ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে দেশের উন্নয়নের প্রাণ হিসেবে অভিহিত করা হয়। বিশ্বের অধিকাংশ দেশের অর্থনৈতিক সাফল্যের পেছনে রয়েছে এসএমই খাত। কিন্তু সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এ খাতে আশানুরূপ সাফল্য অর্জন করতে পারেনি বাংলাদেশ। দুর্বল নীতি এবং যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতার অভাবকেই এর জন্য দায়ী করা হয়। বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রুগ্‌ণ ও বন্ধ শিল্পের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। দেশে বিসিকের ৮২টি শিল্পনগরীর সবগুলোই নানা সমস্যায় জর্জরিত। কোথাও প্লট বরাদ্দ নিলেও কারখানা হয়নি, আবার একসময় কারখানা থাকলেও এখন বাড়ি, দোকান কিংবা গুদামে পরিণত হয়েছে। যেখানে কারখানা করেছেন মালিকরা, স্বস্তিতে নেই তারাও। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সংকটে ধুঁকছেন। নিরাপত্তাহীনতার কারণে কারখানায় চুরি হচ্ছে প্রায়ই। বর্জ্য ও ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার অভাবে কোনো কোনো শিল্পনগরী পরিণত হয়েছে ময়লার ভাগাড়ে। সম্ভাবনার এমন পরিণতি কারো কাম্য নয়। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র কুটির শিল্প করপোরেশনকে নতুন করে সাজাতে হবে। তাদের অধীনে থাকা শিল্পনগরীগুলো সংস্কারের মাধ্যমে সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতও করা দরকার। একই সঙ্গে ভালো উদ্যোক্তাদের হাতে শিল্পপ্লট তুলে দিতে প্রতিযোগিতামূলক স্বচ্ছ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। 

দেশের শিল্প খাতকে এগিয়ে নেয়ার পেছনে একটি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকার কথা কমই আলোচনায় আসে। সেটি হচ্ছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এ প্রতিষ্ঠানের অধীনে পাকিস্তান আমলেই জেলাভিত্তিক ১৮টি শিল্পনগরী গড়ে তোলা হয়। বাংলাদেশ আমলে এসে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮২-তে। এতগুলো শিল্পনগরীতে অসংখ্য কলকারখানা গড়ে উঠেছে। শিল্পনগরীগুলো ঘিরে আর্থসামাজিক উন্নয়ন ঘটেছে। বিপুল মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, দারিদ্র্য বিমোচন ঘটেছে। এক কথায় ভারসাম্যপূর্ণ আঞ্চলিক উন্নয়নে বিসিক একটি উদাহরণ তৈরি করেছে বলা যায়। আবার এর উল্টো পিঠে হতাশাও কম নয়। কোনো কোনো শিল্পনগরীর দীর্ঘশ্বাসের শব্দ আমরা শুনতে পাই। প্রযুক্তি ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে শিল্পদুনিয়া এগিয়ে গেছে কত আগে আর বিসিক শিল্পনগরীগুলো পড়ে আছে পেছনে। যাকে বলা হয় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলা। বস্তুত শিল্প প্লটগুলোয় পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই। নেয়া হয়নি বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা। কিছু ক্ষেত্রে এমন জায়গায় শিল্পনগরী করা হয়েছে, যেখানে মানুষ যেতে চায় না। আসলে বিসিকে একটি সংস্কার প্রক্রিয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। বিসিক কর্তৃপক্ষ অবশ্য বলছে, সংস্থাটি তারা ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে। কী সেই উদ্যোগ? কোনো উদ্যোগই তো দৃশ্যমান হচ্ছে না। প্রথম কথা, শিল্পের নামে বরাদ্দ নিয়ে প্রতিষ্ঠান না গড়লে প্লট বাতিল করে অন্য উদ্যোক্তাকে দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, বরাদ্দকৃত প্লটে শিল্প-কারখানার পরিবর্তে অন্য কোনো স্থাপনা গড়লে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। তৃতীয়ত, দক্ষ উদ্যোক্তা সৃষ্টির লক্ষ্যে গবেষণা, উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, পুঁজির জোগান ও পণ্য বিপণনে সহায়তা দিতে হবে। এছাড়া ক্রেতা-বিক্রেতা সম্মেলনের আয়োজন, উদ্যোক্তাদের কর কমানোর বিষয়ে পদক্ষেপ এবং শিল্পের কাঁচামাল আমদানি ও পণ্যের মানোন্নয়নে সহায়তা প্রদান করতে হবে। বিসিকে জনবলেরও সংকট রয়েছে, বেশির ভাগ কর্মকর্তাই এখন অবসরের পথে। এ সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য নতুন নিয়োগ ও নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। 

ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর জন্যই মূলত বিসিকের জন্ম হয়। লক্ষ্য ছিল, ছোট ছোট উদ্যোক্তা বিসিকের এক-দুটি প্লট নিয়ে ব্যবসা শুরু করবেন। পরে ব্যবসা ভালো হলে ধীরে ধীরে মাঝারি ও বড় শিল্প গড়বেন। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ছোটরা নিজেদের ব্যর্থতার পাশাপাশি বড় বড় প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলো প্লট নেয়ার কারণে বিসিক শিল্পনগরী থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। বিসিক শিল্পনগরীর দুর্দশার কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—প্লট বরাদ্দের ক্ষেত্রে সঠিক উদ্যোক্তা নির্বাচন করতে না পারা, মূলধনের অভাব, ঋণপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে সমস্যা, শিল্প স্থাপনে যথাযথ ব্যবসা পরিকল্পনা না থাকা, কাঁচামালের অভাব, পণ্য বৈচিত্র্যকরণের উদ্যোগ না থাকা ও স্থানীয় বাজারে বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারা ইত্যাদি। যদিও সংস্থাটির কার্যক্রমের ক্ষেত্রই হচ্ছে উদ্যোক্তা সৃষ্টি, পণ্য বিপণন ও অর্থায়নে সহায়তা, পরিবেশবান্ধব শিল্প পার্ক স্থাপন, যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ দেয়া। তবে রুগ্‌ণ শিল্প বৃদ্ধির পেছনে এ বিষয়গুলোয় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের অভাবই দায়ী। দীর্ঘদিন ধরে বিসিক পুরনো কাঠামো দিয়েই ঢিমেতালে চলেছে। এর পরিবর্তন প্রয়োজন। 

বাংলাদেশ বিসিকের মূল উদ্দেশ্য হলো সমগ্র দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন, ভারসাম্যপূর্ণ আঞ্চলিক উন্নয়ন, অর্থ ও মানবসম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতকরণ এবং দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন। বিসিকের নীতিমালা অনুযায়ী কারখানা চালাতে না পারলে স্বেচ্ছায় তা বিক্রি করে দিতে হয়, তা না হলে প্লট বাতিল করে নতুন উদ্যোক্তাদের বরাদ্দ দিতে পারে বিসিক। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, এখন প্রকল্প প্রস্তাব পাওয়ার পর সম্ভাব্যতা যাচাই করে উদ্যোক্তাদের প্লট দেয়া হচ্ছে। প্লট নিয়ে প্রতিশ্রুত সময়ের মধ্যে যদি কেউ কারখানা তৈরি না করেন, তাহলে তাদের প্লট বাতিল করা হচ্ছে। পাশাপাশি যারা দীর্ঘ সময় ধরে কারখানা বন্ধ রাখছেন, তাদের প্লটও বাতিল করা হচ্ছে। এটি ঠিক যে নিয়ম ও আইন অনুযায়ী চলতে হবে। তবে বিসিক হলো দেশের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে নিয়োজিত সরকারি খাতের মুখ্য প্রতিষ্ঠান। বিশ্বায়ন ও মুক্তবাজার অর্থনীতির বিভিন্ন প্রভাব থেকে বিসিক নীতিগতভাবে নতুন শিল্পোদ্যোগকে সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন এবং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে থাকে। করোনা পরিস্থিতির জন্য নতুন বিনিয়োগ ও অর্থের সংস্থানের সংকট রয়েছে। সুতরাং বিসিককে বুঝতে হবে নিয়মনীতির যূপকাষ্ঠে পড়ে তাদের মূল উদ্দেশ্য যেন ব্যাহত না হয়।

সাধারণত বিসিকের কথা শুনলেই চোখের সামনে কিছু ছোট ও কুটির শিল্প কারখানার চিত্রই ভেসে ওঠে। কিন্তু বিসিক থেকে অনেক নামজাদা শিল্প-কারখানাও গড়ে উঠেছে, যারা দেশে-বিদেশে নাম কুড়িয়েছে। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, যেটি ১৯৮৯ সালে পাবনা বিসিক শিল্পনগরীতে স্থাপিত হয়েছিল। একসময়ের জনপ্রিয় ন্যাশনাল ফ্যানের সুখ্যাতি ছড়ায় টঙ্গী বিসিক থেকে। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৯ সালে। এ সময়ের দারুণ সফল ও জনপ্রিয় ব্র্যান্ড আরএফএলের যাত্রা হয়েছিল রংপুর বিসিক শিল্পনগরী থেকে। একইভাবে বরিশাল বিসিক থেকে পথচলা শুরু করেছিল দেশের প্রথম প্রজন্মের বিস্কুট কারখানা বেঙ্গল বিস্কুট। এছাড়া বিসিক শিল্পনগরীর নামজাদা অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে জাহাজ মার্কা আলকাতরা, মেরিডিয়ান চিপস, হ্যামকো ব্যাটারি, বিআরবি কেবলস, কৃষি যন্ত্রপাতির কারখানা বগুড়ার উত্তরা এজেন্সি অটোমোবাইল, গাড়ির যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান বগুড়া মটরস উল্লেখযোগ্য। ফলে সম্ভাবনা রয়েছে, প্রয়োজন তার পরিচর্যা। সঠিক উদ্যোক্তা নির্বাচন ও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা প্রদান জরুরি। সরকার দেশব্যাপী ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করছে বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য। অথচ দেশে ৮২টি বিসিক শিল্পনগরী ধুঁকছে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাবে, যা কাম্য নয়। শিল্প-কারখানাগুলোয় এমন পরিমাণ সাহায্য করতে হবে যেন তারা ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তারা সহায়তা পেল কিন্তু ঘুরে দাঁড়াতে পারল না তাতে তো কোনো লাভ হবে না। তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন তা দিতে হবে। কেননা ভালো প্রতিষ্ঠান রুগ্‌ণ হয়ে গেলে তাতে অর্থনীতিরই ক্ষতি। আগে নেয়া ঋণ খেলাপি হয়ে যাবে। ব্যাংকও ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। আমরা মনে করি, বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হলেও সময়মতো সরকার তা জোগান দেবে।