ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ড (আইএফআরএস) অনুসারে, কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন তৈরির সময় লাভ-ক্ষতি হিসাব দেখাতে হয়। বাংলাদেশেও কোম্পানি আইন, সিকিউরিটিজ আইন, ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট ও আয়কর অধ্যাদেশেও আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে আর্থিক প্রতিবেদন তৈরির বিধান রয়েছে। ২০১০ সালের বীমা আইন অনুসারেও বীমা খাতের কোম্পানিগুলোর লাভ-ক্ষতি হিসাব তৈরির বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু জীবন বীমা কোম্পানিগুলো দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করছে লাভ-ক্ষতির হিসাব ছাড়াই। গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লাভ-ক্ষতি হিসাব ছাড়াই আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করার কারণে জীবন বীমা খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হিসাব করা হচ্ছে না। এতে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এ খাতের কোম্পানিগুলোর মূল্য-আয় অনুপাতও (পিই রেশিও) নির্ধারণ করা সম্ভব হচ্ছে না। অথচ কোনো কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে পিই রেশিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নির্দেশক। তাছাড়া কোনো শেয়ারে বিনিয়োগের জন্য মার্জিন ঋণ দেয়া হবে কিনা, সেটি পিই রেশিওর মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। পিই রেশিও ৪০ বা এর বেশি হলেও সেই কোম্পানির শেয়ার কেনার ক্ষেত্রে মার্জিন ঋণ দেয়া হয় না। অথচ জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর পিই রেশিও অজ্ঞাত থাকায় মার্জিন ঋণ দেয়া যাবে কিনা, তা অনেকাংশেই ব্রোকারের ওপর নির্ভর করে। ফলে এ খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারে অবারিত মার্জিন ঋণ দেয়ার সুযোগ থাকছেই। আর এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে পুঁজিবাজারের দুষ্ট চক্র সহজেই তালিকাভুক্ত জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর শেয়ার নিয়ে কারসাজি করার সুযোগ পাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক বিবরণীর অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো, স্থিতিপত্র তথা ব্যালান্স শিট, আয় বিবরণী বা লাভ-লোকসান হিসাব এবং সাধারণ শেয়ারে পরিবর্তনের বিবরণী। এছাড়া ক্যাশ ফ্লো স্টেটমেন্ট এবং ব্যালান্স শিটের টিকাগুলোও আর্থিক বিবরণীর অংশ হিসেবে হিসাব নিরীক্ষকদের কাছে সমাদৃত। অতীতে চূড়ান্ত হিসাব বা বর্তমানে আর্থিক বিবরণী যে নামেই অভিহিত করা হোক না কেন, লাভ-লোকসান হিসাব তার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে সারা বিশ্বই মানে। এটা হিসাবরক্ষণের এতটাই মৌলিক বিষয় যে এতে কারোরই দ্বিমত থাকার কথা নয়। একটি হিসাব বছরে অর্জিত সব আয় এবং ব্যয়ের পার্থক্য থেকে ওই বছরের নিট মুনাফা বের করা হয়, যার ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী সময়ে বণ্টনযোগ্য মুনাফা বের করা হয়। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে দেশের জীবন বীমা কোম্পানিগুলো কোনো বার্ষিক লাভ-লোকসান হিসাব প্রস্তুত করছে না। ফলে জীবন বীমা কোম্পানিগুলো সঠিকভাবে তাদের বার্ষিক আয়-ব্যয় নির্ণয় করতে পারছে না। এতে একদিকে সরকার যেমন বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে সঠিক মুনাফা বের না হওয়ায় বিনিয়োগকারীরাও বঞ্চিত হচ্ছেন তাদের প্রাপ্য ডিভিডেন্ড থেকে। উপরন্তু, সব বীমা গ্রাহকও বঞ্চিত হচ্ছেন তাদের প্রাপ্য মুনাফা থেকে। সবাই জানেন শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীরা লাভ-লোকসান হিসাবের বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে তাদের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেন। ফলে সঠিক লাভ-লোকসান হিসাব না থাকায় তাদের অধিকার খর্ব হচ্ছে, দুর্নীতির সুযোগও তৈরি হচ্ছে।
কোম্পানি আইন ১৯৯৪, বীমা আইন ২০১০ এবং সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ রুল ১৯৮৭-এ সব পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির জন্য লাভ-লোকসান হিসাব প্রস্তুতের নির্দেশনা রয়েছে। তাছাড়া আর্থিক বিবরণী বিষয়ে বিশ্বজনীন নিয়মকানুনগুলোও বেশ সুস্পষ্ট। আন্তর্জাতিক আর্থিক বিবরণী প্রকাশনা অনুযায়ী, জীবন বীমা, সাধারণ বীমাসহ সব ধরনের পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির আয় বিবরণী প্রস্তুতি বিষয়ে সুস্পষ্ট মান বজায় রাখতে বলা হয়েছে। শ্রীলংকা, পাকিস্তান, ভারত, নেপালসহ সব প্রতিবেশী দেশের জীবন বীমা কোম্পানিগুলো লাভ-লোকসান হিসাব প্রস্তুত করে। পিছিয়ে নেই বীমাজগতে নবীনতম দেশ মিয়ানমারও। অথচ আমরা রয়েছি সেই তিমিরেই।
মূলত আমাদের জীবন বীমা কোম্পানিগুলো রাজস্ব হিসাবের মাধ্যমে একটি দীর্ঘমেয়াদি সলভেন্সি সারপ্লাস নির্ণয় করে। এটি করা হয় লাইফ ফান্ড থেকে অনুমাননির্ভর বীমা দায় বাদ দিয়ে কোনো ধরনের লাভ বা লোকসান হিসাব প্রস্তুত করছে না। বীমা আইনের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কোম্পানিগুলো তাদের মতো আর্থিক মূল্যায়ন করছে। কিন্তু উদ্বৃত্ত কখনই বার্ষিক লাভ নয়; বরং এটি হলো অ্যাকচুয়ারি প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নির্ণীত অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সম্ভাব্য অর্জনের একত্র একটি রূপ, যা কোনো কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সচ্ছলতাবিষয়ক একটি তথ্য মাত্র। লাভ কখনই অনুমাননির্ভর হতে পারে না। এজন্যই চলতি বছরে সংঘটিত পারফরম্যান্সই বিশ্বজুড়ে জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর আয় নির্ণয়ের ভিত্তি। ফলে সেটিই করপোরেট ট্যাক্স নির্ণয়েরও ভিত্তি হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত ধারণা। উপরন্তু, বীমা আইন ২০১০-এ সুস্পষ্টভাবে সব বীমা কোম্পানিকে লাভ-লোকসান হিসাব প্রস্তুতের জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলো বিষয়টি মেনে চললেও মানছে না জীবন বীমা কোম্পানিগুলো। শ্রীলংকার বীমা কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তারা আর্থিক বিবরণী প্রস্তুতের সব আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখছে। অর্থাৎ লাভ-লোকসান হিসাব প্রস্তুত করছে। অধিকন্তু, কোম্পানিগুলো বার্ষিক প্রতিবেদনে অ্যাকচুয়ারিয়াল ভ্যালুয়েশন-বিষয়ক অ্যাকচুয়ারি কর্তৃক স্বাক্ষরিত সার্টিফিকেশন প্রদর্শিত হয়েছে। রয়েছে ক্লেইম রিজার্ভ-বিষয়ক পৃথক অ্যাকচুয়ারি কর্তৃক স্বাক্ষরিত সার্টিফিকেশন। অথচ বাংলাদেশে অ্যাকচুয়ারিরা সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের উদ্দেশে এ ধরনের কোনো প্রত্যয়ন পত্র প্রদান করছেন না। ইনকাম ট্যাক্স অর্ডিন্যান্স ১৯৮৪ বলেছে, জীবন বীমা কোম্পানির সারপ্লাস নির্ণয় করতে হবে বীমা আইন, ২০১০-এ বর্ণিত অ্যাকচুয়ারিয়াল ভ্যালুয়েশনের ভিত্তিতে। উল্লেখ্য, অ্যাকচুয়ারিয়াল ভ্যালুয়েশনের ভিত্তিতে নির্ণীত বীমা দায় আমাদের আলোচ্য লাভ-লোকসান হিসাবেরও অবিচ্ছেদ্দ্য অংশ। অধিকন্তু, সারা বিশ্বের সব দেশে অ্যাকচুয়ারিয়াল ভ্যালুয়েশনের ভিত্তিতে নির্ণীত ওই বীমা দায়কে লাভ-লোকসান হিসাবে দেখানো হয়।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন এসে যায়, আমাদের দেশে জীবন বীমা কোম্পানিগুলো কেন লাভ-লোকসান হিসাব করছে না, কেন তারা শুধু রেভিনিউ হিসাব তৈরি করে তাদের দায় সারছে? এর মূলে রয়েছে ২০১২ সালের ১১ জুন ইস্যুকৃত আইডিআরএ সার্কুলার এবং আর্থিক বিবরণী প্রস্তুতি-বিষয়ক নির্দেশনা। যেখানে জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর জন্য কোনো লাভ-লোকসান হিসাব প্রস্তুতির বিধান রাখা হয়নি। এ বিষয়ে ওই সার্কুলারে প্রদত্ত বীমা আইন, ২০১০-এর ১৬০ ধারার যে উদ্ধৃতি দিয়েছে, তা বিশ্লেষণের দাবি রাখে। এক্ষেত্রে আইডিআরএর দায় রয়েছে। বাংলাদেশে প্রণীত জাতীয় বীমা নীতিতে বলা হয়েছে, আমাদের বীমা নীতি হবে বিশ্বের অন্যান্য দেশের বীমা নীতিগুলোর অনুরূপ। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলংকা বীমাসংক্রান্ত তাদের মূল বিধিবিধানগুলো পেয়েছে ব্রিটেন থেকে। এসব দেশের জীবন বীমা কোম্পানি লাভ-ক্ষতি হিসাব প্রস্তুত করছে। একমাত্র ব্যতিক্রম শুধু বাংলাদেশ। এটি কাম্য নয়। আশ্চর্যজনকভাবে বাংলাদেশের জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর প্রদর্শিত লাভের হার বিশ্ব গড়ের অর্ধেক। ফলে আমাদের জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর করের হার বিশ্ব গড়ের প্রায় দ্বিগুণ হওয়া সত্ত্বেও কোম্পানিগুলোর প্রদর্শিত স্বল্প রাজস্বের বিপরীতে কোম্পানিগুলোর প্রদত্ত করের পরিমাণ বিশ্বের অন্য দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম। এতে একদিকে সরকার যেমন বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে সঠিক মুনাফা বের না হওয়ায় বিনিয়োগকারীরাও বঞ্চিত হচ্ছেন তাদের প্রাপ্য ডিভিডেন্ড থেকে। উপরন্তু, সব বীমা গ্রাহকও বঞ্চিত হচ্ছেন তাদের প্রাপ্য মুনাফা থেকে।









