একটি কল্যাণরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সর্বজনীন পেনশন অন্যতম একটি অনুষঙ্গ। বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনী সুসংহত ও যুক্তিসংগত করতে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার প্রচলন অপরিহার্য। সংবিধানের ১৫ ঘ অনুচ্ছেদেও সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার অর্থাৎ বেকারত্ব, ব্যাধি বা পঙ্গুত্বজনিত কিংবা বৈধব্য, মাতৃ-পিতৃহীনতা, বার্ধক্যজনিত ও অনুরূপ পরিস্থিতির কারণে অভাবগ্রস্ততার ক্ষেত্রে সরকারি সাহায্য লাভের অধিকারের কথা স্পষ্ট উল্লেখ আছে। কয়েক বছর ধরেই সর্বজনীন পেনশন চালুর কথা জোরেশোরে আলোচিত হচ্ছিল। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের জন্য সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা প্রবর্তনের আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা দেন। এ কথা স্বীকার করতেই হবে যে প্রধানমন্ত্রীর এ পদক্ষেপ বাংলাদেশের জন্য এক যুগান্তকারী ঘটনা। আর্থসামাজিক উন্নয়নে সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের জন্য তিনি সাধুবাদ পেতেই পারেন।

সর্বজনীন পেনশন স্কিম বলতে আর্থিক অবদান বিবেচনায় না এনে নাগরিকত্ব ও বয়সের শর্ত পূরণসাপেক্ষে রাষ্ট্র কর্তৃক প্রবীণদের প্রদেয় অর্থ সুবিধাকে বোঝায়। বিশ্বের সব কল্যাণ রাষ্ট্রে প্রবীণ নাগরিকরা এ সুবিধা ভোগ করেন। সাধারণত রাজস্ব আয় থেকে এ খাতে অর্থায়ন হয়ে থাকে। ১৭৬০-১৮৪০ সময়কালে কৃষি ও বাণিজ্যিক ব্যবস্থা থেকে আধুনিক শিল্পায়নের দিকে ধাবিত হয়ে যে শিল্প বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল, তাতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিস্ময়কর পরিবর্তন ঘটে। শ্রমশক্তির বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন হয়। কৃষি থেকে শিল্পে শ্রমের স্থানান্তর ঘটে, গ্রামের মানুষ শহরমুখী হতে থাকে, যৌথ পরিবারের প্রথা ভেঙে সৃষ্টি হতে থাকে অণুপরিবার। কিন্তু একপর্যায়ে দেখা যায়, কর্মজীবন শেষে ষাটোর্ধ্ব নাগরিকদের সঙ্গী হয় একাকীত্ব আর আর্থিক অনটন। কর্মশক্তি হারানো বয়স্ক এ নাগরিকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়েই ঊনবিংশ শতাব্দীতে পেনশনের যাত্রা হয়। ১৮৮৯ সালে জার্মানির চ্যান্সেলর ভন বিসমার্ক সরকারের রাজস্ব আয় থেকে ৬৫-ঊর্ধ্ব শ্রমিকদের সবাইকে একই হারে সামাজিক পেনশনের প্রবর্তন করেন। জার্মানির যুগান্তকারী এ উদ্যোগের সাফল্য দেখে ১৮৯১ সালে ডেনমার্ক ও ১৮৯৮ সালে নিউজিল্যান্ডও সামাজিক পেনশন ব্যবস্থা চালু করে। বিংশ শতকে এসে পেনশন স্কিম আরো জনপ্রিয়তা লাভ করে। উন্নত দেশগুলো একের পর এক প্রবীণ নাগরিকদের জন্য পেনশন সুবিধা চালু করে কল্যাণ রাষ্ট্র ধারণার সূচনা ঘটায়।

বিভিন্ন দেশে বিদ্যমান পেনশন স্কিমকে মূলত দুটি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। প্রথমত, সরকারের রাজস্ব খাতের অর্থায়নে পেনশন প্রদান। দ্বিতীয়ত, ব্যক্তির আয় থেকে নির্দিষ্ট হারে অর্থ কর্তন করে নির্দিষ্ট হারে পেনশন প্রদান। বর্তমানে অনেক দেশের পেনশন ব্যবস্থায় এ দুই স্কিমেরই সংমিশ্রণ দেখা যায়। মারসার সিএফএ ইনস্টিটিউটের গ্লোবাল পেনশন সূচক ২০২১ অনুযায়ী পেনশন স্কিমের ভিত্তিতে আইসল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও ডেনমার্ক বিশ্বের শীর্ষ তিন দেশ। আইসল্যান্ডের পেনশন ব্যবস্থাকে ‘থ্রি পিলার অ্যাপ্রোচ’ বলা হয়ে থাকে। প্রথম স্তম্ভে সোশ্যাল সিকিউরিটি সিস্টেমের আওতায় সরকারি-বেসরকারি খাতের ৬৫ ও ৬৭ বছর অতিক্রান্তে বসবাসের গড় খরচের ১৫ শতাংশ পেনশন হিসেবে দেয়া হয়। দ্বিতীয় স্তম্ভে রয়েছে পেশাভিত্তিক পেনশন। আর তৃতীয় স্তম্ভের মাধ্যমে সরকার অনুমোদিত বিভিন্ন প্রাইভেট পেনশন স্কিমে পেশাভিত্তিক পেনশন, যার মাধ্যমে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ও নিয়োগকৃতদের যৌথ অর্থায়নে প্রবীণ বয়সে বসবাসের গড় খরচের ৫০-৬০ শতাংশ পেনশন হিসেবে পান। আইসল্যান্ডে বেসরকারি উদ্যোগে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত বিভিন্ন পেনশন স্কিমও বেশ জনপ্রিয়। উল্লেখ্য, বিশ্বের সবচেয়ে শান্তিময় দেশের তালিকায় প্রথমেই রয়েছে আইসল্যান্ড। এর ঠিক পরেই আছে যথাক্রমে নিউজিল্যান্ড ও ডেনমার্ক। সর্বজনীন পেনশন প্রবর্তনের অভূর্তপূর্ব সাফল্য এ তিন দেশকে যে বিশ্বের সবচেয়ে শান্তির দেশে পরিণত করেছে, সে কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম একটি উদীয়মান অর্থনীতির দেশ। নানা প্রতিকূলতা, ঘাত-প্রতিঘাত সত্ত্বেও বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা বজায় রেখেছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২০ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশের ৬ কোটি ৮৪ লাখ ১২ হাজার ৬৭৮ জন মানুষ কর্মবাজারে নিয়োজিত। বাংলাদেশের জিডিপির ৫৭ শতাংশ আনুষ্ঠানিক খাত থেকে আসে, যেখানে নিয়োজিত আছেন মোট জনসংখ্যার মাত্র ১৩ শতাংশ। অন্যদিকে মোট জিডিপির বাকি ৪৩ শতাংশ আসে অনানুষ্ঠানিক খাত থেকে, যেখানে নিয়োজিত আছেন ৮৭ শতাংশ নাগরিক। পক্ষান্তরে সরকারি ও বেসরকারি পেনশন স্কিম ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের অধীনে সরকারি খাতের ৫ শতাংশ ও বেসরকারি খাতের ৯ শতাংশ নাগরিক প্রবীণ বয়সের জন্য সুরক্ষিত আছেন। অথচ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত নাগরিকরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সত্ত্বেও প্রবীণ বয়সে তীব্র আর্থিক নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। ২০১৯ সালের হিসাবে, বাংলাদেশের ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে, যা দেশের মোট জনসংখ্যার ৮ শতাংশ। এ সংখ্যা ২০৩০ সালে দাঁড়াবে ১৮ শতাংশে এবং ২০৫০ সালে ২১ দশমিক ৯ শতাংশে। অর্থাৎ ২০৫০ সালে প্রতি পাঁচজন বাংলাদেশীর একজন প্রবীণ নাগরিক হবেন। বাংলাদেশ বর্তমানে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডে সবচেয়ে ভালো সময় পার করছে। যেহেতু ২০৩০ সালের পর থেকে নির্ভরশীল জনসংখ্যার অনুপাত বেড়ে যাবে, সেহেতু নির্ভরশীল জনসংখ্যার আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত দুরূহ হবে। এ অবস্থায় সরকার ঘোষিত সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা অত্যন্ত সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ।

দেশের ১৭ কোটি মানুষকে সর্বজনীন পেনশন প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা বেশ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। বর্তমানে প্রায় সাত কোটি মানুষ কর্মবাজারে নিয়োজিত। এদের মধ্যে ১৮-৬০ বছর বয়সীরা ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকেই পেনশন স্কিমে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন এবং পেনশনের জন্য ১০ বছর ধারাবাহিকভাবে নির্দিষ্ট পরিমাণ চাঁদা জমা দেয়ার পর মাসিক পেনশন পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করবেন। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে বর্তমানে দেশে ১৮-৬০ বছর বয়সী মানুষের সংখ্যা ৮ কোটি ৪৬ লাখ ৫৯ হাজার ৫১০। সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের সর্বজনীন পেনশন স্কিমে এখনই অন্তর্ভুক্তির কথা সরকার ভাবছে না, সে কারণে সরকারি চাকরিজীবী ১৪ লাখ মানুষকে বাদ দিলে আগামী অর্থবছরে সরকারকে আট কোটিরও বেশি মানুষকে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। যেহেতু শুরুতে সর্বজনীন পেনশন স্কিমে বাধ্যতামূলক অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারটি থাকছে না, তাই সরকারকে সম্ভাব্য পাঁচ কোটি নাগরিককে আগামী এক বছরে পেনশন স্কিমের আওতায় আনার লক্ষ্য নিয়ে এগোতে হবে। বর্তমানে মোট শ্রমশক্তির মধ্যে সরকারি খাতে কর্মরত ৫ শতাংশ নাগরিক পেনশন সুবিধার আওতায় আছেন। বেসরকারি খাতে কর্মরতদের মাত্র ৮ শতাংশ এককালীন গ্র্যাচুইটি সুবিধা পেয়ে থাকেন। সচ্ছল ব্যবসায়ী বা আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিতদের অনেকে বিভিন্ন ব্যাংক-বীমায় বেসরকারি পেনশন স্কিমে নিজেদের যুক্ত করেছেন।

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে সরকারের এ সর্বজনীন পেনশন স্কিমের উদ্দিষ্ট জনগোষ্ঠী কারা? নিঃসন্দেহে অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত দেশের শ্রমশক্তির সিংহভাগ মানুষ, যারা প্রবীণ বয়সে সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তা, সামাজিক অবহেলা ও আর্থিক নিরাপত্তাহীনতায় জীবন অতিবাহিত করেন। তবে এ অনানুষ্ঠানিক খাতকে পেনশনের আওতায় আনতে হলে পেনশন স্কিমকে সহজ ও সুলভ করতে হবে। কল্যাণ রাষ্ট্রগুলোয় সরকারি অর্থায়নে সব নাগরিককে পেনশন দেয়া হয়। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের আট কোটিরও বেশি মানুষকে একসঙ্গে সরকারি অর্থায়নে পেনশন সুবিধার আওতায় আনা এবং তা অব্যাহত রাখার মতো সক্ষমতা আমাদের তৈরি হয়নি।

এখানে আলোচনার বিষয় হলো, সরকারের পেনশন স্কিমের ধরন কেমন হবে কিংবা কেমন হওয়া উচিত? এক্ষেত্রে সরকার মোট শ্রমশক্তিকে তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করে এ সুবিধা প্রবর্তন করা যায়। যেমন ১. সরকারি চাকরিজীবী পেনশন স্কিম: যে পদ্ধতির পেনশন সুবিধা সরকারি খাতে নিয়োজিত শ্রমশক্তি বর্তমানে ভোগ করছেন। ২. যৌথ অর্থায়নে পেনশন স্কিম বা পে অ্যাজ ইউ গো পেনশন স্কিম, যেখানে ১০০ টাকা থেকে শুরু করে যেকোনো পরিমাণ মাসিক প্রিমিয়াম প্রদানের মাধ্যমে ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী নাগরিকরা পেনশন স্কিমে যুক্ত হবেন। সরকার এ স্কিমে নির্দিষ্ট হারে অর্থ প্রদান করবে। ৩. প্রবীণ নাগরিক পেনশন স্কিম বা বঙ্গবন্ধু পেনশন স্কিম। এই স্কিমের আওতায় বিনা প্রিমিয়ামে দুস্থ, অসহায়, বিধবা, অক্ষম ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন প্রবীণ জনগোষ্ঠীকে সরকার পেনশন সুবিধা প্রদান করবে। এক্ষেত্রে সরকার তাদের পেনশন অ্যাকাউন্টে মাসিক ভিত্তিতে একটা নির্দিষ্ট প্রিমিয়াম জমা করবে, যা থেকে মেয়াদ শেষে তাদের ন্যূনতম মজুরির অন্তত ৫০ শতাংশ হারে মাসিক পেনশন সুবিধা প্রদান করবে। তবে বর্তমানে প্রচলিত বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতাসহ সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় চলমান কর্মসূচি অন্তত আগামী ২০ বছর চালিয়ে যেতে হবে। কারণ সর্বজনীন পেনশন স্কিম এমন একটি বৃক্ষ, যা প্রতি ১০ বছর অন্তর তার ফল দেয়া শুরু করবে।

বাংলাদেশে সর্বজনীন পেনশন প্রবর্তনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা বাংলাদেশকে বিশ্বে আলাদা মর্যাদা এনে দেবে। এ উদ্যোগ তার দূরদর্শী আর্থসামাজিক উন্নয়ন পরিকল্পনার অন্যতম হাতিয়ার। বর্তমান কর্মক্ষম জনশক্তি যদি তাদের ভবিষ্যেক নিরাপদ রাখতে পেনশন স্কিমে যুক্ত হয়, তাহলে ২০৩০ সালের পর থেকে বাংলাদেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। এ উদ্যোগ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মধ্যে সঞ্চয়প্রবণতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সার্বিকভাবে দেশের মানুষের জীবনমানের উন্নতি ঘটাবে।

 

ড. মো. আইনুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি