অমর্ত্য সেনের জীবনে অর্জিত সাফল্যে বাইসাইকেলের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বলার তেমন কিছু নেই। আপাতত এতটুকু বলাই যথেষ্ট যে সুইডেনের নোবেল জাদুঘরে রক্ষিত তার একটা বাইসাইকেল: ‘অর্থনীতিবিজ্ঞানে বাইসাইকেল পরিচিত কোনো হাতিয়ার নয় কিন্তু অমর্ত্য সেনের বাইসাইকেল তার গবেষণায় একটা ভূমিকা পালন করেছিল।’ শ্রুতি আছে, এ বাহন ১৯৯৮ সালে তাকে নোবেল পুরস্কার পেতে সাহায্য করেছিল।

গল্পটা এ রকম: শিশু বালক ও বালিকার পার্থক্য গবেষণা করতে গিয়ে একজন সহকারীকে পশ্চিম বাংলার গ্রামাঞ্চলে শিশুদের ওজন নেয়ার জন্য সাইকেলে করে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু ওই কাজে বাধা পড়ল যখন গবেষণা সহকারীকে শিশুরা কামড় দেয়া শুরু করল। এদিকে ছাত্র-ছাত্রীরাও ক্যাম্পাস ছেড়ে তথ্য সংগ্রহে অনীহা প্রকাশ করে বসল। অগত্যা অমর্ত্য সেন নিজেই পল্লী অঞ্চলে সাইকেল চালিয়ে গিয়ে শিশুদের ওজন নেন, যা তিনি পরবর্তী সময়ে মানব উন্নয়ন সূচকের জন্য ব্যবহার করেছিলেন। তাছাড়া ক্যাম্পাসে সাইকেলে তার আসা-যাওয়া ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারস্যাপার।

দুই.

সম্ভবত এটাই স্বাভাবিক যে কেমব্রিজে যাওয়ার পর অমর্ত্য সেনের প্রথম বিনিয়োগ ছিল একটা বাইসাইকেল ক্রয়ে। মাত্র কিছুদিনের জন্য এ সাইকেল কেনার পেছনে কারণ হিসেবে কাজ করেছিল ‘সময়ের অর্থনীতি’, অর্থাৎ অল্প সময়ের ভেতর অধিক কাজ সম্পন্ন করা, যেমন তিনি যেখানে থাকতেন সেই প্রিওরি রোড থেকে ট্রিনিটি ও ইউনিভার্সিটির কেন্দ্রে হেঁটে যেতে দীর্ঘ সময় নিত। তাছাড়া শহরের বিভিন্ন অংশে যাওয়ার তাগিদও বাইসাইকেল চাহিদার পেছনে নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে, যার মধ্যে ছিল অন্যান্য কলেজ দর্শন, বক্তৃতায় উপস্থিতি, লাইব্রেরিতে যাওয়া, বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে সাক্ষাৎ, রাজনৈতিক ও সামাজিক সমাবেশে যোগদান ইত্যাদি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বাজেট সীমিত থাকায় তার পক্ষে গিয়ারসমেত সাইকেল কেনা সম্ভব হয়নি বিধায় একটা সাধারণ গিয়ারবিহীন সেকেন্ড হ্যান্ড সাইকেল কিনে তাকে তুষ্ট থাকতে হয়েছিল। বর্তমান নিবন্ধকারের মতে, অমর্ত্য সেনের জীবনের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, শত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তিনি সান্ত্বনা খুঁজে পান এবং এবারো তার ব্যতিক্রম ছিল না—সস্তা সাইকেল কিনে নিজেকে সান্ত্বনা দিলেন এই বলে যে সেকেলে এ যন্ত্রটি চড়ে যাতায়াত করলে অন্তত দরকারি ব্যায়ামটুকুর কাজ সেরে নেয়া যাবে।

তিন.

সেদিন ছিল শরতের এক সুন্দর সকাল। কেমব্রিজে জীবনের প্রথম বক্তৃতা শুনতে কিংস প্যারেড দিয়ে তাড়াহুড়া করে হাঁটছিলেন অমর্ত্য সেন। যাওয়ার পথে পাকিস্তান থেকে আসা একজন মানুষ, মাহবুব উল হকের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে। লোকটি মার্জিতভাবে পোশাক-পরিচ্ছদে পরিপাট। যা-ই হোক, বক্তৃতা দেয়ার কথা ছিল প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ জোয়ান রবিনসনের, যিনি The Economics of Imperfect Competition (১৯৩৩) নামে বিখ্যাত একটা বই লিখে খ্যাতি কুড়িয়েছেন। অমর্ত্য সেন অবশ্য বইটা অনেক আগেই প্রশস্তির সঙ্গে কলকাতায় পড়ে শেষ করেছিলেন; আজ সেই লেখকের বক্তৃতা শোনার জন্যই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা। মাহবুব উল হক ও অমর্ত্য সেন দুজনেই একটু দেরি করে ফেলেছিলেন বটে, তবে জোয়ান রবিনসন আরো দেরি করে উপস্থিত হয়েছিলেন বলে রক্ষা। মাহবুব উল হক সম্পর্কে অমর্ত্য সেন বলেছেন, ‘আমার ভাগ্য ভালো যে ১৯৫৩ সালের অক্টোবরে যে আলাপচারিতা কিছুটা বিরামহীনভাবে শুরু হয়েছিল, ১৯৯৮ সালে মাহবুব উল হকের হঠাৎ এবং দুঃখজনক মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তা অব্যাহত ছিল—ক্লাসরুমের বাইরে আমরা মূল স্রোতের অর্থনীতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করতাম। কেন অর্থনীতি মানুষের জীবন নিয়ে অত কম আগ্রহ দেখায়?’ মাহবুব উল হক ও অমর্ত্য সেন শুধু একে অন্যের বন্ধু ছিলেন না, তাদের মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয়ও বিনিময় হতো (তার প্রাণবন্ত স্ত্রী বানী বা খাদিজা পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি)। ১৯৯০ সালে মাহবুব উল হক যে ‘হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট’ চালু করেছিলেন, সেটা ছিল অর্থনীতির আবরণ বিস্তৃত করার জন্য প্রবল অনুরাগের প্রতিফলন মাত্র, যা সবটুকু বিচক্ষণভাবে যৌক্তিক অনুরাগ (A thoroughly well-reasoned passion)। তেমনি কিংস কলেজে শ্রীলংকার লাল জয়াবর্ধনের সঙ্গে জীবনব্যাপী বন্ধুত্বের বন্ধন, মমতা ও অংশীদারিত্বমূলক প্রতিশ্রুতির মিশ্রণে অর্থনীতির বিচরণ বিস্তৃত করার যৌথ অভিপ্রায় আজও স্মৃতিজাগানিয়া হয়ে আছে অমর্ত্য সেনের জীবনে।

অমর্ত্য সেনের আন্ডারগ্র্যাজুয়েট দিনগুলোয় কেমব্রিজে দক্ষিণ এশিয়ার আগন্তুকরা একটা বেশ বিশিষ্ট গোষ্ঠী তৈরি করেছিলেন, যেখানে বিশেষত পাকিস্তানি ও ভারতীয়রা পরস্পর মিলিত হতেন। কেমব্রিজে পাকিস্তানি বা ভারতীয় কোনো সমিতির অস্তিত্ব না থাকলেও সতেজে বেড়ে উঠছিল ‘মজলিস’ বা সমাবেশ নামে একটা সংগঠন। এর প্রথম ও প্রধান কাজ ছিল দক্ষিণ এশিয়া থেকে কেমব্রিজে যারা আসেন তাদের সাদর অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করা। অমর্ত্য সেনের খুব কাছের লোকদের মধ্যে এ মজলিসে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান (পরে বাংলাদেশ) থেকে আসা রেহমান সোবহান এবং পশ্চিম পাকিস্তানের মাহবুব উল হক ও আরিফ ইফতিখার। আরিফ ইফতেখার অমর্ত্যের জীবনে জানা সবচেয়ে ভালো তার্কিক। যাই হোক,  দ্বিতীয় বর্ষ থেকেই অমর্ত্য সেনের জীবনে মজলিস একটা বড় ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল এবং এর প্রেসিডেন্ট রেহমান সোবহানের কার্যকালে মজলিসের সব ‘অস্তিত্বহীন সম্পদ’ (Non-existent Treasure) পাহারা দেয়ার নিমিত্তে তিনি সংগঠনটির ট্রেজারার নিযুক্ত হয়েছিলেন। অমর্ত্য সেনের ধারণা, তার জীবত্কালে যত বন্ধুর সান্নিধ্য পেয়েছেন, তার মধ্যে রেহমান সোবহান সম্ভবত সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং তাদের দুজনকে অবিরত একত্রে রাখার ব্যাপারে অবশ্যই মধ্য ১৯৫০ দশকে আবির্ভূত সেই মজলিসের একটা ভূমিকা ছিল বলে তিনি মনে করেন। 

আবার কখনো-সখনো অক্সফোর্ড মজলিসের সঙ্গে কেমব্রিজ মজলিসের যৌথ সভা হতো। একবার রেহমান সোবহান ও অমর্ত্য সেন কোল্ডওয়ার বা ঠাণ্ডা যুদ্ধ নিয়ে বিতর্কে অংশ নিতে ওখানে গিয়েছিলেন। সে সময় অক্সফোর্ডের প্রতিনিধি ছিলেন কামাল হোসেন, যিনি আইন বিষয়ে পড়াশোনা করছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ গঠনে সক্রিয় এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিযুক্ত হয়েছিলেন। কামাল হোসেন জানালেন, তাদের আগমনের আগে এই বলে সতর্ক করা হয়েছিল যে কেমব্রিজ মজলিস থেকে দুজন অগ্নিময় বামপন্থী বক্তা আসছেন এবং তারা সেজন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু রেহমান সোবহান ও অমর্ত্য সেনকে তেমন তপ্ত না দেখে কিছুটা হতাশাই ব্যক্ত করেছিলেন কামাল হোসেন।

চার.

প্রত্যেক অক্টোবরে নতুন ছাত্র এলেই কেমব্রিজ মজলিস নতুন সদস্য সংগ্রহে বেশ বলীয়ান হয়ে উঠত। রেহমান সোবহান তার প্ররোচনামূলক প্রস্তুতি সম্পন্ন করে দক্ষিণ এশিয়া থেকে আসা নতুন সদস্য সংগ্রহ অবারিত করতেন। প্রসঙ্গত একটা বিশেষ ঘটনা উল্লেখ করতেই হয়। ১৯৫৫ সালের অক্টোবরে পাকিস্তান থেকে আসা নিয়নহেম কলেজের আকর্ষণীয় সালমা ইকরামুল্লাহ পৌঁছামাত্রই তাকে সদস্য করতে রেহমান সোবহান ব্যতিক্রমধর্মী আগ্রহ প্রদর্শন করলেন। যখন সালমা সোবহানকে মজলিসে যোগ দেয়ার জন্য প্রলুব্ধ করার সাহস সঞ্চয় করলেন, সেই মুহূর্তে অমর্ত্য সেনকে তাড়া দিলেন তার সঙ্গ দেয়ার জন্য। রেহমান সোবহান সালমার জন্য আগে থেকে ভালোভাবে মহড়া দেয়া যুক্তি প্রস্তুত রেখেছিলেন, যেমন কেন দক্ষিণ এশিয়া থেকে কেমব্রিজে পদার্পণ করা নবাগত কাউকে অবিলম্বে মজলিসের সদস্য হওয়া বাঞ্ছনীয় এবং তা না হলে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে কতটা নিঃস্ব জীবনের মুখোমুখি হতে হবে ইত্যাদি। রেহমান সোবহান যখন সালমা সোবহানের সামনে তার যুক্তি উপস্থাপন করার কসরত করছিলেন, সালমা সোবহান তখন হাস্যকৌতুকের সঙ্গে সেটা শুনছিলেন; মনে হচ্ছিল পরিষ্কারভাবে রেহমান সোবহানের আগ্রাসী বিপণন কৌশলের সামনে তিনি যেন অপ্ররোচিত অবস্থান বজায় রেখেছিলেন এবং তার চোখে হতবুদ্ধিকর সন্দিগ্ধচিত্ততা লক্ষ করা গিয়েছিল। তা সত্ত্বেও এবং যেভাবেই হোক, শেষ পর্যন্ত তিনি মজলিসে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

অমর্ত্য সেনের কাছে অবশ্য জানা ছিল না যে রেহমান সোবহানের নিজের জীবনে এবং এ উপমহাদেশের ও পৃথিবীর এমন অনেকের জীবনে সেই দিনের সেই সাক্ষাৎ অতি গুরুত্ববহ হতে পারে। সালমা সোবহান পরে রেহমান সোবহানকে বিয়ে করেন এবং ক্ষুদ্র মজলিস ছাড়িয়ে তার সঙ্গে আরো অনেক বড় ও বেশি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগে যোগ দেন। সময়ের আবর্তনে সালমা সোবহান মানবাধিকার কর্মী হিসেবে পথপ্রদর্শক হয়ে ওঠেন এবং বাংলাদেশে প্রগতিশীল ভাবনায় নতুন মাত্রা যোগ করেন; তিনি সাধারণভাবে সামাজিক অসমতা বিশেষ করে লিঙ্গ অসমতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আবেগপূর্ণভাবে লিপ্ত থাকতেন। সব প্রেরণার উৎস ছিলেন তিনি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অত্যন্ত প্রশংসিত শিক্ষক হিসেবে সালমা সোবহানের মানবাধিকারের গুরুত্ব সম্পর্কে নতুন ও সুদূরপ্রসারী ধারণা ছিল। যেমন নারী অধিকার ও সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রায়োগিক পথ ও পাথেয়। তিনি বাংলাদেশে এবং অন্যত্র লিঙ্গ বিষয়ে অবস্থানগত দৃষ্টির মান উন্নয়নে ও বাংলাদেশের সামাজিক অসমতার ‘নারীবাদী’ উপলব্ধিতে প্রশংসনীয় পরিবর্তন আনেন। অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তিনি। তার মধ্যে নিজের হাতে গড়া ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’ জেন্ডার সম্পর্কিত অসুবিধার বিরুদ্ধে সংগ্রামরতদের এখনো আইনি সহায়তা দিয়ে চলেছে।

উপরোক্ত কাজটির পেছনে বঞ্চনার সূত্র সম্পর্কে বুদ্ধিবৃত্তিক উপাদান গভীরভাবে কাজ করেছে। যদিও স্বীকৃত অধিকারবঞ্চিতদের সপক্ষে প্রায়ই আইন প্রণয়নের প্রয়োজন পড়ে। তার পরও এমনকি বিদ্যমান আইনি ধারাও গুরুতরভাবে বঞ্চিত জনগণের জন্য অকার্যকর হতে বাধ্য এবং এর কারণ নিরক্ষরতা ও দারিদ্র্যের মতো প্রতিবন্ধকতা। এসব অসুবিধা নিচে থাকা মানুষের আইনের সংরক্ষণমূলক শক্তি পাওয়া ও ব্যবহার থেকে বিরত রাখে। যেমন যদি কেউ আইন কী বলে তা পড়তে না পারে, সেক্ষেত্রে সে  তা ব্যবহারকল্পে অপরিহরণীয়ভাবে বাধাগ্রস্ত হবে, এটাই তো স্বাভাবিক। এসব উদ্দেশ্যে ব্যাপকভাবে নিবেদিত তার বন্ধু ও সহকর্মীদের (সুলতানা কামাল, হামিদা হোসেন ও অন্যরা) সঙ্গে করে সালমা সোবহান মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রতিরোধ এবং সমাজের সবচেয়ে অসুবিধাগ্রস্ত সদস্যদের অধিকার সুরক্ষায় একটা সমন্বিত পদ্ধতি বিনির্মাণের ভিত্তি রচনা করেন। ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে হঠাৎ করেই সালমা সোবহানের মৃত্যু হয় কিন্তু আইন ও সালিশ কেন্দ্র তার বুদ্ধিবৃত্তিক নাগাল ও প্রায়োগিক প্রতিশ্রুতিসমেত দূরদৃষ্টি ও উদ্যোগের স্থায়ী উত্তরাধিকার হিসেবে থেকে যায়।

‘পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কি রে হায়

ও সেই চোখের দেখা, প্রাণের কথা, সে কি ভোলা যায়।

আয়, আরেকটি বার আয় রে সখা,

প্রাণের মাঝে আয়

মোরা সুখের দুখের কথা কব,

প্রাণ জুড়াবে তায়।’

 

আব্দুল বায়েস: অর্থনীতির অধ্যাপক

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির খণ্ডকালীন শিক্ষক