পিপলস রিপাবলিক অব চায়না। জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের বৃহত্তম রাষ্ট্র। ইরান, ভারত ইনকা, মায়ার মতো প্রাচীন চীনের সভ্যতা। ১৯৪৯ সালে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে বিপ্লবের পর এক নতুন চীনের যাত্রা হয়। নানা রকম সংস্কার ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বর্তমান বিশ্বে চীন অন্যতম এক পরাশক্তি। জিডিপির হিসাবে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ফসল নয়া চীন এখন পুঁজিবাদী বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্র। ঐতিহাসিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষিতে চীনের শক্তি-দুর্বলতা, সাফল্য-ব্যর্থতা ও ধারাবাহিক পরিবর্তনগুলো নিয়ে লিখেছেন আনু মুহাম্মদ

কৃষক বিদ্রোহ

অনেক কৃষক-জনবিদ্রোহ উনিশ শতকের চীনের সমাজ ও রাষ্ট্রক্ষমতার ভিতে বড় আকারের নাড়া দেয়। বেশির ভাগ বিদ্রোহ আপাতদৃষ্টিতে ব্যর্থতায় শেষ হলেও তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পরবর্তী শতকের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করে। বিভিন্ন অনুসন্ধানী বিবরণী থেকে ধারণা করা যায়, উনিশ শতকে চীনের অভ্যন্তরে জনবিক্ষোভ ও বিদ্রোহ যে রক্তাক্ত দমনের শিকার হয় তাতে ১০ লক্ষাধিক মানুষ নিহত হয়। এর বাইরে যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট খাদ্যাভাব, দুর্ভিক্ষ এবং বিভিন্ন রকম অসুস্থতায় প্রায় দুই কোটি মানুষ নিহত হয় বলে বিভিন্ন ইতিহাসবিদ দাবি করেন।

উনিশ শতকের বেশির ভাগ প্রবল বিদ্রোহ সংঘটিত হয় ৫০ ও ৬০ দশকে। এর মধ্যে ‘তাইপিং বিদ্রোহ’ খুবই উল্লেখযোগ্য। দক্ষিণ চীনে এ বিদ্রোহ শুরু হয় ১৮৫০ সালে, অব্যাহত থাকে ১৮৬৪ পর্যন্ত। বিদ্রোহের সঙ্গে যে কাহিনী প্রচলিত তাতে হং জিউ কুয়ান নামে এক ব্যক্তির কথা জানা যায়, যিনি নিজেকে যিশুর ছোট ভাই হিসেবে প্রচার করতেন এবং দেশের অবিচার অত্যাচার বৈষম্যের বিরুদ্ধে যিশুর নামেই বিদ্রোহ পরিচালনা করেন। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ধর্মের আবরণ থাকলেও এটি ছিল বস্তুত সামন্ত নির্যাতনের ভয়াবহতার বিরুদ্ধে ব্যাপক কৃষক জনতার অসন্তোষ থেকে সৃষ্ট বিদ্রোহ। সেজন্যই এতে মানুষের বিপুল অংশগ্রহণ সৃষ্টি হয়েছিল। বহু বছর এ হংয়ের নেতৃত্বে দক্ষিণ চীনে তিন কোটি মানুষের এলাকায় প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন রাজ্য টিকে ছিল। এর রাজধানী ছিল নানজিং।

বিদ্রোহীদের চেষ্টা ছিল ব্যাপক সমাজ সংস্কার করা, যার মধ্যে সম্পত্তিতে সর্বজনের অধিকার, নারীর সমানাধিকার প্রশ্ন অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে যেক্ষেত্রে সংস্কার করতে গিয়ে তাদের সমর্থন কমেছে সেটি হলো কনফুসিয়ান, বৌদ্ধ মতবাদ ও চীনা লোকসংস্কৃতি বর্জন করে খ্রিস্টধর্মের বিস্তার। তার পরও সামাজিক ক্ষেত্রে জনগণের অবস্থার পরিবর্তনের কর্মসূচি থাকায় তারা বহু বছর টিকে থাকতে পেরেছে। খ্রিস্টধর্মের বিস্তারের চেষ্টা সত্ত্বেও বিদ্রোহীরা ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। বরং ব্রিটিশ ও ফরাসিদের সহায়তা নিয়েই কিং সম্রাট শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহ নিশ্চিহ্ন করতে সক্ষম হন। তার আগেই অবশ্য বিদ্রোহের নেতা অসুস্থতায় মৃত্যুবরণ করেন। তার কোনো চিহ্ন না রাখার জন্য দেহাবশেষ পুড়িয়ে কামানের গোলায় ভরে সেই ছাই দূরে নিক্ষেপ করা হয়।

কাছাকাছি সময়ে কিং সাম্রাজ্য চীনের বিভিন্ন অঞ্চলে আরো অনেকগুলো বিদ্রোহের সম্মুখীন হয়। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: পান্টি-হাক্কা গোত্র যুদ্ধ (১৮৫৫-৬৭), নিয়ান বিদ্রোহ (১৮৫১-৬৮), মিয়াও বিদ্রোহ (১৮৫৪-৭৩), পান্থে বিদ্রোহ (১৮৫৬-৭৩), ডুংগান বিদ্রোহ (১৮৬২-৭৭)। এসবের রেশ থাকতে থাকতেই উত্তর চীনে ১৮৭৬-৭৯ সময়কালে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, যাতে প্রায় ৯০ লাখ থেকে দেড় কোটি মানুষ মৃত্যুবরণ করেন বলে ধারণা করা হয়। ১৮৯৮ সালে তত্কালীন সম্রাট সাংবিধানিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও তা কার্যকর হয়নি। শতকের শেষ বছরে চীনের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদেশী শক্তির ক্রমবর্ধমান প্রভাবের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে এবং তা গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ১৮৯৯ থেকে ১৯০১ পর্যন্ত সংঘটিত এ বিদ্রোহ ‘বক্সার বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত হয়।

বস্তুত প্রথম ও দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধে চীনের পরাজয়ের পর সেখানে ইউরোপীয় শক্তির প্রভাব অনেক বাড়ে। ব্যবসায়ী ও সেনাবাহিনীর ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি ছাড়াও বাড়ে তাদের সঙ্গে সম্পর্কিত খ্রিস্টান মিশনারির সংখ্যাও। বক্সার বিদ্রোহের পেছনে ছিল জনগণের মধ্যে সৃষ্ট ব্যাপক ক্ষোভ, যার পেছনে দুটো কারণ প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করে। এর একটি হলো বিস্তৃত খরায় মানুষের দুর্ভোগ এবং দ্বিতীয় ছিল বিদেশীদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব, যাকে নিজেদের সমস্যা সমাধানের পথে বাধা হিসেবে দেখেছেন চীনের মানুষ। এ বিদ্রোহে সম্রাটের প্রভাবাধীন বিভিন্ন গোষ্ঠীর একাংশও যোগ দেয়। কারণ তাদের ভয় ছিল ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির আধিপত্য চীনে ভারতের পরিণতি নিয়ে আসবে।

বক্সার বিদ্রোহে প্রধানত তরুণরাই অংশ নেয়। কোন কোন অঞ্চলে এটি খ্রিস্টান জনগোষ্ঠীর ওপর সাম্প্রদায়িক হামলারও রূপ নেয়। বিদ্রোহী বাহিনীতে নারীর অংশগ্রহণ অনুমোদিত ছিল না। সেজন্য ভিন্নভাবে গড়ে ওঠে নারী বাহিনী। বিদ্রোহীদের ক্রমবর্ধমান বিস্তৃতিতে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তাদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় সম্রাটের বাহিনী বক্সার বিদ্রোহীদের নির্মমভাবে দমন করে। সরকারের মধ্যে থেকে যেসব ব্যক্তি এ বিদ্রোহের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। শেষ পর্যন্ত তাতে কোনো কাজ হয়নি।

বিদ্রোহ ও জনবিক্ষোভই এক দশকের মাথায় সম্রাটের শাসনের অবসান ঘটায় এবং ২০ শতকের প্রথম দিকে চীনা প্রজাতন্ত্রের আবির্ভাব ঘটে।

বিশ্ব বাণিজ্য

চীনের সম্পদ, ঐশ্বর্য ও প্রযুক্তি নিয়ে ইউরোপের আগ্রহ বহু পুরনো। আগেও কেউ কেউ ইউরোপ থেকে চীন সফর করেছেন, তবে ত্রয়োদশ শতকে ইতালির মার্কোপোলোর সফরেরই প্রথম বিস্তৃত প্রামাণ্য বিবরণ পাওয়া যায়। কারণ কুবলাই খানের শাসনাধীন চীন থেকে ২৩ বছর পর দেশে ফিরে মার্কোপোলো তার সফর নিয়ে বিস্তারিত লিখেছিলেন। তত্কালীন ইউরোপ তার কাছ থেকে চীনের সমৃদ্ধি সম্পর্কে জেনে মোহিত হয়েছিল। চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিস্তৃত হয় বিশ্বের বহু অঞ্চলে, ‘সিল্ক রুট’ ছিল অন্যতম যোগাযোগ পথ, এর নামকরণও হয়েছিল চীনা সিল্কের নামে। তবে ইউরোপসহ পশ্চিমা বিশ্ব এ বাণিজ্যে কর্তৃত্ব নিয়ে অংশগ্রহণের সক্ষমতা অর্জন করে কেবল শিল্পবিপ্লব শুরুর পরই।

অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি থেকে চীনের চা বহির্বিশ্বে আমদানি শুরু করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। উনিশ শতকের প্রথমার্ধেই ব্রিটেন ও আমেরিকায় এ চায়ের চাহিদা এত বেড়ে যায় যে এটাই হয়ে দাঁড়ায় এ কোম্পানির মুনাফার প্রধান উৎস। এর ওপর আরোপিত শুল্ক থেকেই তখন ব্রিটেনের মোট রাজস্বের এক-দশমাংশ আয় হতো। এর সঙ্গে চীনা সিল্ক, চীনামাটির বাসন-কোসনসহ আরো বেশকিছু দ্রব্য তালিকায় নিয়ে পরিষ্কার দেখা যায়, তখন ইউরোপ ও আমেরিকায় চীনা দ্রব্যের চাহিদা ছিল লাভজনক বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম অবলম্বন। কিন্তু বিশ্ববাণিজ্যের এ অবস্থা ছিল খুবই ভারসাম্যহীন। কেননা ইউরোপ-আমেরিকায় চীনা দ্রব্যের চাহিদা বাড়তে থাকলেও তখন চীনে ইউরোপ-আমেরিকার পণ্যের চাহিদা তৈরি হয়নি, চীনা বাজারে ইউরোপ আমেরিকার কোনো পণ্যই আগ্রহ তৈরি করতে পারেনি। চীনাদের ভাষ্য ছিল, খাদ্য, পোশাক-আশাকসহ সব ক্ষেত্রেই চীনের দ্রব্য উন্নততর। সুতরাং তাদের কোনোকিছুই আমদানি করার দরকার নেই।

চীনে তখন ব্রিটিশদের বাণিজ্যের জন্য একটি বন্দরই খোলা ছিল—জোয়ানজো, যা ক্যান্টন নামেও পরিচিত। কিন্তু আর কোনো বন্দরের অনুমতি পাওয়া যায়নি। পণ্যের বাজারেরও কোনো নিশ্চয়তা মেলেনি। এর ফলে বাণিজ্য সম্প্রসারিত হতে থাকল ঠিকই, কিন্তু তা থেকে গেল প্রায় একমুখী, ফলে ক্রমবর্ধমান হারে তা হতে থাকল অসম। এর ফলে ব্রিটেনের মুদ্রা বিশেষত স্বর্ণ ও রূপা গিয়ে জমতে থাকল চীনে। কিন্তু এর বিপরীত স্রোত সৃষ্টি করা হয়ে দাঁড়াল দুষ্কর। তখনই ব্রিটিশ বণিকরা আফিমের মধ্যে দেখল তাদের সংকট থেকে বের হওয়ার একমাত্র পথ, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা। তাই চীনে তার রফতানি চেষ্টায় বহুমুখী তত্পরতা শুরু হলো।

আগেই বলেছি, চীনে এ আফিমের বাজার তৈরিও সহজ ছিল না। চীন কর্তৃপক্ষ রাজি ছিল না, তাদের রাজি করাতে ব্রিটিশদের যুদ্ধ করতে হলো। এ যুদ্ধে চীনের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে চীনের বাজার উন্মুক্ত হলো আফিমের জন্য। শুধু তা-ই নয়, পরাজয়ের পর জরিমানা হিসেবে হংকং চলে গেল ব্রিটিশদের হাতে। আর তার সঙ্গে শুরু হলো চীনের অপমানের আরো অধ্যায়। এর আগেই ম্যাকাও পর্তুগিজরা দখলে নিয়েছিল। চীনে একের পর এক ইউরোপীয় কোম্পানির আধিপত্য বাড়তে থাকল। মার্কিনরাও ছিল পেছনে। উনিশ শতকের শেষে এসে জাপানের কাছে তার পরাজয় ছিল আরো বড় আঘাত। শুধু সামরিক নয়, সাংস্কৃতিকও; কেননা চীনারা বিশ্বাস করত চীনের সংস্কৃতি দর্শন নিয়েই গড়ে উঠেছে জাপান। কিন্তু ১৮৬৮ সালে মেইজি পুনরুত্থানের মধ্য দিয়ে জাপান তখন ইউরোপের শিল্পবিপ্লবের মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে, এগিয়ে গেছে চীনের তুলনায়। সে কারণে ইউরোপের মতো জাপানও নিজ ক্ষমতা বিস্তারের তাগিদেই নতুন নতুন সম্পদ ও বাজার দখলে আগ্রাসী।

প্রকৃতপক্ষে ১৯৪৯ সালের বিপ্লব ছিল চীনকে শতবর্ষের অপমানের ভার থেকে মুক্ত করার সামাজিক তাগিদের এক শক্তিশালী বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু এর ক্ষেত্র তৈরিতে বিশ শতকের শুরু থেকেই নানা পরিবর্তন ভূমিকা পালন করে।

সান ইয়াৎ সেন ও প্রজাতন্ত্রের আবির্ভাব

চীনে সম্রাটের শাসন বা রাজতন্ত্রের ব্যবস্থা নানা অভ্যন্তরীণ সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে উনিশ শতকের মধ্যেই। একদিকে বিদেশী আগ্রাসন এবং অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ জনবিদ্রোহ এ সংকট বাড়ায় এবং এর পতন অনিবার্য হয়ে পড়ে। অনেক ঘটনাবলি, লড়াই ও রক্তপাতের পর বিশ শতকের শুরুতেই সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। চীন প্রবেশ করে প্রজাতন্ত্রের পর্বে। প্রজাতন্ত্র হিসেবে চীনকে পুনর্গঠন করা সহজসাধ্য বা শান্তিপূর্ণ ছিল না। কিন্তু এ পর্ব ছিল ভবিষ্যতের আরো বড় পরিবর্তনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

চীনের প্রজাতন্ত্র হিসেবে আবির্ভাবের সঙ্গে যার নাম সবচেয়ে বেশি শোনা যায় তিনি ডা. সান ইয়াৎ সেন (১২ নভেম্বর ১৮৬৬-১২ মার্চ ১৯২৫)। চীনের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের পথিকৃৎ হিসেবে তিনি স্বীকৃত। তাকে ১৯১২ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। তিনি চীন প্রজাতন্ত্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ‘বিপ্লবী ঐক্য’ নামের একটি মঞ্চ থেকেই কিং সাম্রাজ্য পতনের আন্দোলন পরিচালিত হয়। পরে এ মঞ্চের ধারাবাহিকতা থেকেই কুওমিংটান নামে রাজনৈতিক দলের জন্ম হয়। সান ইয়াৎ সেন এরও অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। তার রাজনৈতিক মতাদর্শের মূল ভিত্তি ছিল তিনটি: জাতীয়তাবাদ (সরহুঁ), গণতন্ত্র (সরহয়ঁধহ) ও জনকল্যাণ (সরহংযবহম)। সানের জীবন ছিল খুবই সংঘাতময়, বহুবার তাকে নির্বাসনে যেতে হয়েছে। প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরও তার জীবন নিরাপদ হয়নি।

উনিশ শতকের শেষদিকে কিং সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে উপর্যুপরি বিদ্রোহের কালে সান ইয়াৎ সেন হংকংয়ে চিকিৎসাশাস্ত্রের ছাত্র ছিলেন। তবে একই সঙ্গে তিনি চীনের ভেতর ও বাইরে নানা সংগঠনের মাধ্যমে তত্পর ছিলেন। ডাক্তার হিসেবে তার কর্মজীবন স্থগিত করেই চীনকে বদলানোর রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে বিভিন্ন কর্মযজ্ঞে যোগ দেন তিনি। বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে বহুমুখী তত্পরতার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন সান। অনেকগুলো গ্রুপ তৈরি হয়েছিল তখন। কেউ কেউ সম্রাট শাসনের সংস্কার শক্তিশালীকরণের পক্ষে ছিলেন, কেউ কেউ এর পরিবর্তনের নানা মডেল নিয়ে কথা বলছিলেন। অভ্যুত্থান, ক্ষমতা দখলের তত্পরতাও ছিল। এসবের সঙ্গে যুক্ত থাকার দায়ে সানকে বেশ কয়েকবার নির্বাসনে যেতে হয়েছিল। সান ইয়াৎ সেনের রাজনৈতিক তত্পরতায় প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন তার হাউয়াই প্রবাসী ভাই। এখানেই সান তার ‘রিভাইভ চায়না সোসাইটি’ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে সানের ভাই তার ১২ হাজার একর খামারের জমি ও গবাদিপশুর বড় অংশ বিক্রি করে সানের বিপ্লবী তত্পরতায় অর্থ জোগান দেন।

উনিশ শতকের শেষে ফিলিপাইনে বিপ্লবী সংগ্রাম বিস্তার লাভ করে, মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ফিলিপাইনের যুদ্ধও সে সময়ের ঘটনা। সানের সঙ্গে ফিলিপিনো বিপ্লবীদের যোগাযোগ আদান-প্রদান শুরু হয়। সানের ধারণা ছিল ফিলিপাইনে স্বাধীনতা সংগ্রাম বিজয়ী হলে চীনে বিপ্লবী আন্দোলন অনেক অনুকূল উপাদান পেয়ে আরো গতিপ্রাপ্ত হবে। কিন্তু ১৯০২ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র বিজয়ী হিসেবে ফিলিপাইনে তার দখল নিশ্চিত করে।

বস্তুত সান ইয়াৎ সেনের নেতৃত্বে বেশ কয়েকটি অভ্যুত্থান পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। সেজন্য তাকে বারবারই নির্বাসনে যেতে হয়। শুধু জাপান নয়, নির্বাসনে তাকে যেতে হয়েছে ইউরোপের বিভিন্ন শহরে, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায়ও। এসব স্থানে তিনি প্রবাসী চীনা ও সেদেশীদের মধ্যে নতুন চীন নিয়ে জনমত তৈরি করেছেন, তহবিল সংগ্রহ করেছেন। তবে বিভিন্ন স্থানে চীনের রাজকীয় গোয়েন্দা সংস্থার হয়রানির শিকারও হয়েছেন। আটক হয়েছেন, হত্যার চেষ্টাও হয়েছিল।

১৯০৫ সালে টোকিওতে তিনি চীনা ছাত্রদের বিপ্লবী গ্রুপে যোগদান করেন। মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে প্রবাসী চীনাদের মধ্যেও তখন এ ধরনের পরিবর্তনকামী চিন্তার বিস্তার ঘটছিল দ্রুত। সে কারণে সানের সঙ্গেও তাদের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। এসব অঞ্চলে অনেকগুলো পাঠচক্রের মাধ্যমে নতুন চিন্তার বিকাশ ও বিস্তার ঘটতে থাকে। ১৯০৭-৮-এ বেশ কয়েকটি অভ্যুত্থান চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এসব ব্যর্থতার কারণে সানবিরোধী বেশ কয়েকটি গ্রুপও তৈরি হয়, সানপন্থী ও সানবিরোধী এ দুই গ্রুপে বিভক্ত হয়ে যায় বিপ্লবী গ্রুপগুলো।

১৯১১ সালের ২৭ এপ্রিল আরেকটি ব্যর্থ অভ্যুত্থান হয়, শহীদ হন অনেকে। কিন্তু একই বছরের ১০ অক্টোবর হুয়াং জিংয়ের নেতৃত্বে সফল সশস্ত্র অভ্যুত্থান ঘটে, যা দুই হাজার বছরের সাম্রাজ্যিক শাসনের অবসান ঘটায়। কিন্তু এতে সান ইয়াৎ সেন সরাসরি যুক্ত ছিলেন না। তিনি তখন যুক্তরাষ্ট্র সফর করছিলেন, সেখান থেকে ফিরে আসেন এর পর পরই। ১৯১১ সালের ২৯ ডিসেম্বর বিভিন্ন প্রদেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে নানকিংয়ে সর্বদলীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সভায় সান ইয়াৎ সেনকে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট, লি ইওয়ান হং ভাইস প্রেসিডেন্ট ও হুয়াং জিংকে সামরিক বিষয়ক মন্ত্রী নির্বাচন করা হয়। চীন রিপাবলিক বা সর্বজনতন্ত্রের যাত্রা হয় ১৯১২ সালের ১ জানুয়ারি। (চলবে)

 

আনু মুহাম্মদ: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়