‘এরা তো বঙ্গবন্ধুকে মাইরা ফেলাইলো, অহন বঙ্গবন্ধু অইবো কেডা? দেশ চালাইবো কেডা? সেদিন জগা সাধুর যে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারিনি, বঙ্গবন্ধু শহীদ হওয়ার ৪৫ বছর পর, আজ বলতে পারি, বঙ্গবন্ধুর পুনর্জন্ম সাধিত হয়েছে তার কন্যা বিশ্বনেত্রী শেখ হাসিনার সফল নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে।’ (বঙ্গবন্ধুর পুনর্জন্ম, নির্মলেন্দু গুণ)।

এক.

‘শেখ হাসিনা সংগ্রামী জীবন’ শিরোনামে ৪০০ পাতার একটা বই সম্পাদনা করেছেন ড. শামসুল আলম (মাননীয় পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী)। ওই বইতে মোট ৪১টি নিবন্ধে ৪১ জন বিখ্যাত লেখকের কলমে ফুটে উঠেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংগ্রামী জীবনালেখ্য এবং তার সঙ্গে সফলতার কিছু খণ্ডচিত্রও। বইখানা পাঠ শেষে অন্তত আমার মনে হয়েছে শেখ হাসিনা, কবির কথায়, ‘জ্বলেপুড়ে মরে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়।’

এ বইতে যারা শেখ হাসিনা সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন কিংবা তাকে কাছ থেকে দেখার ভাগ্যবরণ করে ঘটনাপ্রবাহ বিধৃত করেছেন, তারা বিভিন্ন পেশা থেকে আসা রাজনীতিবিদ, কবি, সাহিত্যিক, বন্ধুবান্ধব, সাংবাদিক কিংবা অধ্যাপক। এরা সবাই স্ব স্ব সীমানায় শ্রয়মাণ, সমাদৃত। নির্মোহ এবং নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে শেখ হাসিনাকে নিয়ে তাদের নিজস্ব অনুভূতি পেশ করেছেন বিধায় প্রতিটি প্রবন্ধ হয়ে উঠেছে সুখপাঠ্য, একদমে শেষ করার মতো। সম্পাদিত বইটির বিশেষত্ব এই, আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে কঠিন কষ্টের মধ্য দিয়ে গেছেন জন্মাবধি, বিশেষত পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের (পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু) আপসহীন রাজনীতির জন্য, তার একটা বার্তা দেয় বইটি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালরাতে ঘাতকের নির্মম বুলেট কেড়ে নিয়েছে পিতামাতা, ভাই, আত্মীয়স্বজন কিন্তু তার পরও এদেশের মানুষকে আপন ভেবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি চারবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। অনুমান করি, কষ্ট তার শেষ হওয়ার নয় যতদিন পর্যন্ত এ দেশের একটি মানুষও কষ্ট ভোগ করবে।

এ বইয়ের সবকটি গল্প দিয়ে একটা চলচ্চিত্র তৈরির চিন্তা বাতুলতা নয় নিশ্চয়।

দুই.

তার কষ্টের শুরু কৈশোর থেকেই। খুব ছোটবেলায়, যখন একটা শিশু ‘আব্বা’, ‘আব্বা’ বলে বাবার কোলে বসে আর নামে, শেখ হাসিনার সেই কালে পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে, ভাষা আন্দোলনের সময়টায়, মামলার হাজিরার জন্য পুলিশ এক শহর থেকে অন্য শহরে নিয়ে যেত। আর এরই ফাঁকে খুব অল্প সময়ের জন্য পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটত। দুই বছরের ছোট কামাল বাবার কাছ পর্যন্ত যাচ্ছে কিন্তু কোলে উঠছে না কারণ তার জন্মের সময় তিনি কাছে ছিলেন না; জন্মানোর পর মাত্র একবার এসে দেখে গিয়েছিলেন। এর পর থেকে জেলে জেলেই কেটেছে বঙ্গবন্ধুর জীবন। কামাল তখন শেখ হাসিনাকে বলল, ‘হাসু আপা, তোমার আব্বাকে আমি একটু আব্বা বলি?’ (তবু মুখ বুজে মুক্তা ফলাও, আ ব ম ফারুক)।

বাবা জেলখানায়, মা অতিকষ্টে বড় এক সংসারের হাল ধরেছেন এবং একই সঙ্গে বাবার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সাহায্যের নিমিত্তে বিভিন্ন সূত্রে যোগাযোগ রক্ষা করছেন দেখে হাসিনাও হয়ে ওঠেন রাজনৈতিক কর্মী—‘স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ছাত্রলীগের নেত্রী হিসেবে আইয়ুববিরোধী আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলনসহ বিভিন্ন-আন্দোলন-সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেন। পিতার মতো চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে পছন্দ করেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলনে কখনো পিছপা হননি; দাবি আদায়ের মাধ্যমে আন্দোলন সফল করেই ফিরেছেন।’ জীবনকে তুচ্ছজ্ঞান করে বঙ্গবন্ধুর মতো অকুতোভয় নেতৃত্ব দিয়ে, বঙ্গবন্ধু হত্যার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের যে চেতনা ও মূল্যবোধ হত্যা করা হয়েছিল, তা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন তিনি।

তিন

নারীনেত্রী নাসিমুন আরা হক ‘আমার বন্ধু শেখ হাসিনা’ নিবন্ধে বলেছেন, ‘শেখ হাসিনার জীবনটাই হলো ঝড়ের মধ্য দিয়ে নৌকা বেয়ে চলা; সকল ঝড় উপেক্ষা করে সেই নৌকাকে তিনি তীরে ভিড়িয়েছেন।’

অন্য এক লেখক শেখ হাসিনার কষ্টের কথা বলছেন এভাবে: ‘শৈশব থেকে আজ অব্দি সুদীর্ঘ পথপরিক্রমা তার কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। কণ্টকাকীর্ণ পথ পেরিয়ে পৌঁছেছেন আজকের অবস্থানে। দেশের মানুষের ভোট ও ভাতের অধিকার এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এক অতন্দ্রপ্রহরী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। ...দীর্ঘ ছয় বছর পর ইতিহাসের নানা বাঁক পেরিয়ে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ আর রক্তের উত্তরাধিকার ১৯৮১ সালে ফিরে আসেন মুজিবহীন বাংলায়... কমপক্ষে ১৯ বার হত্যার অপচেষ্টা করা হয়েছে। ...শেখ হাসিনা সংকটকে সম্ভাবনায় রূপ দেন। ধ্বংসস্তূপের মাঝে থেকে ওড়ান সৃষ্টির পতাকা। তিনি মৃত্যুর মিছিলে দাঁড়িয়ে গেয়ে যান জীবনের জয়গান।’ (‘শেখ হাসিনার সংগ্রাম’ ওবায়দুল কাদের এমপি)।

আসাদুজ্জামান খান কামাল এমপির ‘অতুলনীয় শেখ হাসিনা’ নিবন্ধেও উঠে এসেছে কিশোর বয়স থেকে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার কথা। একদিকে ছাত্রলীগের নেত্রী হিসেবে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ, অন্যদিকে কারাগারে অন্তরীণ বাবার অনুপস্থিতে বঙ্গমাতা ফজিলাতুন নেছার কাছ থেকে রাজনৈতিক দীক্ষা গ্রহণ। ছোটবেলা থেকেই বঙ্গবন্ধুকে অনুসরণ করতেন এবং বঙ্গবন্ধুও তাকে বেশি কাছে টেনে নিতেন।

সম্ভবত সেজন্যই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণে তার মন উচাটন। সব হারিয়েও তিনি সব পাওয়ার আনন্দে উচ্ছ্বল: ‘আমি সর্বহারা। আমার কেউ নাই। আপনাদের মাঝেই আমার হারানো পিতামাতা, আমার ভাই, আত্মীয়স্বজন সবাইকে আমি খুঁজে পেতে চাই। আপনাদেরকে কথা দিলাম, এই দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য আমি জীবন উৎসর্গ করব।’ (‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’, তোফায়েল আহমেদ এমপি)।

‘১৯৮১ থেকে শুরু করে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু কন্যা বঙ্গরত্ন শেখ হাসিনা যেভাবে বিরামহীন সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন এবং যে গতিশীল নেতৃত্বের মাধ্যমে দেশকে সামরিক স্বৈরশাসনের নাগপাশ থেকে মুক্ত করেছেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে তার সে অবদান স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকবে’ (স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনে শেখ হাসিনার ভূমিকা ১৯৮১-১৯৯০), ড. আব্দুল খালেক)।

বিশিষ্ট সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন শেখ হাসিনার অনেক মানবিক গুণাবলির মধ্যে একটি উল্লেখ করেছেন এভাবে: “চোখে পানি এসে যায়, যখন মুক্তিযুদ্ধের সময়ের অসাধারণ গীতিকার গোবিন্দ হালদারের কাছে প্রধানমন্ত্রীর আর্থিক অনুদান পৌঁছে যায় কলকাতায় নিযুক্ত বাংলাদেশ হাইকমিশনারের মাধ্যমে। তিনি কিডনির অসুস্থতা নিয়ে কলকাতার একটা হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় গাওয়া হয়েছে তার গান ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে, রক্ত লাল রক্ত লাল’, এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা”, একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি—এমন কয়েকটি গান (অনির্বাণ শিখা জ্বলুক প্রাণে, সেলিনা হোসেন)।

হারুন হাবীব অতিসংক্ষেপে শেখ হাসিনার সাফল্যের সূত্র চিহ্নিত করেছেন: ‘... শেখ হাসিনার শাসনামলে মোড় ঘোরানো মৌলিক স্তরগুলোকে মূলত চার ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথমত, জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের হূতগৌরব পুনরুদ্ধার সংগ্রামে তার সাফল্য। দ্বিতীয়ত, সামরিক ও আধাসামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম-সফলতা। তৃতীয়ত, জাতির পিতার হত্যাকারী ও মুক্তিযুদ্ধের ঘাতক যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের আইনের হাতে সোপর্দ করা। এবং চতুর্থত, অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশকে প্রগতির সড়কে আনা’ ‘(বাংলাদেশের পুনরুত্থান ও শেখ হাসিনার সংগ্রাম’ হারুন হাবীব)।

‘তবু বলব, শেখ হাসিনাকে মূল্যায়নের সময় এখনো আসেনি। তার মূল্যায়ন করবে নিরবধিকাল ও ভবিষ্যৎ ইতিহাস, বাংলাদেশের রাজনীতি শেখ হাসিনাকে নতুন আশা ও তারুণ্যের প্রতীক হিসাবে দেখতে চায়। এরই মধ্যে তা প্রমাণিতও হয়েছে।’ ‘(শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন, নুহ উল-আলম লেনিন)

সুন্দর প্রচ্ছদ আর ছাপায় বইটা পাঠকের নজর কাড়তে সক্ষম হবে বলে আসা রাখি এবং এই উদ্যোগের জন্য ড. শামছুল আলমকে ধন্যবাদ।

পাদটীকা

২০০১ সালের পরের কথা, আওয়ামী লীগ তখন বিরোধী দলে।

বঙ্কিম চন্দ্রের ‘দেবী চৌধুরানী’ উপন্যাসে জমিদার মহেন্দ্র সিংকে যেমন রাতের আঁধারে জমিদারি ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল, আমিও তেমনি রাতের আঁধারে ভিসির চেয়ার ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলাম। অর্থাৎ জাবির ‘জমিদারি’ ছেড়ে আমি অনেকটাই পথে বসা।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কোনো এক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আমাদের টুঙ্গিপাড়া যাওয়া। মধ্যাহ্নভোজে নিজ হাতে ভাত, মাংস, তরিতরকারি আমাদের পাতে পরিবেশন করে খাওয়ালেন ২০০১ সালের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। খাওয়া-দাওয়া শেষে বললেন, আপনারা যাবার সময় গোপালগঞ্জের মিষ্টি নিয়ে যাবেন; এখানকার মিষ্টি খুব ভালো।

লক্ষ করলাম, আমি এক বর্গমাইলেরও কিছু কম জায়গার কর্তৃত্ব হারিয়ে যতটা শুইয়ে ও নুইয়ে পড়েছি, ৫৫ হাজার বর্গমাইলের তথা পুরো দেশের ক্ষমতা হারিয়ে শেখ হাসিনা ততটাই শক্তভাবে দাঁড়িয়ে আছেন।

শুনেছি, ফিনিক্স পাখী যতই আঘাতপ্রাপ্ত হয়, ততই তেজোদ্দীপ্ত হয়ে ফিরে আসে আপন ঠিকানায়। এবং তিনি ক্ষমতায় এসেছিলেন ২০০৯ সালে এবং এখনো সেখানেই আছেন।

‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির,

জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর

আপন প্রাঙ্গণতলে দিবসশর্বরী

বসুধারে রাখে নাই খণ্ড ক্ষুদ্র করি।’

 

আব্দুল বায়েস: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও অর্থনীতির অধ্যাপক; ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির খণ্ডকালীন শিক্ষক