কখনো ভেবেছেন, ৫ মিনিটের জন্য ফেসবুকে ঢুকে কীভাবে আমাদের ঘণ্টা পার হয়ে যায়, তবুও সেখান থেকে বের হতে পারি না! অথবা ইউটিউবে মাত্র একটি বিশেষ ভিডিও দেখব বলে ঢুকে বের হওয়ার কথা ভুলে যাই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমরা বিভিন্ন সাইটে ঘুরতে থাকি। কোথায় শুরু করেছিলাম আর শেষ কোথায় করলাম, তার কোনো মিল থাকে না। কেন এমনটা হয়? এর জবাব দেয়ার আগে আমরা দুটো অ্যাপ্রোচ সম্পর্কে জানি। সেগুলো হলো রি-অ্যাক্টিভ ও প্রো-অ্যাক্টিভ অ্যাপ্রোচ। আমাদের দেশে অধিকাংশ সেলসম্যান প্রথম ধারার। তারা যা করে, রোবটকে দিয়ে অনায়াসে শিগগিরই সেই কাজগুলো করানো যাবে। তখন আর এমন রক্ত-মাংসের মানুষ খোঁজার জন্য মালিকদের অযথা টেনশন করতে হবে না! কেন সেটা বলছি, তাহলে চলুন এ বিষয়ে একটু ধারণা নেয়া যাক।
আমরা যখন কোনো পণ্য বা সেবা সম্পর্কে জানতে বিশেষ কোনো ওয়েবসাইটে ঢুকি, তখন সাধারণত সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তরসংবলিত পেজগুলোই সামনে আসে। অর্থাত্ তারা রি-অ্যাক্টিভ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু কিছু ওয়েবসাইট প্রশ্নের জবাব দেয়ার পাশাপাশি এমন কিছু তথ্য বা ক্লু দেয়, যা আমাদের আরো কিছু জানতে উত্সাহ জোগায়। অর্থাত্ তাদের ভূমিকা হলো প্রো-অ্যাক্টিভ। ওই বিষয়গুলো পড়া বা দেখার সময় আমরা আরো উত্সাহী হই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জানতে, যা আমাদের ভাবনার জগেকও বিশেষভাবে প্রভাবিত করে। অ্যামাজন ডটকম এ বিষয়ে সবচেয়ে দক্ষতার পরিচয় দেয় বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। আমাদের দেশে রকমারি ডটকম এক্ষেত্রে অনেকটা সফল হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। গোটা দুনিয়ায় এ বিষয়ে অনেক বেশি গবেষণা হচ্ছে, যেন ক্রেতাদের বেশি সময় নিজের সাইটে ধরে রাখা যায়। ফেসবুক বা ইউটিউবের সফলতার রহস্যও কিন্তু এখানেই নিহিত রয়েছে।
সোস্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটগুলো আজব এক সিস্টেম ডেভেলপ করে ছেড়ে দিয়েছে। আর আমরা নাওয়া-খাওয়া, পড়ালেখা, অফিসের কাজ ভুলে এর পেছনে ছুটে চলেছি। সেই গানের মতো—কি যে এক চাবি মাইরা দিছে ছাইড়া জনমভর চলিতেছে! কখনো ভেবে দেখেছেন, পণ্যের উত্পাদনকারীও আমরা, ভোক্তাও আমরা, মাঝখানে সিংহভাগ সুবিধা নিয়ে যাচ্ছে এর প্রতিষ্ঠাকারী কোম্পানিগুলো। কিন্তু বিষয়টা কি এতই সহজ? অবশ্যই না, শুরুতে অনেকটা তেমন থাকলেও এখন তারা প্রতিনিয়ত বিস্তর গবেষণা করে বের করছে কোন কোন বিষয়ে আপনার আগ্রহ রয়েছে বা থাকতে পারে। কৌশলে সেগুলোই আপনার সামনে নিত্যনতুন উপায়ে হাজির করছে।
তবে খেয়াল করবেন, শুধু পছন্দের বিষয়গুলোই কিন্তু আপনার সামনে আসে না। মাঝে মধ্যেই একটু অপরিচিত বা নতুন বিষয় তারা সামনে আনে। সেগুলো দেখে হয়তো কিছুটা বিরক্ত হন। ভাবেন, জাস্ট এটা দেখেই বের হয়ে যাব। কিন্তু বাস্তবে সেটা আর হয়ে ওঠে না। কেন তারা এমন আচরণ করে, ভেবেছেন কখনো? কারণ শুধু আপনার ভালো লাগে এমন কনটেন্ট দিলে তো কিছুক্ষণ পরই আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হয়ে যাবে, আপনি দ্রুতই লগআউট করবেন। তাই ফেসবুকের প্রায় ৪৫ হাজার কর্মী রাতদিন পরিশ্রম করছেন নিজেদের সাইটে আপনাকে চুম্বকের মতো ধরে রাখতে।
তাছাড়া নতুন বিষয়ে আপনাকে আগ্রহী করে তুলতেও সেই কৌশল প্রয়োগ করা জরুরি। তবে টিভি বিজ্ঞাপনের মতো একেবারে অতিষ্ঠ করে তোলে না। যখনই বিরক্ত হয়ে বের হয়ে যাবেন ভাবতে থাকেন, তখনই আবার ভালো লাগার দু-একটা বিষয় সামনে আনে। ফলে আপনি আবার কিছু সময়ের জন্য আটকে যান। এভাবেই বিশ্বব্যাপী তারা ২৫০ কোটি মানুষের ইমোশন নিয়ে খেলা করছে। ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের অর্ধেকই ঘুম থেকে জেগেই ফেসবুকের নোটিফিকেশন চেক করা অপরিহার্য মনে করে। প্রতিবার লগইনে তারা গড়ে ২০ মিনিট সক্রিয় সময় অতিবাহিত করে। সেজন্যই তো সংশ্লিষ্টরা এ-বিষয়ক গবেষণার নাম দিয়েছেন ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স!
এই নতুন বিষয় সামনে আনার মাধ্যমে তারা আপনার রুচি বা পছন্দ বদলানোর চেষ্টাও করে। সেজন্যই আপনি পরিচিত নন বা কখনো ঢুঁ মারেননি এমন বিষয়গুলো সামনে আনার মাধ্যমে তারা দেখতে চায় আপনি কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখান। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা সফল হয়। অজানা বিষয়ে হঠাত্ ক্লিক করে আপনি সেই বিষয়ের ভক্ত হয়ে যেতে পারেন। ফলে পছন্দের কনটেন্ট, নতুন বা কম পছন্দের বিষয় আবার মজার বিষয় নিয়ে তারা আপনার সঙ্গে টম-জেরির মতো খেলতে থাকে। যারা ব্লু-হোয়েলের মতো গেম খেলে, তাদের বর্ণনা শুনে আপনি হয়তো তাদের বোকা ভাবেন। কিন্তু আপনি যে গেম খেলছেন (ফেসবুক, ইউটিউব, নেটফ্লিক্স, ফেভারিট গেমস ইত্যাদি), তারও কি শেষ পরিণতি একই রকম নয়। তারা মরে দ্রুত আর আপনি ধীরে ধীরে স্লো পয়জনের মতো, তাই না?
একজন দক্ষ বিক্রয়কর্মীও ক্রেতাদের বৈশিষ্ট্য, রুচি, পছন্দ ইত্যাদি বিশ্লেষণ করে কৌশলে তাদের এমন কিছু তথ্য দিতে থাকেন বা পণ্য প্রদর্শন করেন যে উঠি উঠি করেও কাস্টমাররা শোরুমে আরেকটু সময় কাটান। একটা কিনতে এসে তিনটা পণ্য কেনার ঘটনাও ঘটে এমন কৌশলের কারণেই। দক্ষ সেলসম্যানরা ক্রেতার ভাবনার জগত্ নিয়ে খেলা করেন। তাদের চিন্তা করার ক্ষমতা প্রভাবিত করতে তারা এমন সব গেম খেলতে থাকেন, যাতে ক্রেতা জিতলে তো খেলবেনই, হেরে গেলে আরো খেলার জিদ চেপে বসে। এ দক্ষতা গড়ে ওঠে দীর্ঘদিনের চর্চার মাধ্যমে। এক্ষেত্রে Derek Thompson-এর The four-letter code to selling anything ভিডিওটি দেখতে পারেন। বেশকিছু মজার ও গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ পাবেন। আপনার অবচেতন মনকে সেগুলো গাইড করবে বলেও আশা করা যায়।
তবে হ্যাঁ, শিকারি নিজে আবার অন্যের শিকার হয়ে গেলে বিপদ! এ বিষয়ে একটি ঘটনা মনে পড়ছে। কিছুদিন আগে সিলেটে শিশুদের জন্য স্পেশালাইজড পণ্যের এক আউটলেটে ক্লিয়ারিং সেল চলছিল। তখন সন্ধ্যার আগমুহূর্ত হওয়ায় শোরুম ক্রেতায় ভর্তি ছিল। ক্রেতাদের সেবা দেয়ার জন্য ম্যানেজারসহ মোট তিনজন ছিলেন। ফলে কাস্টমারদের অনেকেই ভিন্ন কালার, সাইজ হবে কিনা, সে বিষয়ে জিজ্ঞাসা করার লোক খুঁজছিলেন। কিন্তু একজন বিক্রয়কর্মী খুব সম্ভবত তার কোনো বন্ধুর সঙ্গে তখন চ্যাট করছিলেন। ফলে তিনি শুধু চান্স খুঁজছিলেন বড় কোনো পিলারের আড়ালে যাওয়ার, যেখানে দাঁড়ালে ম্যানেজারের চোখ ফাঁকি দেয়া যাবে। সে রকম স্থানে দাঁড়িয়ে তিনি স্মার্টফোনের স্ক্রিনে ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন। অথচ অসংখ্য কাস্টমার বারবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেও তার সাড়া পাচ্ছিল না!
তাছাড়া সেই ছেলেটার ওভারঅল গেটআপ ও পোশাক-আশাক ছিল একজন বিক্রয়কর্মীর সঙ্গে পুরোপুরি অসামঞ্জস্যপূর্ণ। টি-শার্টের ওপরে বোতাম খোলা শার্ট পরে, গলায় সানগ্লাস ঝুলিয়ে, মাথায় স্পাইক করা চুল নিয়ে আর যাই হোক, সেলসম্যানশিপ হয় না। সেটা কোনো পার্টির ডিজে হলে হয়তো মানানসই হতো। একজন বিক্রয়কর্মীকে সর্বদা স্মরণ রাখতে হবে যে মুখ খোলার আগেই আপনার পোশাক ও গেটআপ সম্ভাব্য ক্রেতাদের গুরুত্বপূর্ণ মেসেজ দিয়ে থাকে। অনেক সময় সেলসম্যানের বডি ল্যাংগুয়েজ সম্ভাব্য ক্রেতাদের মনে বিরক্তি জাগায়। আমার ক্ষেত্রে সেদিন অন্তত তেমনটাই ঘটেছিল।
একজন সম্ভাব্য ক্রেতা শোরুমে প্রবেশের পর কোনো পণ্য না কিনে (বিরক্ত হয়ে) বের হয়ে যাওয়া সেই প্রতিষ্ঠানের জন্য খুবই দুর্ভাগ্যজনক। কারণ ভবিষ্যতে তাদের হয়তো আর কোনোভাবেই সেখানে আনা যাবে না। তাই যেসব বিক্রয়কর্মী ডিউটির সময় ‘তথাকথিত বন্ধুদের’ সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে গিয়ে ক্রেতাদের অবহেলা করেন, তারা আসলে নিজেদেরই কপাল পোড়ান। তথাকথিত বলছি এ কারণে যে বর্তমানে প্রায় ৮ কোটি ৩০ লাখ ভুয়া অ্যাকাউন্ট রয়েছে বলে ফেসবুক কর্তৃপক্ষও স্বীকার করেছে। তাহলে আপনার ভাগে কয়টা পড়েছে ভেবেছেন কখনো? তাছাড়া বাস্তব জীবনে মানুষের সত্যিকারের বন্ধু হয় কয়জন? আর ফেসবুকে? হাজার হাজার! তাছাড়া যাদের বন্ধু বলছেন, তারা প্রকৃতপক্ষে আপনার শত্রুর ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছেন! কারণ তাদের সন্তুষ্ট রাখতে গিয়ে আপনার পড়ালেখায় ক্ষতি, চাকরি হারাতে হতে পারে, ক্যারিয়ারে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। তাই সাবধান!
আমার তো মনে হয়, এ যুগে ক্রেতার সতিন হলো স্মার্টফোন! বিক্রয়কর্মী হিসেবে দুটোকে একই সঙ্গে সন্তুষ্ট রাখতে পারবেন না। তাই সম্ভাব্য ক্রেতা যতক্ষণ আপনার সামনে থাকবেন, দয়া করে ফোনের দিকে তাকাবেন না। ফোন হাতে রাখা থেকে বিরত থাকুন। শুধু পেশাগত প্রয়োজনে যেটুকু দরকার, সেটুকু সময়ই ফোন, ট্যাব বা কম্পিউটার ব্যবহার করবেন। ক্রেতার চোখের দিকে যখন তাকাবেন, আপনার দৃষ্টি যেন ক্লান্ত না থাকে। ডিউটির সময় যদি বন্ধুদের নিয়ে কর্মস্থলে আড্ডা দেয়া না যায়, তবে সোস্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটও ব্যবহার করা যাবে না। যারা করবেন তাদের ধ্বংস অনিবার্য। আপনি ক্রেতার কাছ থেকে পালাতে চেষ্টা করলে প্রতিষ্ঠান আপনাকে স্থায়ীভাবে সেই বন্ধুদের কাছে পাঠিয়ে দেবে। অর্থাত্ চাকরি নট!
এ যুগে অনলাইনে উপস্থিতি অবশ্যই দরকার। কিন্তু সেটারও উদ্দেশ্য থাকতে হবে। আপনি অন্যদের খেলার উপকরণ হবেন, আপনাকে ব্যবহার করে অন্যরা সুবিধা নিয়ে যাবে আর আপনি শুধু নিজের মেধা, শ্রম, সময়, মনোযোগ ব্যয় করবেন; সেটা হওয়া উচিত নয়। আপনি কেন সেখানে এগুলো বিনিয়োগ করবেন, তা প্রথমে ঠিক করুন। দীর্ঘমেয়াদে সেখান থেকে কী অর্জন করতে চান, তাও নির্ধারণ করুন। তার পরে পরিকল্পিতভাবে সময় দিন। সেটা আপনার পেশা ও ব্যক্তিজীবনের সঙ্গে যেন সাংঘর্ষিক না হয়, সে ব্যাপারেও সর্বদা খেয়াল রাখুন। আমরা অধিকাংশই সোস্যাল মিডিয়ায় যেভাবে সময় কাটাই, তা অনেকটা A ship without a radar-এর মতো চলতে থাকে। অনেক কিছু বিনিয়োগ করেও শেষমেশ কোথায় পৌঁছতে চাই, তা আমরা নিজেই জানি না, তাই না?
নোট: এমন অসংখ্য বিষয়ে ধারণা পেতে লেখকের ‘ফেইলিওর ইন সেলস: বিক্রয় চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার কারণ ও প্রতিকার’ বইটি পড়তে পারেন।
মো. আব্দুল হামিদ: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক
আমরা যখন কোনো পণ্য বা সেবা সম্পর্কে জানতে বিশেষ কোনো ওয়েবসাইটে ঢুকি, তখন সাধারণত সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তরসংবলিত পেজগুলোই সামনে আসে। অর্থাত্ তারা রি-অ্যাক্টিভ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু কিছু ওয়েবসাইট প্রশ্নের জবাব দেয়ার পাশাপাশি এমন কিছু তথ্য বা ক্লু দেয়, যা আমাদের আরো কিছু জানতে উত্সাহ জোগায়। অর্থাত্ তাদের ভূমিকা হলো প্রো-অ্যাক্টিভ। ওই বিষয়গুলো পড়া বা দেখার সময় আমরা আরো উত্সাহী হই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জানতে, যা আমাদের ভাবনার জগেকও বিশেষভাবে প্রভাবিত করে। অ্যামাজন ডটকম এ বিষয়ে সবচেয়ে দক্ষতার পরিচয় দেয় বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। আমাদের দেশে রকমারি ডটকম এক্ষেত্রে অনেকটা সফল হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। গোটা দুনিয়ায় এ বিষয়ে অনেক বেশি গবেষণা হচ্ছে, যেন ক্রেতাদের বেশি সময় নিজের সাইটে ধরে রাখা যায়। ফেসবুক বা ইউটিউবের সফলতার রহস্যও কিন্তু এখানেই নিহিত রয়েছে।
সোস্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটগুলো আজব এক সিস্টেম ডেভেলপ করে ছেড়ে দিয়েছে। আর আমরা নাওয়া-খাওয়া, পড়ালেখা, অফিসের কাজ ভুলে এর পেছনে ছুটে চলেছি। সেই গানের মতো—কি যে এক চাবি মাইরা দিছে ছাইড়া জনমভর চলিতেছে! কখনো ভেবে দেখেছেন, পণ্যের উত্পাদনকারীও আমরা, ভোক্তাও আমরা, মাঝখানে সিংহভাগ সুবিধা নিয়ে যাচ্ছে এর প্রতিষ্ঠাকারী কোম্পানিগুলো। কিন্তু বিষয়টা কি এতই সহজ? অবশ্যই না, শুরুতে অনেকটা তেমন থাকলেও এখন তারা প্রতিনিয়ত বিস্তর গবেষণা করে বের করছে কোন কোন বিষয়ে আপনার আগ্রহ রয়েছে বা থাকতে পারে। কৌশলে সেগুলোই আপনার সামনে নিত্যনতুন উপায়ে হাজির করছে।
তবে খেয়াল করবেন, শুধু পছন্দের বিষয়গুলোই কিন্তু আপনার সামনে আসে না। মাঝে মধ্যেই একটু অপরিচিত বা নতুন বিষয় তারা সামনে আনে। সেগুলো দেখে হয়তো কিছুটা বিরক্ত হন। ভাবেন, জাস্ট এটা দেখেই বের হয়ে যাব। কিন্তু বাস্তবে সেটা আর হয়ে ওঠে না। কেন তারা এমন আচরণ করে, ভেবেছেন কখনো? কারণ শুধু আপনার ভালো লাগে এমন কনটেন্ট দিলে তো কিছুক্ষণ পরই আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হয়ে যাবে, আপনি দ্রুতই লগআউট করবেন। তাই ফেসবুকের প্রায় ৪৫ হাজার কর্মী রাতদিন পরিশ্রম করছেন নিজেদের সাইটে আপনাকে চুম্বকের মতো ধরে রাখতে।
তাছাড়া নতুন বিষয়ে আপনাকে আগ্রহী করে তুলতেও সেই কৌশল প্রয়োগ করা জরুরি। তবে টিভি বিজ্ঞাপনের মতো একেবারে অতিষ্ঠ করে তোলে না। যখনই বিরক্ত হয়ে বের হয়ে যাবেন ভাবতে থাকেন, তখনই আবার ভালো লাগার দু-একটা বিষয় সামনে আনে। ফলে আপনি আবার কিছু সময়ের জন্য আটকে যান। এভাবেই বিশ্বব্যাপী তারা ২৫০ কোটি মানুষের ইমোশন নিয়ে খেলা করছে। ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের অর্ধেকই ঘুম থেকে জেগেই ফেসবুকের নোটিফিকেশন চেক করা অপরিহার্য মনে করে। প্রতিবার লগইনে তারা গড়ে ২০ মিনিট সক্রিয় সময় অতিবাহিত করে। সেজন্যই তো সংশ্লিষ্টরা এ-বিষয়ক গবেষণার নাম দিয়েছেন ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স!
এই নতুন বিষয় সামনে আনার মাধ্যমে তারা আপনার রুচি বা পছন্দ বদলানোর চেষ্টাও করে। সেজন্যই আপনি পরিচিত নন বা কখনো ঢুঁ মারেননি এমন বিষয়গুলো সামনে আনার মাধ্যমে তারা দেখতে চায় আপনি কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখান। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা সফল হয়। অজানা বিষয়ে হঠাত্ ক্লিক করে আপনি সেই বিষয়ের ভক্ত হয়ে যেতে পারেন। ফলে পছন্দের কনটেন্ট, নতুন বা কম পছন্দের বিষয় আবার মজার বিষয় নিয়ে তারা আপনার সঙ্গে টম-জেরির মতো খেলতে থাকে। যারা ব্লু-হোয়েলের মতো গেম খেলে, তাদের বর্ণনা শুনে আপনি হয়তো তাদের বোকা ভাবেন। কিন্তু আপনি যে গেম খেলছেন (ফেসবুক, ইউটিউব, নেটফ্লিক্স, ফেভারিট গেমস ইত্যাদি), তারও কি শেষ পরিণতি একই রকম নয়। তারা মরে দ্রুত আর আপনি ধীরে ধীরে স্লো পয়জনের মতো, তাই না?
একজন দক্ষ বিক্রয়কর্মীও ক্রেতাদের বৈশিষ্ট্য, রুচি, পছন্দ ইত্যাদি বিশ্লেষণ করে কৌশলে তাদের এমন কিছু তথ্য দিতে থাকেন বা পণ্য প্রদর্শন করেন যে উঠি উঠি করেও কাস্টমাররা শোরুমে আরেকটু সময় কাটান। একটা কিনতে এসে তিনটা পণ্য কেনার ঘটনাও ঘটে এমন কৌশলের কারণেই। দক্ষ সেলসম্যানরা ক্রেতার ভাবনার জগত্ নিয়ে খেলা করেন। তাদের চিন্তা করার ক্ষমতা প্রভাবিত করতে তারা এমন সব গেম খেলতে থাকেন, যাতে ক্রেতা জিতলে তো খেলবেনই, হেরে গেলে আরো খেলার জিদ চেপে বসে। এ দক্ষতা গড়ে ওঠে দীর্ঘদিনের চর্চার মাধ্যমে। এক্ষেত্রে Derek Thompson-এর The four-letter code to selling anything ভিডিওটি দেখতে পারেন। বেশকিছু মজার ও গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ পাবেন। আপনার অবচেতন মনকে সেগুলো গাইড করবে বলেও আশা করা যায়।
তবে হ্যাঁ, শিকারি নিজে আবার অন্যের শিকার হয়ে গেলে বিপদ! এ বিষয়ে একটি ঘটনা মনে পড়ছে। কিছুদিন আগে সিলেটে শিশুদের জন্য স্পেশালাইজড পণ্যের এক আউটলেটে ক্লিয়ারিং সেল চলছিল। তখন সন্ধ্যার আগমুহূর্ত হওয়ায় শোরুম ক্রেতায় ভর্তি ছিল। ক্রেতাদের সেবা দেয়ার জন্য ম্যানেজারসহ মোট তিনজন ছিলেন। ফলে কাস্টমারদের অনেকেই ভিন্ন কালার, সাইজ হবে কিনা, সে বিষয়ে জিজ্ঞাসা করার লোক খুঁজছিলেন। কিন্তু একজন বিক্রয়কর্মী খুব সম্ভবত তার কোনো বন্ধুর সঙ্গে তখন চ্যাট করছিলেন। ফলে তিনি শুধু চান্স খুঁজছিলেন বড় কোনো পিলারের আড়ালে যাওয়ার, যেখানে দাঁড়ালে ম্যানেজারের চোখ ফাঁকি দেয়া যাবে। সে রকম স্থানে দাঁড়িয়ে তিনি স্মার্টফোনের স্ক্রিনে ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন। অথচ অসংখ্য কাস্টমার বারবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেও তার সাড়া পাচ্ছিল না!
তাছাড়া সেই ছেলেটার ওভারঅল গেটআপ ও পোশাক-আশাক ছিল একজন বিক্রয়কর্মীর সঙ্গে পুরোপুরি অসামঞ্জস্যপূর্ণ। টি-শার্টের ওপরে বোতাম খোলা শার্ট পরে, গলায় সানগ্লাস ঝুলিয়ে, মাথায় স্পাইক করা চুল নিয়ে আর যাই হোক, সেলসম্যানশিপ হয় না। সেটা কোনো পার্টির ডিজে হলে হয়তো মানানসই হতো। একজন বিক্রয়কর্মীকে সর্বদা স্মরণ রাখতে হবে যে মুখ খোলার আগেই আপনার পোশাক ও গেটআপ সম্ভাব্য ক্রেতাদের গুরুত্বপূর্ণ মেসেজ দিয়ে থাকে। অনেক সময় সেলসম্যানের বডি ল্যাংগুয়েজ সম্ভাব্য ক্রেতাদের মনে বিরক্তি জাগায়। আমার ক্ষেত্রে সেদিন অন্তত তেমনটাই ঘটেছিল।
একজন সম্ভাব্য ক্রেতা শোরুমে প্রবেশের পর কোনো পণ্য না কিনে (বিরক্ত হয়ে) বের হয়ে যাওয়া সেই প্রতিষ্ঠানের জন্য খুবই দুর্ভাগ্যজনক। কারণ ভবিষ্যতে তাদের হয়তো আর কোনোভাবেই সেখানে আনা যাবে না। তাই যেসব বিক্রয়কর্মী ডিউটির সময় ‘তথাকথিত বন্ধুদের’ সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে গিয়ে ক্রেতাদের অবহেলা করেন, তারা আসলে নিজেদেরই কপাল পোড়ান। তথাকথিত বলছি এ কারণে যে বর্তমানে প্রায় ৮ কোটি ৩০ লাখ ভুয়া অ্যাকাউন্ট রয়েছে বলে ফেসবুক কর্তৃপক্ষও স্বীকার করেছে। তাহলে আপনার ভাগে কয়টা পড়েছে ভেবেছেন কখনো? তাছাড়া বাস্তব জীবনে মানুষের সত্যিকারের বন্ধু হয় কয়জন? আর ফেসবুকে? হাজার হাজার! তাছাড়া যাদের বন্ধু বলছেন, তারা প্রকৃতপক্ষে আপনার শত্রুর ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছেন! কারণ তাদের সন্তুষ্ট রাখতে গিয়ে আপনার পড়ালেখায় ক্ষতি, চাকরি হারাতে হতে পারে, ক্যারিয়ারে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। তাই সাবধান!
আমার তো মনে হয়, এ যুগে ক্রেতার সতিন হলো স্মার্টফোন! বিক্রয়কর্মী হিসেবে দুটোকে একই সঙ্গে সন্তুষ্ট রাখতে পারবেন না। তাই সম্ভাব্য ক্রেতা যতক্ষণ আপনার সামনে থাকবেন, দয়া করে ফোনের দিকে তাকাবেন না। ফোন হাতে রাখা থেকে বিরত থাকুন। শুধু পেশাগত প্রয়োজনে যেটুকু দরকার, সেটুকু সময়ই ফোন, ট্যাব বা কম্পিউটার ব্যবহার করবেন। ক্রেতার চোখের দিকে যখন তাকাবেন, আপনার দৃষ্টি যেন ক্লান্ত না থাকে। ডিউটির সময় যদি বন্ধুদের নিয়ে কর্মস্থলে আড্ডা দেয়া না যায়, তবে সোস্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটও ব্যবহার করা যাবে না। যারা করবেন তাদের ধ্বংস অনিবার্য। আপনি ক্রেতার কাছ থেকে পালাতে চেষ্টা করলে প্রতিষ্ঠান আপনাকে স্থায়ীভাবে সেই বন্ধুদের কাছে পাঠিয়ে দেবে। অর্থাত্ চাকরি নট!
এ যুগে অনলাইনে উপস্থিতি অবশ্যই দরকার। কিন্তু সেটারও উদ্দেশ্য থাকতে হবে। আপনি অন্যদের খেলার উপকরণ হবেন, আপনাকে ব্যবহার করে অন্যরা সুবিধা নিয়ে যাবে আর আপনি শুধু নিজের মেধা, শ্রম, সময়, মনোযোগ ব্যয় করবেন; সেটা হওয়া উচিত নয়। আপনি কেন সেখানে এগুলো বিনিয়োগ করবেন, তা প্রথমে ঠিক করুন। দীর্ঘমেয়াদে সেখান থেকে কী অর্জন করতে চান, তাও নির্ধারণ করুন। তার পরে পরিকল্পিতভাবে সময় দিন। সেটা আপনার পেশা ও ব্যক্তিজীবনের সঙ্গে যেন সাংঘর্ষিক না হয়, সে ব্যাপারেও সর্বদা খেয়াল রাখুন। আমরা অধিকাংশই সোস্যাল মিডিয়ায় যেভাবে সময় কাটাই, তা অনেকটা A ship without a radar-এর মতো চলতে থাকে। অনেক কিছু বিনিয়োগ করেও শেষমেশ কোথায় পৌঁছতে চাই, তা আমরা নিজেই জানি না, তাই না?
নোট: এমন অসংখ্য বিষয়ে ধারণা পেতে লেখকের ‘ফেইলিওর ইন সেলস: বিক্রয় চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার কারণ ও প্রতিকার’ বইটি পড়তে পারেন।
মো. আব্দুল হামিদ: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক










