পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টার মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডের বর্ষপূর্তির সময়ই রোববার গুলশানে বহুতল আবাসিক ভবনের ভয়ংকর অগ্নিকাণ্ড ঘটল। এ ঘটনায় আমাদের ভবনগুলোর অভ্যন্তরীণ অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থায় সীমাহীন দুর্বলতা ও নগর সংস্থাগুলোর সার্বিক পরিকল্পনা, প্রস্তুতি, নজরদারি ও আইন প্রয়োগের দুর্বলতার বিষয়টি আবারো সামনে নিয়ে এসেছে। ভবন নির্মাণের কিছু নিয়মকানুন ও বিধি আছে, সেগুলো সঠিকভাবে অনুসরণ করা হলে ভবন নির্মাণ ও ব্যবহারের সময় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে না বলে আশা করা হয়। কিন্তু ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুরোপুরি অনুসরণ করা হয় না। ফলে অন্যান্য ঝুঁকির সঙ্গে বেড়েছে অগ্নিঝুঁকিও। আবার নিয়ম মেনে ভবন নির্মাণ করলেও অপ্রশস্ত সড়কের কারণে দুর্ঘটনাকবলিত মানুষ ও সম্পদ রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার অপ্রশস্ত রাস্তার কারণে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিস পৌঁছানো এবং উদ্ধারকাজ চালানো বেশির ভাগ সময় দুরূহ হয়ে পড়েছে। ঢাকা মহানগর ইমারত বিধিমালা ২০০৮ অনুযায়ী, নতুন ভবন নির্মাণে রাস্তার ন্যূনতম প্রশস্ততা থাকতে হয় আড়াই মিটার। কিন্তু ঢাকার অধিকাংশ ভবন এ নিয়ম উপেক্ষা করেই তৈরি করা হয়েছে। ফলে অগ্নিকাণ্ডসহ বিভিন্ন দুর্যোগে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এটা খুবই দুঃখজনক। উঁচু উঁচু ভবন গড়ে তোলা হচ্ছে। অথচ এসব ভবনের ভেতরে যারা বাস করবেন, তাদের নিরাপত্তা নিয়ে কারো কোনো চিন্তা নেই। 

১৯৯৩ সালে হাউজ বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউশনের মাধ্যমে সব পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ ইমারত নির্মাণ বিধিমালা প্রণীত হয়, তা মাঠপর্যায়ে প্রয়োগের জন্য ২০০৬ সালে আইনগত ভিত্তি পায়। কিন্তু এ বিধিমালা প্রয়োগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আজ পর্যন্ত কোনো প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়নি। বিধিমালা অনুসরণ করে ভবন নির্মাণ না করলে সাত বছর কারাদণ্ড অথবা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে। কিন্তু এ বিধানের প্রয়োগ নেই বললেই চলে। ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় বলা হয়েছে, সাত তলার চেয়ে উঁচু ভবনের ক্ষেত্রে আগুন শনাক্তকরণ যন্ত্র, ধোঁয়া শনাক্তকরণ যন্ত্র, পানি ছিটানোর ব্যবস্থা ও কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন ব্যবস্থা থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু দেশের বিভিন্ন নগরীর বেশির ভাগ বহুতল ভবন নির্মাণে এসবের তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। বর্তমানে ঢাকাসহ সারা দেশের নগর এলাকায় সিঁড়ি, ফায়ার লিফট, ফায়ার ডোর ইত্যাদি অগ্নিনির্বাপক সিস্টেমের ব্যবস্থা না করেই বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে কোনো ধরনের অকুপেন্সি সনদ ছাড়াই এ ভবনগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে। এমনকি রাজধানীর এফআর টাওয়ার অগ্নিকাণ্ডের পর রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সরেজমিন তদন্তের পর বহুতল ভবনে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ভবন মালিক ও ডেভেলপারদের যে নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল, সেগুলোর বাস্তবায়ন সঠিকভাবে করা হয়েছিল কিনা সেটাও নিশ্চিত করা যায়নি।

গুলশানের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা আমাদের সবার জন্য সাবধানবাণী হতে পারে। প্রশস্ত সড়কের পাশে অবস্থিত ভবনে আগুন লাগায় অগ্নিনির্বাপণ দল দ্রুত সেখানে যেতে পেরেছে এবং ক্ষতি তুলনামূলক কম হয়েছে। ঘিঞ্জি এলাকায় সরু কোনো সড়কের পাশে এ রকম দুর্ঘটনা ঘটলে উদ্ধারকাজ চালানো কঠিন হতো এবং ক্ষয়ক্ষতিও বাড়ত। নিকট অতীতে এর বহু উদাহরণ আছে। সেক্ষেত্রে অগ্নিকাণ্ড থেকে রক্ষা পেতে ভবন, সড়ক দুটিই এমনভাবে নির্মাণ করতে হবে, যাতে দ্রুত উদ্ধারকাজ চালানো যায়। প্রতিটি বহুতল ভবন ও শিল্প-কারখানায় যেন অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। ভবনে প্রয়োজনীয় অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা থাকাই যথেষ্ট নয়, সেখানকার বাসিন্দাদের সেসবের ব্যবহারবিধিও শেখানো জরুরি। যেসব ভবনে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই বা নকশাবহির্ভূতভাবে নির্মিত হয়েছে, সেসব ভবন চিহ্নিত করে কর্তৃপক্ষ দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলে আমাদের প্রত্যাশা। 

ঢাকা শহর কোনো পরিকল্পিত শহর হিসেবে গড়ে ওঠেনি। বণিক বার্তার রিপোর্টে জানা যায়, গত বছর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের এক জরিপে ঢাকার ১ হাজার ১৬২টি বহুতল ভবন ও শিল্প-কারখানার মধ্যে ৫২৭টি ভবনের অবস্থা সন্তোষজনক, ৪৯৯টি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ ও ১৩৬টি ভবন অতিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। চিহ্নিত বহুতল ভবনগুলোর অধিকাংশে নেই পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা। নেই কোনো বিকল্প সিঁড়ি ও নির্গমন পথ, ফায়ার লিফট, ফায়ার ডোর, ফায়ার ডিটেক্টর, ফায়ার স্প্রিংকলার, ফায়ার সাপ্রেশন সিস্টেমের মতো ব্যবস্থা। নতুন ভবন ব্যবহারের আগে রাজউকের অকুপেন্সি সনদ নেয়ার কথা থাকলেও তা ছাড়াই ব্যবহার হচ্ছে এসব ভবন। ফায়ার সার্ভিস বলছে অগ্নিঝুঁকিতে থাকা ভবনের সংখ্যা শনাক্ত করা সম্ভব হলেও সরু রাস্তার পাশে নির্মিত বহুতল ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে তা নির্বাপণে সবচেয়ে বেশি বেগ পেতে হয় সংস্থাটির কর্মীদের। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, অগ্নিনির্বাপণের কাজে ব্যবহৃত গাড়িগুলো আগুন লাগা ভবনের কাছে ঠিকমতো পৌঁছতেই পারে না। যার ফলে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করার আগেই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক গুণ বেড়ে যায়। গুলশানের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১১ মিনিটের মধ্যে ফায়ার সার্ভিসের দমকল বাহিনী সেখানে পৌঁছে যাওয়ার পরও এড়ানো বা কমানো যায়নি হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ। 

ঢাকা ও তার আশপাশের ভবনগুলোয় অগ্নিপ্রতিরোধ, নির্বাপণ ব্যবস্থা এবং সঠিক বিল্ডিং কোডসহ অন্যান্য আইনবিধি মেনে নির্মাণ হয়েছে কিনা তা সঠিকভাবে তদারকি হয় না। সে সুযোগেই অগ্নিনিরোধক ছাড়পত্র বা অকুপেন্সি ছাড়পত্র ছাড়াই নির্মিত হচ্ছে বহুতল আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনসহ বিভিন্ন শিল্প-কারখানা। ভবন নির্মাণে মানা হচ্ছে না রাস্তার ন্যূনতম প্রশস্ততা রাখার নিয়ম। বেশির ভাগ সেসব ভবনের নকশা ঠিক নেই। এতে করেই অগ্নিপ্রতিরোধ ও নির্বাপণ ব্যবস্থা উপেক্ষিত হচ্ছে; সঙ্গে বাড়ছে ঝুঁকি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিতে থাকা এসব ভবনের মালিক বা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া হয়। ফায়ার সার্ভিস ভবন পরিদর্শনের পর ঝুঁকি চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্টদের চিঠি দিয়ে নিজের দায়িত্ব শেষ করে। সংশ্লিষ্টরা ব্যবস্থা নিল কি নিল না সেটা তারা দেখে না। ভবনের ধরনভেদে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের সেটা তদারকির কথা থাকলেও করা হচ্ছে না। ঝুঁকি প্রশমনে দায়িত্ব-কর্তব্য যাদের, তাদের অবহেলা রয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। কখনো কখনো অগ্নিঝুঁকিতে থাকা ভবন মালিক ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে নামমাত্র ব্যবস্থা নেয়া হয়। গুলশানের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা আমাদের নগর সংস্থাগুলোর সার্বিক পরিকল্পনা, প্রস্তুতি, নজরদারি ও আইন প্রয়োগের দুর্বলতাকে আবারো সামনে নিয়ে এসেছে।

সরকারকে এখন এদিকে নজর দিতে হবে। ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অমান্যকারী ও আইন উপেক্ষা করে দুর্নীতির মাধ্যমে ভবন নির্মাণের অনুমোদন যারা দেন, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি সরকারি সংস্থাগুলোর কঠোর নজরদারি বাড়ানোসহ জনসচেতনতা সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর দায়িত্বশীলতা ও সদিচ্ছার অভাবকে দায়ী করা যায়। এক্ষেত্রে অগ্নিঝুঁকি রয়েছে এমন বহুতল ভবন প্রশমনে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। মানুষের জীবনকে প্রাধান্য দিয়ে বহুতল ভবনসহ নগরে অগ্নি ও দুর্যোগজনিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডেভেলপার ও ভবন মালিকদের দায়বদ্ধতায় নিয়ে আনার পাশাপাশি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ সব নগর সংস্থাকে জবাবদিহিতায় আনা প্রয়োজন। পাশাপাশি বহুতল ভবনের সংজ্ঞায়নে অগ্নিনিরাপত্তা সংক্রান্ত ফায়ার সার্ভিসের আইনকে প্রাধান্য দিয়ে ইমারত ও নির্মাণ সংক্রান্ত বিধিমালাগুলোর প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা দরকার।