রিজার্ভের অর্থ অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয়ের লক্ষ্যে সরকার বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়ন তহবিল (বিআইডিএফ) গঠন করেছে। এরই মধ্যে এ তহবিল থেকে ‘পায়রা বন্দরের রাবনাবাদ চ্যানেলের ক্যাপিটাল ও মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং’ স্কিমে অর্থায়নের লক্ষ্যে ত্রিপক্ষীয় ঋণ চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, এটি সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংক তদারক করবে। ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন অ্যাক্ট মেনে বাংলাদেশ ব্যাংক এটা ব্যবহারের জন্য পুনঃঅর্থায়ন স্কিম করতে পারে। স্মরণকালের সর্বোচ্চ উচ্চতায় বিদেশী মুদ্রার মজুদ। এ অর্থ দিয়ে মেটানো যাবে ১০ মাসের আমদানি ব্যয়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, তিন মাসের রিজার্ভের মজুদ থাকাই যথেষ্ট। এমন প্রেক্ষাপটে রিজার্ভ ব্যবহারের মাধ্যমে অবকাঠামো নির্মাণের পদক্ষেপটি ইতিবাচক। কিন্তু এর কিছু ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ঝুঁকি নির্ভর করবে এর ব্যবস্থাপনার দক্ষতার ওপর। রিজার্ভ শক্তিশালী হওয়ায় বিদেশী ঋণ পাওয়াটা বাংলাদেশের জন্য সহজ হয়ে উঠেছিল। রিজার্ভ রেকর্ড বৃদ্ধির কারণ করোনায় আমদানি ও শিল্প উৎপাদন হ্রাস এবং রেমিট্যান্সপ্রবাহ বৃদ্ধি। ভবিষ্যতে বিনিয়োগ বেড়ে উঠলে আমদানিও বাড়বে। এ চাহিদা মেটাতে রিজার্ভের অর্থের প্রয়োজন হবে।

রিজার্ভের অর্থ কোন প্রকল্পে ব্যয় করা হচ্ছে, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আলোচ্য ক্ষেত্রে প্রথম অর্থ দেয়া হচ্ছে পায়রা বন্দরকে। এক্ষেত্রে পায়রা বন্দর টেকসই প্রকল্প কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। এ ধরনের প্রকল্পে রিজার্ভের অর্থ বিনিয়োগ করলে বাণিজ্যিক স্বার্থ পূরণ হবে কিনা, তা-ও বিবেচনায় রাখতে হবে। এছাড়া বাংলাদেশে সরকারি খাতের এক প্রতিষ্ঠান আরেক প্রতিষ্ঠানকে অর্থ ফেরত দেয়া নিয়ে গড়িমসি করে। ব্যাংকের অর্থ নিয়ে ফেরত না দেয়ার উদাহরণও রয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছেই ব্যাংকের পাওনার পরিমাণ কম নয়। রিজার্ভের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটলে তাতে আর্থিক ক্ষত বড় হবে। বহির্বিশ্বে আমাদের ভাবমূর্তি শঙ্কায় পড়বে। রিজার্ভের অর্থ কোনো কারণে সংকটে পড়লে বিদেশী ঋণ পেতেও বেগ হতে পারে। মনে রাখতে হবে এটি সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির জন্য রাজস্ব খাত থেকে পাওয়া অর্থ নয়। তাই এর ব্যবস্থাপনাও আলাদা হতে হবে। রিজার্ভের অর্থ ব্যবহারে ব্যাংকিং মডেলে কাজ করলেও এর মান হতে হবে বৈশ্বিক। অর্থাৎ কাকে টাকা দেয়া হবে এবং সেটি সঠিকভাবে কাজে লাগানো হবে কিনা, সর্বোপরি সঠিক সময়ে ফেরত আসবে কিনা, তা নিশ্চিত করতে হবে। নইলে দায়-দেনা বাড়বে, রিজার্ভের অর্থের অপব্যবহারের ঝুঁকিও তৈরি হবে।

অর্থনীতির ভিত কতটা শক্তিশালী তা বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিমাপক হলো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। ফলে এটি ব্যবহারে অধিক মনোযোগ ও তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। রিজার্ভের অর্থ সব জায়গায় ব্যবহার করা যায় না। এজন্য সুনির্দিষ্ট নিয়মকানুন-বিধিবিধান তৈরি করা দরকার। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং নিয়মকানুনগুলো দৃঢ়তার সঙ্গে মেনে চলতে হয়। কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার হচ্ছে কিনা, নিয়ম মানা হচ্ছে কিনা এবং ঝুঁকি নির্ণয় করে টাকা ব্যবহার করা হচ্ছে কিনা এসব বিষয় নিশ্চিত করা। এর দায়বদ্ধতা অনেক। অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে হবে এর ব্যবহার যাতে সুষ্ঠু হয়। সাধারণ ব্যাংকিং ঋণের চেয়েও এখানে ভিন্ন নিয়ম ও সতর্কতা মেনে চলতে হবে। নইলে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে। ঠিকমতো ব্যবহার না হলে দক্ষতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠবে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাইলেই অবকাঠামোগত উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করা যাবে, সেটা নয়। অনেক দেশের রিজার্ভের পরিমাণ আরো বেশি কিন্তু তারা অবকাঠামো কাজে ব্যবহার করছে এমন নয়। এর বড় কারণ হলো, যে পরিমাণ রিজার্ভ এখনো আছে, সেটা আমদানি ব্যয় মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়। রিজার্ভের অর্থ ব্যবহার করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন, আইনি প্রস্তুতি প্রয়োজন। এ তহবিল পরিচালনা করার মতো দক্ষতা ও কাঠামো আছে কিনা, সেটাও বিবেচনায় নিতে হবে। এ ধরনের তহবিল ব্যবহারের ক্ষেত্রে সরকারি অন্যান্য কোষাগারের টাকা যেভাবে ব্যবহার করা হয়, সেভাবে ব্যবহার করা যৌক্তিক হবে না। বর্তমানে বাংলাদেশ ও বিশ্ববাজারের অর্থনীতি এক ধরনের অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে রিজার্ভ থেকে অর্থ ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে।

বর্তমানে ৫০টির মতো দেশে রিজার্ভের অর্থে সার্বভৌম সম্পদ তহবিল রয়েছে বলে খবর মিলছে। বিশ্বের যেসব দেশ রিজার্ভের অর্থ ব্যবহার করেছে, তাদের প্রক্রিয়া ভিন্ন। অর্থাৎ স্থানীয় মুদ্রায় রূপান্তর না করে, পৃথক কোম্পানি খুলে অর্থ ব্যবহার করেছে অধিকাংশ দেশ। বিশেষ করে বিদেশী কেনাকাটার দায় মেটানোর কাজে এ অর্থ ব্যবহার হয় বেশি। যেখানে শর্ত থাকে, যেকোনো সময় এ অর্থ ফিরিয়ে দিতে হবে। রিজার্ভ ব্যবহার করেছে চীন, জাপান, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং, সিঙ্গাপুর। সেক্ষেত্রে দেখা যায়, সিঙ্গাপুর রিজার্ভের অর্থ ব্যবহার করেছে পৃথক কোম্পানির মাধ্যমে, যার নাম সিঙ্গাপুর বিনিয়োগ করপোরেশন (জেআইসি)। জেআইসি হলো সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের প্রধান বিনিয়োগকারী এজেন্ট। রিজার্ভ ব্যবহারে ওই দেশগুলোর অভিজ্ঞতা নীতিনির্ধারকদের আমলে নেয়া উচিত।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ একটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বিদেশীদের আস্থার নির্দেশক। তবে শুধু রিজার্ভ বেশি হলেই অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী বলার সুযোগ নেই। বেশি রিজার্ভ থাকলে অর্থনৈতিক খাতে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট মোকাবেলা করা যায়। এজন্য প্রায় সব দেশই রিজার্ভের পরিমাণ বেশি রাখতে চায়। করোনা সংকটকালীন এ সময়ে রিজার্ভ ধরে রাখাই নিরাপদ কৌশল। এখন কত মাসের রিজার্ভ রাখা হবে, তা নির্ধারণ করতে হবে। সংকটের সময় তিন মাস নাকি ছয় মাসের মজুদ প্রয়োজন, তা-ও খতিয়ে দেখা দরকার। এখন অল্প পরিমাণে অর্থ বিনিয়োগ করা হচ্ছে কিন্তু ভবিষ্যতে এর পরিমাণ বাড়লে আর তার ব্যবস্থাপনা দক্ষতা ঠিকমতো নিশ্চিত না হলে মূল্যস্ফীতি কিংবা মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতার মতো সংকটের আশঙ্কা থাকে। রিজার্ভের অর্থ ব্যবহার নিয়ে কোনো সমস্যা তৈরি হলে সেটি পরে আবার বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও যেমন সমস্যা সৃষ্টি করবে, তেমনি যারা বৈদেশিক মুদ্রা পাঠান, তাদের মধ্যেও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে।