উচ্চমূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবেলায় দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি ও ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের মাধ্যমে নিত্যপণ্য সরবরাহ করছে সরকার। ঈদ পর্যন্ত চলবে আলোচ্য কার্যক্রম। কিন্তু চাহিদার তুলনায় জোগানের অপ্রতুলতায় হিমশিম খেতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের। প্রতিদিন ওএমএস ও টিসিবির লাইনে দাঁড়িয়ে পণ্য না পেয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে বহু মানুষকে। টিসিবির মাধ্যমে পণ্য সরবরাহের জন্য এক কোটি পরিবারকে কার্ড সরবরাহ করা হয়েছে। ওএমএসের মাধ্যমে আরো কয়েক লাখ মানুষকে খাদ্য প্রদান করা হচ্ছে স্বল্পমূল্যে। ক্রমে চাহিদা বেড়ে ওঠায় সরবরাহ করে কুলিয়ে ওঠা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে দুর্নীতি, চুরি ও অপচয়ের অভিযোগও রয়েছে। এ মুহূর্তে ওএমএসের আওতা আরো সম্প্রসারণ এবং দুর্নীতি ও অপচয় রোধে তদারকি আরো জোরদার করা প্রয়োজন। খাদ্য মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ আলোচ্য কার্যক্রমে যুক্ত অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের সক্রিয় ভূমিকা এক্ষেত্রে জরুরি।
ওএমএসের পণ্য বিক্রিতে ব্যবস্থাপনার ঘাটতিই একমাত্র সমস্যা নয়। এখানে অনেক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগও আছে। প্রায়ই ওএমএসের পণ্য পাচারের খবর পাওয়া যায়। এর আগে গণমাধ্যমে হাজার হাজার কেজি চাল পাচারের একাধিক খবর প্রকাশ হয়েছে। পাচার হওয়ার সময় অনেক চাল জব্দ করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পাচারে যুক্ত থাকার অভিযোগে দু-একজনকে গ্রেফতারের কথা শোনা যায়। অভিযোগ রয়েছে, বিপুল পরিমাণ চাল পাচারের সঙ্গে খাদ্য বিভাগের এক শ্রেণীর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ রয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধানে কোনো কেনো অভিযোগের সত্যতাও মিলেছে। ব্যবস্থাপনার ঘাটতি দূর করার পাশাপাশি এসব অভিযোগেরও সুরাহা করা জরুরি। ওএমএসের পণ্য পাচার বন্ধ করা না গেলে প্রকৃত উপকারভোগীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। পাচারের অভিযোগে চুনোপুঁটিদের গ্রেফতার করে বা জেলে ভরে সমস্যার সমাধান করা যাবে না। পাচারের নেপথ্যে কারা আছে সেটা খুঁজে বের করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। ডিলারদের বিরুদ্ধেও পাচারের অভিযোগ উঠেছে। তাদের বিরুদ্ধেও তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। ওএমএস কার্যক্রম প্রতি বছর একটি নির্ধারিত সময় বন্ধ থাকলেও এবার চলছে লাগাতার। বাড়ানো হয়েছে আওতা। পূর্বনির্ধারিত বরাদ্দ শেষ হয়ে গেলে নতুন করে আবার চাল ও আটার বরাদ্দ পুনর্নির্ধারণ করা হয়। গত সেপ্টেম্বর থেকে এ কার্যক্রম চললেও ভোক্তার চাহিদা পূরণ হচ্ছে না পুরোপুরি। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে ওএমএসের প্রতি মানুষের নির্ভরতা বাড়ছে। ফলে বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকারিভাবে আরো বরাদ্দ বাড়াতে হবে।
খাদ্য অধিদপ্তরের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ওপেন মার্কেট সেলের (ওএমএস) চাল ও আটা বিক্রিতে অব্যবস্থাপনা আর অনিয়ম-দুর্নীতির অনেক অভিযোগই পাওয়া গেছে। ব্যবস্থাপনায় ঘাটতির বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরেও এসেছে। যে কারণে তিনি কার্ডের মাধ্যমে ওএমএস কার্যক্রম পরিচালনা করার নির্দেশ দিয়েছেন। গত সোমবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কার্ডের মাধ্যমে ওএমএসের চাল, আটার মতো জরুরি খাদ্যপণ্য বিক্রি করা হলে মানুষ উপকৃত হবে বলে মনে করছে সরকার। এতে হয়তো একটা শৃঙ্খলা আসবে। মানুষকে লাইনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে পণ্য কিনতে হবে না হয়তো। ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠু হলে জনগণের ভোগান্তি অনেকাংশে কমানো যায়। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে দেশের মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। স্বল্পমূল্যে ওএমএসের পণ্য কিনতে পারলে তাদের কিছুটা হলেও স্বস্তি মেলে। প্রান্তিক দরিদ্র মানুষের পাশাপাশি এখন অনেক মধ্যবিত্তেরও ভরসা ওএমএসের পণ্য। ওএমএসের কার্ড কারা পাবেন সে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন। আমরা আশা করব, উপকারভোগী নির্বাচনে বা কার্ড বিতরণে কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি হবে না।
যুক্তরাজ্যের মানুষ শিশুদের খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার গত দুই বছরের ক্রমাবনতির প্রবণতা তথ্যের মাধ্যমে জানতে পেরেছে। সেটা জানতে পেরে সরকারের খাদ্যনিরাপত্তার তথ্য সম্পর্কে সেখানকার জনগণ কিছু বলার আগেই সরকারি ফুড ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী নিজেই খাদ্য মজুদ নিয়ে সরকারের তথ্যগত ঘাটতির ব্যাপারে সরব হয়ে উঠছেন। অর্থাৎ সেখানকার কর্মকর্তারা জনকল্যাণে সরকারের মুখরোচক বক্তৃতার অসারতার ব্যাপারে কোনো তোয়াক্কা করেন না। তারা জনগণের কল্যাণে সঠিক তথ্য প্রকাশ করতে বা সত্য কথা বলতে সর্বদাই নিবেদিত। এসব বিষয়ে কথা বলার ব্যাপারে তাদের অধিকার ও সৎসাহস দুটোই বিদ্যমান। এটা বর্তমানে একটা জরুরি অবস্থা। এ অবস্থা মোকাবেলায় সরকারি সাহায্য নিতান্তই অপ্রতুল। টিসিবির পণ্য কিনতে গিয়ে ট্রাকের পেছনে লম্বা লাইন অথবা ভাসমান দরিদ্র মানুষের দৌড়ানোর চিত্র আমাদের বেশ ভাবিয়ে তুলছে। ট্রাকসেলের কাছে মধ্যবিত্ত ও ভদ্রঘরের মানুষ যেতে লজ্জাবোধ করছে। অনেকে বলেছেন ট্রাকসেলের কাছে পণ্য কিনতে গেলে নিজেকে অসহায় ও অসম্মানজনক মনে হচ্ছে। প্রতিবেশী ও পরিচিতজন আমাদের দরিদ্র ভেবে উপহাস করতে ছাড়ছে না। তাই ট্রাকসেলে না দিয়ে কোনো নির্দিষ্ট বাজারের মধ্যে সেলের কর্নার খোলা উচিত। তাই খাদ্য মজুদ আছে এমন বক্তব্য না দিয়ে সরকারি ভাণ্ডার খুলে মানুষের কাছে নিত্যপণ্য নিয়ে এগিয়ে আসুন। মানুষ পর্যাপ্ত মজুদের কথা শুনতে চায় না—বরং স্বল্পমূল্যে প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য কেনার নিশ্চয়তা পেতে চায়।
সরকারি কর্তৃপক্ষ বলছে, ‘দেশে পণ্যের যথেষ্ট পরিমাণে মজুদ আছে।’ পাশাপাশি জানানো হচ্ছে, ‘নিত্যপণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হচ্ছে।’ তবে নিম্ন আয়ের মানুষ প্রতিনিয়ত এসব কথা শুনতে শুনতে হয়রান হয়ে পড়েছে। এসব ভোক্তা জানে না কৃত্রিম সংকট কে সৃষ্টি করছে। তারা ভাবছে, মজুদ যদি পর্যাপ্ত থাকে তাহলে বাজারে পণ্যসংকট কেন? ছয়টি শিল্প গ্রুপের কাছে ৩ লাখ ২ হাজার টন ভোজ্যতেল, পাঁচটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ২ লাখ ২৫ হাজার ৫৬৩ টন চিনি এবং পাইপলাইনে আরো বিপুল পরিমাণ আমদানি খাদ্যপণ্য দেশে আসার পথে রয়েছে। এগুলো ব্যবসায়ীদের পণ্য, সরকারের নিজস্ব নয়। মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ ব্যতিরেকে শুধু তাদের মজুদের ওপর নির্ভর করে হিসাব কষলে দ্রব্যমূল্য কমানো দুরূহ ব্যাপার। এ মুহূর্তে সরকারের নিজস্ব যথেষ্ট মজুদ থাকলে সেগুলো এ ভয়াবহ সংকটের সময় ভাণ্ডার খুলে দিয়ে নিত্যপণ্যের বাজারকে স্থিতিশীল করা প্রয়োজন। বর্তমানে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। এক্ষেত্রে ওএমএসের আওতা ও বরাদ্দ বাড়ানো দরকার। সরকার বরাদ্দ বাড়িয়েছেও। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় এখনো অনেক কম। সার্বিকভাবে বাজারে দ্রব্যমূল্য না কমলে ওএমএসের এ লাইন আরো বড় হবে। অর্থাৎ বাজারে দাম কমলে ওএমএসের প্রতি নির্ভরতা কিছুটা কমবে। মানুষ এখন বাজারমূল্যে দিশাহারা। মানুষকে অনেক কিছুই কাটছাঁট করতে হচ্ছে। আমাদের জরিপে দেখেছি, ওএমএস বা টিসিবির লাইনে মানুষ দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। এতে তাদের অনেক সময় নষ্ট হচ্ছে। তার পরও যা পায় প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। এজন্য সাময়িকভাবে হলেও আওতা ও বরাদ্দ বাড়ানো দরকার। আমরা জানি বৈশ্বিক নানা কারণে বাজারে কিছুটা দাম বেশি। কিন্তু অভ্যন্তরীণভাবেও আমাদের বাজারে বিভিন্ন ধরনের প্রভাব রয়েছে। এজন্য বাজার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। সাময়িকভাবে ব্যবসায়ীরা যেন বাজার ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করতে না পারে সেটা নিশ্চিত করতে হবে।
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) একটি জরিপ থেকে জানা গেছে, দেশের নিম্ন আয়ের ৯২ শতাংশ মানুষই খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। তাদের মধ্যে ২৫ দশমিক ৪৪ শতাংশই মারাত্মক নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। মূল্যস্ফীতির লাগাম টানা না গেলে কম মূল্যে ওএমএসের পণ্য কেনার লাইন আরো দীর্ঘ হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন। এজন্য তারা পণ্যের সরবরাহ বাড়ানোর কথা বলেছেন। আবার বাজার নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও হয়তো পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে; কিন্তু সেই কাজ করা সম্ভব হবে কিনা সেটা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, দেশে মূল্যস্ফীতি আরো বাড়তে পারে। মানুষের কষ্ট লাঘব হোক সেটাই আমরা চাই। ওএমএসের লাইন থেকে কেউ যেন খালি হাতে না ফেরে সে ব্যবস্থা করতে হবে। পণ্যের সরবরাহ আরো বাড়ানো যায় কিনা সেটা সরকার সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করবে—সেটাই প্রত্যাশা।
খোলাবাজারে পণ্য বিক্রির (ওএমএস) ট্রাক থেকে পণ্য কিনতে উপকারভোগীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ট্রাক আসার নির্ধারিত সময়ের আগেই মানুষ লাইন ধরে দাঁড়ায়। যে কারণে তাদের অপেক্ষা বাড়ে। ট্রাক আসার আগে লাইনে না দাঁড়িয়ে তাদের উপায়ও নেই। কারণ প্রতিদিনই লাইনের শেষের কয়েকজনকে ফিরতে হয় খালি হাতে। তাদের সিরিয়াল আসার আগেই পণ্য ফুরিয়ে যায়। কাজেই বাজারের চেয়ে কম দরের পণ্য কেনার সুযোগ হারাতে চায় না স্বল্প আয়ের মানুষ। কষ্ট হলেও তারা সাতসকালে এসে লাইনে দাঁড়ায়। দীর্ঘ অপেক্ষার শেষে যদি কাঙ্ক্ষিত পণ্য মেলে তাহলে তাদের মুখে হাসি ফোটে। সরকার ওএমএসের আওতা বাড়িয়েছে। এ কার্যক্রম প্রতি বছর একটি নির্ধারিত সময় বন্ধ থাকলেও এবার সেটা হয়নি। তা সত্ত্বেও প্রয়োজন মেটানো যাচ্ছে না। দ্রব্যমূল্য বাড়ছে কিন্তু মানুষের আয় বাড়েনি। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা অনেক কমে গেছে। মূল্যস্ফীতির কারণে অনেক মানুষই এখন ওএমএসের পণ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। চাহিদা যে হারে বেড়েছে সে হারে জোগান বাড়েনি। ওএমএস ও টিসিবির আওতা ও বরাদ্দ বাড়াতে হবে।










