শবেবরাতের
আগের দিন অর্থাৎ ৭ মার্চ বাজারে
গিয়েছিলাম গরুর মাংস কেনার উদ্দেশ্যে। রাজধানীর দারুস সালাম এলাকা। মহল্লার বাজারে ঢুকতেই দেখা গেল, মাংসের দোকানে বেশ ভিড়। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর দোকানদারকে জিজ্ঞেস
করলাম, কেজি কত! চেহারার দিকে না তাকিয়ে ব্যস্ত
দোকানদার জবাব দিলেন, ‘বেচতেছি সাড়ে আটশ। আপনি যদি নেন আটশ বিশ ট্যাকা রাখা যাইব।’ তাকে আবার প্রশ্ন করলাম, গতকাল না সাড়ে সাতশ
টাকা কেজি বিক্রি করলেন...কথা তখনো শেষ হয়নি আমার। বেশ খানিকটা বিরক্ত হয়ে দোকানদার উত্তর দিলেন, ‘ভাই, কালকেরটা কাল ছিল আজকে ভুলে যান। আজ দাম এইটা
নিলে নেন, না নিলে পাশের
জনকে সুযোগ দেন।’ উপায়ান্তর না দেখে ওই
দামেই এক কেজি মাংস
কিনে বাসায় ফিরতে হলো।
এ ঘটনায় কয়েকটি বিষয় খেয়াল করলাম। প্রথমত, ব্যবসায়ীদের কাছে আপনার আমার মতো ভোক্তারা পুরোপুরি জিম্মি, তারা জানে পণ্যটি আপনার দরকার। আপনি কিনবেনই। তাই দাম যা নির্ধারণ করা হচ্ছে, এটা তার একান্তই মর্জির ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্বিতীয়ত, দাম যতই বাড়ুক দোকানে কিন্তু কোনো জিনিস অবশিষ্ট পড়ে থাকছে না। কেউ না কেউই কিনছেই। তার মানে আপনার আমার কাছে হয়তো বাড়তি দামে পণ্য ক্রয়ের মতো যথেষ্ট অর্থ না থাকতে পারে। কিন্তু সমাজের একটি শ্রেণীর কাছে বাড়তি অর্থ কোনো বিষয়ই নয়। ঠিক এ সুযোগ ব্যবসায়ীরা সহজে নিতে পারছেন। আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, তা হলো সয়ে যাওয়ার অভ্যাস। ব্যবসায়ীরা যখন কোনো একটি পণ্যের দাম ঠিক করছেন, তা সঙ্গে সঙ্গেই কার্যকর। বাজার তদারকি প্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থা এবং ভোক্তা সাধারণ তা যেন মাথা পেতেই মেনে নিচ্ছে। এই যে সয়ে যাওয়ার অভ্যাস, এটি অবশ্যই গণতান্ত্রিক কোনো একটি দেশের জন্য ইতিবাচক বিষয় হতে পারে না।
গরুর মাংসের মতো বাড়তি দামের একটি পণ্যের উদাহরণ দিয়ে জীবনযাত্রার বর্তমান মানের পরিস্থিতি বোঝানোর চেষ্টা করেছি মাত্র। ভাবছেন এক মাংসেই বুঝি ভোক্তার দিনযাপনের কেচ্ছা খতম! না মোটেও তা নয়। বাড়তি দামের ছোবল থেকে কোনো পণ্যই কিন্তু এখন আর মাফ পাচ্ছে না। সবশেষ ব্রয়লার মুরগির দাম ১৫০ থেকে বেড়ে কেজিপ্রতি ২৬০ টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার পর ভোক্তার নাভিশ্বাসে ষোলকলা পূর্ণ হয়ে গেছে। গরিবের মাংস বা ব্যাচেলরদের সম্বল বলা হয় যে ডিমকে, এর ডজন ১৪০ টাকা। বর্তমান অবস্থা এতটাই শোচনীয় হয়েছে যে বাজারে গিয়ে খুঁজতে হয় কোন জিনিসের দাম বাড়েনি। যেসব পরিবারে শিশু আছে, তাদের বিপত্তিটা আরো এক ধাপ বেশি। প্রায় ছয় মাস হলো শিশুর নিত্যপ্রয়োজনীয় ডায়াপারের দাম ব্র্যান্ডভেদে ন্যূনতম ২০০-৪০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। শিশুখাদ্যের দামের অবস্থাও একই। বাচ্চাদের কৌটাজাত গুঁড়াদুধ থেকে শুরু করে প্রোটিনজাত বিদেশী পাউডার বা অন্যান্য ব্র্যান্ডের পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবারের দাম বেড়েছে আকাশছোঁয়া। এছাড়া চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, মসলা, মাছ, সবজি, আটা, ডিটারজেন্ট পাউডার, সাবান, শ্যাম্পু, প্রসাধনী সামগ্রী, ফলমূলের কোনোটারই দাম সাধারণ ভোক্তার নাগালে নেই। দাম কেন বেশি, এ প্রশ্নের রেডিমেড উত্তর সবশ্রেণীর ব্যবসায়ীরা প্রস্তুত করে রেখেছেন। কেউ জিজ্ঞেস করলেই ঝটপট তা উগড়ে দেন। যেমন আপনি কোনো বাজার বা সুপারশপে গেলেন বাচ্চার খাদ্য কিনতে, দোকানদার আপনাকে জানাচ্ছেন এলসি বন্ধ, বাইরে থেকে পণ্য কেনা যাচ্ছে না সেজন্য দাম বেশি। মাছের বাজারে গেলেন, সেখানে গেলে শুনবেন, ডিজেল-পেট্রোলের দাম বাড়তি তাই পরিবহন খরচ বেশি সেজন্য মাছের দাম বেড়েছে। এবার গেলেন সবজি কিনতে, সেখানে গেলে শুনবেন ব্যবসায়ীরা বলছেন, চাহিদা বেড়েছে সে তুলনায় উৎপাদন কম তাই সব ধরনের তরিতরকারির দাম বাড়তি রয়েছে। একইভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রত্যেকটা জিনিসের বাড়তি দামের কারণ আপনি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে শুনতে পাবেন। আচ্ছা একবার ভাবুন তো, দাম বেশির কারণ সবাই আপনাকে শোনাতে পারছেন। বাসায় ফেরার পর আপনার সন্তান যদি জিজ্ঞেস করে বসে, বাবা এটা কেন কিনে আনোনি? এর উত্তর কি আপনি আপনার ছোট্ট শিশুসন্তানকে দিতে পারবেন? বলতে কি পারবেন এলসি বন্ধ দাম বেশি, সেজন্য কিনিনি? রাষ্ট্রের কাছেও কি এর সদুত্তর আছে? যদি না থেকে থাকে, তাহলে রাষ্ট্রের কি ক্ষমতা আছে ছোট্ট সন্তানের সামনে আপনাকে এমন কঠিন প্রশ্নের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর?
এবার আসুন ‘রমজানুল বাড়তি দাম মোবারক’ নিয়ে একটু বাতচিত করা যাক। গত ১০ বছর ধরে দেশের বাজার নিয়ন্ত্রণ ও তদারকিতে সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে কী ধরনের পদক্ষেপ বা বক্তব্য দেয়া হয়েছে, সেটাতে একটু চোখ বোলানো যেতে পারে। ২০১৪ সালের ৯ জুন তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের একটি অনুষ্ঠান কাভারের সুযোগ হয়েছিল। ওই অনুষ্ঠানে তোফায়েল আহমেদ আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন, ‘রমজানে বাড়তি পণ্যের চাহিদা মেটাতে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এ জন্য পর্যাপ্ত পণ্য মজুদ রয়েছে। এতে রমজান মাসে পণ্যের কোনো ঘাটতি হবে না। নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে না। সেই সঙ্গে দাম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হবে।’ রমজানে যেন নিত্যপণ্য ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে এ ব্যাপারেও তিনি ব্যবসায়ীদের পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানিয়েছিলেন ওই বছর। তবে ফলাফলে এর বাস্তবায়ন ঘটেনি, ওই বছরের রমজান আসতে না আসতেই দামও হু হু করে বেড়ে যায়। দেখা দেয় ভোক্তা সাধারণের হা-হুতাশ। ব্যবসায়ীরাও মন্ত্রীর আহ্বানে খুব একটা পাত্তা দিয়েছে বা মেনেছে বলে মনে হয়নি। ঠিক একই চিত্র ২০১৫, ২০১৬, ২০১৭, ২০১৮ কিংবা পরের বছরগুলোতেও দেখা গেছে। রমজান আসে এর আগে আগে বাণিজ্যমন্ত্রীরা ব্যবসায়ী নেতাদের ডাকেন, আলোচনায় বসেন। সাংবাদিকদের সামনে গৎবাঁধা বক্তব্য ‘আমাদের যথেষ্ট মজুদ রয়েছে, এবারের রমজানে কোনো পণ্যের দাম বাড়বে না। ভোগ্যপণ্যের দাম যাতে নিয়ন্ত্রণে থাকে সেজন্য আমরা যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি।’ জোরেশোরে জানানো হয়। এরপর কী হয়? রমজান শুরু হয়, দাম দামের মতোই বাড়ায় ব্যবসায়ীরা, ভোক্তারা অভিযোগ তোলে টিভি ক্যামেরার সামনে।
এর মাঝে হুট করে রাজধানীর কারওয়ান বাজার কিংবা কোনো একটি এলাকার বাজারে অভিযান চালায় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। কিছু জব্দ, জরিমানা হয়, সংবাদমাধ্যমে খবরের শিরোনাম হয়। পরদিন পরিস্থিতি আবার যা তাই। প্রতিবারের মতো এবারো রমজান আসার আগেই বর্তমান বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি রমজানে দ্রব্যমূল্য বাড়বে না বলে কয়েক দফা ঘোষণাও দিয়ে দিয়েছেন। গত ১০ মার্চ চাঁদপুরের এক অনুষ্ঠানে টিপু মুনশি বলেছেন, ‘কেউ যেন রমজানের আগে নিত্যপণ্য মজুদ করতে না পারে, সে জন্য বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা মাঠে থাকবে। রমজান মাসে যে পরিমাণ নিত্যপণ্য দরকার তা আমাদের কাছে আছে। এবারের রমজানে দ্রব্যমূল্য বাড়বে না।’ মন্ত্রী তার দায়িত্ব মোতাবেক ঠিকঠাক দাপ্তরিক ঘোষণা, ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান বা সতর্কতা জানিয়েছেন। ভোক্তাদের উদ্দেশে প্রতি বছরের মতো এবারো আশ্বস্ত করে ক্ষান্ত হয়েছেন মন্ত্রী। ভাবছেন সব ঠিক হয়ে গেছে!
বর্তমান বাজার পরিস্থিতি মোটামুটি সবারই জানার কথা। রোজা শুরু হতে এখনো সপ্তাহ খানেক বাকি। কিন্তু নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়া শুরু হয়েছে আরো দুই সপ্তাহ আগেই। বাজারদরের বর্তমান চিত্রে দেখা গেছে, সপ্তাহের ব্যবধানে বাজারে চাল, চিনি, তেল, ছোলা, ডাল, পেঁয়াজ, আদা, মাছ, মাংস সবকিছুরই দাম বেড়েছে। এমনিতেই দেশের টালমাটাল অর্থনীতির কারণে বেড়ে স্থির হওয়া নিত্যপণ্যের চড়াদামে নাকাল সাধারণ মানুষ, এরপর রমজান এলে যদি দাম আরো বাড়ে সেক্ষেত্রে মানুষ এবার করবে কী? অথচ মূলধারার গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবছর দেখা যায়, রমজান এলে দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে দ্রব্যমূল্য কমিয়ে বিভিন্ন ছাড় বা মানুষের প্রতি সহানুভূতি দেখানো হয়। আরব আমিরাতের বিভিন্ন কোম্পানি প্রতিবার রমজান মাসে বিভিন্ন পণ্যে সর্বোচ্চ ছাড়ের ব্যবস্থা করে। গত বছর ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিয়েছিল দেশটির বিভিন্ন কোম্পানি। কাতারে রোজাদারদের সেবায় গতবার ৮০০টিরও বেশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানো হয়। বাজার থেকে সুপারশপ সবখানেই এটি কার্যকর ছিল। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমানে গত রমজানে বিভিন্ন পণ্যে ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত দাম কমানো হয়। কয়েক বছর ধরে দেখা গেছে, মালয়েশিয়া সরকার রমজান উপলক্ষে অধিকাংশ পণ্যের দাম কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম সেখানে কমানো হয়। তাহলে আমাদের দেশে কেন বছরের পর বছর ধরে বাজারের এ বেহাল পরিস্থিতি?
শেষ করার আগে বেশ কয়েকটি প্রশ্ন রেখে যাই। প্রত্যেক রমজানে দেশের বাজারে যে নাজুক দশা তৈরি হয়, এখানে আসলে আমাদের সমস্যা কোথায়? দেশের ব্যবসায়ীদের মনমানসিকতা এমন কেন? তারা কেন ওঁত পেতে রমজান আসার অপেক্ষায় বসে থাকেন? আমাদের অর্থের লোভ আসলে কোথায় গিয়ে শেষ হবে? কেন আমাদের বাজার তদারকি কর্তৃপক্ষের আদেশ কার্যকর হয় না? কেন আমাদের ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর কালেভদ্রে ‘সিজনাল’ অভিযান চালিয়ে চুপ করে যান?
কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের বিখ্যাত কবিতার পঙক্তির মতো বলতে হয়, ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, ও সে সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি।’ হ্যাঁ, রানীই। তবে অনিয়মের, লোভের, স্বার্থের, দায়সারা প্রশাসনের কিংবা ভোক্তা সাধারণের লাগামহীন কষ্ট ও দীর্ঘশ্বাসের।










