দেশে গ্যাস সরবরাহকারী দেশী-বিদেশী কোম্পানিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মজুদ রয়েছে সিলেট গ্যাসফিল্ড কোম্পানি লিমিটেডের (এসজিএফসিএল)। তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে মজুদকৃত গ্যাস ছিল সাড়ে ৯ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফিটের (টিসিএফ) মতো। এর মধ্যে কোম্পানিটির আওতাধীন গ্যাসক্ষেত্রগুলোয় মজুদকৃত গ্যাস ছিল প্রায় সাড়ে ৪ টিসিএফ বা ৪ হাজার ৪০৯ বিসিএফ (বিলিয়ন কিউবিক ফিট)। মোট গ্যাস মজুদের প্রায় অর্ধেক। কিন্তু পাঁচ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন সর্বনিম্নে। বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, গত ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জাতীয় গ্রিডে এসজিএফসিএল গ্যাস সরবরাহ করেছে ৯১ মিলিয়ন ঘনফুট; যা অন্য কোম্পানিগুলোর তুলনায় সবচেয়ে কম। বর্তমানে গ্যাসের ঘাটতিতে শিল্প-কারখানা ধুঁকছে। কিছু কারখানা বন্ধ হওয়ার খবর মিলছে। অনেক কারখানায় শিল্পোৎপাদন অনেক ক্ষেত্রে ব্যাহত হচ্ছে। তাই সংকট মোকাবেলায় স্থানীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে কোম্পানিটির উৎপাদন বাড়াতে কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সেগুলোর সুষ্ঠু ও দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি। 

১৯৮২ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত এসজিএফসিএল কোম্পানির আনুষ্ঠানিক যাত্রা। তখন থেকেই গ্যাস উৎপাদন ও সরবরাহে কাজ করছে এটি। বর্তমানে এ কোম্পানির অধীনে পাঁচটি গ্যাসক্ষেত্র রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এসব গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন হচ্ছে সবচেয়ে কম। তথ্য বলছে, গত পাঁচ অর্থবছরে কোম্পানিটির উৎপাদন কমেছে ৩২ শতাংশ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে কোম্পানিটির দৈনিক গ্যাসের উৎপাদন ছিল যেখানে ১৪১ মিলিয়ন ঘনফুট, সেখানে ২০২০-২১ অর্থবছরে তা নেমে আসে ৯৭ মিলিয়ন ঘনফুটে। ধারাবাহিকভাবে কোম্পানিটির উৎপাদন কমে আসার পেছনে কিছু ফ্যাক্টর কাজ করছে। এক দশকেরও বেশি সময় এ কোম্পানির আওতাধীন গ্যাসক্ষেত্রগুলোর কোনো উন্নয়নকাজ করা হয়নি। রশিদপুর ছাড়া কোম্পানির অধীন বাকি চার গ্যাসক্ষেত্র বেশ পুরনো। ষাটের দশকে সেগুলো আবিষ্কৃত হয়েছে এবং তখন থেকেই উত্তোলন চলছে। দীর্ঘ সময় পেরোলেও নতুন কূপ খনন দূরে থাক, বিদ্যমান কূপগুলোও যথাযথ সংস্কার (ওয়ার্কওভার) হয়নি। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারেও পিছিয়ে কোম্পানিটি। উৎপাদন বাড়াতে বিদেশী কোম্পানিগুলো কমপ্রেসার বসালেও প্রতিষ্ঠানটি সে ধরনের উদ্যোগ নেয়নি। আবার তথ্যগত গরমিলও রয়েছে। উৎপাদন ও মজুদের তথ্য হালনাগাদ করা হয় না। সব মিলিয়ে কোম্পানিটির গ্যাস উৎপাদন হতাশাজনক। 

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে জ্বালানি সংকট এখন বৈশ্বিক রূপ নিয়েছে। এজন্য প্রতিটি দেশই স্থানীয় প্রাথমিক জ্বালানি জোগানোর দিকে নজর দিয়েছে। নতুন করে নিজস্ব ভূখণ্ডে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান করছে। বিদ্যমান কূপগুলো সংস্কার করছে। এ খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ করা হচ্ছে। এমনকি অনেকেই বন্ধ হয়ে যাওয়া কূপে সেকেন্ডারি রিকভারি শুরু করেছে। বিশেষ করে কাতার, নরওয়ে বা মেক্সিকোর মতো দেশগুলো ‘প্রাইমারি রিকভারি’ শেষে সেকেন্ডারি রিকভারির মাধ্যমে গ্যাস উত্তোলন করছে। এতে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে। বলা চলে, নানামুখী পদক্ষেপে দেশগুলো জ্বালানি সংকট মোকাবেলা করছে, যা বাংলাদেশের জন্য অনুসরণীয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে ও কূপ সংস্কারে এখন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে এসজিএফসিএল। কথা হলো, কাজটি আগে শুরু করলে সুফলও মিলত দ্রুত। কোম্পানিটির আওতায় গ্যাসফিল্ডগুলোর যথাযথ সংস্কার করা গেলে আরো বেশি গ্যাস পাওয়া যেত। চলমান সংকট অনেকটা সামাল দেয়া যেত। আমরা দেখেছি, শেভরন ও অন্য বিদেশী কোম্পাানিগুলো তাদের গ্যাসক্ষেত্রগুলো সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। এর সুফলও মিলেছে। চার-পাঁচটি কূপের ওয়ার্কওভারের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে ৩০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাস সরবরাহ বেড়েছে। আগে থেকে উদ্যোগ নিলে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিটির উৎপাদন বাড়ানো যেত। সেটি সঠিক সময়ে করা হয়নি। বলতে গেলে রাষ্ট্রীয় অদূরদর্শিতায় আমাদের এখন ভুগতে হচ্ছে। 

বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন নতুন ও পুরনো কূপ সংস্কারের মাধ্যমে স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি এবং নতুন অনুসন্ধান চালানোর কথা বলে আসছিলেন। কিন্তু সরকার তাদের কথা আমলে না নিয়ে আমদানির দিকে ঝুঁকে পড়ে। শুরুতে পরিস্থিতি অনুকূল থাকলেও হঠাৎ করে গ্যাসের আন্তর্জাতিক বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। ভর্তুকি ও গ্যাসের দাম বাড়িয়েও সেটি সামাল দেয়া সরকারের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়লে স্পট মার্কেট থেকে গ্যাসের আমদানি বন্ধ করে দেয়া হয়। এখন জ্বালানি বিভাগ সচেতন হয়েছে এবং স্থানীয় গ্যাস আহরণে দৃষ্টি দিয়েছে। এটা ইতিবাচক। গ্যাসের অভাবে যেভাবে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ভুগছে তা শঙ্কার। এতে অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। এমনকি উন্নয়নের ধারাবাহিকতাও হুমকিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই জরুরি ভিত্তিতে স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো জরুরি। সেক্ষেত্রে এরই ধারাবাহিকতায় পেট্রোবাংলা বিদ্যমান কূপগুলো সংস্কার, নতুন কূপ খননসহ একগুচ্ছ পরিল্পনা রয়েছে। শুধু পরিকল্পনা রাখলে হবে না, কাজগুলো দ্রুত বাস্তবায়নও করতে হবে। সেকেন্ড রিকভারিরও উদ্যোগও প্রয়োজন। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের যেসব গ্যাসকূপ বন্ধ হয়ে গেছে, সেগুলো থেকে প্রাইমারি রিকভারির মাধ্যমে ৫০ শতাংশ গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে। বাকি অর্ধেক গ্যাস এখনো রয়ে গেছে। গবেষণা বলছে, প্রাথমিক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ গ্যাস উত্তোলন সম্ভব হয়। পরবর্তী আরো দুটি ধাপে উত্তোলন করলে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত গ্যাস উত্তোলন করা যেতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের কোম্পানিগুলো এ রকম কোনো চেষ্টা কখনো করেনি। এখন কোথায় কোথায় সেকেন্ডারি রিকভারি করা যায়, তা নিয়েও সুচিন্তিত কৌশল নিতে হবে। 

বরাবরই আমাদের রাষ্ট্র আশু লক্ষ্য নিয়ে এগোয়। দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা নেয় না। জ্বালানির ক্ষেত্রেও এটা প্রযোজ্য। অনেক দিন ধরে এ খাতে স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে, সুদূরপ্রসারী তেমন পরিকল্পনা নেই। এটা টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তার অন্তরায়। দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার পূর্বশর্ত প্রাথমিক জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো। প্রাথমিক জ্বালানিতে আমাদের গত এক দশকে বড় ধরনের কোনো বিনিয়োগ হয়নি। অথচ অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ হয়েছে। এসব খাতে বিনিয়োগ করে সুফলও কম। দেশের অনেক জায়গায় গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়েছে, কিন্তু এসব লাইনে গ্যাস সরবরাহ করা যায়নি। অথচ এ পরিমাণ অর্থ গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমে বিনিয়োগ করা গেলে সেখান থেকে নিশ্চিতভাবেই ইতিবাচক ফল পাওয়া যেত। বিদেশের বিভিন্ন সংস্থার গবেষণায় উঠে এসেছে, দেশে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা বিপুল। কিন্তু সরকার গ্যাস অনুসন্ধানে তেমন উদ্যোগ নেয়নি। দেশের ভূখণ্ডের অনেক অংশই এখনো অনুসন্ধানের আওতায় আনা হয়নি; বিশাল সমুদ্র এলাকায় অনুসন্ধান ন্যূনতম পর্যায়ে রয়ে গিয়েছে। জলসীমার আইনগত মীমাংসার পর থেকে মিয়ানমার ও ভারত বঙ্গোপসাগরে ব্যাপক অনুসন্ধান কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। মিয়ানমার এরই মধ্যে সমুদ্রে গ্যাস পেয়েছেও। আমরা সেদিকে তেমন মনোযোগ দিইনি। সংকট মোকাবেলায় এখন গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদারে আরো উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন।

পত্রিকান্তরে প্রকাশ, এরই মধ্যে ২০২৩ সালকে লক্ষ্যমাত্রায় নিয়ে চারটি কূপের ওয়ার্কওভার পরিকল্পনা করেছে এসজিএফসিএল। এরই মধ্যে বিয়ানীবাজার গ্যাসফিল্ডে কূপ খননকাজ শুরু হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে আগামী বছর নাগাদ আরো ৩১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত করার আশা করছে তারা। এটা ইতিবাচক। পাশাপাশি চাপ বাড়াতে কম্প্রেসার বসানোসহ আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন করতে হবে। নানামুখী উদ্যোগে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিটিতে গ্যাস উৎপাদন বাড়বে, এমনটাই প্রত্যাশা।