গত ১১ জুন, স্থপতি লুই আই কানের নকশায় নির্মিত মহান জাতীয় সংসদে ২০২০-২০২১ অর্থবছরের বাজেট পেশ করা হয়েছে। একটি দেশের অর্থনীতি, আয় ব্যায় বাজেটের ওপর নির্ভরশীল। বাজেটের মাধ্যমে নির্ধারিত হয় আগামী এক বছরের রাষ্ট্র পরিচালনা ও সকল উন্নয়ন কর্মকাণ্ড।
সাধারণত বাজেট প্রণয়নের জন্য একটি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার, পরিকল্পনা বা স্থানীয় চাহিদা অনুসারে বাজেটে খাত অনুসারে বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। তাছারা বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন বা পেশাজীবি সংগঠন, অর্থনীতিবিদ সহ বিভিন্ন মহলের মতামত বা পরামর্শ বিবেচনা করা হয়।
এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে গৃহায়ন খাতে ৬৯৩৭ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে এবং এর মধ্যে ৫১৯৩ কোটি টাকা উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে। বিগত ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে বাজেটে ৪৯৭৭ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। গত অর্থবছরের থেকে এ বছর অর্থবছরে গৃহায়ন খাতে বাজেটের আকার বৃদ্ধি পেয়েছে।
এ বাজেট বরাদ্দের বড় অংশ খরচ হবে ভবন নির্মাণ ও সংস্কারে, যার সঙ্গে স্থাপত্য ও প্রকৌশল পরামর্শসেবা জড়িত। বেসরকারি খাতে কাজের সুযোগ বৃদ্ধি ও অধিক কর্মসংস্থানে সৃষ্টির বিষয়ে গুরুত্ব দিলে করোনা পরিস্থিতির কারণে স্থাপত্য পেশার ক্ষতি কিছুটা হ্রাস সম্ভব হবে।
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে, এবছর বাজেটের কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হয়েছে যা বর্তমান করোনা মহামারী মোকাবেলা ও উন্নয়ন কার্যক্রমকে অব্যাহত রাখার বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করে বাজেটে স্বাস্থ্য খাতকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে, কৃষিকে দ্বিতীয়, সামাজিক নিরাপত্তাকে তৃতীয়, পল্লীউন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে চতুর্থ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি গৃহহীন জনগোষ্ঠীর জন্য গৃহনির্মাণকেও অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। অগ্রাধিকার প্রাপ্ত অধিকাংশ খাতই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে স্থাপত্য ও প্রকৌশল পেশার সঙ্গে জড়িত। এ সকল খাতে স্থপতিদের সক্রিয় অংশগ্রহণের বিষয়টি বিবেচনায় আনতে হবে।
যেহেতু স্বাস্থ্য খাতকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে এবং স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন ওষুধ ও উপকরণ আমদানিতে শুল্ক ছাড় দেয়া হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে করোনা মোকাবেলায় নতুন নতুন হাসপাতাল স্থাপন বা সম্প্রসারণ ও সংস্কার প্রয়োজন হবে। এ ক্ষেত্রে করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় হাসপাতাল বা স্বাস্থ্য সেবা খাতের নির্মাণ, সম্প্রসারণ বা ইন্টেরিয়র কাজের জন্য প্রয়োজনীয় ডিজাইন পরামর্শ সেবা, নির্মাণ এবং নির্মাণসামগ্রী আমদানির জন্য যাবতীয় শুল্ক ছাড় দেয়া প্রয়োজন যা পরোক্ষভাবে স্বাস্থ্য খাতে সক্ষমতা অর্জনে সহায়তা করবে।
সরকারের আয়ের উৎস হিসেবে মূ্ল্যসংযোজন কর বা ভ্যাট একটি বড় খাত বিগত সময়ের মত এবারও স্থাপত্য পরামর্শ সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ একই সেক্টরের একটি ভবন নির্মানণের ক্ষেত্রে ভ্যাটের পরিমান ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ধার্য করা হয়েছে। স্থাপত্য সেবার বিপরীতে ভ্যাটের পরিমান ৭ দশমিক ৫ শতাংশ করা হলে ভ্যাট ফাঁকি দেয়ার প্রবণতা হ্রাস পাবে এবং সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে। প্রস্তাবিত বাজেটে স্থাপত্য সেবার জন্য নির্ধারিত ভ্যাট হ্রাসের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) প্রস্তাব করা যেতে পারে।
প্রস্তাবিত বাজেটে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও সার্ভিস সেক্টরে ৩০ হাজর কোটি টাকার ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের জন্য স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা এবং কুটিরশিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের শিল্পের জন্য আরো ২০ হাজার কোটি টাকার একই ধরনের ঋণের মাধ্যমে প্রণোদনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে স্থাপত্য সেবাকে সার্ভিস সেক্টরের আওতায় আনার কোনো সুযোগ আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা যেতে পারে এবং সম্ভব হলে এ ধরনের স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা গ্রহণ করা যেতে পারে।
২০২০-২০২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্থানীয় সরকার ও পল্লীউন্নয়ন খাতে ৩৯ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে যার বড় অংশ ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ এ কাজে স্থপতিদের সম্পৃক্ত হওয়ার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা যেতে পারে। এছাড়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ২৬ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ কাজে ব্যয় হবে।
এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিভিন্ন ধরনের ভবন নির্মাণ করা হয়ে থাকে। সাধারণত এ ধরনের কাজের নকশা আন্তর্জাতিক দরপত্রের আওতায় বিদেশী পরামর্শক প্রতিষ্ঠান করে থাকে তবে স্থানীয়ভাবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থপতিদের নিয়োগ দেয়া হয়ে থাকে। তবে এ ধরনের বড় কাজে দেশীয় পরামর্শ প্রতিষ্ঠান অন্তত ভবন নির্মাণে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করার বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করা যেতে পারে যা স্থাপত্য পেশার বিকাশে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
এ বছরের প্রস্তাবিত বাজেটটি করোনা পরিস্থিতি উত্তরণে সব সেক্টরকে যথাযথভাবে সম্পৃক্ত করার প্রয়াস লক্ষ্যণীয় এবং সার্বিক বিবেচনায় প্রস্তাবিত বাজেটটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও জনবান্ধব ও ডাইনামিক বাজেট হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। বাজেট প্রণয়নে প্রতিবছর সর্বস্তরের স্টেকহোল্ডার তথা অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, পেশাজীবীদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়ে থাকে।
তবে আমরা স্থপতিরা পেশাজীবী সমাজের অংশ হিসেবে বা গুরুত্বপূর্ণ স্টেকহোল্ডার হিসেবে নিজেদেরকে প্রমাণ করতে পেরেছি কিনা তা নিয়ে ভাববার অবকাশ রয়েছে।
এ বছর করোনার পরিস্থিতির কারণে ডিজিটাল প্লাটফর্ম ব্যবহার করে বা ওয়েবসাইটে সবার মতামত আহ্বান করে প্রাপ্ত মতামতকে বাজেট প্রণয়নে বিবেচনা করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে পেশাজীবী সংগঠন তথা স্থপতি ইনস্টিটিউট প্রতিবছর বাজেটের পূর্বে সুনির্দিষ্ট মতামত বা প্রস্তাব যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করতে পারে । এ লক্ষ্যে স্থপতি ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে জাতীয় বাজেট বিষয়ে একটি কমিটি কাজ করতে পারে এবং প্রয়োজনে অর্থনীতিবিদদের সহায়তা গ্রহণ করা যেতে পারে।
স্থাপত্য পেশা বা নির্মাণ খাত প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জাতীয় বাজেটের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। তাই স্থাপত্য পেশার উন্নয়নের প্রয়োজনেই স্থপতিদের জাতীয় অন্যান্য ইস্যুর পাশাপাশি বাজেট নিয়ে গুরুত্বসহকারে ভাবতে হবে।
লেখক: স্থপতি ও গবেষক
nafizhbri@gmail.com










