এক.

ছফিউল্লাহ জামালপুর জেলার ইসলামপুর থেকে আসা ঢাকায় বসবাস করা একজন যুবক। বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে তিনি কাজ করতেন। আহামরি না হলেও মোটামুটি বেতনে তার চলে যেতো। কিন্তু কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে ২৬ মার্চ থেকে দেশে সাধারণ ছুটি শুরু হয়। অফিস বন্ধ। প্রতিষ্ঠানটিও তার বেতন দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে। এভাবে ছফিউল্লাহদের মতো আরো অনেকেই কর্মহীন হয়ে পড়েছে। কারো কারো ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলো আবার একমাসের বেতন দিয়ে পরের মাসগুলোর বেতন দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী মেরিনা (আসল নাম নয়)। পরিবারে আয়ের উৎস বলতে তিনিই। চার থেকে পাঁচটি টিউশনে প্রতি মাসে আয় ছিল ২০ হাজার টাকারও বেশি। এই টাকা দিয়ে নিজের পড়াশোনার খরচ চালানোর পাশাপাশি পরিবারের ব্যয় মেটাতেন তিনি, কিন্তু করোনার কারণে তার সব টিউশন এখন বন্ধ। নিজে কিভাবে চলবেন বা সংসার খরচ কিভাবে চালাবেন, তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের শিক্ষার্থী মাসুম আহমেদ। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস করে তিন বছর আগে নেমেছেন চাকরি পাওয়ার যুদ্ধে। ৪০তম বিসিএসে লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন, যা শেষ হয়েছে জানুয়ারি মাসে। আরো কয়েকটি মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিলেও চূড়ান্ত ফল আসেনি। করোনার কারণে চাকরি পাওয়ার স্বপ্নটাও তার থমকে গেছে।    

২.

কভিড-১৯ সংকটের মধ্যেই ১১ জুন ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট ঘোষিত হতে যাচ্ছে। ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা, চিন্তা-ভাবনা। অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষক থেকে শুরু করে আমজনতার মধ্য থেকেও বিভিন্নজন তাদের মতামত তুলে ধরে বাজেট প্রণয়নকারী মন্ত্রণালয় তথা সরকারকে নানা পরামর্শ দিচ্ছেন। এরই মধ্যে সংবাদপত্রের মাধ্যমে বাজেটের সম্ভাব্য আকারের কিছু আভাসও পাওয়া গেছে। বাজেটের সম্ভাব্য আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। একটি বিশাল অংকের বাজেট বটে। এ বাজেট বাস্তবায়নে জনগণের ওপর করের বোঝাসহ বিভিন্ন চাপ আসছে এটা স্পষ্ট। 

২০২০-২০২১ অর্থবছরের বাজেটে চারটি খাতকে গুরুত্ব দেয়ার বিষয়ে সুপারিশ করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)। খাতগুলো হলো-স্বাস্থ্য, কৃষি, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী এবং কর্মসংস্থান। এ জন্য অর্থনীতিতে কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি করবে, অর্থনৈতিক গতি ত্বরান্বিত করবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এমন ব্যয় রেখে, অপ্রয়োজনয়ী ও অনুৎপাদনশীল ব্যয় কাটছাঁট করার পরামর্শ দিয়েছে গবেষণা সংস্থাটি।

তিন. 

কোভিড-১৯-এর আগেই কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাসের শ্লথগতি, আমদানি-রপ্তানি হ্রাস ও রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রায় ঘাটতির চিহ্ন ছিল। ফলে চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই সরকার ব্যাংক খাত থেকে লক্ষ্যমাত্রার পুরো ঋণ নিয়ে নিয়েছে। এর মধ্যে কোভিড-১৯ মহামারি এসে অর্থনীতিতে অভিঘাতের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাব ও বিস্তৃতির ফলে সব দেশেই অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট ও চাহিদা বদলেছে, যা আমাদের দেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। প্রায় তিন মাস ধরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা, বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কথিত লকডাউনে থাকা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পেশাজীবী ও শ্রমিক এবং প্রান্তিক কৃষকদের কর্মহীন হয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে এবারের বাজেটে কর্মসংস্থান, শিল্প ও কৃষি খাতে উৎপাদন, সার্ভিস সেক্টর সচল করাসহ দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিসঞ্চার করার মতো উপাদান থাকবে নিশ্চয়। 

চার.

এ কথা অনস্বীকার্য, যুবকদের সম্পৃকতা ছাড়া বিশ্বের কোথাও কখনো কোনো সংগ্রাম বা বিপ্লব সংঘটিত হয়নি। এদেশে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে সিপাহী বিপ্লব, কৃষক বিদ্রোহ, নীলকরদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, তেভাগা আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, বন্যার মতো জাতীয় দুর্যোগে স্যালাইন প্রকল্প, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, ’৯০-র গণঅভ্যুত্থান, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন, জাতীয় সম্পদ রক্ষা আন্দোলন, গণআদালত, সাম্প্রদায়িকতা-জঙ্গিবাদবিরোধী আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারীদের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও গণজাগরণ মঞ্চ সৃষ্টি ইত্যাদি বহুবিধ কর্মকাণ্ডে এদেশের যুব সমাজ এক সাহসী-উদ্যোগী ভূমিকা রেখেছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অগ্রসর ও প্রগতিশীল যুব সংগঠন বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন করোনাভাইরাস প্রতিরোধে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য বিনামূল্যে স্যানিটাইজার উৎপাদন, মাস্ক উৎপাদন, খাদ্যসামগ্রী বিতরণ, স্বাস্থ্য হেল্পলাইন চালুর কাজ করছে। এছাড়া হাওর অঞ্চলে প্রান্তিক কৃষকদের সাথে ধানকাটার কাজে অংশও নিয়েছে তারা। এ সংগঠনটি ১৯৭৬ সালের ২৮ আগস্ট থেকে একটি কার্যকর যুব আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। দেশের বন্যা-খরায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে, করোনা সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বাড়ানোর জন্য পাড়ায়-পাড়ায় কাজ করেছে এবং সবশেষে আম্পানের প্রবল ঝড়ে বিধ্বস্ত প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে কারা?-এদেশের যুবসমাজই।  

পাঁচ.

সরকারি উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের গবেষণায় দেখা যায়, শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে সম্পূর্ণ বেকার ৩৩ দশমিক ৩২ শতাংশ। অর্ধ শিক্ষিত বেকার, ছদ্ম বেকারের সংখ্যা নাই বা বললাম। বাংলাদেশে বেকারত্বের ভয়াবহতা জানতে কোনো জরিপের প্রয়োজন হয় না। বিসিএস ক্যাডার সার্ভিস কিংবা অন্য কোনো খাতে একটি শূন্য পদে চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যা দেখলেই সেটি অনুমান করা যায়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-এর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা ৩ কোটি। আইএলও-এর হিসাবটিকেই পর্যবেক্ষকরা বাংলাদেশের প্রকৃত বেকারের সংখ্যা বলে মনে করেন।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর পর থেকে দেশের এ বিপুল বেকার যুবকদের সঙ্গে নতুন করে কর্মহীন হয়ে পড়া আরো লক্ষ-কোটি যুবক যুক্ত হয়েছে। অর্থনীতিবিদ বিনায়ক সেনের মতে, ‘কোভিডের প্রাথমিক ধাক্কায় নতুন করে ৮০ লাখ থেকে আড়াই কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যেতে পারে। যারা ইতিমধ্যে দারিদ্র্যের মধ্যে আছে তাদের অধিকাংশই চরম দারিদ্র্যের কাতারে চলে আসবে’। আবার বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের হিসাবে, করোনার কারণে বাংলাদেশে চাকরি হারানোর তালিকায় যুক্ত হতে পারেন অন্তত দেড় কোটি মানুষ। এ প্রসঙ্গে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘এই দেড় কোটি মানুষ চাকরি হারালেও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে অন্তত ৫ কোটি মানুষ (প্রতি পরিবারে গড়ে ৪ জন করে সদস্য)’। সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) বলেছে, ‘করোনার কারণে প্রায় ৮৭ লাখ তরুণ-তরুণী দারিদ্রতার শিকার হবে। যুবকদের এই দারিদ্র তাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, চাকরি, আয় ও পারিবারিক সহিংসতার ওপর প্রভাব পড়বে’। ইতিমধ্যে বিজিএমইএ-র সভাপতি রুবানা হক বলেছেন, ‘জুন থেকেই শ্রমিক ছাঁটাই করা হবে।’ ইতিমধ্যে বিভিন্ন গণমাধ্যমে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ইস্যুকে কেন্দ্র করে সরকারের কাছ থেকে আবারও প্রণোদনা নেয়ার পাঁয়তারা করছে। তবে রুবানা হকের এ বক্তব্য বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে কর্মহীনদের সংখ্যা কতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, বাড়বে। 

কয়েক মাস আগের কথা। দৈনিক প্রথম আলো একটি তারুণ্য জরিপ করেছে। জরিপে তরুণদের কাছে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের কথা জানতে চাইলে তাতে দেখা যায় জীবনের লক্ষ্য, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান নিয়ে তাদের বেশি উদ্বেগ। ৭৪ দশমিক ৫ শতাংশ তরুণরাই এসব নিয়ে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় থাকেন। অথচ দুই বছর আগেও এই এই ধরনের হার ছিল ৬৩ দশমিক ১ শতাংশ। এই উদ্বেগের পেছনে কারণ হচ্ছে, ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা। 

আমরা যখন আমাদের এই ব্যাপক সংখ্যক জনশক্তিকে কাজ দিতে পারবো না তখন এই শক্তি পরিণত হবে আপদে। বেকারত্ব, অভাব, আর দারিদ্র্য তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি করবে। যুবকরা কাজ করতে চায়, আয় করতে চায়, জীবনে দাঁড়াতে চায়। কাজ না পাওয়া থেকে যে হতাশা তৈরি হবে তা এই যুবকদের সৃজনশীলতা, কর্মউদ্যোগ, ভালো কিছু করার ইচ্ছা, সমাজের পাশে দাঁড়ানোর  ইচ্ছা, প্রতিভা, সততা সব নষ্ট করে দেবে। হতাশা থেকেই যুব শক্তি হয়ে যেতে পারে পথচ্যুত ও মাদকাসক্ত। যার ফলে আমাদের ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে যাবে।   

এই যুবকদের কাজের পরিবেশের মধ্যে রাখার জন্য হতাশা থেকে মুক্তির জন্য কী করতে পারি? ধনী দেশগুলো ট্রিলিয়ন ডলার প্রণোদনা প্যাকেজ নিয়ে এগিয়ে আসছে। যুবকদের কাজের সুযোগ, শ্রমবাজার, বেকারত্ব, অভিবাসী শ্রমিক, নারী শ্রমিক, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, পেশাগত নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভাবতে হবে সরকারকে। যুবকদের ঋণ মওকুফ করতে হবে, সুদবিহীন র্ঋণ দিতে হবে, এবং বেশি বেশি কাজে নিয়োগ দিতে হবে। জাতীয় বাজেটে কর্মসংস্থান নামে কোনো খাত নেই। কমংস্থানের সংকট সমাধানের জন্য ঘুষছাড়া চাকরি ও সহজ শর্তে ঋণের নিশ্চয়তাসহ আসন্ন জাতীয় বাজেটের ৫ শতাংশ পৃথকভাবে কর্মসংস্থান খাতে বরাদ্দ দেওয়ার আহবান রাখছি। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন এ দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর বরাবর একটি স্মারকলিপি দিয়েছে। আমরা যদি যুবকদের অবস্থার উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ও দ্রুত উদ্যোগ না নিতে পারি, তাহলে এই ভাইরাসের দায় আমাদের দশক ধরে বয়ে বেড়াতে হবে।

হাবীব ইমন : সভাপতি, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, ঢাকা মহানগর