করোনাভাইরাস অনেক হাই প্রোফাইল মিলিয়নেয়ার, বিশিষ্টজন ও বিশ্ব ব্যক্তিত্বকে পৃথিবী ছেড়ে যেতে বাধ্য করেছে। সুতরাং পৃথিবীর সর্বত্রই এটা বলা শুরু হয়েছে কভিড-১৯ হচ্ছে ‘লেভেলার’—এলিট ও আমজনতার বিভেদ ঘুচিয়ে দিয়েছে। এটি সম্ভবত আংশিক সত্য। কারণ ২০২০-এর মতো করোনাকালে সারা পৃথিবীতে যে ১৬ জন বিলিয়নেয়ারের মৃত্যু হয়েছে তাদের একজনেরও করোনাভাইরাস পজিটিভ হয়ে মৃত্যু হয়নি। আরো একটি কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হচ্ছে করোনা সংক্রমণ মৃত্যুর সংখ্যা বাড়িয়ে দিলেও ২০২০ সালে বিলিয়নেয়ারের মৃত্যু ২০১৯ সালের তুলনায় ২৭ ভাগ কম। ২০১৯-এ ২২ জন বিলিয়নেয়ার মৃত্যুবরণ করেছেন।

প্রয়াত ১৬ জন বিলিয়নেয়ার সম্পর্কে সংক্ষেপে একটি ধারণা দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে:

সামার রেডস্টোন

তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। তাকে বাধ্যতামূলক সৈনিক হতে হলো। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন মার্কিন সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা, তার দায়িত্ব ছিল জাপানি সামরিক কোড ডিসাইফার করে প্রকৃত বার্তা উদ্ধার করা। ১৯৪৩-৪৫ ফার্স্ট লেফটেন্যান্ট থেকে আবার পড়াশোনায় ফিরে এলেন। বিএ ও এলএলবি ডিগ্রি নিলেন। ১৯৫৪ সালে পারিবারিক ব্যবসা নর্থ ওয়েস্ট থিয়েটার করপোরেশনে যোগ দিলেন। লাগাতার পরিশ্রম তাকে সাংস্কৃতিক মিডিয়া মোগলে পরিণত করল। প্যারামাউন্ট পিকচার্স ফিল্ম স্টুডিওর অধিকাংশ শেয়ার তার হাতে এল; ভায়াকম, সিবিএস নেটওয়ার্কের বড় শেয়ার তার। আমেরিকার সেরা দানবীরদের একজন তিনি।

তার জন্ম ১৯২৩ সালে, বোস্টনে, ইহুদি পরিবারে। পুরো নাম ছিল সামার মারি রথস্টেইন। নাম থেকে ইহুদি চিহ্ন সরাতে বাবা তা ছেঁটে করলেন রেডস্টোন। ‘হলিউড ওয়ার অব ফেইম’ রেডস্টোনের ছেলে ব্রেন্ট বাবার বিরুদ্ধে মামলা করেন যে, তিনি তার মেয়ে শারিকে বেশি সম্পদ দিয়েছেন। দুই স্ত্রী তালাকের পর তার গার্লফ্রেন্ড মেনুয়েলা হার্জার তাকে প্রদত্ত ক্ষমতা প্রত্যাহার করে নেয়ায় রেডস্টোনের বিরুদ্ধে মামলা করেন যে, তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ, মামলা খারিজ হয়ে যায়। তবে তার কথা বলতে সমস্যার কারণে তার সম্পদ রক্ষার জন্য একজন অভিভাবক নিয়োগ দেয়া হয়।

১১ আগস্ট, ২০২০ তিনি ৯৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

লি কুন হি

মৃত্যুর দিন পর্যন্ত স্যামসাং গ্রুপের চেয়ারম্যান দক্ষিণ কোরিয়ার লি কুন হি ২১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি সম্পদ রেখে দীর্ঘ সময় কোমায় থাকার পর ২৫ অক্টোবর ২০২০ সালে ৭৮ বছর বয়সে প্রয়াত হলেন। ফোর্বসের তালিকায় ২০০৭ থেকে এ পর্যন্ত তিনিই দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি ছিলেন এবং ফোর্বস তাকে সবচেয়ে ক্ষমতাশালীও মনে করেছে।

কোরিয়া যখন জাপানের দখলে, সে সময় ৯ জানুয়ারি ১৯৪২-এ তার জন্ম, তিনি স্যামসাং গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা লি বিয়ুঙ্গ চুলের তৃতীয় ছেলে। স্যামসাং শুনলেই ইলেকট্রনিকস সামগ্রী মোবাইল ফোন ইত্যাদির ইমেজ যেমন চোখের সামনে ভেসে ওঠে, শুরুতে তা ছিল না। শুরুতে ছিল ফল এবং শুঁটকি রফতানি। লি কুন হি ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে বাণিজ্য বিষয়ে স্নাতকোত্তর করতে যান। কিন্তু তার ডিগ্রি নেয়া হয়নি। লি ১৯৬৬ থেকে স্যামসাং গ্রুপের ব্রডকাস্টিং ও কনস্ট্রাকশন কোম্পানিতে কাজ শুরু করেন। ১৯৮৭ সালে বাবার মৃত্যুর পর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন।

তার যে কথাটি বহুল উদ্ধৃত তা হচ্ছে, ক্ষতি হলেও বৌ আর বাচ্চাদের ছাড়া সব বদলে ফেলুন। তখন চলছিল সনির রাজত্ব। তার নির্দেশনায় বহুমুখী ও বিচিত্র উৎপাদন এবং আগ্রাসী বাজারজাতের ফল পেলেন ২০০৬ সালে। এ বছর স্যামসাং সনিকে ছাড়িয়ে গেল।

তার বিরুদ্ধে সাবেক প্রেসিডেন্ট ও কর্মকর্তাদের ঘুষ প্রদান ও আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগে সাত বছরের কারাদণ্ড ও ৯৮ মিলিয়ন ডলার অর্থদণ্ড হয়। কিন্তু প্রেসিডেন্ট লি মিয়ুঙ্গ-বাক তাকে ক্ষমা করে দেন। এখানেও বড় অংকের ঘুষ দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। তার এক ছেলে ও তিন মেয়ে, একটি মেয়ে আত্মহত্যা করেন। তার মৃত্যুর পর সন্তানরা বাবার কর ফাঁকির মামলায় পড়তে যাচ্ছেন।

জোসেফ সাফরা

লেবাননের ইহুদি পরিবারে ১৯৩৮ সালে জন্ম নেয়া জোসেফ জারার সম্পদ লি কুন হির চেয়েও বেশি। উসমানিয়া রাজত্বকাল থেকেই তার পরিবারের পূর্বপুরুষরা ব্যাংকিং ব্যবসায় জড়িত ছিলেন। তাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছড়িয়ে ছিল আলেম্পো, বৈরুত, আলেকজান্দ্রিয়া ও ইস্তাম্বুলে। তার বয়স যখন ১৪, তাদের পরিবার ব্রাজিলে এসে বসতি স্থাপন করে। ইহুদি নিপীড়ন এড়াতে তার বাবা এ সিদ্ধান্ত নেন। জোসেফ সাফরা ১৭ বছর বয়সে বাঙ্কো সাফরা—সাফরা ব্যাংক স্থাপন করেন, যা ব্রাজিলের ষষ্ঠ বৃহৎ প্রাইভেট ব্যাংক। তার ব্যাংকিং ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ব্যবসা ইউরোপ এবং উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকাজুড়ে ছড়িয়ে আছে। বিভিন্ন ব্যাংকের তিনি বিনিয়োগকারী।

জোসেফ নিজে কাজের জন্য নেশাগ্রস্ত মানুষ, তিনি অন্যদেরকেও তা-ই প্রত্যাশা করেন। যেসব কর্মচারী নির্ধারিত সময়ের বেশি তার কোম্পানির জন্য কাজ করেন তিনি তাদের স্ত্রীদেরকে স্বামীসহ না পাওয়ার ক্ষতি পোষাতে স্বর্ণালঙ্কার কিনে দেন। তিনি তার ব্যবসায়ের প্রশ্নে অনেকটা গোপনীয়তা রক্ষা করেন। তিনি ইংরেজি আরবি, হিব্রু, ফরাসি ও পর্তুগিজ ভাষায় দক্ষ। তিনি খুব সাদাসিধে জীবন যাপন করলেও নিজের ও পরিবারের জন্য ইসরায়েলি মোসাদের কাছে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ দিয়েছেন। তিনি প্রাচীন ও দুর্লভ বইয়ের পাঠক ও সংগ্রাহক। তিনি বিশেষ করে দরিদ্র ও যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বড় ধরনের সহায়তা করে থাকেন। ২০১৬ সালে ঘুষ প্রদান ও কর এড়ানোর অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তার চার সন্তান—এক মেয়ে ও তিন ছেলে। ছেলেরা নিউইয়র্কে নিজস্ব ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি গত ১০ ডিসেম্বর ৮২ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

হুইটনি ম্যাকমিলান

আমেরিকান বিলিয়নেয়ার পরিবারে জন্মগ্রহণ করা (২৫ সেপ্টেম্বর ১৯২৯) হুইটনি ম্যাকমিলান ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হয়ে বাবাকে যখন জিজ্ঞাসা করলেন—এবার কী করবেন? বাবা বললেন, ‘তুমি যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছ, এটাই চালিয়ে যাও। কারণ ভবিষ্যতে আর এখানে ফেরার সুযোগ পাবে না, তবে ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে পড়াশোনা করো না। যখন ব্যবসায় নামবে তখন ব্যবসা থেকেই তা শিখতে পারবে, ইয়েল ইউনিভার্সিটি যা শেখাবে তার সবই ভুল।

তিনি প্রথমে পৈতৃক প্রতিষ্ঠান কার্গিলের ভেজিটেবল অয়েল শাখায় কাজ শুরু করলেন। বিলিয়নেয়ারের ছেলে বলে বাবা বাড়তি খাতির করেননি, একটার পর একটা কাজ শিখে প্রতিষ্ঠানের সেলস প্রমোশনে ডিরেক্টর হয়েছেন। তার হাত ধরেই কার্গিল এখন পৃথিবীর অন্যতম মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি।

তারই ভাষ্য, আমি যে সময়টা কার্গিলের জন্য কাজ করেছি (সিইও হিসেবে ১৯৭৬-৯৫), পৃথিবীর অন্য যেকোনো প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষকে আমি দারিদ্র্য থেকে তুলে এনেছি।

হুইটনি ম্যাকমিলান ১১ মার্চ ২০২০ সালে ৯০ বছর বয়সে ফ্লোরিডায় মৃত্যুবরণ করেন।

সুনা কিরাচ

২০২০ সালে মৃত্যুবরণ করা একমাত্র নারী বিলিয়নেয়ার। সুনা তুরস্কের সবচেয়ে ধনী পরিবারে জন্মগ্রহণ করা মেয়ে; তার জন্ম ৩ জুন ১৯৪১। তার বাবা বেহবি কচ-ই কচ হোল্ডিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা। সুনা এ প্রতিষ্ঠানেরই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইনান কিরাচকে বিয়ে করেন। সুনা কচ হোল্ডিংয়ের ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। দাম্পত্য জীবনের প্রথম ১৫ বছরেও কোনো সন্তান না হওয়ায় ইপেক নামের চার মাস বয়সী একটি কন্যাশিশুকে পালক নেন। শিক্ষা বিস্তার এবং উচ্চ শিক্ষার জন্য তিনি প্রচুর দান করেছেন। তার সৃষ্ট শিক্ষা ও সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন ২০০৫ সালে একটি জাদুঘরও উদ্বোধন করেছে। ১৯৯৮ সালে সুনা কচ তার আত্মজীবনী প্রকাশ করেন। তিনি তার জীবন, বিয়ে, সন্তান পালক গ্রহণ করা, ব্যবসা, তার পেশাগত জীবন, অসুস্থতা ও স্বপ্ন নিয়ে এ বই রচনা করেছেন।

তিনি এমিওট্রোপিক লেটারাল স্ক্লেরোসিস রোগে আক্রান্ত অবস্থায় ২০০০ সালে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েন। এমনকি তার কথা বলার শক্তিও লোপ পায়। ৭৯ বছর বয়সে ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ তিনি ইস্তাম্বুলে পরলোকগমন করেন।

অ্যালয়সিয়ো দ্য অ্যান্দ্রাদে ফারিয়া

অ্যান্দ্রাদে ফারিয়ার জন্ম ব্রাজিলে। তিনি শিশুচিকিৎসক হিসেবে প্রশিক্ষিত, কিন্তু বাবা ক্লেমেন্ত দ্য ফারিয়ার মৃত্যুর পর তার ব্যাংক ব্যবসাতেই মনোযোগী হতে বাধ্য হন। শিশুযত্নের মতোই তিনি বাবার ব্যাংককে সফল করে তোলেন, বাঙ্কো রিয়েল হয়ে ওঠে ব্রাজিলের সবচেয়ে সফল ব্যাংক। তার হাতে সৃষ্ট সেগুরাস রিয়েল দেশের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ কোম্পানিতে পরিণত হয়। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা করেন ব্যাংক আলফা। শাখা ও গ্রাহক প্রোফাইলের হিসাবে এটিও শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ একটি ব্যাংক।

১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ মৃত্যুর সময় তিনি ছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে বয়স্ক বিলিয়নেয়ার, তখন তার বয়স ছিল ৯৯ বছর।

তিনি পৃথিবীর বৃহত্তম ফল বাগানগুলোর একটির মালিক, একটি চেইন হোটেল গ্রুপ এবং ট্রান্স আমেরিকান করপোরেশনও তার মালিকানাধীন। পৃথিবীর অনেক প্রকৃত ধনী মানুষের মতো তিনিও সাধারণ জীবনযাপন করতেন। তার ব্যবহূত গাড়িটি ছিল ১৯৬০ মডেলের একটি মার্সিডিজ।

এদুয়ার্দো মারফি গোজুয়াঙ্কো

এই ফিলিপিনো ব্যবসায়ী বিলিয়নেয়ার পরিচিত ছিলেন ড্যানডিং গোজুয়াঙ্কো নামে। তার বাবা চীনা বংশোদ্ভূত ব্যবসায়ী এবং মা আইরিশ-কানাডিয়ান। ১৬ জুন ২০২০ পরিবার পরিবৃত অবস্থায় ৮৫তম জন্মদিনে হূদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

ফিলিপাইনের একনায়ক প্রেসিডেন্ট ফার্দিন্দ মার্কোসের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে তিনি একদিকে যেমন বাণিজ্যিক সুবিধা পেয়েছেন, অন্যদিকে রাজনৈতিক মহলে অসৎ ও ষড়যন্ত্রকারী হিসেবেও পরিচিত হয়েছেন। খাবার ও কোমলপানীয় কোম্পানি সান মিগুয়েল করপোরেশনের তিনিই ছিলেন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যান। একসময় ফিলিপাইনের মোট জাতীয় আয়ের এক-চতুর্থাংশ আয় করত তার কোম্পানিগুলো। দেশের এ প্রধান ব্যবসায়ীকে রোলেক্স ১২ গ্রুপের একজন সদস্য মনে করা হয়, যেখানে ১১ জন সেনা কর্মকর্তা ও একজন বেসামরিক ব্যক্তি হিসেবে তিনি ১৯৭২ সালের সামরিক আইন জারির পরিকল্পনা করেছিলেন। বেনিনো একুইনো হত্যাকাণ্ডের অন্যতম পরিকল্পনাকারীও তিনি। এটা ফিলিপিনোদের বিশ্বাস। কিন্তু তারই কন্যা প্রেসিডেন্ট কোরাজান একুইনো যখন প্রকাশ্যে ঘোষণা দিলেন, তার পিতার হত্যাকাণ্ডে যে-ই জড়িত থাকুন না কেন কোনোভাবেই ড্যানডিং গোজুয়াঙ্কো তাদের মাঝে থাকতে পারেন না। তখন জনগণ ধরে নিল, সম্ভবত তিনি কোরাজানকেও কিনে নিয়েছেন।

১৯৭৩-৮২ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয়ভাবে আদায় করা কোকো লেভি ফান্ড (নারকেল চাষ সম্প্রসারণ ও উন্নয়নের জন্য সৃষ্ট তহবিল) তিনি আত্মসাৎ করেন বলে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়।

১৯৮৬-এর ফেব্রুয়ারিতে পিপল পাওয়ার রেভল্যুশন যখন প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোসকে ক্ষমতা থেকে উত্খাত করে, মার্কোস পরিবারের সঙ্গে তিনিও নির্বাসনে চলে যান। তবে নির্বাসনকালে তিনি হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকেননি। অস্ট্রেলিয়া হর্স ব্রিডিং এবং হর্স রেসিংয়ের ব্যবসা করেন। পরিস্থিতি কিছুটা অনুকূলে এলে ১৯৮৯ সালে তিনি ফিলিপাইন ফিরে আসেন। রাজনৈতিক দল গঠন এবং ১৯৯২ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তৃতীয় স্থান অধিকার করেন, প্রেসিডেন্ট হন ফিদেল র্যামোস। ২০০৪-এর নির্বাচনে দাঁড়িয়েও সমঝোতার মাধ্যমে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেন। তিনি কার্যত হয়ে ওঠেন ফিলিপাইনের কিং মেকার। ক্রীড়াঙ্গনে তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। ক্রীড়া উন্নয়নে প্রচুর ব্যয় করেছেন।

পার্ক ইয়োন-চা

স্যামসাং ব্র্যান্ডের কোনো একটি দ্রব্য যেমন আধুনিক যেকোনো পরিবারে মিলবেই, তেমনি যে বাড়িতে তরুণ ছেলে বা মেয়ে আছে, সে বাড়িতে দু-এক জোড়া নাইকি জুতাও থাকবে। নাইকি জুতাই পার্ক ইয়োন চাকে বিলিয়নেয়ার বানিয়েছে।

৩১ জানুয়ারি ২০২০ এই বিলিয়নেয়ার মৃত্যুবরণ করেন। পৃথিবীতে এমন কোনো দেশ নেই, যেখানে নাইকির জুতার গ্রাহক নেই।

কোরিয়ায় তার প্রতিষ্ঠানের নাম টেকওয়াঙ্গ ইন্ডাস্ট্রিয়াল করপোরেশন। ১৯৮০-এর দশকের শেষ ভাগে জুতা প্রস্তুতির কাজ শুরু করেন, নিজের কোরিয়ান কোম্পানিতে শ্রমিক ৭০ হাজার; চীন, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামেও নাইকির মেগা কারখানা স্থাপিত হয়েছে।

পার্ক ইয়োন-চা তার কোম্পানির প্রকল্পে বৈচিত্র্য এনে সার এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিক্রি শুরু করেন। ভিয়েতনামে তার ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের বিদ্যুৎ প্রকল্প ২০২২ থেকে ২৫ বছর ভিয়েতনাম সরকারের মূল সঞ্চালন লাইনে বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে। তার বিরুদ্ধে ঘুষ প্রদান, কর ফাঁকি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ছিল। ২০০৯ সালে কোরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট রোহ মু-হিউনের উপর থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যার তদন্তে বেরিয়ে আসে, পার্ক ইয়োন-চা তাকে ১ মিলিয়ন ডলার দিয়েছিলেন।

পার্ক ইয়োন-চা দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, পড়াশোনাও প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত। হাতে টাকা আসতে শুরু করলে তিনি বুঝতে পারেন, ব্যবসায়িক বৃহৎ সাফল্যের জন্য দরকার অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক। সুতরাং তিনি অর্থ ব্যয় করে তার পরিচিতের দিগন্ত বাড়াতে থাকেন এবং রাজনীতিবিদদেরও তার ওপর নির্ভরশীল করে তোলেন। এর সুফল তিনি পেয়েছেন।

আর্নি ভিলহেল্মসন

৯১ বছর বয়সে ১১ এপ্রিল ২০২০ বিলিয়নেয়ার ও রয়াল ক্যারিবিয়ান ক্রুজের প্রতিষ্ঠাতা আর্নি ভিলহেল্মসন মারা গেলেন। প্রমোদ ভ্রমণে সমুদ্র—এ ধারণাকে আর্নি ভিলহেল্মসন রাজকীয় রূপ দিয়ে বাস্তবায়ন করেছেন। নরওয়ের এ ব্যবসায়ী হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল থেকে এমবিএ করার পর নরওয়ের একটি কোম্পানিতে কিছুকাল কাজ করে নিউইয়র্কে এসে জাহাজ কেনাবেচার দালালি শুরু করেন; তারপর ১৯৫৪ সালে পারিবারিক ব্যবসা। ১৯৬৮ সালে এডউইন স্টেফানকে সঙ্গে নিয়ে চালু করলেন রয়্যাল ক্যারিবিয়ান ক্রুজ। ৬১টি বিশাল সমুদ্রগামী জাহাজের বহর নিয়ে সাতটি মহাদেশে যাত্রী ও পর্যটকসেবা দেয়া আর্নি ভিলহেল্মসনের কোম্পানিই বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্রুজ শিপিং লাইনার। তিনিই আধুনিক সমুদ্রভ্রমণের একজন বাস্তব ‘ভিশনারি’।

দিমিত্রি বরিসোভিচ বোসভ

৬ মে ২০২০ মস্কোর অ্যাপার্টমেন্টে যখন গুলিতে নিহত সফল বিলিয়নেয়ার দিমিত্রি বোসভের মরদেহ পাওয়া গেল, তার বয়স তখন মাত্র ৪২ বছর। তিনি পরিচিত ছিলেন ‘কোল ম্যাগনেট’ হিসেবে। তাকে হত্যা করা হয়েছে এমন অভিযোগ ওঠেনি বরং মৃত্যুর একটু আগেও তিনি ভিডিওকলে আত্মীয়স্বজন ও ব্যবসায়ী বন্ধুদের সঙ্গে হাসিঠাট্টা করেছেন। এটি আত্মহত্যা হিসেবে মেনে নেয়া হয়েছে। তিনি রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে স্কেটিং করতেন। তার ছেলের ভাষ্য, কতগুলো খারাপ ও লোকসানি বিনিয়োগ থেকে সৃষ্ট হতাশা তার মৃত্যু ডেকে এনেছে।

শেলডন হেনরি সলো

সাংস্কৃতিক অঙ্গনের আপনজন, আমেরিকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিত্রকলা সংগ্রাহক এবং রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার বিলিয়নেয়ার শেলডন সলো ৯২ বছর বয়সে ১৭ নভেম্বর ২০২০ মৃত্যুবরণ করেছেন।

ব্রুকলিনের অভিবাসী ইহুদি পরিবারের সন্তান শেলডনের বাবা ছিলেন রাজমিস্ত্রি। শেলডন নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে প্রকৌশল ও স্থাপত্য বিষয়ে পড়াশোনা করতে করতে সময় নষ্ট হচ্ছে মনে করে একসময় তা ছেড়ে দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেন। ১৯৫০ সালে সরকারি ঋণে ৭২টি পরিবারের জন্য একটি অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং বানিয়ে সুনামও অর্জন করলেন, হাতে টাকাও এল। তারপর লং আইল্যান্ডে করলেন একটি শপিং সেন্টার। ১৯৬২-তে পার্ক এভিনিউতে অফিস নিয়ে সরাসরি নিজেই ব্যবসায় নেমে পড়লেন। মানহাটন আপার ইস্ট সাইডে তৈরি করলেন বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট। নিউইয়র্কের ৫৭তম সড়কে সঙ্গোপনে ১৪টি বাড়ি কিনে হাইরাইজ বিল্ডিং বানাতে শুরু করলেন। জাতিসংঘ সদর দপ্তরের পাশের ৯ একর জায়গা ২০০০ সালে ৬০০ মিলিয়ন ডলার দিয়ে কিনে নিলেন। তাকে বহু মামলা-মোকদ্দমার মুখোমুখি হতে হয়েছে।

শেলডনের স্ত্রী সুইডিশ স্থপতি ও ডিজাইনার মিয়া ফনসাগ্রিভস-সলো। তার সংগ্রহে রয়েছে বতিচেল্লি, ব্যালথাস, মাতিসে ভ্যান গগ, ফ্রাঞ্জ ক্লিন, গিয়াকোনেত্তি, ফ্রান্সিস বেকন, জোয়ান মিরো, মদিগ্লিয়ানি প্রমুখের দুর্লভ পেইন্টিং, হেনরি মুরের ভাস্কর্য।

২০২০ সালে প্রয়াত বিলিয়নেয়ারদের মধ্যে আরো রয়েছেন রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার হংকংয়ের ট্যাঙ্গ সুই-টঙ্গ (মৃত্যু ২ জানুয়ারি, ৯০ বছর বয়সে) স্পেনিশ ডেপেলপার ম্যানুয়েল কাপেলান (মৃত্যু ৭ মে, ৭৯ বছর বয়সে) এবং সানবিম টেলিভিশন কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা এডমুন্ড আনসিল (মৃত্যু ২৬ জুলাই, ৮৪ বছর বয়সে)।

 

ড. এমএ মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা