বায়ু মানুষের জীবনধারণের অপরিহার্য উপাদান। কিন্তু বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার বাতাস এখন জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। বাতাসে যেসব ক্ষতিকর ধূলিকণা ও রাসায়নিক পদার্থ মিশে থাকে তা খালি চোখে দেখা যায় না। কিন্তু এসব ধূলিকণা ও রাসায়নিক পদার্থের কারণে মানুষের ফুসফুস আক্রান্ত হয়। বিশ্বব্যাংক বলছে, এশিয়ার দেশগুলো আর্থিকভাবে কার্যকর ও সুলভ পদ্ধতিতে বায়ুদূষণ রোধ করতে পারে। তবে এজন্য দেশগুলোর মধ্যে নীতি ও বিনিয়োগের সমন্বয় প্রয়োজন। দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ ও দরিদ্র অঞ্চলের বাতাসে সূক্ষ্ম কণা এবং অতি সূক্ষ্ম ধূলিকণার ঘনত্ব বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মানদণ্ড থেকে ২০ গুণ বেশি। এশিয়ার এ অঞ্চলে প্রতি বছর ২০ লাখ মানুষের অকালমৃত্যু হয় বায়ুদূষণের কারণে। সেই সঙ্গে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আর্থিক ক্ষতিরও মোকাবেলা করতে হয়। অস্বাস্থ্যকর এ বায়ুতে শ্বাস নেয়ার ফলে শিশুদের জ্ঞানীয় বিকাশ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হয় না। পাশাপাশি শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ দেখা দেয়, শিশুরা দীর্ঘস্থায়ীভাবে অসুস্থ ও দুর্বল হয়ে পড়ে। এসবের কারণে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বেড়ে যায়, দেশের উৎপাদন সক্ষমতা কমে যায় এবং কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। বায়ুদূষণ একটি শহর, রাজ্য বা জাতীয় সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অবস্থান একই এয়ারশেডের মধ্যে, অর্থাৎ এখানকার জনগণ যে ভৌগোলিক এলাকায় বাস করে সেখানে বাতাসের মান একই ধরনের। ফলে এ দেশগুলো যদি সমন্বিত উদ্যোগ নেয় তবেই বায়ুদূষণের এ বিপজ্জনক মাত্রা কমিয়ে আনা সম্ভব। বায়ুদূষণ রোধে একসঙ্গে কাজ করলে দেশগুলো দ্রুত, স্বল্প খরচে ও ভালো ফলাফল পেতে পারে। 

রাজধানীর বায়ুদূষণে অন্যতম ভূমিকা পালন করছে ঢাকার রাস্তায় চলাচলকারী অতিরিক্ত যানবাহন। ঢাকা শহরে প্রতিদিন গড়ে তিন লাখের বেশি যান্ত্রিক যানবাহন চলাচল করে। নগরীতে চলাচলকারী গণপরিবহন বা ব্যক্তিগত অনেক গাড়ি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে পড়েছে। ফিটনেসবিহীন এসব গাড়ি থেকে নির্গত ধোঁয়া বায়ুদূষণের জন্য দায়ী। এছাড়া গাড়িতে ব্যবহারকারী ভেজাল ও নিম্নমানের জ্বালানিও দায়ী বায়ুদূষণে। অপরিকল্পিতভাবে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, ড্রেনেজ এবং রাস্তাঘাট উন্নয়ন, মেরামত ও সংস্কার কার্যক্রমের আওতায় রাস্তাঘাট খোঁড়াখুঁড়ির পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিষাক্ত কালো ধোঁয়াও বায়ুদূষণের অন্যতম উৎস। এসব উৎস থেকে বিপুল পরিমাণ ধুলা, বিষাক্ত ক্ষতিকারক গ্যাস ও ভারী ধাতব কণা বাতাসে মিশে জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে দ্রুত বায়ুদূষণের উৎসগুলো বন্ধ করতে হবে। বায়ুদূষণে জড়িত দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। সর্বোপরি বায়ুদূষণের সব উৎস বন্ধে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। হাইকোর্টের দেয়া নির্দেশ অনুযায়ী রাজধানীর বায়ুদূষণ রোধে পরিবেশ অধিদপ্তরকে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে হবে। ইট প্রস্তুতের ধরন ও আগে-পরের বিষয় বা পদ্ধতি নিয়ে আগের ইট প্রস্তুত আইন-২০১৩ সংশোধন করা হয়েছে। ২০১৮ সালেও সংশোধন করা হয়েছে। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। বড় চিন্তার জায়গা হলো নির্মাণকাজ। যে যেভাবে পারছে নির্মাণকাজ করছে। এজন্য যুগোপযোগী আইন ও নীতিমালা তৈরি করতে হবে। যত্রতত্র ও ‘যে যেভাবে পারে’ নির্মাণকাজ থেকে বিরত থাকার জন্য প্রশাসনকে বা কর্তৃপক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে। শুধু মুনাফার কথা না ভেবে মালিক, সমিতি বা ডেভেলপারদের দেশ ও ভবিষ্যতের দিকেও লক্ষ রাখতে হবে। বাতাসে ক্ষতিকর এসব বস্তুকণা মিশছে মূলত যানবাহনের কালো ধোঁয়া, শিল্পের জ্বালানি এবং কাঠ ও কয়লা পোড়ানোর ফলে। বায়ুতে বেঁচে থাকা অক্সিজেনের মাত্রা আশঙ্কাজনক হারে কমিয়ে দিচ্ছে। এসবের জন্য দরকার সবুজায়ন। বৃক্ষরোপণের কোনো বিকল্প নেই। 

ঢাকায় বায়ুদূষণ কমাতে ২০২০ সালের ১৩ জানুয়ারি মহামান্য হাইকোর্ট নয় দফা নির্দেশনা দিয়েছিলেন। এর মধ্যে কয়েকটি স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ রয়েছে। এছাড়া মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়। বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য যথাযথ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আবশ্যক। এক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। ডাম্পিং স্টেশনের পাশাপাশি রাস্তার পাশে বর্জ্য পোড়ানো থেকে বিরত থাকতে হবে। বর্জ্যের পরিমাণ কমাতে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ উভয় সিটি করপোরেশনকে উন্মুক্ত বর্জ্য ফেলার পদ্ধতি বন্ধ করতে হবে। ঢাকা শহরের বায়ুদূষণ সমস্যা হ্রাস করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মধ্যমেয়াদি কিছু কৌশল নিতে পারে, যা আগামী ছয় মাসের মধ্যে সম্পন্ন করা যেতে পারে। এর মধ্যে রাস্তা পরিষ্কার এবং রাস্তার ধুলো সংগ্রহের জন্য ম্যানুয়াল ঝাড়ুর পরিবর্তে সাকশন ট্রাক এবং ভ্যাকুয়াম সুইপিং ট্রাকের প্রচলন করতে পারে। এটি রাস্তার ধুলো থেকে বায়ুদূষণ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। ঢাকা শহরের বায়ুদূষণ কমানোর জন্য পৃথক সাইকেল লেন অন্যতম প্রধান পদক্ষেপ হবে। পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ এবং ছাদবাগান বায়ুমান উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে। অভ্যন্তরীণ বায়ুদূষণ কমাতে ঘরের অভ্যন্তরে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল নিশ্চিত করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের মধ্যে দূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন তৈরি, নিয়মনীতি প্রণয়ন, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত বাজেট বৃদ্ধিসহ পরিবেশ পুলিশ নিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এক্ষেত্রে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য সবাইকে একযোগে সমন্বিত, টেকসই, বিজ্ঞানভিত্তিক ও অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতিতে কাজ করতে হবে। এর জন্য স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাকে একটি প্লাটফর্মে যুক্ত করে পৃথক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় নির্মল বায়ু আইন ২০১৯-এর পরিবর্তে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ নীতি নিয়ে কাজ করছে। পরিবেশ সংরক্ষণ ও সচেতনতা তৈরির জন্য পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে হবে। ইট প্রস্তুত ও ইটখোলা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন-২০১৩ অনুযায়ী লাইসেন্স ছাড়া কোনো ইটখোলার কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না।

রাজধানী ঢাকার বাতাস এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। এতে শিশু ও বৃদ্ধদের মধ্যে শ্বসনতন্ত্রের সংক্রমণ বাড়ছে। বিভিন্ন উন্নয়নকাজ করতে গিয়ে বায়ুদূষণের হার বেড়ে যাচ্ছে, অপরিকল্পিত ইটভাটাও দায়ী। ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও অতিরিক্ত যানবাহন বায়ুদূষণের জন্য অন্যতম দায়ী। অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিভিন্ন দপ্তরের আন্তঃসমন্বয়হীনতাও কম দায়ী নয়। নাগরিকরাও বায়ু বা অন্যান্য দূষণের হার বাড়াচ্ছে। এক্ষেত্রে তাই দূষণ রোধে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন এবং যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন করতে হবে। বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং কিছু ক্ষেত্রে আইন সংশোধন, পরিমার্জন করে সময়োপযোগী করা প্রয়োজন। 

বাতাসের মান উন্নত করতে বাংলাদেশসহ কিছু দক্ষিণ এশীয় দেশ বিশেষ নীতিমালা গ্রহণ করেছে। জাতীয় পর্যায়ের পাশাপাশি দেশগুলোর মধ্যে আন্তঃসীমান্ত পদক্ষেপও নেয়া প্রয়োজন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান নীতিমালায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, বড় কারখানা এবং পরিবহন খাত থেকে সৃষ্ট দূষণের ওপর দৃষ্টি দেয়া হয়েছে। তবে বায়ুতে পিএম ২.৫-এর উপস্থিতি কমাতে হলে শুধু এসব খাতকেন্দ্রিক ব্যবস্থা নেয়া হলে বায়ুদূষণ রোধের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে না। বৃহত্তর অগ্রগতির জন্য নীতিনির্ধারকদের অন্যান্য খাত বিশেষ করে ছোট কারখানা, কৃষি, গৃহস্থালির রান্না এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দিকেও নজর দিতে হবে।