ২০২২-২৩ অর্থবছরেও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি অব্যাহত রাখবে। ৫০ লাখ নিম্ন আয়ের পরিবারকে বছরে কর্মাভাবকালীন সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর এবং মার্চ ও এপ্রিল, অর্থাৎ পাঁচ মাসব্যাপী ১৫ টাকা কেজি দরে পরিবারপ্রতি মাসে ৩০ কেজি চাল বিতরণপূর্বক খাদ্যসহায়তা প্রদান করবে। উল্লেখ্য, এর আগে এ কর্মসূূচিতে বিতরণকৃত চালের দাম ছিল প্রতি কেজি ১০ টাকা।

খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি নীতিমালা ২০১৭ অনুযায়ী, ইউনিয়ন পর্যায়ে বসবাসরত নিম্ন আয়ের দরিদ্র জনসাধারণের মধ্যে হতদরিদ্র পরিবারগুলো এ কর্মসূচির সুবিধাভোগী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার যোগ্য। হতদরিদ্র পরিবার বলতে ভূমিহীন, কৃষিশ্রমিক, দিনমজুর, ভিক্ষুক ইত্যাদি পরিবারকে বোঝাবে। কেবল তালিকাভুক্ত ও কার্ডপ্রাপ্ত পরিবার খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির সুবিধা ভোগ করবে। যারা এ কর্মসূচির সুবিধাভোগী হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার যোগ্য নন তারা হলেন—ক. সচ্ছল ও অবস্থাপন্ন পরিবার; খ. একই পরিবারের একাধিক সদস্য; গ. ভিজিডি কর্মসূচির সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তি।

কর্মসূচি প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণে রয়েছে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে ইউনিয়ন খাদ্যবান্ধব কমিটি, জাতীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা চেয়ারম্যানকে যথাক্রমে প্রধান উপদেষ্টা এবং উপদেষ্টা রেখে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সভাপতিত্বে উপজেলা খাদ্যবান্ধব কমিটি এবং জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে জেলা খাদ্যবান্ধব মনিটরিং কমিটি। ইউনিয়ন কমিটির কাজ হলো—(ক) ওয়ার্ডভিত্তিক দারিদ্র্যের প্রকোপ, দুস্থতা ইত্যাদি বিবেচনায় উপকারভোগী পরিবার নির্বাচন ও উপজেলা কমিটির অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন; (খ) খাদ্যশস্য উত্তোলন থেকে সুবিধাভোগীদের মধ্যে বিতরণ; (গ) ইউনিয়নে ডিজিটাল সেন্টারে সুবিধাভোগীদের তালিকা প্রকাশ। উপজেলা কমিটির দায়িত্বাবলির মধ্যে রয়েছে—ক. দারিদ্র্যের প্রকোপ, দুস্থতা বিবেচনা করে ইউনিয়নভিত্তিক সুবিধাভোগীদের সংখ্যা বিভাজন; খ. ইউনিয়ন কমিটি কর্তৃক প্রণীত সুবিধাভোগীদের তালিকা যাচাই-বাছাই করে অনুমোদন প্রদান; গ. ডিলার নিয়োগ; ঘ. খাদ্যশস্য বিতরণ কার্যক্রম পরিবীক্ষণ। জেলা কমিটির দায়িত্ব হলো ক. কর্মসূচির সার্বিক পরিবীক্ষণ; খ. কর্মসূচি বাস্তবায়নে উদ্ভূত সমস্যা সমাধান।  

বর্তমানে সব শ্রেণীর চালের দামে উল্লম্ফন ঘটেছে। তবে দেশের বেশির ভাগ মানুষের প্রধান খাদ্য মোটা চালের দাম অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। টিসিবির বরাত দিয়ে ২৩ আগস্ট একটি দৈনিকের (প্রথম আলো) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাজারে এখন ১ কেজি মোটা চাল সর্বনিম্ন ৫৫, সর্বোচ্চ ৫৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা এক মাস আগের তুলনায় ১৫ শতাংশ বেশি। এর আগে ২০১৭ সালের এপ্রিলে সিলেটের হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যায় সরকারি হিসাবে ১০ লাখ টন বোরো চাল নষ্ট হলে মোটা চালের দাম কেজিতে ৫০-৫২ টাকায় উঠেছিল। ২৩ আগস্টের প্রতিবেদনে সরু চাল প্রতি কেজি ৬৫ থেকে ৮০ টাকা এবং মাঝারি চাল কেজিপ্রতি ৫৫ থেকে ৬০ টাকা বিক্রি হয় বলে উল্লেখ করা হয়। টিসিবির বরাত দিয়ে ২৭ আগস্ট অন্য একটি সূূূূত্র বলেছে, গত এক সপ্তাহে মোটা চালের দাম বেড়েছে ৬ দশমিক ৬০ শতাংশ। এতে এক কেজি মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৫ থেকে ৫৮ টাকায়। এক সপ্তাহের ব্যবধানে মাঝারি মানের চালের দাম বেড়েছে ৫ দশমিক ৪১ শতংশ। এতে এক কেজি মাঝারি মানের চালের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫৫ থেকে ৬২ টাকায়, যা এক সপ্তাহ আগে ছিল ৫৩ থেকে ৫৮ টাকা। উল্লেখ্য, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি চালুর দিনেও রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে প্রতি কেজি মোটা চাল ৫৪-৫৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে (প্রথম আলো, সেপ্টেম্বর ২)।

বাজারে চালের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে যেসব ফ্যাক্টর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, দেশে সেগুলোর অনেকটা অভাব রয়েছে। এসব ফ্যাক্টরের মধ্যে রয়েছে—এক. দেশে চাল উৎপাদনে উচ্চপ্রবৃদ্ধি হার : সরকারি তথ্য মোতাবেক, কৃষি খাতে (শস্য উপখাত, প্রাণিসম্পদ ও মত্স্য উপখাত এবং বন উপখাত নিয়ে গঠিত) প্রবৃদ্ধি হার ২০০৯-১০ অর্থবছরের ৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছরে কমে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ১৭ শতাংশে, যা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক প্রাক্কলন অনুযায়ী হ্রাস পেয়ে গত অর্থবছরে (২০২১-২২) ২ দশমিক ২০ শতাংশে নেমে আসবে। কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি হার তলানিতে পৌঁছানোর প্রভাব পড়েছে শস্য উপখাতের প্রধান ফসল চাল উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি হারে। বণিক বার্তার ২৫ জুলাই এক রিপোর্ট অনুযায়ী, জনসংখ্যা বৃদ্ধির (২০২০ সালে ১ দশমিক ৩৭ শতাংশ) চেয়ে কম হারে বাড়ছে খাদ্যশস্য উৎপাদন। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ) বাংলাদেশে চালের উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার আভাস দিয়েছে। ইউএসডিএ বলেছে, সদ্যসমাপ্ত বোরো মৌসুমে চালের উৎপাদন দাঁড়াবে ১ কোটি ৯৭ লাখ টনে। ইউএসডিএর এ আভাস সঠিক হলে বোরো চালের উৎপাদন সরকারের ২ কোটি ৯ লাখ টন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১২ লাখ টন কম হবে। ইউএসডিএর মতে, জুনে বন্যার কারণে আউশের উৎপাদনও সরকারি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম হবে। দীর্ঘ খরার কারণে চলতি আমন ফসল নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। আমন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশ চাল নিয়ে বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে পারে। দুই. কৃষক পর্যায়ে ধান উৎপাদনে ব্যয় হ্রাস: ধান উৎপাদনে ব্যয় কমলে উৎপাদক ও ভোক্তা উভয়ই লাভবান হন। কিন্তু দেখা যায়, দেশে কৃষক পর্যায়ে ধান উৎপাদন ব্যয় ক্রমে বেড়েই চলেছে। সম্প্রতি সার ও ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধিতে ধান উৎপাদন ব্যয় নতুন করে বেড়ে যাবে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে দীর্ঘ খরা ও অনাবৃষ্টি। কৃষিমন্ত্রী মো. আবদুর রাজ্জাক সম্প্রতি বলেছেন, খরা আর অনাবৃষ্টির কারণে এ বছর আমন রোপা ব্যাহত হচ্ছে। খরা আর অনাবৃষ্টির পাশাপাশি জ্বালানির দাম বেশি। গ্রামগঞ্জে অনেক সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। বিদ্যুৎ সংকট তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দেরিতে লাগানো আমনের খেত ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। ফলে আমন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। তিনি আরো বলেছেন, আগস্টের পর ধানের চারা রোপণে উৎপাদন কমে যাবে। চলতি আমন আবাদের সফলতা নিয়ে জনমনে যে হতাশা বিরাজ করছে, কৃষিমন্ত্রীর বক্তব্যে তাই ফুটে উঠেছে। তিন. চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যকর ভূমিকা: বলতে দ্বিধা নেই, দেশে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে মূলত চালকল মালিকরা। সরকার দেশে উৎপাদিত ধান-চালের খুব সামান্য পরিমাণ সংগ্রহ করায় ধান (বোরো ও আমন) কাটা-মাড়ার মৌসুমে চালকল মালিকরা সিন্ডিকেশনের মাধ্যমে কম দামে প্রচুর পরিমাণে ধান কিনে তা চালে রূপান্তর করে। সিন্ডিকেশনের মাধ্যমে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে মৌসুম শেষে অর্থাৎ সেপ্টেম্বর-নভেম্বর ও মার্চ-এপ্রিলে চালের দাম অনেকটা বাড়িয়ে দেন। বর্তমানে চালের আকাশছোঁয়া দাম এর প্রমাণ। চার. চাল আমদানি জোরদারকরণ: দেশে চলমান চাল সংকট এড়াতে চাল আমদানির কোনো বিকল্প নেই। ‘দেশ খাদ্যে স্বনির্ভরতা অর্জন করেছে’—এ রাজনৈতিক ধারণার বশবর্তী হয়ে সরকার চাল আমদানি নিয়ে প্রায়ই দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে। সময়মতো চাল আমদানি না করার খেসারত দিতে হয় জনগণকে। গত কয়েক বছরে এ অব্যবস্থার একাধিকবার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।

অর্থমন্ত্রীর ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় বর্তমান সরকারের একটানা এক যুগের শাসনামলের অর্জন নিয়ে একটি তালিকা দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘দারিদ্র্যের হার ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমে ২০ দশমিক ৫ শতাংশে এবং অতিদারিদ্র্যের হার ১০ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।’ অর্থমন্ত্রীর বক্তৃতায় ব্যবহূত এ তথ্যটি পুরনো। এ তথ্যটি করোনাভাইরাসের প্রকোপকালের আগের। এর সত্যতা মেলে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (জুলাই ২০২০-জুন ২০২৫) থেকে। এতে বলা হয়েছে, ‘২০১৯ অর্থবছরে দারিদ্র্যের হার ২০ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে বলে হিসাব করা হয়। চরম দারিদ্র্য নিরসনেও একই চিত্র দেখা যায়। ২০১৬ অর্থবছরে চরম দারিদ্র্যের হার ১২ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে কমে ২০১৯ অর্থবছরে ১০ দশমিক ৫ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে।’ গত দুই বছরে করোনার প্রাদুর্ভাবে দেশের অর্থনীতি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবং কর্মসংস্থানে মূল ভূমিকা পালনকারী বেসরকারি খাতে চাকরিচ্যুতি, বেতন-মজুরি হ্রাস এবং অন্যান্য কারণে মানুষের আয় কমেছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক জনমত জরিপ প্রতিষ্ঠান গ্যালাপ পরিচালিত ‘স্টেট অব দ্য গ্লোবাল ওয়ার্কপ্লেস ২০২১’ অনুযায়ী, করোনার সময় বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ৫৫ শতাংশ মানুষের আয় কমেছে। এর ফলে দারিদ্র্যসীমার সামান্য ওপর থাকা মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে আসে, অর্থাৎ তারা দরিদ্র শ্রেণীভুক্ত হয়ে যায়। অন্যদিকে দরিদ্ররা অতিদরিদ্রদের কাতারভুক্ত হয়। করোনাকালীন তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) কর্তৃক নতুন করে হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে (হায়েস) প্রণীত না হওয়ায় জানা যাচ্ছে না দেশে বর্তমানে দরিদ্র ও হতদরিদ্র মানুষের সংখ্যা ও শতকরা হার কত। এদিকে দেশের কয়েকটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান/সংস্থা যেমন—সিপিডি, পিপিআরসি, বিআইজিডির মতে, করোনা মহামারীর কারণে ২০২০-২১ অর্থবছরে দারিদ্র্য হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫ থেকে ৪২ শতাংশে। সেক্ষেত্রে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা দাঁড়ায় সাত কোটি বা তার ওপর। আর বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) তথ্য অনুসারে করোনার আগে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ২০ দশমিক ৫ শতাংশ। কিন্তু করোনাকালে বেড়ে হয়েছে ৪২ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে অতিদারিদ্র্য। ৯ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে তিন গুণ বেড়ে এটি ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে (যুগান্তর, ৩ সেপ্টেম্বর)। সেক্ষেত্রে অতিদরিদ্র বা হতদরিদ্র মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে কমবেশি পাঁচ কোটিতে (মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৫১ লাখ ধরে)। খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত ৫০ লাখ পরিবারে জনসংখ্যা দাঁড়াতে পারে দুই কোটি (প্রতি পরিবারে চারজন হিসাবে)। অর্থাৎ কমবেশি তিন কোটি হতদরিদ্র মানুষ এ কর্মসূচির সুবিধা থেকে বঞ্চিত।

৫০ লাখ পরিবারকে বছরে কর্মাভাবকালীন সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর এবং মার্চ ও এপ্রিল, অর্থাৎ পাঁচ মাসব্যাপী ১৫ টাকা কেজি দরে পরিবারপ্রতি মাসে ৩০ কেজি চাল বিতরণ ওই সময়কালে তাদের খাদ্যনিরাপত্তা অনেকটা নিশ্চিত করবে। তবে বছরের বাকি সাত মাস তাদের খাদ্যনিরাপত্তা যে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবে তা অনেকটা জোর দিয়ে বলা যায়। আর যে বিষয়টি অধিক গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, হতদরিদ্রদের একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যা কর্মসূচির বাইরে থেকে যাচ্ছে। আর্থিক সামর্থ্য না থাকলেও প্রয়োজনের তুলনার অর্ধেক বা তারও কম পরিমাণ চাল তারা খোলাবাজার থেকে সংগ্রহ করবে। এতে তাদের খাদ্যনিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। 

১ সেপ্টেম্বর খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি চালুর দিনে সরকার সীমিত আকারে ওএমএস কর্মসূচিও চালু করে। খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি এবং ওএমএসের মাধ্যমে খাদ্য মন্ত্রণালয় সেপ্টেম্বর-নভেম্বর সময়কালে সাশ্রয়ী মূল্যে ৭ লাখ ৬৫ হাজার টন চাল নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে বিতরণের পরিকল্পনা নিয়েছে (দ্য ডেইলি স্টার, ১ সেপ্টেম্বর)। উপরে বর্ণিত ফ্যাক্টরগুলো এবং দেশে বছরে প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ টন চালের চাহিদার বিপরীতে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে বিতরণ করা মাত্র ৭ দশমিক ৬৫ লাখ টন চাল বাজারে পণ্যটির আকাশছোঁয়া দাম হ্রাসে উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে বলে মনে হয় না। গত ২৮ আগস্ট সরকার চাল আমদানিতে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ককর ১০ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে নির্ধারণ করায় এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি এবং ওএমএস চালু হওয়ায় চালের দাম, বিশেষ করে মোটা চালের দাম কেজিতে ৪-৫ টাকা হ্রাস পেতে পারে। এর বেশি কিছু আশা করা বোধ হয় ঠিক হবে না।

 

মো. আবদুল লতিফ মণ্ডল: সাবেক খাদ্যসচিব