সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে নারী শ্রমিকের লাশ দেশে আসছে। সংশ্লিষ্ট দেশ থেকে লাশের সঙ্গে মৃত্যুর সনদ দেয়া হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এ সনদে মৃত্যুর কারণ ‘স্বাভাবিক’ লেখা হচ্ছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ লেখা সনদের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। পরিবারের সদস্যসহ অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা এ ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ কতটা স্বাভাবিক, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। অভিবাসীদের নিয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান রামরুর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডেথ সার্টিফিকেটের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে মারা যাওয়া ৬৯ শতাংশ বাংলাদেশী নারী শ্রমিকের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু এ তথ্য বিশ্বাস করে না ৪৮ শতাংশ নিহতের পরিবার। স্বাভাবিক বা অস্বাভাবিক যে মৃত্যুই হোক সংশ্লিষ্ট দেশ প্রতিটি মৃত্যুর ময়নাতদন্ত করবে সে ধরনের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এক্ষেত্রে আন্তঃদেশীয় যোগাযোগ বৃদ্ধি ও বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোকে আরো সক্রিয় হতে হবে। কয়েক বছর ধরে শ্রমিকের মৃত্যু সনদে ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ লিখে পাঠানো হচ্ছে সংশ্লিষ্ট দেশ থেকে, এটা দুঃখজনক। শ্রমিকের সঙ্গে পরিবারের সদস্যরা মোবাইল ফোনে যাতে নিয়মিত যোগাযোগ করতে পারেন তাও নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সন্দেহ হলে দেশে আসার পর পুনঃময়নাতদন্ত করতে হবে। 

বলতে দ্বিধা নেই অনেক নারী শ্রমিক নিপীড়িত নির্যাতিত হয়ে কারো সহায়তা না পেয়ে নীরবে নিভৃতে দেশে ফিরে এসেছেন। তবে নারী নির্যাতনের চিত্রটা বেশি বোধ হয় সৌদি আরবেই। সৌদি আরবে বাংলাদেশী নারী নির্যাতনের চিত্র নতুন নয়। দৈহিক নির্যাতন, ধর্ষণ, পাশবিক নির্যাতন— এ রকম শত শত অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে যাওয়া বেশির ভাগ নারী শ্রমিকের কর্মস্থল হলো সৌদি আরব। কিন্তু সেখানে বাংলাদেশের মেয়েদের পূর্ণ নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত হয়নি। সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসসংলগ্ন সেফ হোমে নির্যাতিত নারী শ্রমিকের সংখ্যা কেবল বেড়েই চলেছে। প্রতিদিনই বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নির্যাতিত নারীরা সেফ হোমে এসে আশ্রয় নিচ্ছেন। এমন কথাও জানা গেছে, অনেক নারী সেফ হোমে এসে সন্তান প্রসব করেছেন। এ অপ্রিয় সত্যগুলো এখন মেনেও নিতে হচ্ছে। সৌদি আরব, জর্ডানসহ কয়েকটি দেশ থেকে নির্যাতনের কারণে অনেক নারী শ্রমিককে মৃত্যুর মুখ থেকে দেশে ফেরত আসতে বাধ্য হতে হয়েছে।

কোনো অভিবাসী শ্রমিক নির্যাতনের শিকার হলে তার সুবিচার অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। দুঃখজনক বিষয় হলো, বাংলাদেশের শ্রমিকরা অবিচারের শিকার হলেও সরকার সব সময় তার প্রতিকার নিশ্চিত করতে পারছে না। আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় না থাকার কারণে অভিবাসী কর্মীরা নির্যাতন ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। মামলা করলেও সুবিচার পাচ্ছেন না। অভিবাসীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে এ-সংক্রান্ত কাজ প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের হাতে নিতে হবে। অন্য মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। এক ছাদের নিচে আমরা যদি সব সেবা না দিতে পারি, তাহলে মন্ত্রণালয় ভালোভাবে কাজ করতে পারবে না। প্রবাসীকল্যাণে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় বিসিএসের মাধ্যমে নিয়োগের ব্যবস্থা করা উচিত। এজন্য বরাদ্দ বাড়াতে হবে। অভিবাসী কর্মীর সুবিচার প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে আলাদা জুডিশিয়াল ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বাংলাদেশের মানুষ যিনি যেখানেই থাকবেন; সংবিধানের আলোকে ন্যায়বিচার পাবেন। বিদেশী কোনো নাগরিক বাংলাদেশে থাকলে তিনিও সংবিধান অনুযায়ী ন্যায়বিচার পাবেন। অভিবাসী শ্রমিকের মৃত্যু সনদ তৈরিতে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার নির্ধারিত মানদণ্ড রয়েছে। বাংলাদেশের অভিবাসী শ্রমিকদের মৃত্যুর ক্ষেত্রে সে মান যেন সংশ্লিষ্ট দেশ অনুসরণ করে সেটি নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে জোর তৎপরতা চালাতে হবে। 

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে শ্রমিক যে দেশে মারা যাচ্ছেন, সে দেশের সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক মৃত্যুসনদ প্রদান করেন। সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস এ সনদ লাশের সঙ্গে দেশে পাঠায়। বিদেশে বা দেশে শ্রমিকের মৃত্যুর কারণ নিয়ে কোনো পুলিশি তদন্ত হয় না। এ কারণে শ্রমিকের মৃত্যুর কারণ সনদে যা লেখা থাকে, তা নিয়ে পরিবারের কোনো আপত্তি থাকলেও তাদের কিছু করার থাকে না। এটি কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা হতে পারে না। বিদেশে নারী শ্রমিকের মৃত্যু যে কারণেই হোক, সংশ্লিষ্ট দেশে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে প্রতিটি মৃত্যুর পুলিশি তদন্ত করতে হবে। সংশ্লিষ্ট দেশ অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিলে তা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরতে হবে। আর লাশ দেশে আসার পর পরিবার অভিযোগ করলে তারও তদন্ত করতে হবে। শুধু কারণ লিখে লাশের সঙ্গে চিকিৎসকের দেয়া মৃত্যুর সনদ পাঠিয়ে দায় শেষ করা যাবে না।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি নারী শ্রমিক গেছেন সৌদি আরবে। তারা মূলত গৃহ শ্রমিক হিসেবে গেছেন। এর বাইরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে নারীরা গেছেন। তারা পোশাক কারখানাসহ বিভিন্ন খাতে কাজ করছেন। নারী শ্রমিকদের লাশ সবচেয়ে বেশি সৌদি আরব থেকে এসেছে। শ্রমিকদের বিদেশ যাওয়ার আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক। তাদের বড় বা জটিল কোনো রোগ থাকলে স্বাস্থ্য পরীক্ষাতেই বাদ যাওয়ার কথা। তাই মৃত্যুর সনদে থাকা ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ নিয়ে সন্দেহ করছেন মারা যাওয়া শ্রমিকদের পরিবারের সদস্যরা। মারা যাওয়া অধিকাংশের বয়স ৪০ বছরের কম। 

প্রায় শূন্য অভিবাসন খরচে নারী শ্রমিকের বিদেশ গমন বেড়েছে। এমনও দেখা গেছে, গ্রামের যে মেয়ে আগে কখনো নিজ জেলা শহরে যায়নি সেও নামমাত্র খরচে কাজের সন্ধানে পাড়ি জমিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশে। কিন্তু আগের তুলনায় নারী কর্মী গমন বৃদ্ধি পেলেও তাদের বেতন বৃদ্ধি এবং সুরক্ষার বিষয়ে কার্যকর কৌশল ও পরিকল্পনা সেই অর্থে দৃশ্যমান হয়নি। একই সঙ্গে সৌদি আরব, জর্ডান, লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে নিয়োগকর্তা কর্তৃক নির্যাতিত নারী কর্মীদের অভিযোগ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা করতে না পারাটাও আমাদের অক্ষমতা। এক্ষেত্রে অবশ্যই সরকারের নতুন কৌশল বের করা প্রয়োজন।

নারী অভিবাসীদের নিয়ে এমনিতে খুব একটা আলোচনা হয় না, যতটা হয় পুরুষ কর্মীদের নিয়ে। সেই নিরিখে নারী অভিবাসন বিষয়টি একেবারে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে আলোচনার টেবিলে উঠে আসা আলাদা গুরুত্ব বহন করে। প্রত্যাশা থাকবে, লেবার অ্যাটাচেসহ বিভিন্ন দূতাবাসের কর্মকর্তারা নারী শ্রম অভিবাসীদের বিষয়ে আরো সংবেদনশীল হবেন। তাদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় সঠিক ভূমিকা পালন করবেন। নির্যাতিতা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াবেন এবং ক্ষতিপূরণ আদায়ে সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।