আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে উঠলে সরকার নির্বাহী আদেশে দেশে সরবরাহকৃত সব জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়। উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান কমানো ও ভর্তুকি বন্ধ করা। সে সময়ে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৩৭ ডলার পর্যন্ত উঠে যায়, বর্তমানে যা ৮০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে। ফলে জ্বালানি তেল বাবদ বিপিসির ব্যয়ও কমেছে, যদিও চাহিদা কমেনি। বিপিসি এখন উচ্চমুনাফা করছে। কিন্তু বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমার কোনো সুবিধা দেশের সাধারণ ভোক্তারা উপভোগ করতে পারছে না। কারণ সরকার জ্বালানি তেলের দাম কমায়নি। তেলের বাজার অস্থিতিশীল হলে দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়তে পারে। এ কারণেই জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনের ক্ষেত্রে বিপিসিকে শুধু মুনাফার কথা চিন্তা করলে হবে না; তাকে সর্বোচ্চ জনকল্যাণের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। এ মুহূর্তে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে অভ্যন্তরীণ বাজারেও তেলের দাম কমানো যেতে পারে। জ্বালানি তেলের সহজলভ্যতা ছাড়া কোনো উন্নয়ন কার্যক্রমই সফল হবে না।
প্রায় ছয় বছর ধরে সরকার আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কম দামে জ্বালানি কিনে জনগণের কাছে বেশি দামে বিক্রি করেছে। বিপুল পরিমাণ অর্থ সরকার লাভ করেছে। অন্যদিকে গেল বছর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কিছুটা বাড়তেই সরকার লিটারপ্রতি ৩৫ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছে। সে সময়ে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমলে স্থানীয় বাজারেও দাম কমানো হবে। অর্থমন্ত্রী, পরিকল্পনামন্ত্রীসহ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রীরা বলেছিলেন, বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে স্থিতিশীল হলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। বর্তমানে জ্বালানি তেলের দাম কম এবং সেটি স্থিতিশীলও বটে। বিশ্ব অর্থনীতি শ্লথ হয়ে পড়ায় আগামীতে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম আরো কমার সম্ভাবনার কথা বলছে গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো। বিপিসি যেখানে মুনাফা করছে সেখানে স্থানীয় বাজারে দাম না কমানোর কোনো যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে না। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মাসিক ভিত্তিতে দাম সমন্বয় করা হোক।
জ্বালানি তেল হলো একটি কৌশলগত আবশ্যিক পণ্য। জ্বালানি তেল ব্যতীত এখনো কোনো উন্নয়নকাজ সমাধার কথা চিন্তা করা যায় না। বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে দেশের বাজারে জ্বালানির দাম নির্ধারণে নতুন কোনো ফর্মুলার প্রয়োজনও নেই, শুধু সদিচ্ছা প্রয়োজন। আমদানি করা জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণে বিশ্বে প্রধানত তিনটি পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। অধিকাংশ দেশ মার্কেট ডিটারমাইন্ড বা বাজারদরের সঙ্গে সমন্বয় পদ্ধতি অনুসরণ করে। আবার কোনো কোনো দেশ সর্বোচ্চ দর বা প্রাইস সিলিং পদ্ধতি অনুসরণ করে। বাংলাদেশের মতো কিছু দেশ ফিক্সড প্রাইস বা নির্ধারিত দরে জ্বালানি তেল বিক্রি করে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে বহুদিন ধরেই ডায়নামিক ডেইলি প্রাইসিং মেথড অবলম্বন করা হচ্ছে। সেখানে প্রতিদিন ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বিবেচনায় দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হয়। বিশ্বের যেসব জায়গা থেকে তেল আমদানি করা হয়, তার সঙ্গে সরকারি কর ও মুনাফা যোগ করে প্রতিদিন তেলের দাম নির্ধারণ করে দেয়া হয় ভারতে। প্রতিদিন সরকারের জ্বালানি মন্ত্রণালয় ঠিক করে দেয়, কত দামে ডিজেল-পেট্রল বিক্রি হবে। অনেক কিছু বিকেন্দ্রীকরণ করা হলেও এখানে ভারত সরকারের কড়া নিয়ন্ত্রণ আছে। আবার যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ঘণ্টায় তেলের দাম নির্ধারণ করা হয়। যুক্তরাজ্যে প্রতিদিনই জ্বালানি তেলের দাম ওঠানামা করে। কিন্তু সেখানে সরকারি কোনো সংস্থা সেটা নির্ধারণ করে না। ক্রুড অয়েলের দাম, সরকারি কর, ভ্যাট ইত্যাদির সঙ্গে নিজেদের মুনাফা মিলিয়ে পাম্প মালিকরাই প্রতিদিন সেটা ঠিক করেন। ফলে একই দিন একেক এলাকায় তেলের দাম একেক রকমও হতে পারে। ভারতেও এলাকাভেদে তেলের দাম ভিন্ন হয়, কিন্তু বাংলাদেশের সব জায়গায় একই দামে তেল বিক্রি হয়। দাম নির্ধারণেও বাংলাদেশে কোনো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নেই। বাংলাদেশ এনার্জি কমিশনকে এড়িয়ে সরকার নির্বাহী আদেশে জ্বালানির দাম নির্ধারণ করে। এতে বিপিসি অতিমুনাফা ও চুরি-দুর্নীতি করলেও তা রোধে কোনো ব্যবস্থাই নেয়া হয় না। এর দায় গিয়ে বর্তাচ্ছে জনগণের ওপর।
বাংলাদেশে তেলের দামের সঙ্গে অনেক কিছুর সম্পর্ক আছে। ধানের প্রধান উৎপাদন মৌসুম বোরো চাষ শুরু হবে সামনে। বোরো চাষ শতভাগ সেচনির্ভর, যাতে ডিজেলের ব্যবহার হয়। তেলের দামের সঙ্গে মূল্যস্ফীতির বিরাট সম্পর্ক আছে। এরই মধ্যে নিত্যপণ্যের দাম আকাশ ছুঁয়েছে। মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত ও খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ ভয়াবহ চাপে আছে। এ অবস্থায় সরকার যদি গতবারের মতো দাম বাড়িয়ে আর না কমায় তাহলে মানুষের দুর্ভোগ আরো বাড়বে। আমরা আশা করব, সব দিক বিবেচনা করে সরকার এবার তেলের দাম কমাবে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় কৃষি, শিল্পসহ পরিবহন খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতির হারও বেড়েছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দামও বেশি। এ মুহূর্তে উদ্যোক্তাদের কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে জ্বালানি তেলের মূল্য হ্রাস। এক্ষেত্রে অনেকে বলে থাকেন, জ্বালানির দাম কমালেও জনগণ তার সুফল পাবে না। কারণ ব্যবসায়ীরা দাম কমাবেন না। এটি কোনো যৌক্তিক কারণ হতে পারে না। জ্বালানি তেলের দাম কমানোর সুফল ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব সরকারের। জ্বালানির দাম বাড়ানোর সময় সরকার এক সপ্তাহের মধ্যে পরিবহনের মূল্য নির্ধারণ করে দিতে পারলে কমানোর সুফল কেন নিশ্চিত করতে পারবে না, তা বোধগম্য নয়। সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছাই এক্ষেত্রে যথেষ্ট।
সরকার একক আমদানিকারক হিসেবে জ্বালানির মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি পণ্য নিয়ে উচ্চমুনাফাভিত্তিক ব্যবসা পরিচালনা করছে। কোনো বেসরকারি কোম্পানি এটি করলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সরকার তাকে জেল-জরিমানার আওতায় নিয়ে আসত। বিপিসির বেলায় কোনো পদক্ষেপ কেন নেয়া হবে না, তা একটি প্রশ্ন বটে। বাংলাদেশে বিপিসি জ্বালানি পণ্যের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। তারা ব্যবসা করে বিধায় রেগুলেটরের আওতায় জ্বালানির দাম নির্ধারণ করা উচিত। সরকার যদি ভর্তুকি উঠিয়ে দিতে চায়, তবে একটা সহফর্মুলার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক দামের সঙ্গে দেশীয় দামের সমন্বয় করা হোক। তা না হলে একটা গড় মূল্য স্থিতি অবস্থায় রেখে কম মূল্যের সময় মুনাফাটা বেশি মূল্যের সময় ভর্তুকি দিয়ে দাম ঠিক রাখতে পারে।










