ক্রমাগত জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও মানুষের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের ফলে দেশে ভোজ্যতেলের চাহিদা বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। মাথাপিছু দৈনিক ৪০ গ্রাম ধরে ২০৩০ সালে ভোজ্যতেলের মোট দেশীয় চাহিদা দাঁড়াবে প্রায় ২৮ লাখ টন। কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ভোজ্যতেল আমদানি করতে বাংলাদেশ সরকারকে প্রতি বছর ২০-২৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়। তেলজাতীয় ফসলের দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে আমদানি ব্যয় কমানো সম্ভব। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মধ্যে তেল ফসলের উৎপাদন ২৮ লাখ টনে উন্নীত করা। 

বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হিসাব অনুযায়ী, সর্বশেষ ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে ভোজ্যতেল আমদানি করতে হয়েছে বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে মোট চাহিদা ২৪ লাখ টনের বিপরীতে দেশে ভোজ্যতেল উৎপাদন মাত্র তিন লাখ টন, যা চাহিদার মাত্র ১২ শতাংশ। 

‘‌তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্প’-এর মাধ্যমে জুন ২০২৫ সালের মধ্যে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার ৪০ ভাগ ভোজ্যতেল স্থানীয়ভাবেই উৎপাদনের লক্ষ্যে কাজ করছে কৃষি মন্ত্রণালয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, বর্তমানে প্রায় সাড়ে আট লাখ হেক্টর জমিতে তেলজাতীয় ফসল উৎপাদন হচ্ছে, যার বেশির ভাগই সরিষা। ভোজ্যতেলের আমদানিনির্ভরতা হ্রাস তথা দেশীয় উৎপাদন বাড়িয়ে চাহিদার ৪০ শতাংশ পূরণে প্রয়োজন প্রায় ২৪ লাখ হেক্টর জমি। তেলজাতীয় ফসল, বিশেষ করে সরিষাকে প্রাধান্য দিয়ে আবাদের আওতায় আনা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে ভোজ্যতেল হিসেবে সরিষাই প্রধান। এ অবস্থায় ভোজ্যতেলের আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশে সরিষা চাষের আওতায় জমির পরিমাণ বাড়ানো, উচ্চফলনশীল (উফশী) জাতের সরিষা অন্তর্ভুক্তিই একমাত্র উপায়। উল্লেখ্য, ভোজ্যতেল হিসেবে সরিষার তেলে সম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণ ৩০ শতাংশের নিচে ও অসম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণ ৫০ শতাংশের ওপরে এবং ওমেগা-৩ ও ওমেগা-৬-এর অনুপাত ১:২ বিদ্যমান, যা পুরোপুরিভাবে স্বাস্থ্যসম্মত।

সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক ‘‌তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্প’-এর আওতায় ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আবদুর রাজ্জাক এমপি মহোদয়ের প্রত্যাশার অনুকূলে ভোজ্যতেলের চাহিদার ৪০ শতাংশ দেশীয় উৎপাদন দিয়ে মেটানো সম্ভব হবে। ভোজ্যতেলের আমদানিনির্ভরতা কমাতে বাংলাদেশে তেলজাতীয় ফসল সরিষা চাষের আওতায় জমির পরিমাণ বৃদ্ধিসহ উফশী জাতের দ্রুত সম্প্রসারণ ও উৎপাদন কলাকৌশলে আধুনিক পদ্ধতির অনুসরণই একমাত্র উপায়।

বিশেষায়িত গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) মিউটেশন প্রজনন পদ্ধতির মাধ্যমে উদ্ভাবন করেছে স্বল্প জীবনকালের উচ্চফলনশীল, প্রতিকূলতা সহনশীল ও সর্বাধিক জনপ্রিয় জাত বিনা সরিষা-৪, বিনা সরিষা-৯, বিনা সরিষা-১১ ও বিনা সরিষা-১২ এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) উদ্ভাবিত বারি সরিষা-১৪ ও বারি সরিষা-১৭ যেগুলোর জীবনকাল ৮০-৮৮ দিন এবং গড় ফলন হেক্টরপ্রতি দেড় থেকে দুই টন। প্রচলিত জাতের সরিষার স্থলে শুধু বিনা ও বারি উদ্ভাবিত সরিষার উল্লিখিত জাতগুলো প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে দেশের সরিষা উৎপাদন অনেকাংশেই বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে।

তেল উৎপাদন বাড়াতে প্রয়োজন আমন ধানের পর জমি পতিত না রেখে স্বল্পমেয়াদি সরিষার আবাদ করা। এজন্য দেশের বিজ্ঞানীরা এরই মধ্যে স্বল্প জীবনকালের (১০০-১২০ দিন) অথচ উফশী আমন ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন, যেগুলো মূল জমিতে চারা রোপণের মাত্র ৮০-৯৫ দিনের মধ্যেই সংগ্রহ করে ঘরে তোলা যায়। এরপর জমি পতিত না রেখে উন্নত জাতের সরিষা চাষ করা সম্ভব হচ্ছে। যেগুলো ৮০-৮৫ দিনের মধ্যে পরিপক্ক হওয়ায় পরবর্তী সময়ে একই জমিতে আবার বোরো ধান চাষ করে প্রচলিত দুই ফসলী জমিকে তিন ফসলীতে রূপান্তর করা সম্ভব হচ্ছে।

স্বাভাবিক চাষাবাদ পদ্ধতিসহ শূন্যচাষ ও রিলে চাষ পদ্ধতিতে আবাদযোগ্য স্বল্প জীবৎকালের বিনা সরিষা-৪, বিনা সরিষা-৯, বিনা সরিষা-১১ ও বিনা সরিষা-১২ আবাদের মাধ্যমে উল্লিখিত জমির অনেকটাই শস্যবিন্যাস পরিবর্তন করে আমন সরিষা বোরোতে রূপান্তর করে অতিরিক্ত সরিষার উৎপাদন দিয়ে দেশীয় চাহিদার অনেকটাই পূরণ করা সম্ভব।

দেশের প্রায় ১ দশমিক ৭ লাখ হেক্টর চরের পতিত জমিতে সরিষার আধুনিক ও প্রতিকূলতা সহনশীল (বিনা সরিষা-৪, বিনা সরিষা-৯, বিনা সরিষা-১১ ও বিনা সরিষা-১২) জাতের সরিষা চাষের আওতায় এনে অতিরিক্ত প্রায় ২ দশমিক ২ লাখ টন সরিষা উৎপাদন করা সম্ভব। নাবিতে বপনোপযোগী বিনা উদ্ভাবিত উফশী ও রোগ প্রতিরোধী এবং শূন্যচাষে বা প্রয়োজনে রিলে চাষ পদ্ধতিতে আবাদযোগ্য বিনা সরিষা-৪, বিনা সরিষা-৯, বিনা সরিষা-১২ ও বারি সরিষা-১৮ জাতগুলো সহজেই ওই এলাকায় সম্প্রসারণ করে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।

বাংলাদেশে সরিষা বপন-পরবর্তী অগ্রহায়ণে (মধ্য নভেম্বর-মধ্য ডিসেম্বর) নিম্নচাপজনিত বৃষ্টিপাতের কারণে জমিতে সাময়িক জলাবদ্ধতায় দেশী জাতের সরিষা টরি-৭ ও অন্যান্য উফশী জাত নষ্ট হলেও বিনা সরিষা-৪, বিনা সরিষা-৯ এবং সম্প্রতি উদ্ভাবিত বিনা সরিষা-১২ জাতগুলো পাঁচদিন পর্যন্ত সাময়িক জলাবদ্ধতা/জলমগ্নতা সহিষ্ণু হওয়ায় কৃষকরা ফসলহানি হতে রক্ষা পাচ্ছে। 

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণে আগামী দুই বছরে দেশের ভোজ্যতেলের আমদানিনির্ভরতা কমপক্ষে ৪০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা অবশ্যই সম্ভব হবে। উল্লিখিত লক্ষ্য বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বিনা ও বারি উদ্ভাবিত সরিষার জাতগুলো। এজন্য প্রয়োজন সরকারি বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিএডিসি ও বেসরকারি বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে উন্নত জাতের মানসম্পন্ন বীজ পর্যাপ্ত পরিমাণে উৎপাদন ও যথাসময়ে সরবরাহের নিশ্চয়তা প্রদানের পাশাপাশি ডিএই এবং বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) মাধ্যমে সরিষা চাষে কৃষককে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উদ্বুদ্ধকরণ, সরিষার সঠিক চাষাবাদ পদ্ধতি বিষয়ে কৃষককে অবহিতকরণ ও মাঠপর্যায়ে ডিএইর মনিটর জোরদার করা। 

ড. মো. আব্দুল মালেক: পরিচালক, গবেষণা বিভাগ, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা), ময়মনসিংহ