বর্তমান সময়ে শিশু-কিশোরদের স্ক্রিনের প্রতি আসক্তি মাত্রাতিরিক্ত পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্ক্রিনের প্রতি নির্ভরশীলতার ফলে শিশুরা এক ধরনের হারিয়েও যাচ্ছে বাস্তব জগৎ থেকে। পৃথিবীজুড়ে আধুনিকতার ছড়িয়ে যাওয়া অত্যাধুনিক সময়ে স্মার্টফোনের স্ক্রিন কিংবা কম্পিউটারের মনিটরের অবাধ ব্যবহার যেকোনো বয়সের শিশুদের জন্য ঠিক কতটুকু কার্যকর বা আদৌ কার্যকরী কিনা তা নিয়ে ভাবার যথাযথ সময় এসেছে। প্রতি দশকের ব্যবধানে নতুন নতুন আবিষ্কার মানুষের আচার-আচরণকে বেশ বদলে দিচ্ছে। তরুণ প্রজন্মের ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়ছে সবচেয়ে বেশি। বর্তমান পৃথিবীতে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের হাতছানি যেমন আছে, তেমনি যুদ্ধের ভয়াবহতাও আছে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সফলতার পাশাপাশি আছে পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহতাও। রোবটিকস কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে একদিকে যেমন পৃথিবীকে বদলে দেয়ার স্বপ্ন বড় হচ্ছে; অন্যদিকে পৃথিবীব্যাপী তেল, গ্যাস, খাদ্য এমনকি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সংকটও আমাদের ঘিরে রেখেছে। আরো একটি অস্পষ্ট ভবিষ্যৎ সংকট আমাদের সামনে। তরুণ প্রজন্মের সংকট। অবশ্য সম্পূর্ণ অর্থে অস্পষ্টও নয়। আমাদেরই যথেষ্ট অবহেলা কিংবা উদাসীনতা বলা যেতে পারে। হঠাৎ করেই যেন প্রজন্মের বড় একটি অংশ আটকে গেল ডিজিটাল স্ক্রিনে।

কম্পিউটার মনিটর কিংবা মোবাইল স্ক্রিনের প্রতি শিশুর আসক্তি আমাদের বর্তমান সময়ে একটি ভয়াবহ সংকটের আভাস দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতি নতুন প্রজন্মের নিরাপদ পৃথিবীকে হুমকির মুখে ফেলবে। আমাদের শিশুরা প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে একটি অনিরাপদ পৃথিবীর দিকে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। চোখের সামনে একটি প্রজন্ম স্ক্রিনের মাঝে নিজেদের শৈশব, কৈশোরের গল্পগুলোকে লোহায় পড়া মরীচিকার মতো ধ্বংস করে দিচ্ছে। এসব ঘটনা আমাদের অজান্তেই ঘটছে এমনটা মানতে নারাজ আমি। বরং বলব, আমাদের চোখের সামনেই ঘটছে। আমরা দেখেও দেখছি না, শুনেও শুনছি না। ভাবছি, ছোট মানুষই তো। বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে। মোটেও নয়। অভিভাবকের এ সামান্য অবহেলার ফলাফল হতে পারে ভয়াবহ সংকটের শুরু মাত্র। এ কথার পক্ষে যথেষ্ট যুক্তি দাঁড় করানো যেতে পারে। ব্রিটিশ সাইকোলজিক্যাল সোসাইটি বলছে, স্ক্রিন আসক্তি শিশুদের মস্তিষ্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শুধু তা-ই নয়, এ আসক্তি শিশুর মস্তিষ্কের গঠনকেই পরিবর্তন করে দেয়। গাঠনিক পরিবর্তনের ফলে তারা সাধারণত যেকোনো চিন্তাভাবনাকে সহজ করে উঠতে পারে না। ফলে বিকৃত মানসিকতার একটি ভয়ানক সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। বর্তমান প্রেক্ষাপটে অপরাধ এবং অপরাধের ধরন বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট বোঝা যায়, অধিকাংশ অপরাধের ধরন বিকৃত মানসিকতা। 

বৈশ্বিক রাজনৈতিক সংকট, অর্থনৈতিক সংকট, জলবায়ু সংকটের মতো আগামী প্রজন্মের সংকটকেও ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। একটি শিশুর আধুনিকায়ন এবং মেধা বিকাশের একমাত্র মাধ্যম মোবাইল ফোন; এমন ভাবনা শিশুর সুরক্ষিত পৃথিবীর জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আধুনিক জীবনযাপনে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা জীবনের একটি অংশমাত্র; সম্পূর্ণ জীবন কিন্তু নয়। বর্তমান পৃথিবীতে আমাদের চিন্তা-চেতনায় বিপত্তি বেধেছে এখানেই। নতুন প্রজন্মের বড় একটি অংশ প্রযুক্তিকে জীবনের একমাত্র অংশ ভেবে বসে আছে। একটি উদাহরণ দেয়া যাক, খুব ছোট বয়সে শিশুর কান্না থামানোর জন্য চাঁদ মামা অথবা কাজলা দিদির কবিতা এখন আর শোনানো হয় না বলে সেসব সংস্কৃতি এখন বিলুপ্তপ্রায়। তার পরিবর্তে শিশুর হাতে মোবাইল ফোন তুলে দেয়ার মতো ভয়াবহ কাজটি অনেক বাবা মা-ই করে থাকেন। ভুলের শুরুটা হয় এখান থেকেই। ফলে শিশু বড় হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয় প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীলতা, যা প্রতিটি মুহূর্তে শিশুর জীবনে বড় আকারের অদৃশ্য ক্ষতের সৃষ্টি করে। অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা শুধু যে সময়ের ক্ষতি করে তা নয়, শারীরিক এমনকি মানসিক সংকটও দানা বাঁধে শিশুর মস্তিষ্কে। এ সংকট হয় দীর্ঘস্থায়ী। ঠিক ক্যান্সারের কোষ আক্রান্ত হওয়ার মতো। ধীরে ধীরে ক্ষতি করতে করতে এমন একটি পর্যায়ে নিয়ে যায় যে শেষ পর্যায়ে পদক্ষেপ নেয়ার মতো আর কিছুই করার থাকে না।

দেশে অনবরত খেলার মাঠ দখল হচ্ছে। খোলা জায়গা ভরাট করে দালানকোঠা, কলকারখানা তৈরি হওয়ায় শিশুরা চার দেয়ালে বন্দি হয়ে থাকতেও বাধ্য হচ্ছে। আমাদের কাঠামোগত এমন ধরনের পরিবর্তন অবশ্যই ভালো নয়। শিশুর সুরক্ষিত পৃথিবী নিশ্চিত করতে এ নির্দিষ্ট সংকটগুলোর সমাধান করা সরকারের অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক, রাজনৈতিক ব্যাপারগুলোর মতোই গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত। নব্বইয়ের দশক পর্যন্তও আমাদের দেশে সবুজ মাঠে তারুণ্যের ছোটাছুটি, দলবেঁধে নদীতে ঝাঁপাঝাঁপি করার দৃশ্য চোখে পড়েছে; এখন আর তেমন নেই। প্রযুক্তিকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনা বর্তমান প্রজন্মের শিশুদের চিন্তাশক্তিকে প্রতিনিয়ত একপেশে এবং আবদ্ধ করে তুলছে। বিভিন্ন জরিপে উল্লিখিত তথ্য ও উপাত্ত তরুণদের এমন আবদ্ধ জীবনযাপনের ফলে তৈরি হওয়া হতাশার স্পষ্ট গল্প ও অদৃশ্য ক্ষতের অন্যতম প্রতিচ্ছবি। কম্পিউটার মনিটর বা মোবাইল ফোনের বাইরেও সুন্দর একটি সামাজিকীকরণ ব্যবস্থার পৃথিবীতে আমাদের বসবাস; শিশুদের কাছে এ বার্তা পৌঁছানো আমাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। একটি শিশুকে অন্য দশটি শিশুর সঙ্গে মাঠে খেলতে দেয়ার যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা, পরমতসহিষ্ণুতা, সত্যবাদিতাসহ সমাজের সব মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে বসবাস করার মানসিকতার ভিত্তি মূলত তৈরি হয় এ সময়ে। শিশুকে অন্যের বিপদে এগিয়ে যাওয়ার শিক্ষা দিন। জীবনে বেঁচে থাকার জন্য সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাবের বিকল্প নেই। খুব ছোট বয়স থেকে শিশুর মানসিকতার উন্নয়ন ব্যাপকভাবে আজীবনের শিক্ষা হিসেবে কাজে দেয়। শিশুরা উর্বর মস্তিষ্কের অধিকারী হয়। চাষাবাদের সময় জমিতে নরম মাটিকে যেমন ফসল ফলনের জন্য উপযোগী করে তোলা হয়—আমাদের শিশুদের ছোটবেলা থেকেই ভবিষ্যতের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শিশুর পথ চলায় কোনো বাধা-বিপত্তিকে সততার সঙ্গে মোকাবেলা করার উপায় আবিষ্কারের শিক্ষা শিশুর বিকাশের জন্য সমান গুরুত্ব বহন করে। স্বাধীনতার অর্থ খেয়ালখুশি অনুযায়ী যা ইচ্ছা তাই করা নয়—এ শিক্ষা শিশুকে জীবনমুখী হতে এবং নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করবে। পারিবারিক শিক্ষা কিংবা প্রাথমিক শিক্ষা একটি শিশুর জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক হলেও আমাদের সেই সীমারেখাকে শতভাগ পর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে। একটি শক্তিশালী নৈতিক ভিত্তির ওপর বেড়ে ওঠা শিশু খুব কম সময়ই বিপথে যায়।

বাস্তবিক অর্থে সংস্কৃতিকে আটকে রাখা কিংবা বেঁধে রাখা সম্ভব নয়। সংস্কৃতি প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। নতুন নতুন প্রযুক্তি সামনে আরো নতুন হয়ে বাজারে আসবে, খুব স্বাভাবিক। তবে সমস্যা হলো, সেই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করার ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে আমাদের তেমন কোনো ধারণা নেই। আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার উপাদানগুলো যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। পরীক্ষায় ভালো করার মন-মানসিকতার বাইরে এসে বাস্তবিক উপলব্ধি আমাদের বেশ কম। শেখা কিংবা জানার চেয়ে আমরা শেখাতে বা জানাতেই বেশি পছন্দ করি। সেজন্য একটি শিশুর হাতেও তাকে ম্যানেজ করার জন্য মোবাইল ফোন তুলে দিতে দ্বিধা করি না। অভিভাবক হিসেবে আগামী প্রজন্মের জন্য প্রথম ভুলটা তাই আমরাই করি। শিশুটি যখন আসক্তির সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন এই আমরাই তাকে শাসন করি। শাসনের প্রতিক্রিয়া আবার অনেক সময় খারাপ হয়। অথচ আমাদের শুরুটাই হওয়ার কথা ছিল শিশুর মানসিকতাকে কীভাবে সুস্থ-স্বাভাবিকভাবে গড়ে তোলা যায় সেদিক বিবেচনা করা।

নবীনদের আচরণগত বিকাশ কেমন হবে তা নির্ভর করে প্রবীণদের ওপর। শিশুরা সাধারণত অনুকরণের মাধ্যমে শিখতে পছন্দ করে। প্রবীণদের আচরণগত বৈশিষ্ট্য নবীনদের সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে। শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে তাই আচরণগত ক্ষেত্রকে প্রথম দিকের বিবেচনায় রাখা উচিত। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা, সততা, আচরণগত সৌন্দর্য বিকশিত হওয়ার জন্য শিশুকে চার দেয়ালে বন্দি করে রাখা চরম অকার্যকর পদ্ধতি। একটি শিশু মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা করে যে শিক্ষালাভ করবে; বাস্তব জগতে প্রযুক্তিগত শিক্ষা তার একাংশও দিতে পারবে না। আধুনিক পৃথিবীতে তাল মিলিয়ে চলতে যদিও প্রযুক্তির বিকল্প নেই, তবে তার ওপর নির্ভরশীলতা এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ। শিশুর মানসিকতা বিকাশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো পরিবার। পারিবারিক সংকট অথবা দূরত্ব শিশুর মনুষ্যত্বকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বাবা-মার দায়িত্ব সন্তানকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে স্নেহ-মমতার আভিজাত্য অনুভব করানোর পাশাপাশি তাকে সময় দেয়া। সুস্থ ও সুন্দর পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখতে বাস্তবমুখী শিক্ষার বিকল্প নেই। এইমাত্র পৃথিবীর কোনো প্রান্তে যে শিশু সদ্য জন্মগ্রহণ করল, উপহার হিসেবে একটি সুন্দর সমাজ পাওয়ার অধিকার তার আছে। তবেই শিশু বড় হয়ে সেই সৌন্দর্যের পরিচর্যা করতে জানবে। সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে শিশুর মেধা ও মনন, চিন্তাশক্তি এবং মানসিকতার উন্নয়নে সুস্থ ও সুন্দরের চর্চা করার জন্য প্রতিটি সদ্যভূমিষ্ঠ শিশুর একটি অবাধ বিচরণক্ষেত্রের প্রয়োজন; যা পরিচর্যা করার দায়িত্ব আমার, আপনার এবং আমাদেরই।

মো. খশরু আহসান: শিক্ষার্থী, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়।