বৃহস্পতিবার (৮ সেপ্টেম্বর, ২০২২) রাতেই ড. আকবর আলি খান অন্তিম যাত্রার যাত্রী হয়েছেন। তার কয়েক ঘণ্টা পর ব্রিটেন তথা ২১টি কমনওয়েলথ দেশের মহামান্য রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। দুজনের সঙ্গে জীবনে আমার দেখা হয়েছে। রানীর ওপর একটি লেখা ছিল, সেটা ছিল তার সঙ্গে দ্বিতীয়বার সাক্ষাতের একটি স্মৃতিময় লেখা। ২০১৩ সালে কমনওয়েলথ সম্মেলন উপলক্ষে তার সঙ্গে বাকিংহাম প্যালেসে সাক্ষাৎ হয়েছিল।

শুক্রবার সকালটা বড্ড ব্যস্ত ছিলাম। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকৌশল বিভাগের এক মহাআয়োজন ছিল বলা যায়। প্রধান অতিথি ছিলেন ডুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হাবিবুর রহমান, একজন কীর্তিমান মানুষ। প্রথিতযশা বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম, যিনি পদ্মা সেতু ভাবনার স্তর থেকে প্রকল্প পরিচালক নিয়োজিত হয়ে এখনো স্বপদে বহাল আছেন। সে অনুষ্ঠানে আমার বক্তব্য আমি মহান জাতির মহান স্থপতি, জাতির পিতা ও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিবসহ ১৫ আগস্টের আত্মাহুতিদাতাদের রুহের মাগফেরাত কামনা করলাম। একই সঙ্গে ব্রিটেনের রানী ও স্বদেশে ড. আকবর আলি খানের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করলাম। অনুষ্ঠান শেষে মনে হলো, আকবর আলি খান সম্পর্কে অন্তত আরো দু-চারটি কথা বলা সংগত।

ড. খান ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৪ সালে। সে সময় কেন তার পরও যারা জন্ম নিয়েছেন তারা বৃহত্তর কুমিল্লার অস্তিত্বকে মেনে চলেছেন জীবনভর। সে হিসেবে এক ধরনের নৈকট্য ছিল। আর একটি কারণ ছিল, ড. খান ছিলেন আমার চাচাত ভাই জহিরুল হক চৌধুরীর সহপাঠী। এ কথা বহুদিন আগে শুনলেও আমি বিশ্বাস করিনি; কেননা জহির ভাই মাত্র ডেপুটি সেক্রেটারি পদে থাকাবস্থায় চাকরিচ্যুত হয়েছিলেন—অপরাধ ছিল দুটি, তিনি মার্শাল ল’য়ের পর পুনর্গঠিত বৃহত্তর কুমিল্লা জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ও মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। একদিন দুজনের টেলিফোন আলাপ কাছ থেকে শুনলাম, জহির ভাই তার সহপাঠী আকবর আলিকে তুই তুই বলে সম্মোধন করছেন। আমি শুনলাম তারা প্রাইমারি স্কুল থেকেই সহপাঠী। সেটাই আকবর আলির সঙ্গে আমার প্রথম পরোক্ষ পরিচয়। সরাসরি আলাপ হলো বহু পরে, তাও কয়েক মিনিটের জন্য। সে স্মৃতি ভোলার নয়,  আর সেটা না শোনালেও শান্তি পাচ্ছি না।


ড. খান তখন অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব; সে সময় ব্যাংকিং ডিভিশন বলে আলাদা কোনো শাখা ছিল কিনা মনে পড়ছে না। তবে এটুকু মনে পড়ছে যে দুদকের এককালীন চেয়ারম্যান ও ক্যাবের বর্তমান সভাপতি গোলাম রহমান অতিরিক্ত সচিব ছিলেন। ঘটনাচক্রে আমি তখন বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান, সে বোর্ডে বহু বিখ্যাত সিনিয়র তথা মাইডাসের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল করিম ও অতিকনিষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ড. বিনায়ক সেনসহ আমাকে সর্বাংশে ছাড়িয়ে যাওয়া ব্যক্তিরা সদস্য ছিলেন। ব্যাংকটি দুর্নীতির কারণে ডুবে গিয়েছিল, তবে তার শেয়ার হোল্ডার, চাকরিজীবী ও গ্রাহকের চাপাচাপিতে শেখ হাসিনার প্রথম সরকার তা পুনর্জীবিত করে এবং আমাকে পুনর্গঠিত বোর্ডের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়া হয়। আমি দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়ে ওই পদে যোগদান করি। মোটামুটি স্বল্পসময়ে আমরা ব্যাংকটির পুনর্গঠনকাজে হাত দিয়ে সফলতা অর্জন করি। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে আমি দেদার সহযোগিতা পাচ্ছিলাম। প্রধানমন্ত্রীর সানুগ্রহ দৃষ্টি ছিল বলে আমি প্রায় সবার আস্থা নিয়ে গন্তব্যের দিকে এগুচ্ছিলাম।

হঠাৎ একদিন গোলাম রহমানের সৌজন্যে ড. আকবর আলি খানের সঙ্গে তার অফিসে দেখা হয়ে গেল এবং ক্ষাণিকটা একান্ত আলোচনার সুযোগ পেলাম।

প্রথম সাক্ষাতে বললেন, ‘আপনি তো চেয়ারম্যান হয়েছেন, অনেক দিন হয়েছে একবারও দেখা করার কথা ভাবলেন না।’ আমি কোনো জবাব দেয়ার আগেই বললেন, ‘কুমিল্লার লোক তো “কু” শব্দটির কারণে আমাদের মেলামেশা কমই হবে তবে চাকরিটার কারণে তো একবার দেখা করতে পারতেন।’ আমি অনেকটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে কাঁচুমাচু করছিলাম। একজন ডাকসাইটে সচিব, মুক্তিযোদ্ধা ও অতিমেধাবী শিক্ষাবিদের সামনে আমি অনেকটা অপ্রস্তুত বোধ করলাম।

দ্বিতীয়ত, তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনাকে এ চাকরিটা নিতে কে বলেছে?’ আমি বললাম, চাকরিটা আমাকে দেয়া হয়েছে সংসদে ঘোষণার মাধ্যমে আর অর্থমন্ত্রীর একান্ত অনুরোধে তা নিয়েছি। অধিবেশন চলার সময় জনৈক সদস্যের প্রশ্নের জবাবে আমি জানতে পারি, আমাকে চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

তিনি বললেন ভালো, তবে মান-ইজ্জত বলে কি কিছু বাকি আছে? আমি বললাম, ‘মান ইজ্জতের কী হয়েছে, আমি তো বুঝলাম না। পক্ষান্তরে আমি আমার অতি চৌকস পরিচালকবৃন্দ নিয়ে অতি সুনামের সহিত দায়িত্ব পালন করছি।’

আমি লক্ষ করলাম তার সামনে অনেক কাগজপত্র। তিনি সেগুলো দেখিয়ে বললেন, ‘এই যে এসব হলো আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ।’ আমি তো আকাশ থেকে পড়ার কথা। আমি বললাম, ‘অভিযোগ যখন পেয়েছেন, তখন তদন্ত করলেই পারতেন।’ তিনি বললেন ‘তদন্ত করেছি এবং কোনো সত্যতা পাইনি।’ তার পরও বলছি ‘আপনি মাঝে মাঝে আমার সঙ্গে কথা বললে আপনাকে সামান্য হলেও দিকনির্দেশনা দিতাম; তাছাড়া আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পেতেন।’ আমি বললাম, ‘আপনার কাছে এলে এবং পূর্বাহ্নে ব্যাখ্যা দিলে আপনিও ভাবতে পারতেন, ‘ঠাকুর ঘরে কে রে? আমি কলা খাই না।’ আরো বললাম ‘স্যার, Truth shall prevail জবাবে ড. খান বলবেন, Truth shall prevail, when you are in the grave’.

বৃহস্পতিবার সে ব্যক্তিটি আমার আগেই কবরবাসী হয়েছেন। একজন প্রগতিশীল মানুষ, সজ্জন মানুষ, মুক্তিযোদ্ধা, ডাকসাইটে আমলা, সফল শিক্ষক, প্রাবন্ধিক, গ্রন্থাকার ও নীতিবাগিশ। আগেই আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। আমি তার পরকালের মঙ্গল কামনা করি।

এ সূর্যের তাপ সহ্য করতে পারব না বলেই কদাচিৎ তার কাছে ঘেঁষা হয়েছে। এখন তার তাপ তো শীতের দিনের উষ্ণতা হয়ে বাংলাদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, আরো থাকবে। বঙ্গবন্ধুর সঠিক মূল্যায়নে তিনি নিরন্তর সুবাস ছড়িয়ে চলে গেলেন।

আমার বিচারে দু-পা, দু-চোখ, দু-কান, নাক, দুটি হাত এবং দেহবল্লরী নিয়ে মানুষ আসলে প্রাণী। মানবপ্রেম, দেশপ্রেম, কর্মপ্রেম ও ধর্মপ্রেম না থাকলে তিনি প্রকৃত অর্থে কোনো মানুষ নন। ড. খানের মধ্যে মানবপ্রেম ও অন্য মানবিক গুণাবলির অনন্য সমাহার ছিল। মৃত্যুর অনেক আগেই মানুষ হতে পেরেছিলেন বলে তাকে স্মরণ করতে ভালো লাগছে। এমন দু-একজন মানুষ বাংলাদেশে ছিলেন বা আছেন।

 

ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী: উপাচার্য, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ