বিশ শতকের শুরুর দিকের মতো আজকের বিশ্বেও আমরা বৈশ্বিক শক্তির ব্যাপক স্থানান্তর, জোরালো সব অর্থনৈতিক সংকট এবং নাজুক গণতন্ত্রের ক্ষয় দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু আমরা এও দেখছি যে গণতন্ত্রের পীঠভূমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্রবিরোধী শক্তির উত্থান। ২০২০ সালের নির্বাচনের ফল উল্টে দিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রয়াস এবং তার মিথ্যাচারের প্রতি তার দলের সমর্থন বড় ধরনের বিপদকেই স্পষ্ট করেছে।
আমি ঠাণ্ডা যুদ্ধের সময় বেড়ে উঠেছি। তখন উদার গণতন্ত্রকে রক্ষা করার রাজনৈতিক একটা প্রেক্ষাপট ছিল যা আমার গড়ে ওঠাকে প্রভাবিত করেছে। এরপর বিশ্বব্যাংকে একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে কাজ করতে গিয়ে আমি এটা বুঝতে শিখেছি যে সমৃদ্ধি রচনায় বাজারভিত্তিক পুঁজিবাদ বড় ভূমিকা রাখে। আর এ সমৃদ্ধির ওপরই একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্ভরশীল। আমি বিশ্ব অর্থনীতিকে উন্মুক্ত করে দেয়ার পদক্ষেপগুলো সমর্থন করেছি, এটাও মেনেছি যে ব্যাপক দারিদ্র্য বিমোচনে, বিশেষত চীনে, বৈশ্বিক পুঁজিবাদের অনেক অবদান রয়েছে।
তবে এখন গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য বা অবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ডের ল্যারি ডায়মন্ডের মতে, বিশ্ব এখন একটি গণতান্ত্রিক মৃদুমন্দার (ডেমোক্রেটিক রিসেশন) মধ্যে আছে। প্রশ্ন হলো, এটা গণতান্ত্রিক মন্দার (ডেমোক্রেটিক ডিপ্রেশন) কতটা কাছে যখন এমনকি যেসব দেশে জোরালো গণতন্ত্র বিরাজ করেছে বলে দীর্ঘকাল চিন্তা করা হতো, সেসব দেশেও তা দুর্বল হয়ে পড়ছে। বাজারভিত্তিক পুঁজিবাদও বিভিন্ন দেশে ব্যাপকভাবে বণ্টিত সমৃদ্ধি রচনার সক্ষমতা হারিয়েছে। লোকরঞ্জন বা জনতুষ্টিবাদ (পপুলিস্ট ডেমোগোগুয়েরি), ‘উদার গণতন্ত্র’, ব্যক্তিনির্ভর একনায়কতন্ত্র এবং চীনের প্রাতিষ্ঠানিক স্বৈরতন্ত্রের এ সময়ে গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদ (যা কিনা উদার গণতন্ত্র ও বাজার অর্থনীতির যুগলবন্দি ফল) কি টিকে থাকতে পারবে?
গণতন্ত্র ও পুঁজিবাদ: ভোটাধিকারভিত্তিক সর্বজনীন গণতন্ত্র এক শতাব্দীর সামান্য বেশি পুরনো। পুঁজিবাদ সে তুলনায় অনেক বেশি পুরনো। যদিও এর আধুনিক করপোরেট রূপটা তেমন পুরনো নয়। গণতন্ত্র ও পুঁজিবাদের সমন্বয়ে সমঝোতা ও প্রতিযোগিতার মাধ্যমে গঠিত হয়েছে সামাজিক সহযোগিতার একটি রূপ। অর্থনীতি ও রাজনীতি দুই ক্ষেত্রেই প্রতিযোগিতা হলো প্রাণভোমরা। কিন্তু সে প্রতিযোগিতা সংঘটিত হয় সমাজের ভেতরকার বিধি ও মূল্যবোধ এবং বিরাজমান আইনি কাঠামোর পরিপ্রেক্ষিতে।
গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদের সবচেয়ে বৈপ্লবিক প্রবণতা হলো এই যে এটা রাজনৈতিক শক্তিকে ধনসম্পদ থেকে আলাদা করে রাখতে চায়। ক্ষমতা থাকে জনগণ ও তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে। আর যারা অর্থনৈতিক ব্যবহারযোগ্য সম্পদের অধিকারী তাদের ও তাদের প্রতিনিধিদের কাছে ধনসম্পদ থাকে। গণতন্ত্র ও পুঁজিবাদ পরস্পরের পরিপূরক এজন্য যে দুটোই করে মানবপ্রতিনিধিকে অন্তর্ভুক্ত করে, আইনের শাসনের ওপর নির্ভরশীল থাকে এবং আরোপিত অবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করে। এ দুটো আরো নির্ভর করে অর্থনীতিবিদ ড্যারেন একমুগলু ও জেমস রবিনসন বর্ণিত ‘শৃঙ্খলিত রাষ্ট্রে’র ওপর। ঐতিহাসিকভাবেই গণতন্ত্র উদ্ভূত হয়েছে গতিশীল বাজার অর্থনীতির বিভিন্ন ধরনের সুযোগ ও লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে।
তার পরও গণতন্ত্র ও পুঁজিবাদ একে অন্যের বিপরীত। পুঁজিবাদ হলো বিশ্বজনীন, আর গণতন্ত্র ভৌগোলিক সীমারেখার সঙ্গে সংযুক্ত। পুঁজিবাদ মানে এক টাকা এক ভোট, গণতন্ত্র মানে এক নাগরিক এক ভোট। এর একটা বিপদ হলো শৃঙ্খলার নামে ধনসম্পদ কিনে নেয় ক্ষমতাকে, গণতন্ত্রকে রূপ দেয় ধনতন্ত্রে (প্লুটোক্রেসি তথা ধনিকগোষ্ঠীর শাসন ব্যবস্থায়)। আরেকটা বিপদ হলো জননায়করা জনগণের নামে ক্ষমতা দখল করে গণতন্ত্রকে স্বৈরতন্ত্রে রূপান্তর ঘটায়।
জনসাধারণের সমৃদ্ধি, স্বাধীনতা ও কল্যাণ বিবেচনায় আজকের উদার গণতন্ত্রগুলো হলো মানব ইতিহাসের সবচেয়ে সফল সমাজ। একই সঙ্গে এটা নাজুকও বটে। ঐকমত্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকার কারণে এর প্রয়োজন আইনগত বৈধতা। আর এ বৈধতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসগুলোর অন্যতম হলো ব্যাপকভাবে ভাগাভাগি করে নেয়া সমৃদ্ধি। তবে বিত্তবান-অভিজাতদের ওপর থেকে আস্থা নেমে যাওয়ার বড় একটি কারণ হলো শ্রমজীবী ও মধ্যবিত্তদের এক বড় অংশের দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিকভাবে তুলনামূলক পতন ঘটা। আর তা মন্দতর হয়েছে বিভিন্ন অর্থনৈতিক আঘাত বিশেষত বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের কারণে।
ব্রেক্সিটের (ইউরোপীয় ইউনিয়ন জোট থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে আসা) মতো জনতুষ্টিবাদ এবং এ মতবাদের কারণগুলোর সমর্থন জুটেছে ‘পতনের ভয়’ থেকে যাকে সমাজতত্ত্ববিদরা অভিহিত করেন এরই মধ্যে অন্যের ইচ্ছাধীন বা নিরাপত্তাহীন (প্রিকারিয়াস) অবস্থায় থাকা মানুষজনের ‘অবস্থার উদ্বেগ’ হিসেবে। এটা তাই বিস্ময়কর নয় যে জনতুষ্টিবাদী নেতার সফল প্রচারণার বৈশিষ্ট্য হলো অতীত-আর্তি বা হারানো সময়ের জন্য বেদনা বোধ (নস্টালজিয়া)। সে কারণেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ (আমেরিকাকে আবার মহান বানাও) ছিল একটি অসাধারণ স্লোগান। একইভাবে ব্রেক্সিটের ‘টেক ব্যাক কন্ট্রোল’ (হারানা নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনো) খুব ভালোভাবে সেসব মানুষজনকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে যারা মনে করত যে তারা তাদের জীবিকা, অবস্থা এমনকি তাদের নিজের দেশের ওপরও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে।
অনেক দীর্ঘমেয়াদি শক্তিই উচ্চআয়ের গণতন্ত্রে খেটে খাওয়া শ্রমজীবী শ্রেণীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থানকে হেয় করেছে, এমনকি ধ্বংসের চেষ্টাও করেছে। বি-শিল্পায়ন, উৎপাদনশীল প্রবৃদ্ধির ধীরগতি, শ্রমের চাহিদার ওপর নতুন নতুন প্রযুক্তির ভারসাম্যহীন প্রভাব এবং শিল্পের ব্যবহারিক জ্ঞানের ওপর পশ্চিমাদের একচেটিয়া দখলের অবসান কমবেশি দৃশ্যমান। কিন্তু এগুলো শক্তিশালী বিষয় ছিল।
ট্রাম্প অভিযোগ করেছিলেন যে ‘বিভিন্ন দেশ আমাদের কাছ থেকে সুবিধা নিচ্ছে...তারা অনেক অনেক বছর ধরে এ কাজ করছে এবং আমরা এর অবসান চাই।’ একজনের দুরবস্থার জন্য অন্যদের, বিশেষত বিদেশীদের দায়ী করা খুব সোজা। এদিকে নজর দেয়া সত্ত্বেও অর্থনীতির ওপর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের তুলনামূলকভাবে সীমিত তবে গভীর প্রভাব পড়েছে। সর্বোচ্চ কল্যাণমূলক পর্যায়ে থাকা অনেক দেশের অর্থনীতিই ছোট তবে ব্যাপকভাবে উন্মুক্ত। ডেনমার্ক এ রকম একটি দৃষ্টান্ত। অবাধে পুঁজি চলাচল করতে পারার সক্ষমতা অবশ্যই বাণিজ্যের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো বৈপ্লবিক অর্থনৈতিক পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে দেশের ভেতর ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য করতে ব্যর্থ হওয়া।
একটি প্রকৃত সমস্যা হলো অনুপার্জিত উপস্বত্বজীবী পুঁজিবাদের (রেন্টিয়ার ক্যাপিটালিজম) উত্থান যেখানে সমাজে কোনো অবদান না রেখেই বিপুল মুনাফা অর্জিত হয়। এ ব্যবস্থায় জনগোষ্ঠীর তুলনামূলক ছোট অংশ অনুপার্জিত আয় ভোগ করে—তাদের কাজের তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণে বা মাত্রাতিরিক্ত আয়ের অধিকারী হয় তারা। একই সঙ্গে এসব ব্যবহারযোগ্য সম্পদ দিয়ে তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষার রাজনৈতিক ও আইনি ব্যবস্থা দাঁড় করায়। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অর্থায়নের উদীয়মান শক্তি ও পরিধি এবং প্রযুক্তিসহ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশসমূহে প্রতিযোগিতার পতন।
আর্থিক সংকট একটি স্বল্পমেয়াদি অথচ বড় ধরনের অর্থনৈতিক আঘাত বয়ে এনেছিল আর তারপর উৎপাদনের ক্ষেত্রে সংকট-পূর্ববর্তী সময়ের প্রবণতার তুলনায় বড় ধরনের ধস নামিয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাজ্যে মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) সংকট-পূর্ববর্তী ধারা বজায় থাকলে যা হতো ২০২১ সালে বাস্তবে তার চেয়ে ৩০ শতাংশ কম হয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এ হার ছিল ২১ শতাংশ কম।
সর্বোপরি, এ সংকট ও সংকট তৈরির জন্য দায়ী বলে যাদের মনে করা হয়, সেই প্রতিষ্ঠানগুলোকে উদ্ধার করার মধ্য দিয়ে সুস্পষ্টভাবে অভিজাতদের অযোগ্যতা এমনকি তাদের কুকর্মই প্রতীয়মান হয়েছে। সংকটের পর এসেছে যন্ত্রণাদায়ক কাঠামোগত রাজস্ব কৃচ্ছ্রসাধন। অনেক ভোটারই তাই নিশ্চিত হয়েছে পরিবর্তনের সময় এসেছে। তাহলে ট্রাম্প বা ব্রেক্সিট চেষ্টা করতে অসুবিধা কি—এমনটাই ছিল তাদের মনোভাব।
নির্বাচনের সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসা জনতুষ্টিবাদের ভিন্ন রূপধারী কর্তৃত্ববাদ এর সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে যায় খুব তাড়াতাড়ি। রাষ্ট্রের স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো এবং বিরোধী পক্ষকে দমন করতে সরকারপ্রধান কর্তৃক তার সর্বোচ্চ ক্ষমতা ব্যবহারের মধ্য দিয়ে রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান, ভিক্টর অরবান এবং ভ্লাদিমির পুতিনের মতো একচ্ছত্র ক্ষমতাসীন বা চরম শাসকের উত্থান ঘটেছে।
এ বিষয়টি কি তাহলে উদার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক? একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ জনতুষ্টিবাদ এ রকম একটি উন্নয়ন ঘটাতে পারে বটে। সব জনতুষ্টিবাদী নেতাই অভিজাতদের প্রতি বিরূপ ও ক্ষুব্ধ। তবে অনেকে আবার বহুত্ববাদবিরোধীও। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জন ওয়ারনার মুলারের যুক্তি হলো: বহুত্ববাদবিরোধী জনতুষ্টবাদীরা বিশ্বাস করে যে ‘প্রকৃত’ জনগণ ছাড়া আর কিছু নেই আর তারাই (জনতুষ্টিবাদীরা) একমাত্র এ জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে, এমনকি তাদের মধ্যেই এ জনগণ মূর্ত হয়। এই বিশ্বাস এক বদ্ধমূল ধারণায় পরিণত হয় যে ক্ষমতা কেবল তাদের (জনতুষ্টিবাদী নেতাদের) হাতে থাকতে হবে।
জনতুষ্টিবাদের পেছনে যে প্রাণশক্তি আছে, তা মোটেও অবজ্ঞা করার মতো নয়, আর চেপে যাওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। বরং এটাকে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। অভিজাতদের প্রতি ব্যাপক অনাস্থার প্রত্যুত্তর দিতে উদার গণতন্ত্রে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রাজনৈতিকদের উচিত তাদের প্রতি নিজেদের সমর্পণ না করে বরং তাদের আবার বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা। ১৯৩০-এর দশকে ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট এটাই করেছিলেন। তিনি সে সময় সৃজনশীল বিভিন্ন ধারণা ও ফ্রান্স পার্কিনসনের মতো যোগ্য লোকদের সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। পার্কিনসন ছিলেন শ্রমমন্ত্রী যিনি যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। এটা করতে গিয়ে তিনি ‘সংগঠিত অর্থের সরকারের’ বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। এখনো এ ধরনের কাজের সফল পুনরাবৃত্তি সম্ভব।
প্রবৃদ্ধি ও কল্যাণ: আমার দৃঢ় বিশ্বাস হলো বাজার অর্থনীতির সঙ্গে একটি সর্বজনীন ভোটাধিকারভিত্তিক গণতন্ত্রের টিকে থাকা অসম্ভব যদি গণতন্ত্র বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে প্রভাবিত করার মতো উন্মুক্ত প্রতীয়মান না হয় এবং যদি বাজার এ জনগোষ্ঠীর স্বার্থ সংরক্ষণ করতে না পারে। আর তাই এমন একটি রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া প্রয়োজন যার শেকড় পরিচয় বিনাশকারী রাজনীতি নয় বরং সব নাগরিকের কল্যাণের মধ্যে প্রথিত আছে। অন্যভাবে বললে, সবার জন্য অর্থনৈতিক সুযোগ ও মৌলিক নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি।
দেশজ নীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত ক্রমবর্ধমান, ব্যাপকভাবে অংশীদারমূলক ও টেকসই মানের জীবনধারণ ব্যবস্থা, যারা কর্মক্ষম তাদের জন্য ভালো কাজ, সুযোগের সমতা, যাদের প্রয়োজন তাদের জন্য (সামাজিক) নিরাপত্তা এবং গুটিকয়েকের জন্য ‘বিশেষ অগ্রাধিকার’ ব্যবস্থার অবসান ঘটানো।
এসব ক্ষেত্রে আমরা যা করে আসছি, তার চেয়ে অনেক ভালো করা সম্ভব। যেমন ঋণ-তাড়িত চাহিদার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ও আর্থিক ব্যবস্থাকে শক্তসমর্থ করে সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে অনেকটাই প্রশমিত করা যায়। এজন্য একটি অবশ্য করণীয় হলো ঋণের সুদের ওপর থেকে কর-কর্তন প্রত্যাহার করা। উদ্ভাবনকে উৎসাহ দান ও বিনিয়োগের বিস্তার ঘটানোর জন্য আরো অনেক নীতিপদক্ষেপ নেয়া সম্ভব। আবার টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে মিলিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকে পড়ার সম্ভাব্যতা এখন ক্রমেই জোরদার হচ্ছে, যদিও এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নীতির এখনো ঘাটতি আছে।
অনেকেই অবশ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পেছনে পাগলের মতো ছোটার বিরোধিতা করছেন অবনতিশীল বৈশ্বিক জলবায়ু পরিস্থিতি সুরক্ষার জন্য। তবে কথিত এ ‘অপ্রবৃদ্ধি’ (ডিগ্রোথ) বিশ্বের পরিবেশগত সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত নয়, পর্যাপ্ত তো নয়ই। এটা অপর্যাপ্ত এজন্য যে এর ফলে বিশেষত কার্বন নিঃসরণের মাত্রা চড়া হয়ে থাকবে। এটা অপ্রয়োজনীয় এজন্য পরিবেশ রক্ষার সর্বোত্তম সমাধান নিহিত আছে প্রযুক্তির সদ্ব্যবহারে। সর্বোপরি প্রবৃদ্ধিকে কমিয়ে ফেলা বা স্থবির করে দেয়ার বিষয়ে গণতান্ত্রিকভাবে মতৈক্য সম্ভব নয়। একমাত্র স্বৈরতন্ত্র এটা করতে পারে। [অপ্রবৃদ্ধি বা ডিগ্রোথ হলো প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার সীমিত করার জন্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ইচ্ছাকৃতভাবে কমিয়ে আনা।]
একইভাবে অর্থনৈতিক উন্মুক্ততার অবসান ঘটানো বা দ্বার বন্ধের চেষ্টা করা মারাত্মক ভুল। সব দেশের সমৃদ্ধির জন্য বাণিজ্যের অবদান অনস্বীকার্য ও অপরিহার্য। ছোট ও গরিব দেশ যেমন, বড় দেশও তেমনি বাণিজ্য থেকে উপকৃত হয়ে আসছে। অর্থনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা একটি বিভ্রম বৈ অন্য কিছু নয়। বরং বিশ্বায়নকে রাজনৈতিক দিক থেকে ভালোভাবে কাজে লাগানো গেলে তা অর্থনৈতিক পরিবর্তনের দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত মানুষ ও পরিবেশের জন্য সহায়ক হবে।
প্রবৃদ্ধি এখনো প্রয়োজনীয়। একইভাবে প্রয়োজনীয় হলো কল্যাণ রাষ্ট্র যা অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে অর্থবহ। ব্যক্তি খাত যে ঝুঁকির বীমা বহন করবে, এটা তা করবে। ঠিকমতো সাজানো হলে কল্যাণ রাষ্ট্র প্রত্যেককেই এক ধাপ এগিয়ে দিতে ভূমিকা রাখবে, তৈরি করবে সবার জন্য সুযোগের সমতা। এটা হতে পারে জীবনব্যাপী দক্ষতার সঙ্গে ভোগব্যয় করা, যুবাবস্থায় (যেমন শিশু, ছাত্র ও তরুণ মাতা-পিতা) ও বৃদ্ধ বয়সে (যেমন অবসরকালে) মানুষকে সাহায্য করা এবং তাদের মাঝ বয়সের সমৃদ্ধির সময় তাদের ওপর করারোপ করা।
কেউ কেউ যুক্তি দেন যে সর্বজনীন মৌলিক আয় হয়তো কল্যাণ রাষ্ট্রের উন্নতি ঘটাবে। কিন্তু এক্ষেত্রে বাড়তি ব্যয় চলে যাবে তাদের কাছেও যারা এ সাহায্য পাওয়ার যোগ্যতম নয়। বরং দুষ্প্রাপ্য রাজস্বসম্পদকে যাদের প্রয়োজন তাদের জন্য ন্যূনতম কল্যাণ ব্যয়কে উন্নত করতে কাজে লাগানো হবে উত্তম কাজ। আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো কর্মসংস্থানে ভর্তুকি দেয়া ও সবার জন্য আবশ্যিক গণসেবার উন্নতি ঘটানো।
আরো অনেক ক্ষেত্রেই সংস্কার প্রয়োজন। যেমন প্রতিযোগিতার নীতিকে আরো কার্যকর করা, কর ব্যবস্থাকে আরো দক্ষ ও ন্যায্য করা এবং দুর্নীতির মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা। রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সরকারি অর্থায়নের প্রয়োজন। উত্তরাধিকারীদের জন্য রেখে যাওয়া বিপুল সহায়সম্পত্তির ওপর উচ্চহারে করারোপের বিষয়টিও বিবেচনা করা উচিত যেন রাষ্ট্রের জনগণের ব্যয় নির্বাহের কিছু অর্থ মেলে।
সমৃদ্ধি ও স্বাধীনতার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদে স্বৈরতন্ত্রের তুলনায় গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতা ভালো ফল বয়ে এনেছে। যদি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আসতেন, তিনি কি একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হতেন? তবে গণতন্ত্র যেন আরো ভালোভাবে কাজ করতে পারে, সেজন্য আমাদের সচেষ্ট হতে হবে। এটা মানতেই হবে যে গণতন্ত্র তখনই কাজ করে যখন সমাজের প্রতি আনুগত্য ব্যক্তির প্রতি আনুগত্যকে ছাপিয়ে যায়। একটি কার্যকর গণতন্ত্রে যারা ভিন্নমত পোষণ করে তাদের আইনি বৈধতাকে অবশ্যই স্বীকৃতি দিতে হবে।
নাগরিক দেশপ্রেম পুনর্জোরদারকরণ, শাসনকাজ উন্নততর ও বিকেন্দ্রীকরণ, রাজনীতিতে টাকার ভূমিকা হ্রাসকরণের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। আমাদের উচিত হবে সরকারকে অধিকতর জবাবদিহির আওতায় আনা। আমাদের এমন গণমাধ্যম থাকতে হবে যেটা গণতন্ত্রকে অবনমন নয় বরং জোরালভাবে সমর্থন করবে। এসব সংস্কারমূলক পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদের প্রাণময় স্বাস্থ্যকে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।
মানবজাতি অনেকগুলো অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে: সমৃদ্ধিকে টেকসই করা; মহামারীর সুব্যবস্থাপনা; সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; পারমাণবিক বিস্তার রোধ; বড় শক্তিগুলোর মধ্যে যুদ্ধ এড়ানো এবং বৈশ্বিক সম্পদ রক্ষা করা।
তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়, কীভাবে গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদ এ বিশ্বে যথাযথ হবে? উদার গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় হলো তার নিজস্ব পদ্ধতির শক্তিকে রক্ষা করা এবং একই সঙ্গে বাকি বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা। শান্তি, সমৃদ্ধি ও ধরিত্রীর জন্যই এটা প্রয়োজন।
বৈশ্বিক সম্পর্ক অবশ্যই হতে হবে সহযোগিতা, প্রতিযোগিতা ও সহাবস্থানের এবং যেখানে অপরিহার্য সেখানে নিয়ন্ত্রিত সংঘাতের। একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা। তবে তা অবশ্যই কোনো সংঘাতময় হবে না, হওয়া চলবে না। তাহলে কেউই লাভবান হবে না। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধ তো নিশ্চিতভাবেই যথেষ্ট বিপর্যয় হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে।
তাহলে কী করতে হবে? প্রথমত, গণতন্ত্রগুলো ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করতে হবে। এ সহযোগিতার ক্ষেত্রে ব্যর্থ পদ্ধতিগুলো সারিয়ে নবায়ন করার পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। দ্বিতীয়ত, উদীয়মান ও প্রতিষ্ঠিত শক্তিগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সন্দেহের মধ্য দিয়ে সংঘাত তৈরির ফাঁদে পা দেয়া চলবে না যাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গ্রাহাম অ্যালিসন ‘থিওসিডিডেস ট্রাম্প’ বলে অভিহিত করেছেন। তৃতীয়ত, সব পক্ষের জন্য লাভনজনক হয় এমন পারস্পরিক নির্ভরতা উৎসাহিত করতে হবে। সর্বোপরি, অংশীদারত্বমূলক অভীষ্টে উপনীত হতে সহযোগিতা থাকতে হবে। এক্ষেত্রে অনিবার্যভাবে প্রথম পদক্ষেপ হলো চীনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংলাপের দ্বার খোলা যেন সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা এগিয়ে নেয়া যায়।
নতুন এই বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্রগুলোর প্রয়োজন হলো নিজেদের ও নিজেদের মূল্যবোধকে রক্ষা করা এবং একই সঙ্গে এটা মেনে নেয়া যে তারা আর এ দুনিয়া পরিচালনা করতে পারবে না যেমনটি অতীতে সম্ভব হয়েছিল। বিশ্বের জনসংখ্যা ও অর্থনীতিতে তাদের হিস্যা অপরিবর্তনীয়ভাবে কমে যাচ্ছে। এটাকে স্বীকার করতে হবে।
আমাদের গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদের ভঙ্গুরতা স্বীকার করতে হবে—এর প্রাণভূমিতেও যে এটা ভঙ্গুর হয়েছে। কিন্তু এর প্রবহমান মূল্যবোধগুলোকে আমরা অস্বীকার করতে পারব না। আমাদের পূর্বপুরুষদের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা এগুলো অর্জন করেছি। আমাদের উত্তরসূরিদের জন্য এগুলোকে সংস্কার করতে ও সুরক্ষা দিতে হবে। এ কাজে সাফল্য বহুলাংশে নির্ভর করবে তাদের অভিজাতদের ন্যায়পরায়ণতা ও প্রজ্ঞার ওপর। লুণ্ঠনকারীদের হাত থেকে এ গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বৈধতাকে রক্ষা করা যাবে যদি এ বিশ্বাস ও আস্থা পুনর্জাগ্রত করা যায় যে লুণ্ঠনকারীরা শুধু বাইরে নয়, বরং দুঃখজনকভাবে এ ব্যবস্থার মধ্যেও অবস্থান করছে।
মার্টিন উলফ: অর্থনৈতিক সাংবাদিক ও বিশ্লেষক
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস থেকে সংক্ষেপে ভাষান্তর করেছেন তানিম আসজাদ










