আপনার চেনাজানা আর্থিকভাবে বেশ সফল এমন পাঁচ ব্যক্তিকে বাছাই করুন। এবার বলুন, এরই মধ্যে তারা যে পরিমাণ সম্পদ অর্জন করেছেন, সেগুলো কি নিজের জীবদ্দশায় ভোগ করে যেতে পারবেন? উত্তর না হলে, ঠিক কত শতাংশ ভোগ করবেন বলে আপনার মনে হয়?

এটা নির্ভর করছে নানা বিষয়ের ওপর। তবে প্যারেটোর তত্ত্ব মোতাবেক তা মোট অর্জিত সম্পদের ২০ শতাংশের কাছাকাছি! তাহলে তারা কেন অতিরিক্ত ৭০-৮০ শতাংশ সম্পদ অর্জনের জন্য সারা জীবন ছুটতে থাকেন? নিজের জীবদ্দশায় যা ভোগ (বা ব্যয়) করা যাবে না, তা অর্জনের এত দায় পড়ল কেন? কে তাদের এ মহান দায়িত্ব দিয়েছে?

হয়তো বলবেন, তাতে সমস্যা কী? সন্তানরা ভোগ করবে। খুব ভালো কথা। তাহলে সন্তানরা নিজেদের চেষ্টায় যে ধন-সম্পদ অর্জন করবে, সেগুলো ভোগ করবে কারা? নাকি তারা এমন উপসংহারে পৌঁছে গেছেন যে, তাদের পরবর্তী বংশধররা চরম অপদার্থ ও অকর্মণ্য হবে। তাই সৃষ্টিকর্তা তাদের ওপর দায়িত্ব দিয়েছেন (এমন পরিমাণ অর্থ উপার্জন করে রেখে যাওয়ার) যেন উত্তরাধিকাররা আমৃত্যু সেগুলো বসে বসে খেতে পারে!

বলতে পারেন, তাই বলে সন্তানদের ‘ভবিষ্যৎ’ নিয়ে ভাবতে হবে না? অবশ্যই ভাবতে হবে। তবে আপনার পরিচিত যেসব ব্যক্তি বিপুল পরিমাণ সম্পদ রেখে মারা গেছেন, তাদের সন্তানরা সত্যিই কি ভালো আছে? তাদের জীবনযাপন ও কর্মপদ্ধতি কি প্রয়াত বাপ-দাদার মর্যাদা বৃদ্ধি করছে?

তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, সম্পদ অর্জনকারী সেই ব্যক্তির মতো তাদের সন্তানরা কি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় দক্ষতা দেখাতে পেরেছে? দুয়েকজন ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশের সন্তানরা সেটা পারেনি। আমাদের দেশে ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে তাকালে সহজেই তার প্রমাণ মেলে। অধিকাংশ উদ্যোক্তা সারা জীবন কষ্ট করে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানকে যে অবস্থায় রেখে মারা গেছেন, সন্তানরা তাতে লালবাতি জ্বালিয়েছেন। অনেকে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে ফেরারি জীবনযাপন করছেন!

কেন এমনটা হয়? এমনটা হওয়ার পেছনে অসংখ্য কারণ থাকে। তবে প্রধান কারণ হলো, উদ্যোগ গ্রহণকারী ব্যক্তি ক্রমান্বয়ে সম্পদ অর্জন ও সেগুলোর ব্যবস্থাপনা শিখেছিলেন। ধাক্কা খেয়ে খেয়ে জীবন সম্পর্কে নানা বোধ ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। কিন্তু সন্তানরা সেই ‘সুযোগ’ পায়নি। তিনি হয়তো পায়ে হেঁটে, সাইকেল চালিয়ে, পাবলিক বাসে চড়ে জীবনের নানা স্তর অতিক্রম করেছেন। কিন্তু সন্তানদের জীবন শুরুই হয়েছে কালো কাচঘেরা গাড়িতে চড়ার মাধ্যমে। ফলে অদৃশ্য এক দেয়াল তাদের কখনো বাস্তবতার কাছাকাছি ঘেঁষতে দেয়নি।

হয়তো সে কারণেই বিনা পরিশ্রমে পাওয়া বিপুল পরিমাণ সম্পদ বা প্রতিষ্ঠিত ব্যবসাকে তারা যেনতেন ভাবে হ্যান্ডল করতে চেয়েছেন। অবাস্তব ও অসম্ভব নানা প্রকল্পে বিপুল পরিমাণ পয়সা ঢেলেছেন। দিন শেষে তাদের অনেকেই ঋণগ্রস্ত হয়ে দেশ ছেড়েছেন। কেউ কেউ ‘দেউলিয়া’ হওয়ার পথে। তাই সন্তানদের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ রেখে যাওয়া মোটেই নিশ্চয়তা দেয় না যে, সেগুলো নিয়ে তারা ভালো থাকবে।

অথচ তাদের জন্য সম্পদ অর্জন করতে গিয়ে আমরা ন্যায়-অন্যায়ের তোয়াক্কা করি না। অমুককে ধরো, তমুককে মারো, খাবারে বিষাক্ত সব পদার্থ মেশাও, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়াও, লাখ টাকা ঘুষ দাও... এমন অসংখ্য অন্যায় ও অন্যায্য কাজ প্রতিনিয়ত করে চলেছি। ভুলে যাওয়া ঠিক হবে না যে, শুধু সম্রাট শাহজাহান নয়; আমাদের জীবদ্দশাতেও তেমন করুণ পরিণতি ঘটতে পারে। সন্তানরা বড় হয়ে ‘অতি চালাক’ হলে আপনার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা মুহূর্তেই ছিনতাই হয়ে যেতে পারে। বদ্ধ এক ঘরের কোণে ধুঁকে ধুঁকে মরতে হতে পারে। কারণ তখন তাদের গায়ে শক্তি ও সিস্টেমকে প্রভাবিত করার সামর্থ্য অর্জিত হবে।

যারা সন্তানদের ‘ভালো থাকা’র চিন্তায় দিন-রাত একাকার করে, খেয়ে না খেয়ে সম্পদের পাহাড় গড়ছেন, একদিন সেজন্য আফসোস করতে হতে পারে। জীবনের সুন্দর সময়গুলোতে নিজেকে একটু বিশ্রাম দেননি। পর্যাপ্ত ঘুমাতে পারেননি। একাধিক আয়ের উৎস নিয়ে সর্বদা ব্যস্ত থেকেছেন। শুধু তাদের কল্যাণ চিন্তায় নিজের জীবনকে বারবার ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছেন। অথচ ভবিষ্যতে তাদের দয়ায় আপনার দিন কাটাতে হতে পারে। ভাগ্য খারাপ হলে লাঠিপেটাও জুটতে পারে। গণমাধ্যমের এমন খবরগুলো দেখে ভাবেন, আমার ক্ষেত্রে এমনটা হবে না, তাই তো? সুসময়ে সবাই তেমনটা ভাবে।

বিদ্যমান সিস্টেমে একটা শ্রেণীর হাতে বিপুল পরিমাণ সম্পদ জমেছে। অনেকটা শরীরে মেদ জমার মতো। আপাতদৃষ্টিতে মেদওয়ালা ব্যক্তিকে স্বাস্থ্যবান মনে হলেও শুধু তিনিই জানেন শরীরে কত ধরনের সমস্যা বয়ে বেড়াচ্ছেন। ঠিক তেমনিভাবে বিপুল সম্পদের অধিকারী ব্যক্তিদের বাইরে থেকে মনে হয় তারা কতই না সুখে আছেন! বাস্তবতা সেটা নয়। একান্ত আলাপে সহজেই সেটা বোঝা যায়। তাই আপনার সীমিত সামর্থ্যে, বৈধভাবে যা আয় হচ্ছে, তাতেই সন্তুষ্ট থাকুন। এ লেখাটা আপনি পড়তে পারছেন। তার মানে দুনিয়ার ৭৫ শতাংশ মানুষ আপনার চেয়ে খারাপ মানের জীবনযাপন করছে। তার পরও আপনি হতাশ হবেন কেন?

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, অর্থ গোবরের মতো। এক জায়গায় জমা থাকলে তা দুর্গন্ধ ছড়ায় এবং স্বাস্থ্যের জন্য হানিকর। কিন্তু তা ছড়িয়ে দিলে জৈবসারের কাজ করে। তা থেকে নতুন ফল-ফসল জন্মায়। অথচ আমরা হাঁটছি তার উল্টো পথে। আধুনিক সিস্টেম অতি সফলভাবে অকল্পনীয় এক ‘ভয়’-এর সংস্কৃতি চালু করেছে। প্রতি মুহূর্তে আমরা ভাবি—এটা হলে কী হবে, সেটা হলে কী করব? তাই সেফগার্ড হিসেবে টাকার পাহাড় জমাতে ক্রেজি হয়ে উঠছি। কিন্তু সেই সম্পদ সত্যিই কি আমাদের রক্ষা করতে পারে?

কত সম্পদশালী, খ্যাতিমান শিল্পপতি নীরবে, নিভৃতে একাকী বিদায় নিল—কে তার খবর রাখে? করোনা মহামারী দেখিয়েছে সম্পদশালী পরিবারের সদস্যরা নিজের জীবনকে ঝুঁকিমুক্ত রাখতে ঠিক কতটা স্বার্থপর হতে পারে। অন্যদিকে গরিব-অসহায় পরিবারের সদস্যরা অসুস্থ মানুষটিকে কখনো একা হতে দেয়নি। করোনা রোগীর সঙ্গে একই বিছানায় ঘুমিয়েছে, পরম মমতায় মুখে খাবার তুলে দিয়েছে! তাই অর্থ থাকলেই আপনার জীবনের শেষ দিনগুলো বা দুঃসময়ে আপনি ভালো থাকবেন তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাহলে ঠিক কাদের জন্য ন্যায়-অন্যায় বিবেচনা বোধকে অগ্রাহ্য করে এমন অর্থ-বিত্ত অর্জনে মরিয়া হওয়া? এতে ইহকাল বা পরকাল কোনোটাই কি সুরক্ষিত থাকে?

মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, তাহলে কি ধন-সম্পদ অর্জন করা উচিত নয়? অবশ্যই করা দরকার। তবে তা শুধু কুক্ষিগত করার জন্য নয়। নিজের বউ-বাচ্চা নিয়ে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার জন্য নয়। জীবনের শেষ দিনগুলো কারাগারে কাটানোর জন্য নয়। অচেনা শুটারের গুলিতে বুকটা ঝাঁঝরা হওয়ার জন্য নয়। বরং কঠোর পরিশ্রম করা উচিত সৃষ্টিকর্তা আমাদের যে অসীম সম্ভাবনা দিয়ে এ পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন তার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিতের জন্য।

আপনার শিক্ষা-দক্ষতা-অভিজ্ঞতা দিয়ে বৈধভাবে, নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের মাধ্যমে যা অর্জন করা সম্ভব অবশ্যই সেগুলো করবেন। তবে মনোযোগ যেন শুধু তা কুক্ষিগত করার দিকে না থাকে—সেটাই এ নিবন্ধের মূল কথা। আমরা শুধু পাওয়ার আনন্দ উপভোগ করতে চাই। কিন্তু আপনার চেয়ে খারাপ অবস্থায় থাকা একজন মানুষকে কিছু দেয়ার মধ্যে যে চরম তৃপ্তি রয়েছে সে ব্যাপারে আমরা চরমভাবে উদাসীন। সেদিকে নজর দেয়া দরকার। এখন রমজান মাস। জাকাত দেয়া, দান-সদকা করার মাধ্যমে আমরা ত্যাগের প্রকৃত সুখ লাভ করতে পারি। আপনার সামান্য মনোযোগে একটি পরিবারও যদি ভালো থাকে, তৃপ্তিসহকারে ঈদ উদযাপন করতে পারে, সেটাই বা কম কী?

পাশাপাশি নিজেদের অর্জিত সম্পদ জীবদ্দশায় ভোগ করার ব্যাপারে আরো বেশি বাস্তববাদী হওয়া দরকার। আপনি যেমন এ পৃথিবীতে বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে এসেছেন, তার বিকাশ ঘটিয়ে সম্পদ অর্জন করেছেন। আপনার সন্তানরাও তেমন সম্ভাবনাময়। প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন ব্যতিরেকে তার জন্য বিপুল পরিমাণ সম্পদ রেখে যাওয়া বরং সেই প্রতিভা বিকাশের অন্তরায়। তাই তাদের সুশিক্ষা ও দক্ষ মানুষরূপে গড়ে তুলতে সচেষ্ট হওয়া অনেক বেশি জরুরি। এ ব্যাপারে হযরত আলীকে (রা.) একবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, জ্ঞান ও সম্পদের মধ্যে পার্থক্য কী? জবাবে তিনি অনেকগুলো পয়েন্ট বলেছিলেন। তার মধ্যে একটি ছিল—জ্ঞান দিয়ে সম্পদ রক্ষা করা যায়। কিন্তু সম্পদ দিয়ে জ্ঞান অর্জন করা যায় না।

আমাদের দেশে অনেকেই ভোর থেকে মাঝরাত পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করেন। তাদের সাপ্তাহিক ছুটিও থাকে না। এভাবে সারাটা জীবন তারা পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। তাহলে তারা অর্জিত সম্পদ ভোগ করবেন কবে? এমনকি তাদের রিটায়ারমেন্টের সুযোগও নেই। তাহলে কার জন্য এসব অর্জন? তাই সম্পদ অর্জনের পাশাপাশি ভোগ করতে হবে।

এ ‘ভোগ’ মানে শুধু খাওয়া-পরা নয়। বরং আপনার যে খাতে অর্থ ব্যয় করলে মনে শান্তি লাভ হয় তেমন খাতে অর্থ ব্যয় করা। কারণ যতক্ষণ আপনি সুস্থ-সবল আছেন, সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা আপনার হাতে। অসুস্থ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আপনার সব ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে অন্যরা। আর মারা গেলে তো কথাই নেই।

তাই গায়ের বল ও মনের জোর থাকা অবস্থায় মানুষের কল্যাণে অর্থ ব্যয় করুন। প্রতিবেশী ও চেনাজানা গরিব-দুঃখীদের সাহায্য করুন, চিকিৎসা বাবদ অর্থকষ্টে থাকা ব্যক্তিকে সাপোর্ট দিন। গরিব কিন্তু মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দিন। সামাজিক কল্যাণমূলক নানা কাজে সময়-শ্রম-অর্থ ব্যয় করুন। বছরে অন্তত এক দুবার নিজেই নিজেকে ছুটি দিন। হয়তো ভাবছেন, আপনি না থাকলে সবকিছু অচল হয়ে যাবে! ওরা কিচ্ছু ঠিকঠাক করতে পারবে না।

আপনার ধারণা মোটেই ঠিক নয়। নিশ্চিত থাকুন, আপনি মারা যাওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে সবকিছু আগের মতো চলতে থাকবে। তাই নিজেকে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভাবা বাদ দিন। পৃথিবীর জন্য কেউ অনিবার্য নয়। বরং আপনি চমত্কার এই সিস্টেমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পেরেছেন, সেজন্য সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞ হোন। দেশ-বিদেশের দর্শনীয় স্থান, উপাসনালয়গুলো ঘুরে দেখুন। জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রসারিত করুন। শুধু আয়ের ক্ষেত্রে নয় বরং বিদ্যমান সম্পদ ব্যয়ের ব্যাপারেও পরিকল্পিত হোন।

হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পূর্বাপর ঘটনাগুলো থেকে আমি নিজে একটা শিক্ষা নিয়েছি। সেটা হলো—মারা যাওয়ার সময় আমরা এক কোটি বা হাজার কোটি টাকার সম্পদ রেখে যাই, তা আমাদের মৃত্যুকে মোটেই প্রভাবিত করে না। বরং বিপুল পরিমাণ অর্থসম্পদ থাকায় মৃত্যু বড় ‘একা ও নিঃসঙ্গ’ পরিবেশে হতে পারে। প্রিয়জনদের অনেকে কাছে ভেড়ার সুযোগটুকু নাও পেতে পারে! অথচ জীবদ্দশায় সেই অতিরিক্ত ৯৯৯ কোটি টাকা অর্জনের জন্য আমরা নিজের দিকে তাকানোর সময় পাই না। সেটা হওয়া উচিত নয়। তাই সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা হাতছাড়া হওয়ার আগেই ভোগের পরিকল্পনাও করা দরকার...

 

ড. মো. আব্দুল হামিদ: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক ও ‘সুখের অসুখ’ বইয়ের লেখক