বাংলাদেশ সংবিধানের ৪৩ (খ) নম্বর অনুচ্ছেদে ব্যক্তির তথ্য সুরক্ষা ও গোপনীয়তা মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃত। এজন্য সংবিধানে ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণের কথা বলা হলেও বর্তমানে তা অনেকটাই অবহেলিত। দেশে নাগরিকের বিনা অনুমতিতে সরকারি-বেসরকারি নানাভাবে মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ ও হাতবদল হওয়ার খবর মিলছে। এতে নিয়ত নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে ব্যক্তি নাগরিক। এমন এক নাজুক অবস্থায় বৃহস্পতিবার পালিত হলো আন্তর্জাতিক তথ্য সুরক্ষা দিবস। আলোচ্য দিবসে আবারো ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষাসংক্রান্ত উদ্বেগগুলো সামনে এসেছে। এগুলোর প্রতিকার জরুরি।

বৈশ্বিক পরিসরে জোরালো প্রযুক্তিগত রূপান্তরের ধারায় গত কয়েক বছরে বাংলাদেশেও তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন এসেছে। সরকারের রূপকল্প অনুযায়ী ডিজিটালাইজেশনের পথে হাঁটছে দেশ। ইন্টারনেটের প্রসারের সঙ্গে বাড়ছে বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল প্লাটফর্মের সংখ্যা। গড়ে উঠছে ই-কমার্সকেন্দ্রিক বিভিন্ন সেবা প্রতিষ্ঠান। এসব ইতিবাচক অগ্রগতির পাশাপাশি বাড়ছে বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল অপরাধও। ফলে অনেক ক্ষেত্রে অরক্ষণীয় হয়ে পড়ছে নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য ও নিরাপত্তা। দেখা যাচ্ছে, কোনো কোনো মোবাইল অপারেটর, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত তথ্য বেহাত হওয়ার ঘটনা ঘটছে। অ্যাপভিত্তিক পরিবহন সেবাদাতাদের বিরুদ্ধে আছে মানুষের তথ্য হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ। মুঠোফোনে রিচার্জ ব্যবসায়ী ও মুঠোফোনে আর্থিক সেবাদাতার (এমএফএস) এজেন্টের কাছ থেকেও অনেক মানুষের তথ্য হাতবদল হচ্ছে। কারো কারো ফোনালাপ, ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে ইন্টারনেটে, জনপরিসরে। শুধু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নয়, সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও ব্যক্তির তথ্য গোপনীয়তা লঙ্ঘনের অভিযোগ মিলছে। ব্যক্তির একান্ততা রক্ষা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থে নিশ্চয়ই রাষ্ট্র ব্যক্তির তথ্য নিতে পারে, কিন্তু কতটুকু নিতে পারবে, তারও একটা সুস্পষ্ট সীমা থাকা দরকার।

তথ্য সুরক্ষার বিষয়টি কেবল বাংলাদেশের নয়, এটি একটি বৈশ্বিক ইস্যু। সংগত কারণে দেশে দেশে এ-সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। আঙ্কটাডের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ১৯৪টি দেশের মধ্যে ১২৮টিতে তথ্য সুরক্ষা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার আইন রয়েছে। অনেক দেশ আইনের খসড়া করেছে। অন্য মহাদেশগুলো দূরে থাক, এশিয়ায় ভারত, নেপাল, চীন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডে তথ্য সুরক্ষা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার আইন আছে। মিয়ানমার ও পাকিস্তান এরই মধ্যে এ আইনের খসড়া প্রণয়ন করেছে। কিছু দেশ কিছুই করেনি, দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশ সেই তালিকায় অবস্থান করছে। সত্য যে দেশে ডিজিটাল আইনসহ অন্য আইনে কিছুটা প্রতিকারের ব্যবস্থা থাকলেও ব্যক্তির তথ্য সুরক্ষা ও গোপনীয়তার স্বতন্ত্র আইন নেই। যত দিন যাবে, ডিজিটাল অপরাধ, প্রতারণা বাড়বে। এতে নাগরিকের তথ্য সুরক্ষা যেমন বিঘ্নিত হবে, তেমনি ব্যক্তির নিরাপত্তাও হুমকিতে পড়বে বৈকি। তাই এ ধরনের একটি আইন প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।

আজকাল বিভিন্ন ধরনের সেবা প্রদানে নানা রকম মোবাইল অ্যাপস তৈরি করছে প্রতিষ্ঠানগুলো। মানুষও জরুরি প্রয়োজনে সেগুলো ব্যবহার করছে। অনেক সময় ওইসব অ্যাপস ব্যক্তির মোবাইলের ছবির ফোল্ডার, কনট্যাক্টস, অডিওসহ বিভিন্ন ফোল্ডারে প্রবেশের অনুমতি চায়। অনেকটা অসচেতনতায় ব্যক্তি অনুমতি দিয়েও দেয়। প্রশ্ন হলো, সুনির্দিষ্ট কোনো সেবার জন্য এসব তথ্য আদৌ জরুরি কিনা। কাজেই কোন অ্যাপ কতটুকু তথ্য নিতে পারবে, তা-ও নির্ধারিত থাকা উচিত মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। এটি অবশ্যই সংশ্লিষ্টদের আমলে নেয়া প্রয়োজন।

তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে ব্যক্তির তথ্য সুরক্ষা অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। রাষ্ট্রের কাছে জনগণের তথ্য কতটা সুরক্ষিত, তা শক্তিশালী গণতন্ত্রের নির্ণায়ক মনে করেন কোনো কোনো রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। সুতরাং এ বাস্তবতায় তথ্য সুরক্ষার বিষয়টি উপেক্ষার সুযোগ নেই। ব্যক্তিগত তথ্যজনিত অরক্ষণীয়তায় মানুষের অসহায়ত্ব দিন দিন বেড়ে চলছে। তাই আইনজ্ঞরা কে কীভাবে কতটুকু তথ্য সংগ্রহ করবেন, কীভাবে ব্যবহার করবেন, সেগুলোর সুরক্ষা ব্যবস্থা কী হবে, তা নিয়ে সুস্পষ্ট আইনি কাঠামো তৈরির কথা বলছেন। সাম্প্রতিক সময়ে সংবাদমাধ্যমকে দেয়া ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রীর এক বক্তব্যেও ব্যক্তির তথ্য সুরক্ষায় আলাদা আইনের প্রয়োজনীয়তা ও উদ্যোগের কথা উঠে এসেছে। অন্য দেশগুলোর অভিজ্ঞতা ও আইন পর্যালোচনায় দেশে এ-সংক্রান্ত একটি যুগোপযোগী আইন প্রণয়নে জরুরি ভিত্তিতে কাজ শুরু করে দিতে হবে। একই সঙ্গে জনসাধারণের সচেতনতাও বাড়িয়ে তুলতে হবে। নীতিনির্ধারকদের কার্যকর পদক্ষেপে দেশে ব্যক্তির তথ্য ও গোপনীয়তা সুরক্ষিত হবে, এটিই প্রত্যাশা।