বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত কৃষক শুমারি ২০১৯-এর তথ্যানুযায়ী, দেশের কৃষক পরিবারগুলোর মধ্যে ৯১ দশমিক ৭ শতাংশই ক্ষুদ্র কৃষক পরিবার। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, বড় পরিবারগুলো ভেঙে যাওয়ায় বড় ও মাঝারি শ্রেণীর কৃষক পরিবারগুলো দিন দিন ছোট হয়ে আসছে। গত ১১ বছরে বড় ও মাঝারি শ্রেণীর কৃষক পরিবারের হার অর্ধেকে নেমেছে। ছোট কৃষক পরিবারের হাতেই এখন দেশের কৃষি। পরিবারগুলো যত ভাঙছে, জমি ততই ক্ষুদ্রাকৃতির হচ্ছে। এটাই বাস্তবতা। মানুষ বাড়ছে, কিন্তু কৃষিজমি কমছে। স্বল্প জমিতে অধিক মানুষের খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করতে হলে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে অন্যতম প্রতিবন্ধক। কারণ তাদের রয়েছে মূলধনস্বল্পতা, প্রযুক্তি অভিগম্যতাও কম। তাছাড়া খণ্ড-বিখণ্ড জমির উৎপাদনশীলতা বাড়ানো ব্যয় সাশ্রয়ীও নয়। এমন পরিস্থিতিতে ভূমি সংস্কার কমিউনিটিভিত্তিক চাষাবাদের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। অন্যথায় ব্যয় বাড়বে কিন্তু কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়বে না, যা আমাদের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

ভূমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে দেখা যায়, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক স্বীয় অস্তিত্ব বজায় রাখার জন্য নিজের জমিতে চাষ করার পাশাপাশি অন্যের জমি বর্গা বা লিজ নিয়ে চাষ করেন; কখনো শ্রমিক হিসেবেও অন্যের জমিতে কাজ করেন। খেতমজুর নাকি কৃষক—এ পরিচয় সুস্পষ্ট করার ক্ষেত্রে যা দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে। অন্যদিকে কঠোর বাস্তবতা হচ্ছে, যেসব কৃষি পরিবারে অকৃষি খাতের কোনো আয় যোগ হয় না তারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ছিটকে পড়ে কৃষিকাজ থেকে, যা কৃষিতে নিঃস্বকরণ প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে থাকে। ছোট ছোট আইলে খণ্ডিত জমি। জমির আয়তন এতই ছোট যে সেখানে ট্রাক্টর ও কম্বাইন হারভেস্টরের মতো বড় কৃষিযন্ত্র ব্যবহারের জো নেই। পদে পদে প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয় সেচে, হয় না সারের সুষম প্রয়োগ। বছরের পর বছর ধরে এভাবেই চলছে দেশের কৃষি উৎপাদন। পারিবারিক ভাগ-বাঁটোয়ারায় ছোট থেকে আরো ছোট হচ্ছে কৃষি খামারের আকার। ফলে বাড়ছে কৃষকের খরচ, কমছে শস্যের নিবিড়তা ও উৎপাদনশীলতা। ক্ষুদ্র খামার হওয়ার কারণে দেশের সিংহভাগ কৃষকই জমিতে কৃষিযন্ত্র ব্যবহার করতে পারেন না। ফলে শস্য খাতে উৎপাদনশীলতা যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে না, তেমনি শস্যের নিবিড়তা বৃদ্ধিতেও এক ধরনের স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে। বাড়তি উৎপাদন খরচ ও উন্নত প্রযুক্তির সম্প্রসারণে বাধার কারণে মুনাফা হচ্ছে না কৃষকের। শস্য আবাদে মোট খরচের এক-তৃতীয়াংশের বেশি খরচ হয় মজুরিতে। সেই মজুরি কয়েক বছরের ব্যবধানে দ্বিগুণ হয়েছে। ফলে বেড়ে যাচ্ছে কৃষকের উৎপাদন খরচ। মুনাফাহীনতায় অধিক শস্য আবাদে আবার আগ্রহ হারাচ্ছেন কৃষক। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, কৃষকের আগ্রহ কমে যাওয়া ও যথাযথ পরিচর্যার অভাবে কমে যাচ্ছে হেক্টরপ্রতি উৎপাদনশীলতা। হেক্টরপ্রতি উৎপাদনশীলতা কমার কারণেই বিভিন্ন শস্যের মোট উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি অনেকটাই গতিহীন। বেশকিছু শস্যে প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক পর্যায়ে চলে এসেছে। অর্থাৎ উৎপাদন বৃদ্ধি না পেয়ে উল্টো কমে গেছে।

সরকার উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর দিকে জোর দিচ্ছে। যেখানে বছরে এক ফসল ছিল সেখানে দুই ফসল এবং যেখানে দুই ফসল ছিল সেখানে তিন ফসল চাষের ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। অনেক কৃষক তার জমিতে বছরে পাঁচটি ফসলও করছেন। কারণ খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। এতে মাটিতে এক ধরনের প্রভাব পড়বে এটা স্বাভাবিক। বিশেষ করে জৈব উপাদানগুলো কমে যাবে। সরকার প্রত্যেক উপজেলায় সার ব্যবহারের নির্দেশিকা দিয়েছে। মাটির গুণাগুণ কীভাবে ঠিক রাখতে হয় সে বিষয়েও সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। সরকার প্রতি বছর বিভিন্ন ফসলের ওপর ঋণদান কার্যক্রম হাতে নেয়। তবে বিশেষ করে কিছু ঋণ আছে আবার ভর্তুকি পর্যায়ের। কিছু ঋণ আছে আবার বাণিজ্যিক। ফসলের ঋণ কৃষক ফসল ঘরে তুললেই পরিশোধ করতে হয়। আর বাণিজ্যিক ঋণ প্রথাগত নিয়মেই বিতরণ করে থাকে ব্যাংকগুলো। দেশের স্বার্থে সরকার প্রতি বছর বিশেষ কিছু ফসলের জন্য স্বল্পসুদে ঋণ বিতরণ করে থাকে। তার মধ্যে মসলা, ডাল এবং দুগ্ধজাত গাভীর জন্য এ ঋণের পদক্ষেপ নেয়া হয়। একজন কৃষককে ঋণ পেতে হলে অনেক মাধ্যম ঘুরে আসতে হয়। গ্রামের নেতাগোছের কিছু লোক তখন দালালের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নিত্যনতুন রোগবালাই ও পোকার আক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় ফসলে কীটনাশক ও বালাইনাশকের ব্যবহার অনেক গুণ বেড়ে গেছে, যা উৎপাদন ও পরিবেশ উভয়ের জন্য ক্ষতিকর। কয়েক বছর ধরে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা ও পরিমাণ অনেক বেড়েছে। অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, তাপমাত্রার তারতম্য ও হাওর এলাকায় আকস্মিক বন্যা এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় আপত্কালীন ব্যবস্থা নেয়া হলেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব বিদ্যমান। নতুন কৃষি বীমা পদ্ধতি কিছু ক্ষেত্রে চালু হলেও তা সর্বজনীন করার তেমন সরকারি পদক্ষেপ দেখা যায় না। একইভাবে দরিদ্র কৃষক প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ থেকে বঞ্চিত হন নিয়মের বেড়াজলে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে ক্ষুদ্র, প্রান্তিক, নারী ও বর্গাচাষীদের উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় সংযুক্ত থাকা দুরূহ হয়ে পড়বে। এ বিশালসংখ্যক কৃষককে উৎপাদনপ্রক্রিয়ার সঙ্গে ধরে রাখতে না পারলে তা খাদ্যনিরাপত্তার সাফল্য ম্লান করে দিতে পারে।

কৃষি উৎপাদন যাতে আরো বিকশিত হতে পারে, তার জন্য অনুকূল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এখন দরকার কৃষক কীভাবে এ ব্যবস্থাকে আরো এগিয়ে নিতে পারেন। কৃষিজমি লিজ নেয়ার ক্ষেত্রে একটা অনিশ্চয়তা আছে, এক বা তিন বছর পর তিনি এ জমিটা আবার পাবেন কিনা, অর্থাৎ প্রতি বছর নতুন চুক্তি করতে হয়। এর সমাধান কৃষক নিজেরাও করতে পারে বা সরকারও করতে পারে। যদি নিজেরা সমবায় করে এলাকার সব জমি ভাড়া বা বন্দোবস্ত নেন তাহলে কৃষক নিজেই করতে পারেন। আবার যদি সরকার করতে চায়, তাহলে কৃষক যাতে দীর্ঘমেয়াদিভাবে জমিটা পায় তাহলে সেটা দেখতে হবে। একসময় ভূমি সংস্কার নিয়ে অনেক কথা হয়েছিল, কিন্তু কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এখন সরকার জমির মালিকদের কাছ থেকে জমি বর্তমান বাজারদরে ভাড়া নিতে পারে, তারপর সেটা কৃষকের কাছে দীর্ঘমেয়াদি শর্তে ভাড়া দিতে পারে। এভাবে কৃষকের কাছে জমি দেয়া সম্ভব আবার কৃষিজমি হ্রাস করার হারও কমানো যেতে পারে।

গত কয়েক দশকের ব্যবধানে দেশের কৃষি খাতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিহীনতার ক্ষেত্রে প্রধান বাধাই হলো জমির খণ্ড-বিখণ্ডতা। সাধারণত জমির মালিকানা পরিবর্তিত হয় বাজার ব্যবস্থাপনা ও জমির উৎপাদনশীলতার ওপর নির্ভর করে, কিন্তু বাংলাদেশে উত্তরাধিকার সূত্রে জমির মালিকানা পরিবর্তনের কারণে মানুষজন জমিকে সঞ্চয় হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে জমির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর চেয়ে জমির ভাড়া প্রদানের মাধ্যমে আয়ে বেশি মনোযোগ থাকে জমির মালিকদের। এতে জমির প্রতিযোগিতা হারিয়ে যাচ্ছে। পারিবারিক কারণে জমির খণ্ডতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। জমি ছোট হওয়ার কারণে ইকোনমিক স্কেল হচ্ছে না। জমি ছোট হচ্ছে, উপকরণের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে কৃষকের খরচও বাড়ছে। এ অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন প্রয়োজন। সেটি করতে হলে জমি সংস্কার ও কাঠামোগত সংস্থার প্রয়োজন। সেটির জন্য অবশ্যই রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।