অর্থনীতির সব খাত করোনার ক্ষতি থেকে সমানভাবে পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করতে পারছে না। বড় ও মাঝারি খাত এগিয়ে থাকলেও মাইক্রো ও ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলো অনেকটাই পিছিয়ে। এ হিসাবে বর্তমান পুনরুদ্ধারের গতি কে-আকৃতির এবং মাইক্রো ও ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থার অবনতি হচ্ছে বলে গবেষণা সংস্থা সিপিডির এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সংস্থাটি বলছে, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় এক ধরনের অসমতা পরিলক্ষিত হচ্ছে, যাতে দেখা যাচ্ছে বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পুনরুদ্ধারের কাজ দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে চললেও মাঝারি এবং ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া অনেকটাই স্থবির। জানুয়ারি পর্যন্ত কৃষি খাতের প্রণোদনার অর্ধেকও বিতরণ হয়নি। ব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকায় ছোট খাতের উদ্যোক্তারা প্রণোদনা পাচ্ছেন না। বিতরণ করা প্রণোদনার টাকা কারা পাচ্ছেন, এ প্রণোদনার কতটুকু ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের হাতে যাচ্ছে, আর কতটুকু অনাদায়ী থাকার আশঙ্কা রয়েছে—এসব বিষয়ে সার্বিক পর্যালোচনা প্রয়োজন। পাশাপাশি যারা প্রণোদনা পাননি, তাদের জন্য উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।
অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে সরকারগুলোকে কতগুলো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে, তার মধ্যে অন্যতম হলো বড় আকারের সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং সরকারের নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, গত অর্থবছরের চেয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সরকারি ব্যয় কম। অর্থনীতির গতি বাড়াতে সরকারি প্রণোদনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও সেটির সর্বোচ্চ উপযোগ নিশ্চিত করা যায়নি। এর সুবিধা বড় শিল্প পেলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প পায়নি। এসএমই শিল্পের গতিশীলতা ফিরে আসেনি, প্রণোদনার সুবিধাও সেভাবে পায়নি তারা। সন্দেহ নেই, প্রণোদনা কর্মসূচির পরবর্তী ধাপে সেগুলো পুনঃপর্যালোচনা ও কাঠামোগত পুনর্গঠনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। সরকার এক্ষেত্রে দ্বিতীয় দফায় প্রণোদনা প্রদানের কথা ভাবছে। শুধু সময় বাড়িয়ে একই প্রণোদনা কর্মসূচির পুনঃঘোষণা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক হবে না। নতুন কর্মসূচিতে ক্ষুদ্র ও ছোট শিল্প খাত, কৃষি, তরুণ ও নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য উদ্ভাবনীমূলক উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে আগামী বাজেটে কর অব্যাহতি ও ভর্তুকি ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে পরিকল্পিত নীতি অনুসরণ এবং নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী উপাত্তের মাধ্যমে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার চিত্র সতর্কতার সঙ্গে তদারক করতে হবে। ওভেন খাতে রফতানি, মূলধন যন্ত্রপাতি আমদানি, সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ, নিট বৈদেশিক বিনিয়োগ, রাজস্ব আহরণ ইত্যাদি খাতে নেতিবাচক প্রবণতা বিদ্যমান।
বর্তমানে চীনে বড় আকারের ‘নতুন অবকাঠামো নির্মাণ’ পরিকল্পনা চালু করেছে। চীন সরকার আবারো ৫জি নেটওয়ার্ক, সূচক কেন্দ্রসহ বিভিন্ন নতুন ধরনের অবকাঠামো নির্মাণে গুরুত্ব দিচ্ছে এবং সরবরাহ চেইন পুনর্গঠনের জন্য নীতিগত সমর্থন দিয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে বিশ্বের শিল্প চেইনে শক্তি জুগিয়েছে এবং চীনের বাজারকে আরো আকর্ষণীয় করেছে। শুধু চীন নয়, সরকারি ব্যয় ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রায় সব দেশ। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র জনগণের অ্যাকাউন্টে নগদ অর্থই প্রদান করেছে। উদ্দেশ্য ভোগ চাঙ্গা রাখা। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে বিশ্বের সব দেশই সরকারি ব্যয়কেই প্রাধান্য দিচ্ছে। কারণ বেসরকারি খাত লোকসান দেখলে গুটিয়ে রাখে কার্যক্রম। এতে মানুষের আয় কমে যায়। সেক্ষেত্রে মানুষের হাতে অর্থ পৌঁছাতে হলে সরকারের ব্যয় বাড়াতে হবে। সরকারের ব্যয় ও মুদ্রা সরবরাহ বাড়লে পণ্য ও সেবার চাহিদাও বাড়বে। আবার সরকার ব্যয় না করলে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ উৎসাহিত হবে না। অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়বে না। কর্মসংস্থানও চাঙ্গা হবে না। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে মানুষের ভোগব্যয় বাড়ানোর ক্ষমতা যাতে তৈরি হয়, সে ব্যবস্থা করতে হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বাড়ানো ও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন এখন জরুরি।
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো, অর্থনীতিতে সম্পদ এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক সুফল ও সুযোগ-সুবিধার বণ্টনমূলক ব্যবস্থা নেয়া। কর্মসংস্থানমুখী সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি কাঠামোর ওপর গুরুত্ব দেয়া। পাশাপাশি অর্থনীতির কাঠামোগত সংস্কারের জন্য নীতিমালা গ্রহণ। সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধা গুটিকয়েক গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত না হয়ে সব নাগরিকের কাছে পৌঁছানোটা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের গতিপথ ক্রমে চরম বৈষম্যমূলক পথে যাবে। সম্পদ উচ্চবিত্ত কিছু গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হবে এবং বিপরীতক্রমে দারিদ্র্য বাড়তে থাকবে। এরই মধ্যে শিল্প, সেবা, কৃষি অর্থনীতির প্রকৃত তিনটি খাতেই আয় কমেছে। অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত ব্যক্তিরাই করোনার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। তবে আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক উভয় খাতের শ্রমিকেরই আয় কমেছে। কারণ অনানুষ্ঠানিক খাতের মতো অনেক আনুষ্ঠানিক খাতেও শ্রমিকের অধিকার রক্ষিত হচ্ছে না। ফলে কোনো রকম সুবিধা ছাড়াই করোনার প্রথম ধাক্কায় অনেকে চাকরি হারিয়েছেন।
সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজগুলো মূলত বড় বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা আনুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত ব্যক্তিদের মধ্যেই বণ্টন করা হয়েছে। অন্যদিকে অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র কুটির ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান উল্লেখযোগ্য সুযোগ পায়নি। এ খাতগুলো মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির ৪০ শতাংশ। দরিদ্র, ঝুঁকিপ্রবণ ও সমাজের পিছিয়ে পড়া বিশাল জনগোষ্ঠী ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না। এ অবস্থা বলবৎ থাকলে দারিদ্র্যের হার বাড়ার মাধ্যমে সমাজে বৈষম্য ও মেরুকরণ বাড়বে এবং অল্প কিছু মানুষের হাতে সম্পদ ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ঘটবে। শ্রেণীভেদে সামাজিক পার্থক্য ত্বরান্বিত হবে। সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে সাধারণ জনগণের ভোগকে চাঙ্গা রাখতে হবে। আর ভোগ চাহিদা চাঙ্গা হলে বেসরকারি উৎপাদনও বাড়বে। এটি একটি চক্রাকার আবর্তন।
সরকারের উচিত ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের একটি ‘পুনরুদ্ধার ফান্ড’ গঠন করা, কেননা তারা আমাদের দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখে। একই সঙ্গে উদ্যোক্তাদের উচিত ছোট ছাতার অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে তাদের পরিসরকে আরো বৃহত্ভাবে সাজানো, ডিজিটাল সুযোগগুলো কাজে লাগানো এবং তাদের যোগ্যতাকে আরো উন্নত করা। করোনায় ব্যাপকসংখ্যক মানুষ চাকরি হারিয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের অনেক উদ্যোক্তার ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে তারা চলতে পারছেন না। ফলে নতুন বছরের প্রথম কাজ হবে ছোট ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসন এবং চাকরিচ্যুত কর্মী পর্যায়ের লোকজনের কাজের ব্যবস্থা করা। দ্বিতীয়ত, ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ লাখ প্রবাসী বিদেশ থেকে ফেরত এসেছেন। তারা বিদেশে ফিরতে পারছেন না। দেশেও তাদের কাজের ব্যবস্থা নেই। এক্ষেত্রে আগামী বছরে অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদার করে তাদের কাজের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। এজন্য আমাদের ফরেন সার্ভিসকে ঢেলে সাজাতে হবে। পাশাপাশি কর্মীদেরও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা বাড়াতে হবে।










