বাংলাদেশ
আয়তনে ক্ষুদ্র
হলেও এর
বৈচিত্র্যময় ভূ-প্রকৃতি
এবং সমৃদ্ধ
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য
দেশটিকে বহুমাত্রিক
একটি ভূখণ্ডে
পরিণত করেছে।
বিশ্বের সবচেয়ে
বড় ব-দ্বীপটিতে
ঠিক কখন
থেকে মানব
বসতি গড়ে
উঠেছে এটি
জানা সম্ভব
না হলেও
দীর্ঘ দুই
শতক ধরে
পরিচালিত প্রত্ন
এবং নৃতাত্ত্বিক
গবেষণা থেকে
স্পষ্ট, দেশটিতে
গ্রামীণ-সংস্কৃতির
পাশাপাশি সমৃদ্ধ
নগর-সংস্কৃতির
বিকাশ ঘটেছিল।
গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা
নদীর অববাহিকা
পরিবেষ্টিত এ
অঞ্চলে ছড়িয়ে
ছিটিয়ে রয়েছে
প্রধান নদীগুলোর
অনেক শাখা-প্রশাখা।
মানব বসতি
গড়ে তোলার
পেছনে নদীগুলোর
ভূমিকা অনস্বীকার্য।
যদিও অতীত
মানুষের সঙ্গে
পরিবেশের আন্তঃসম্পর্কভিত্তিক
গভীরতর গবেষণা
এখন পর্যন্ত
তেমন পরিচালিত
হয়নি। তার
পরও উয়ারী-বটেশ্বর
কিংবা মহাস্থানগড়ের
অবস্থান খেয়াল
করলে দেখা
যায়, দুটি
বৃহদাকৃতির নগর
নদীতীরেই গড়ে
উঠেছিল।
বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব
অধিদপ্তর, বাংলাদেশ
কর্তৃক সংরক্ষিত
পাঁচ শতাধিক
প্রত্নস্থল রয়েছে
দেশটিতে। একদিকে
অসংখ্য প্রত্নস্থল
তথা পরিত্যক্ত
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য
এবং অন্যদিকে
রয়েছে বর্তমানে
টিকে থাকা
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।
দুটি সাংস্কৃতিক
ঐতিহ্যের সমন্বয়ে
বৃহৎ পরিসরে
আকর্ষণীয় এবং
টেকসই পর্যটন
শিল্প গড়ে
তোলার ক্ষেত্রে
আমরা কেন
কার্যকর এবং
টেকসই পরিকল্পনা
গ্রহণ করছি
না?
আমাদের দেশে
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে
হসপিটালিটি এবং
ট্যুরিজম নিয়ে
উচ্চতর অধ্যয়নের
সুযোগ থাকলেও
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যভিত্তিক
পর্যটন নিয়ে
কোনো ধরনের
বিষয় এখন
পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত
করা হয়নি।
গত বছরের
শেষদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের
কোর্সওয়ার্কের পাশাপাশি
গবেষণার জন্য
রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য
ও বাংলাদেশ
অধ্যয়ন বিভাগের
কিছু শিক্ষার্থী
নিয়ে সিরাজগঞ্জের
উল্লাপাড়া উপজেলার
হাটিকুমরুলে অবস্থিত
নবরত্ন মন্দিরে
একটি নিরীক্ষা
পরিচালনা করেছিলাম।
নবরত্ন মন্দির
কম্পাউন্ডের অভ্যন্তরে
মোট তিনটি
মন্দির এবং
বাইরে একটি
শিবমন্দির রয়েছে।
ধারণা করা
হয়, মন্দিরগুলোর
নির্মাণকাল সপ্তদশ
শতকে। অত্যন্ত
আকর্ষণীয় এ
মন্দিরগুলোর কাছাকাছি
স্থানীয়রা বাস
করেন যাদের
বেশির ভাগ
অত্যন্ত দরিদ্র।
তবে দারিদ্র্যের
বেড়াজালে আবদ্ধ
হলেও আমাদের
পুরো দলকে
তারা তাদের
সাধ্যমতো আপ্যায়ন
করেছিলেন। যিনি
রান্না করেছিলেন
তিনি জানালেন,
বছরখানেক আগে
জার্মানি থেকে
কিছু পর্যটক
নবরত্ন মন্দির
ঘুরতে এসে
তাদের রান্না
করা খাবার
অনেক আনন্দ
নিয়ে খেয়েছিল।
উল্লেখ্য, সে
বাড়ির কেউ-ই
কিন্তু ইংরেজিতে
কথা বলতে
পারেন না।
কিন্তু আতিথেয়তার
জন্য ভাষা
যে কোনো
বাধা নয়,
তা অন্তত
অনুধাবন করা
গিয়েছে।
আমাদের মধ্যে
পশ্চিমা পর্যটক
নিয়ে একটি
ভ্রান্তি রয়েছে,
তারা হয়তো
সবাই অভিজাত
হোটেলে থাকতে
চান! কিন্তু
এটি জানা
প্রয়োজন পর্যটকের
মধ্যে বিভিন্ন
শ্রেণিবিভাজন রয়েছে।
যেমন পশ্চিমা
বিশ্বের অনেক
শিক্ষার্থী ছুটিতে
খণ্ডকালীন কাজ
করে অর্থ
জমিয়ে সেটি
দিয়েই ঘুরতে
বের হন।
অর্থাৎ সব
পশ্চিমা পর্যটক
ঘুরতে বের
হলে প্রচুর
অর্থ সঙ্গে
নিয়ে বের
হন না।
বেশির ভাগ
ক্ষেত্রে স্থানীয়
সংস্কৃতি এবং
স্থানীয়দের আতিথেয়তা
পর্যটকের ভ্রমণকে
আনন্দদায়ক করে
তোলে। খেয়াল
করলে দেখবেন
আমাদের মতো
এত অতিথিপরায়ণ
জাতি পৃথিবীতে
সত্যিই কম।
অর্থাৎ টেকসই
পর্যটন শিল্প
গড়ে তোলার
ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত
সুযোগের পাশাপাশি
অন্য যে
শর্তাবলি রয়েছে
তার মধ্যে
‘অতিথিপরায়ণ’
ব্যবস্থাটি আমাদের
পৃথকভাবে তৈরি
করতে হচ্ছে
না, বরং
সেটি গ্রাম-বাংলার
সংস্কৃতিতে এমনিতেই
বিরাজমান।
দ্বিতীয় বিষয়টি
হলো এ
দেশে বেশকিছু
প্রত্নস্থলের আশপাশে
আদিবাসীরা বাস
করেন। রবীন্দ্র
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক
ঐতিহ্য ও
বাংলাদেশ অধ্যয়ন
বিভাগ সিরাজগঞ্জের
রায়গঞ্জ উপজেলার
ক্ষিরতলা-নিমগাছীতে
২০১৮ সাল
থেকে গবেষণা
পরিচালনা করছে।
সেখানে পরিত্যক্ত
প্রত্নস্থলের পাশাপাশি
আদিবাসীদের বৈচিত্র্যময়
সংস্কৃতি রয়েছে।
অথচ পর্যটন
শিল্পে আমরা
সেগুলোর সমন্বয়
ঘটাতে পারছি
না।
মাহাতো জনগোষ্ঠীর
প্রায় হারিয়ে
যাওয়া ভাষা
‘কুর্মালি’
নিয়ে স্থানীয়
গবেষক উজ্জ্বল
মাহাতো বেশ
নিষ্ঠার সঙ্গে
গবেষণা করছেন।
তার চেষ্টায়
কারাম পরব
নামক আদিবাসীদের
একটি উৎসব
গত দুই
বছর ক্ষিরতলা-নিমগাছীতে
উদযাপিত হচ্ছে।
এছাড়াও সহরাই
নামক আরো
একটি উৎসব
রয়েছে। পাশাপাশি
আদিবাসীদের বেশকিছু
পার্বণ রয়েছে
যেগুলো বাংলাদেশের
সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে
বহুমাত্রিকতা দান
করতে সক্ষম।
এত বিপুল
সম্ভাবনাকে স্থানীয়
ও বিদেশী
পর্যটকের সামনে
উপস্থাপনের জন্য
প্রয়োজন প্রশিক্ষিত
গাইড, সুপরিকল্পিত
ও টেকসই
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যভিত্তিক
পর্যটন পরিকল্পনা।
ফলে একদিকে
যেমন স্থানীয়দের
কর্মসংস্থানের সুযোগ
ঘটবে, অন্যদিকে
দেশের সমৃদ্ধ
ও বৈচিত্র্যময়
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য
সংরক্ষণ সম্ভব
হবে।
দেশে বর্তমানে
অর্ধশতাধিক পাবলিক
বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে।
সেগুলোর কোথাও
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যভিত্তিক
পর্যটন নামক
পৃথক বিষয়
নেই। শিক্ষার
উচ্চতর পর্যায়ে
‘সাংস্কৃতিক
ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটন’
নামক বিষয়
প্রবর্তন করতে
পারলে গবেষণার
পরিসর বৃদ্ধি
পাবে এবং
একই সঙ্গে
দেশের অর্থ
উপার্জনের নতুন
একটি পথ
উন্মোচিত হবে।
মো. রিফাত-উর-রহমান: সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বাংলাদেশ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়










