বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে সংবাদপত্রের চিঠিপত্র কলামে নিয়মিত লিখতাম। প্রায় দুই যুগ আগে জনকণ্ঠ পত্রিকায় বাজেট-পরবর্তী তেমন এক চিঠিতে লিখেছিলাম— বাজেট মানে কি জিনিসপত্রের দাম বাড়ানোর লাইসেন্স? কারণ বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে দেখছি বাজেটে যেসব পণ্যের ওপর শুল্কারোপ কিংবা নীতিমালা কঠোর হওয়ার ইঙ্গিত থাকে, সেগুলোর দাম জুনের শুরুতেই বেড়ে যায়। এমনকি কয়েক দিনের জন্য সেই পণ্যগুলো বাজার থেকে উধাও হয়ে যায়। অথচ অর্থমন্ত্রী যেটা সংসদে উপস্থাপন করেন সেটা ‘প্রস্তাব’ মাত্র! এর পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা, যাচাই-বাছাই শেষে সেগুলো পরিবর্তন-পরিবর্ধন-পরিমার্জন এমনকি পুরোপুরি বাতিলও হতে পারে। তার পরও বাজেট ঘোষণার আগেই দাম বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে তাদের মোক্ষম যুক্তি হলো, সরকার বাজেটে দাম বাড়াইছে!

অন্যদিকে যেসব পণ্যের ওপর কর রেয়াতসহ নানা সুবিধা দেয়া হয়, সেগুলোর দাম আর কমে না। এমনকি বাজেট পাসের ছয় মাস পরেও বিক্রেতারা বলতে থাকেন, এগুলো আগের রেটে কেনা পণ্য! বাজেটে সুবিধা দেয়ার কারণে সাধারণত পণ্যের দাম কমে না। কমলেও তা এতই সামান্য এবং এতদিন পরে কার্যকর হয় যে সাধারণ মানুষ সেটা ভুলেই যায়। তাই তখন মনে প্রশ্ন জেগেছিল, প্রতি বছর বাজেট ঘোষণার মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের একচেটিয়া দাম বাড়ানোর অধিকার দেয়া হচ্ছে না তো? সেই প্রশ্নের জবাব এখনো পুরোপুরি পাইনি।

আমি অর্থনীতির বিশ্লেষক নই। তাই প্রস্তাবিত বাজেটের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা আমার কর্ম নয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা-বাণিজ্যের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে বাজেটের গতিপ্রকৃতি ও প্রতিক্রিয়া বুঝতে চেষ্টা করি। সেই প্রেক্ষাপটে এ নিবন্ধে রাষ্ট্র ও ব্যক্তির বাজেট প্রণয়ন এবং তার বাস্তবায়নে মূল পার্থক্যের জায়গায় দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেষ্টা করছি।

রাষ্ট্রের বাজেটের সবচেয়ে সুবিধার জায়গা হলো ‘ঘাটতি বাজেট’। অর্থাৎ অনায়াসে আয়ের চেয়ে অনেক বেশি ব্যয়ের পরিকল্পনা করা যায়। ছোটবেলা ভাবতাম, এ আবার কেমন নিয়ম! প্রবাদ বাক্যে শেখানো হয়, ‘আয় বুঝে ব্যয় করো’। তাহলে এখানে এসে উল্টা রীতি কেন? পরে বুঝলাম, এ ব্যয়গুলো আসলে বিনিয়োগ বা বৃহত্তর কল্যাণের উদ্দেশ্যে করা। সেগুলো থেকে রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে সুফল পায়। ফলে একসময় তা সুদাসলে উঠে আসে, জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়। তাছাড়া সেগুলোর সদ্ব্যবহারে বাই-প্রডাক্ট হিসেবে বেশকিছু সুবিধাও মেলে।

তবে সেক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জের জায়গা হলো, দক্ষতার সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় করা এবং দুর্নীতি রোধ করা। উভয় ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই। তাই ‘অতি সাহসী’ এ উদ্যোগ বা পদক্ষেপগুলো দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রকে ঠিক কতটা রিটার্ন দেবে তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন রয়েছে। কারণ এর আগে বহু প্রকল্পে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা যায়নি। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে নানা রকম ব্যয় ও দুর্নীতি।

হয়তো সেই প্রেক্ষাপটেই আমাদের নীতিনির্ধারকদের বেশি আগ্রহ মেগা প্রজেক্টে। ছোট বিষয়ে মাথা খাটাতে তারা খুব একটা আগ্রহী নন। কিন্তু স্থানীয় কাঁচামাল, জনবল, অবকাঠামো বা প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারলে সেই প্রকল্পের ব্যয় থেকে উপকৃত হয় সর্বস্তরের মানুষ। তারা কাজ পায়, নিজেদের পণ্যের ভালো দাম পায়, স্থানীয় উন্নয়নে সেগুলো ভূমিকা রাখে।

অন্যদিকে যত বড় প্রকল্প তত বিদেশী প্রতিষ্ঠান ও কর্মীরা সুবিধা পান। সেখানে আমাদের ভূমিকা থাকে মূলত শ্রমিক সরবরাহের। বিদেশী একজন কনসালট্যান্ট বা প্রকৌশলী যে সুবিধা পান, আমাদের সহস্র শ্রমিক মিলেও তার সমান অর্থ পান না। ফলে ওইসব প্রকল্প সম্পাদন পর্যায়ে দেশীয় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান খুব একটা লাভবান হয় না। আবার প্রকল্প শেষে তা থেকে প্রাপ্ত আয়ের বড় অংশ চলে যায় বৈদেশিক ঋণ বা তার সুদ পরিশোধে।

তাই বাজেটের ফোকাস হওয়া উচিত বিপুলসংখ্যক কর্মহীন তরুণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা। টেকসই উন্নয়নের জন্য এর বিকল্প নেই। সামাজিক কল্যাণের নিমিত্তে বিভিন্ন সুবিধার আওতা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে বাজেটে। সেগুলো তাদের আপাত চাহিদা মেটাতে ভূমিকা রাখবে কিন্তু স্বাবলম্বী করবে না। কোনো ব্যক্তিকে বছরের পর বছর খাদ্যসহায়তা দেয়ার চেয়ে তাকে ‘একটা কিছু করা’র সুযোগ করে দেয়া অনেক বেশি কল্যাণকর। কারণ সে যদি কয়েকটা গরু-ছাগলও পালন করে, তার হিস্যা বহুজনের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক শিল্প প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে উপকৃত হয়।

রাষ্ট্রের মতো আনুষ্ঠানিক না হলেও প্রত্যেক পরিবার ও ব্যক্তিকে নিজস্ব বাজেট মোতাবেক চলতে হয়। এক্ষেত্রে প্রধান পার্থক্যের জায়গা হলো, ঐতিহ্যগতভাবে ব্যক্তি পর্যায়ের বাজেট প্রণয়নে আমরা বেশ রক্ষণশীল। অর্থাৎ আয় যত কমই হোক না কেন, সেখান থেকে কিছুটা সঞ্চয় করতে সচেষ্ট থাকি। কারণ অপ্রত্যাশিত বিপদ-আপদ বা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এর কোনো বিকল্প নেই। তাই আমরা জাতিগতভাবে সঞ্চয়প্রবণ। হঠাৎ পয়সা হওয়া কিছু ব্যক্তি বাদে অধিকাংশ মানুষ এখনো সেই ধারায় বিশ্বাসী।

হয়তো সে কারণেই ২০০৮-০৯ সালে বিশ্বব্যাপী চরম মন্দার সময়েও আমরা মুখ থুবড়ে পড়িনি। করোনা মহামারী যেভাবে আঘাত হানার কথা, আমাদের অর্থনীতিতে তেমন প্রভাব দেখা যায়নি। কারণ প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ নিজ জায়গা থেকে নিজ ও পরিবারের সুরক্ষায় গোটা বছর এমনকি সারা জীবন তত্পর থাকে। দেশে বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স আসার রহস্যও সেটা। একজন প্রবাসী ১০ টাকা আয় করলে সেখান থেকে ৪-৫ টাকা সঞ্চয় করতে আপ্রাণ চেষ্টা করেন। অথচ শিল্পোন্নত রাষ্ট্রের নাগরিকরা চরম মাত্রায় ভোগপ্রবণ। তারা ১০ টাকা আয় করলে ১২ টাকা বা তারও বেশি ভোগের আয়োজন করে। ফলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর তারা পুরোপুরি নির্ভরশীল।

আমাদের দেশের নিম্ন আয়ের একজন মানুষও পরিবারের বিপদে ১০-২০ হাজার টাকা বের করতে পারে। অথচ ধনী রাষ্ট্রের নাগরিকরা থাকেন ক্রেডিটের ভারে জর্জরিত। ফলে আকস্মিক চাকরি হারালে বা বড় কোনো বিপদে পড়লে মুহূর্তে তারা কপর্দকশূন্য হয়ে পড়েন। রাষ্ট্রের সহযোগিতা ছাড়া তারা চলতে পারেন না। আমাদের ক্ষেত্রে তেমনটা হয় না। কারণ আমরা পিঁপড়ার মতো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয়ে অভ্যস্ত। দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী এখনো সেই চেষ্টায় রত। বাজেটে এ মানুষগুলোকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ খুব বেশি দরকার ছিল। তারা অর্থ সাহায্য চায় না। নিজেই নিজের অর্থ সংকুলান করতে চায়। কিন্তু সেক্ষেত্রে তাদের নীতিসহায়তা অনেক বেশি দরকার। কিন্তু বড় বড় বিষয়ে নজর দিতে গিয়ে এ বিষয়টা অনেকটাই উপেক্ষিত রয়ে গেছে।

দেশের আমজনতা এত বড় বড় টাকার অংক নিয়ে চিন্তা করতে পারে না। এবারের প্রস্তাবিত বাজেটের পরিমাণ অংকে লিখতে গেলে অনেকেই ভুল করবেন। তাই সাধারণ মানুষ সেটা নিয়ে খুব একটা ভাবে না। কিন্তু তারা যেটা ভাবে তা হলো, চলতি মাসের খরচটা কীভাবে নির্বাহ হবে? তারা টেনেটুনে মাসটা চালাতে পারলেই খুশি। কিন্তু গত দেড়-দুই বছরে তাদের হিসাব সেভাবে মিলছে না। মাসের শুরু ও শেষের সংখ্যাগুলোয় অপ্রত্যাশিত গরমিল হয়ে যাচ্ছে। কারণ কখন কোন পণ্যের দাম বাড়বে এবং কতটা বাড়বে তা তারা অনুমান করতে পারছে না। ফলে জীবনযাপনের ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে।

কয়েক দিন পরপর হঠাৎ করে একটি পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে। সেটা কোনো রকমে সমন্বয় করে উঠতে না উঠতেই আরেকটার দাম বেড়ে যাচ্ছে! এভাবে প্রতিনিয়ত নিজের সীমিত আয়ের বাজেট কাটছাঁট করতে গিয়ে তাদের অনেকে সত্যিই ক্লান্ত। এ বাজেট প্রণয়নের সময় তাদের প্রতি খুব একটা মনোযোগ দেয়ার বিষয়টি স্পষ্ট নয়।

নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে নানা সেবা সংস্থার ব্যয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ইচ্ছেমতো টিউশন ফি ও সেশন চার্জ বাড়াচ্ছে। গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির দাম আগামী মাসে কত হবে তা নিশ্চিত নয়। নানা অজুহাতে বাড়ছে পরিবহন ব্যয়। কিন্তু সাধারণ মানুষের আয় সেভাবে বাড়ছে না। ফলে সঞ্চয়প্রবণ জাতি হয়েও বিপুলসংখ্যক মানুষ এখন টেনেটুনে মাস চালানোর চেষ্টায় রয়েছে। মাঝেমধ্যে তারাও রাষ্ট্রের মতো ঘাটতি বাজেটের শরণাপন্ন হচ্ছে। কিন্তু সেক্ষেত্রে বড় অসুবিধার জায়গা হলো, তাদের এমন অর্থের উৎস অসীম নয়। অনির্দিষ্টকালের জন্যও নয়। ফলে তারা বড় কিছুর চিন্তা না করে কোনো রকমে টিকে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত রয়েছে।

একটা রাষ্ট্রের তার অর্জন ধরে রাখতে সবচেয়ে বেশি দরকার অর্জিত সুবিধাগুলো সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেয়া। প্রান্তিক পর্যায়ের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষের জন্য এ বাজেটে সুবিধার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু অর্থনীতির সত্যিকারের চালিকাশক্তি হলো মাঝের লোকগুলো। অতি উচ্চ ও অতি নিম্ন আয়ের মানুষ এসব সিদ্ধান্ত দ্বারা খুব একটা প্রভাবিত হয় না। কিন্তু তথাকথিত মধ্যবিত্ত মানুষ পুরো সিস্টেমটাকে টিকিয়ে রাখে। তাদের অর্থসহায়তা দেয়া কোনো কাজের কথা নয়; বরং তারা যে কাজটা করছে, রাষ্ট্র তাতে পলিসি সাপোর্ট দেবে। আর যে ‘একটা কিছু’ করার চেষ্টায় আছে, তাকে সাহস জোগাবে—দীর্ঘমেয়াদে সফল হওয়ার জন্য এটা খুব জরুরি।

তাই এ বাজেটের মূল চেষ্টা হওয়া উচিত দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে সম্ভাব্য (ও প্রয়োজনীয়) সব ব্যবস্থা করা। আর তরুণদের কর্মসংস্থানের জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেয়া। সেটা সম্ভব হলে আগামীতে রাষ্ট্র ও ব্যক্তির বাজেট পরস্পরের সম্পূরক হবে বলে আশা করা যায়।

 

ড. মো. আব্দুল হামিদ: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক ও ‘মস্তিষ্কের মালিকানা’ বইয়ের লেখক