২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল করতে এবং বৈশ্বিক বাজারে দেশের অর্থনীতির চাকা গতিশীল রাখতে ক্রলিং পেগ নীতি অনুসরণের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক, যা জুন থেকে কার্যকর করার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। গত ৮ মে বাংলাদেশ ব্যাংক এক সার্কুলারের মাধ্যমে প্রতি মার্কিন ডলারের বিনিময় হার স্থানীয় মুদ্রায় ৭ টাকা বৃদ্ধি করে ১১০ টাকা থেকে ১১৭ টাকা নির্ধারণ করেছে। বর্তমানে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি হার এবং অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে দেশের স্থানীয় মুদ্রার সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হারে ব্যাপকভাবে অবমূল্যায়নের হুমকি দেখা দিয়েছে। কয়েক বছর ধরে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় বাজার বেশ অস্থির; ডলারের বিপরীতে টাকার নিয়মিত হারে অবমূল্যায়ন হয়েই যাচ্ছে। ২০২১ সালের মার্চে যেখানে ডলারের বিপরীতে টাকার মান ছিল ৮৪ দশমিক ৮১ টাকা, যা ২০২৪ এর মার্চে ২৯ দশমিক ২০ টাকা বেড়ে ১১৪ দশমিক শূন্য ১ টাকা যা প্রায় ৩৪ দশমিক ৪৩ শতাংশের বেশি।
সাধারণত তিনভাবে কোনো দেশের মুদ্রার বিনিময় হার নির্ধারিত হয়ে থাকে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে স্থির বিনিময় হার। দ্বিতীয় পদ্ধতিটি হচ্ছে বাজারভিত্তিক বিনিময় হার। আর ক্রলিং পেগ হলো এদের মধ্যবর্তী একটি পদ্ধতি যেখানে বৈদেশিক মুদ্রার সঙ্গে বিনিময় হারের একটি উচ্চ ও নিম্ন সীমা নির্ধারণ করা থাকে। এভাবে অস্থিরতার সময় দেশীয় মুদ্রার মূল্য এবং হারের সীমা ঘন ঘন সমন্বয় করা হয়। তবে ক্রলিং পেগ পদ্ধতি অনুসরণ কোনো অর্থনীতির জন্য সুখকর নয়। সাধারণত উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও স্থানীয় মুদ্রার সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের ঘন ঘন অবমূল্যায়ন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস ইত্যাদি কারণে অস্থির একটি অর্থনীতি যখন একদম তলানিতে চলে যায় তখন উপায়ন্তর না দেখে এ পদ্ধতিকে শেষ ভরসা মানতে হচ্ছে। তার মানে এই যে, বাংলাদেশের অর্থনীতি সেই তলানিতে পৌঁছে গেছে যেখান থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হলো এই ক্রলিং পেগ। অনেকেই হয়তো বলবেন, সমস্যার সমাধান যখন পাওয়া গেছে তখন আর চিন্তা কী? অর্থনীতিবিদদের মতে, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সময়ে কোনো দেশে ‘ক্রলিং পেগ’ নীতি অনুসরণ করা হলে সেটির ফল পাওয়া যায়। কিন্তু কোনো দেশের রিজার্ভ দুর্বল হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বিনিময় হারের অস্থিরতা বেড়ে গেলে এবং একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলমান থাকলে সেখানে এ নীতির চর্চা খুব একটা কার্যকরী নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাষ্যমতে, ক্রলিং পেগ নীতি অনুসরণ করা হলে ডলার সংকট কেটে যাবে। বিনিময় হারজনিত অস্থিরতাও হ্রাস পাবে, অর্থনৈতিক উন্নতি ত্বরান্বিত হবে। আসলেই কি ব্যাপারটা এত সহজ! আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ (আইএমএফ), বিভিন্ন সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিশ্বের উন্নত ও স্বাস্থ্যবান অর্থনীতির কোনো দেশই বিনিময় হার নির্ধারণের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত ‘ক্রলিং পেগ’ নীতির প্রয়োগ করেনি। উন্নত দেশগুলো বিনিময় হারকে বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়। নিকারাগুয়া, বতসোয়ানা, একুয়েডর, উরুগুয়ে, কোস্টারিকা, ভিয়েতনাম, আর্জেন্টিনাসহ বেশকিছু নড়বড়ে অর্থনীতির দেশ কেবল এ নীতি অনুসরণ করেছে। তবে তেমন একটা সফলতা অর্জন করতে না পেরে এরই মধ্যে আবার অনেক দেশ এটি থেকে বের হয়েও এসেছে। সম্প্রতি এ নীতি অনুসরণের ঘোষণা দিয়েছে নাইজেরিয়া। ২০২৩-এ আর্জেন্টিনার ব্যাংক খাতের চেয়ে খুচরা ও কালোবাজারে প্রতি ডলারের বিপরীতে পেসো, প্রায় দ্বিগুণ দামে বিক্রি হতো। এ অবস্থায় আগস্টের মাঝামাঝিতে ‘ক্রলিং পেগ’ নীতি গ্রহণ করে আর্জেন্টিনা তবে খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। ব্যাংক খাতের সঙ্গে কালোবাজারে ডলারের দামের ব্যবধান আরো বেড়ে যায়, এক ধাক্কায় প্রতি ডলারের বিপরীতে ৫০ শতাংশ অবমূল্যায়ন ঘটে পেসোর। তাই বলা যায়, সেখানে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে এটি।
তবে ক্রলিং পেগ অনুসরণ করে অস্থির অর্থনীতিতে স্বল্পমেয়াদি কিছু সুফল পাওয়া যেতে পারে। ক্রলিং পেগ ব্যবস্থায় সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিনিময় হারের ওপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারে যা কঠিন সময়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এ ব্যবস্থায় মুদ্রার বিনিময় হার যেহেতু ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়, তাই আকস্মিক পরিবর্তনের চেয়ে বেশি স্থিতিশীল এবং পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশ তৈরি হয়। ফলে রফতানি ও আমদানিকারকরা বাজার সম্পর্কে কিছুটা হলেও ধারণা লাভ করতে পারে। আবার যেহেতু বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর দেশ সে ক্ষেত্রে আমদানিকারকরা কিছুটা স্বস্তির সঙ্গে পণ্য আমদানিতে মনোনিবেশ করতে পারবে। এ ব্যবস্থায় যেহেতু বিনিময় হার পূর্বনির্ধারিত এবং তার সামঞ্জস্য প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা বৃদ্ধি পায় যা বৈদেশিক এবং দেশীয় বিনিয়োগ উভয় ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ তারা জানে যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে এবং ধাপে ধাপে পরিবর্তন করছে, যা আকস্মিক মুদ্রা পতনের ঝুঁকি কমায়। ক্রলিং পেগ ব্যবস্থায় দেশীয় মুদ্রার ধীরে ধীরে অবমূল্যায়ন করা হলে দেশের রফতানি প্রতিযোগিতার হার বাড়তে পারে। যদিও সেক্ষেত্রে যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। অন্যথায় আমদানি ব্যয় বাড়বে যার প্রভাব পড়বে দেশের পণ্যবাজারে। স্পেকুলেটররা মুদ্রার মান কমবে বা বাড়বে বলে ধারণা করে অস্বাভাবিক লাভের আশায় বিনিয়োগ করে থাকে। কিন্তু যখন তারা জানে যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি নির্দিষ্ট ফরমুলা অনুসরণ করে ধারাবাহিকভাবে বিনিময় হার সামঞ্জস্য করছে, তখন এ ধরনের আক্রমণের সম্ভাবনা কমে যায়।
যদিও ক্রলিং পেগ ব্যবস্থার এ সুবিধাগুলো রয়েছে, তবে এটি সবসময় কার্যকর হবেই তেমনটা নয়, কারণ এর যথেষ্ট সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে এবং সঠিকভাবে পরিচালিত না হলে ক্রলিং পেগ ব্যবস্থা উলটো অর্থনৈতিক সমস্যার কারণ হতে পারে, যেমনটি দেখা গেছে আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রে। মনে রাখতে হবে, স্বল্পমেয়াদে কার্যকর হলেও দীর্ঘমেয়াদে সুবিধার চেয়ে অসুবিধাই বেশি। ক্রলিং পেগ সিস্টেমে মুদ্রার ধীরে ধীরে অবমূল্যায়ন ঘটে। যদি এ অবমূল্যায়ন হার পর্যাপ্ত না হয়, তবে এটি মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হতে পারে। বিনিময় হার সমন্বয় করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে প্রায়ই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবহার করতে হয়। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও চাপ পড়তে পারে। এছাড়া মুদ্রার ক্রমাগত অবমূল্যায়ন বৈদেশিক বাণিজ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। এটি রফতানিকে প্রতিযোগিতামূলক করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আমদানি খরচ বাড়িয়ে তুলতে পারে, যা স্থানীয় শিল্পের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। ব্যবসায়ীদের পরিচালনা ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় চাহিদা কমে যাবে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে কিংবা কর্মী ছাঁটাই করতে হবে। আবার বর্ধিত মূল্যে ডলার কিনে এলসি খুলতে অনেক ক্ষেত্রে লোকসানের সম্মুখীন হতে পারেন ব্যবসায়ীরা। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে মুদ্রার মান নিয়মিতভাবে পরিবর্তিত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থা হ্রাস পেতে পারে। ফলে বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে। তাছাড়া ব্যাংক খাতের সঙ্গে কালোবাজারে ডলারের দামের ব্যবধান আরো বেড়ে যেতে পারে।
দীর্ঘ সময় ধরে ক্রলিং পেগ চর্চা থাকলে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সমস্যা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ, নীতিগত জটিলতা, বাজার বিকৃতি, আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থা হ্রাস এবং বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতায় প্রভাব ইত্যাদি সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে দেশের অর্থনীতি। তাই এ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করে সঠিকভাবে পরিচালনার ওপর।
তানজিলা আমির: প্রভাষক, অর্থনীতি বিভাগ
ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি










