বেইজিংয়ের বিজয় দিবসের প্যারেডে দেখা গেল দৃশ্যটা যেন একেবারে পোস্টকার্ডের মতো—শি জিনপিং, ভ্লাদিমির পুতিন আর কিম জং উন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। কেউ যদি ভেবে বসেন, ‘নতুন এক বিশ্বব্যবস্থা জন্ম নিলো’—তাহলে ভুলই ভাবছেন। কারণ শি এখনো সেই চেয়ারে বসার মতো অবস্থায় নেই। তবে তিনি বুঝে গেছেন, পৃথিবীটা এক ধরনের নেতৃত্বশূন্যতার মধ্যে ভাসছে। আর এ শূন্যতাকেই কাজে লাগাতে চাইছেন তিনি।

তিয়ানআনমেন স্কয়ারে গর্জন তোলা সামরিক শক্তির প্রদর্শনী গত সপ্তাহের আসল খবর ছিল না। বরং খবরের কেন্দ্রে ছিল সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন বা এসসিওর সম্মেলন। ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠার পর এটিই সবচেয়ে বড় জমায়েত। একচেটিয়া সিদ্ধান্তে চালিত হোয়াইট হাউজ, যেখানে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেজাজের মতোই নীতিও মুহূর্তে বদলে যায়, তার মুখোমুখি হয়ে এশিয়া ও গ্লোবাল সাউথের দুই ডজনেরও বেশি নেতার সমবেত হওয়া ছিল একটি স্পষ্ট বার্তা। বার্তাটি হলো—যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনার জন্য তারা সবাই বিকল্প পথ খুঁজছেন।

আমি যেটাকে বলি ‘জি-জিরো বিশ্ব’—সেখানে কোনো দেশই আর বৈশ্বিক নিয়ম-কানুন তৈরির দায় নিতে চায় না বা পারছে না। যুক্তরাষ্ট্রকে সবাই আজ শুধু হেঁয়ালিপূর্ণই নয়, অবিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবেও দেখছে। আর এ অবিশ্বস্ততার ভয়ে সবাই এখন বিকল্প খুঁজতে মরিয়া।

এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। অনিশ্চয়তা অনেক সময় কৌশলগতভাবে উপকারী হতে পারে। প্রতিপক্ষকে অস্থির রাখা যায়, মিত্রদেরও বেশি কিছু করতে উদ্বুদ্ধ করা যায়। যেমন ট্রাম্প প্রথমবার ক্ষমতায় আসার আগের তুলনায় ন্যাটো আজ অনেক শক্তিশালী। কারণ ট্রাম্পের অনিশ্চিত আচরণ, আর অবশ্যই পুতিনের ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন। এ দুই কারণে ইউরোপীয়রা প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াতে বাধ্য হয়েছে, এমনকি দুই নতুন সদস্যও জোটে যুক্ত হয়েছে। কিন্তু অবিশ্বস্ততা উল্টো কাজ করে। এতে প্রতিপক্ষই নয়, মিত্ররাও নিজেদের ঝুঁকি কমাতে বিকল্প পথ খুঁজতে শুরু করে।

বাণিজ্য, প্রযুক্তি কিংবা নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই ট্রাম্প একের পর এক চড়া শুল্ক আরোপ করেছেন। বহু গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি থেকে সরে গেছেন এবং ঘনিষ্ঠ মিত্রদেরও ঠেলে দিয়েছেন কেবল লেনদেনভিত্তিক আলোচনায়। স্বল্পমেয়াদে দেশগুলো প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান নিয়েছে। মনে হচ্ছে যে হোয়াইট হাউজকে ‘জয়’ হাতে তুলে দিচ্ছে। কোথাও একতরফা ছাড়, কোথাও শুল্কে সামান্য ছাড়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছে শুধু যাতে উত্তেজনা আর না বাড়ে। কিন্তু একই সঙ্গে তারা খুঁজছে বিকল্প পথ—নতুন বাণিজ্য সম্পর্ক, আর্থিক অবকাঠামো, নতুন সরবরাহ চেইন যাতে দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন নীতির হঠাৎ বদলের ধাক্কা থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারে।

চীন বিষয়টা ভালোভাবেই বুঝে নিয়েছে। তারা নিজেকে হাজির করছে এক স্থির হাত হিসেবে। যে বহুপক্ষীয়তায় বিশ্বাসী, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ‘হস্তক্ষেপহীনতা’র নীতি মেনে চলে। তিয়ানজিনে তারা একেবারে স্পষ্টভাবে বলেছে, ‘আমরা চুক্তিতে অটল থাকব, যুক্তরাষ্ট্র থাকবে না।’

এ বার্তা কাজও করছে। কারণ কেউ মনে করছে না যে চীন হঠাৎ করেই এক দয়ালু বৈশ্বিক মহাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। বরং কাজ করছে এ কারণে যে যুক্তরাষ্ট্র অবিশ্বস্ত হয়ে পড়ায় দীর্ঘমেয়াদি বিকল্প কৌশলের ভরকেন্দ্র হওয়ার মতো মাপ ও নীতিগত ধারাবাহিকতা এখন একমাত্র চীনের হাতেই আছে।

এসসিও সম্মেলনকে শি কাজে লাগালেন এক নতুন বার্তা ছড়াতে। বললেন, পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার বিকল্প হতে হবে এমন একটা ব্যবস্থা যেখানে সার্বভৌমত্বই প্রথম। তিনি ট্রাম্পের ‘একতরফা চাপ প্রয়োগের নীতি’র সমালোচনা করলেন। চালু করলেন নতুন এক স্লোগান—গ্লোবাল গভর্ন্যান্স ইনিশিয়েটিভ। সম্মেলনের যৌথ বিবৃতিতেও প্রতিধ্বনিত হলো তার বক্তব্য, আর সদস্যরা সম্মত হলো জাতীয় মুদ্রায় লেনদেন সহজ করার জন্য আরেকটি উন্নয়ন ব্যাংক গড়তে, যাতে ডলারের প্রভাব কিছুটা কমানো যায়।

এসব সিদ্ধান্ত কার্যত প্রত্যাশিতভাবেই সীমিত পরিসরের। কিন্তু প্রতীকী দিক থেকে এগুলোর তাৎপর্য ছিল প্রবল। কারণ যেসব সরকার চীনের বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গিকে পুরোপুরি মানে না, বরং আমেরিকার সঙ্গে কাজ করতেই বেশি আগ্রহী, তারাও নিজেদের টিকে থাকার পথ মজবুত করার জন্য বিকল্প খুঁজছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো ভারত। টানা সাত বছর পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গেলেন চীন, যেখানে তিয়ানজিনে বৈঠক করলেন শি জিনপিং ও ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে। এমন এক সময়ে এ সফর ঘটল, যখন যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ক ক্রমেই হয়ে উঠছে টালমাটাল ও বিরোধপূর্ণ।

গত বছরের শেষ দিক থেকে চীনের সঙ্গে সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছিল নীরবে। কিন্তু মোদি ও ট্রাম্পের ব্যক্তিগত টানাপড়েন, আর তার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় রফতানির ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক বসানো, মোদিকে আরো দৃঢ়ভাবে বিকল্প খোঁজার দিকে ঠেলে দিয়েছে। এভাবেই ভারত সংকেত দিচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের চাপ মোকাবেলায় তার হাতেও অন্য পথ রয়েছে।

অবশ্য বাস্তবতা হলো, ভারতের প্রধান কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত অংশীদার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে চীন কোনোভাবেই প্রতিস্থাপন করতে পারবে না। কারণ ভারত ও চীন মূলত প্রতিদ্বন্দ্বী, যাদের মধ্যে রয়েছে সীমান্ত বিরোধ আর দক্ষিণ এশিয়ার নানা জায়গায় পরস্পরবিরোধী স্বার্থ—বাংলাদেশ থেকে শুরু করে তিব্বত, এমনকি মালদ্বীপ পর্যন্ত। তার ওপর ভারতের সাধারণ মানুষের মধ্যে চীনবিরোধী মনোভাব এখনো গভীরভাবে প্রোথিত।

পাশাপাশি চীনের ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সম্পর্ক রয়েছে পাকিস্তানের সঙ্গে। ভারতও ক্রমেই জাপান ও ফিলিপাইনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করছে। ফলে পারস্পরিক অবিশ্বাস থেকেই যাচ্ছে। মোদি বেইজিংয়ে পৌঁছানোর আগে গিয়েছিলেন জাপান। আর শির তিয়ানআনমেনের সামরিক কুচকাওয়াজ এড়িয়ে গেছেন ইচ্ছাকৃতভাবেই। এমনকি এসসিওর যৌথ ঘোষণায় চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ সমর্থন না করা একমাত্র সদস্যও ছিল ভারত। সবকিছু মিলিয়ে বার্তাটা স্পষ্ট—ভারত এখনো পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ককেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ফলে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক হলেও ভারত-চীন সম্পর্কের এ উষ্ণতা হবে খুবই সীমিত ও সুযোগসন্ধানী। হয়তো কিছু বাছাই করা অর্থনৈতিক ছাড় আসবে, সীমান্তে কিছুটা উত্তেজনা কমানো হবে, কিন্তু কোনো কৌশলগত মোড় পরিবর্তন ঘটবে না।

একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অবিশ্বস্ততা এসসিওকে সামান্য শক্তিশালী করছে বটে, কিন্তু এটিকে চীন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বা জি৭’র সমতুল্য কোনো জোটে রূপ দিচ্ছে না। গত সপ্তাহে চীন নিঃসন্দেহে বড় ধরনের অগ্রগতি দেখিয়েছে, কিন্তু বাস্তবে সমষ্টিগত পদক্ষেপ সংগঠিত করার সামর্থ্য সীমিত।

চীনের বৈশ্বিক উদ্যোগগুলো—নিরাপত্তা, উন্নয়ন কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটা জিনিসই ইঙ্গিত করে যে তারা স্লোগান আর ব্র্যান্ডিংয়ে দক্ষ হলেও বাস্তব সাফল্য ডেলিভারিতে ততটা নয়। এসসিও এরই মধ্যে তার মূল এজেন্ডা সন্ত্রাসবাদ দমন ও জলবায়ু সহযোগিতা—ছাড়িয়ে গেছে, কিন্তু কোনো একক লক্ষ্য বা দিশা খুঁজে পায়নি। এটি এখন এক বিশাল কিন্তু সন্দেহপূর্ণ স্বার্থভিত্তিক ক্লাব—যেখানে ভারত-পাকিস্তান বৈরিতা থেকে শুরু করে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর প্রতি মস্কোর সন্দেহ—সবকিছুই আছে।

কূটনীতির ময়দানে চীন এখনো তার অর্থনৈতিক শক্তির সমান প্রভাব বিস্তার করতে পারছে না। নিজের আশপাশের বাইরে কোনো সংঘাত এলে তাদের কার্যক্রম প্রায়ই কথার পেছনে পড়ে থাকে। এসসিও হয়তো আগের চেয়ে বেশি উচ্চকণ্ঠ হবে, কিন্তু বৈশ্বিক নিরাপত্তার বড় প্রশ্নগুলোয়—যেমন ইউক্রেন কিংবা গাজা ইস্যুতে তার কোনো কার্যকর ভূমিকা শিগগিরই দেখা যাবে না।

তবুও নতুন বৈশ্বিক অবকাঠামো ধাপে ধাপে গড়ে উঠতে পারে যদি নতুন এসসিও ব্যাংক যথেষ্ট তহবিল পায় (এটি এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক ও ব্রিকস নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের পাশাপাশি কাজ করবে)। তারা যদি জাতীয় মুদ্রায় লেনদেনের বিস্তার, নিষেধাজ্ঞা মোকাবেলার প্রক্রিয়া এবং সাউথ সাউথ সহযোগিতা বাড়াতে পারে তাহলে নিঃসন্দেহে ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

এসব পদক্ষেপ আপাতদৃষ্টিতে ছোট মনে হলেও ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরে গিয়ে বিকল্প তৈরি করাকে সহজ করবে এবং পরে সেটি ভাঙা বা উল্টানো কঠিন করে তুলবে। আমেরিকার একতরফা নীতি বিশ্বকে স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিয়েছে অতিনির্ভরতার খরচ কত ভয়াবহ হতে পারে। এতে চীনের হাতে খুলে গেছে এক সরল সুযোগ—তারা শুধু বলতে পারে, অন্তত আমরা ধারাবাহিক। আর ‘জি-জিরো বিশ্বে’ এ ধারাবাহিকতাই পরিপূর্ণতার চেয়েও বেশি দামি হয়ে ওঠে।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সমাধান আসলে খুবই পরিষ্কার—আবারো এক নির্ভরযোগ্য অংশীদার হয়ে ওঠা। মিত্রদের ওপর আচমকা শুল্ক চাপানো, দীর্ঘ আলোচনার পর গড়ে ওঠা চুক্তি থেকে হঠাৎ সরে যাওয়া—এসব থেকে বিরত থাকতে হবে। বরং দেখাতে হবে এমন প্রতিশ্রুতি, যা সকালে-বিকালে পরিবর্তন হবে না। যতদিন সেটা না ঘটছে, ততদিন বিশ্বের অন্যান্য দেশ বিকল্প পথ খোঁজা অব্যাহত রাখবে। আর বৈশ্বিক ভারসাম্যের কেন্দ্র ধীরে ধীরে সরে যাবে পূর্বের দিকে।

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]

ইয়ান ব্রেমার: ইউরেশিয়া গ্রুপ ও জি-জিরো মিডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট; জাতিসংঘের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক হাই-লেভেল অ্যাডভাইজরি বডির নির্বাহী কমিটির সদস্য

ভাষান্তর: মাহফুজ রাহমান