দক্ষিণ এশিয়ায় উন্নয়নের রোল মডেল খ্যাত শ্রীলংকা আজ পর্যুদস্ত। যে দেশে ৯৫ শতাংশ শিক্ষিত, সে দেশ এখন সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছে। ভাবতে অবাকই লাগবে। সেখানে এখন আর তামিল গেরিলাদের হামলা নেই, এলটিটিই নামের বিদ্রোহীদের আস্ফাালন নেই, রক্তপাত নেই। এমনকি তামিল বিদ্রোহীদের দমনের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কোনো অর্থ খরচ করতে হয় না। যখন তামিল বিদ্রোহ শ্রীলংকাকে ব্যস্ত রেখেছিল, তখনো সে দেশের সরকার এতটা কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েনি। জনগণ তখন চেয়েছিল অস্ত্রের ঝনঝনানি থেকে মুক্তি। অবশেষে যখন এলটিটিইকে দমন করতে সক্ষম হলো তখন সরকার হলো নিশ্চিন্ত, জনগণ যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল! অথচ শান্তির পরিবেশ থেকে যে অশান্তির আগুন জ্বলতে পারে, সে আগুন থেকে ধূসর ধোঁয়ায় সবার চোখ ঝলসে যেতে পারে, এ কথা কে জানত?

সেই অশান্তির কুণ্ডলে বসবাস করে জনগণ এখন ক্লান্ত। ১৭ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতিতে দিশেহারা মানুষের ঘরে খাবার নেই, বিদ্যুতের অভাবে ঘরে আলো নেই, বিদ্যুৎ সরবরাহের এতই ঘাটতি যে কারখানার মেশিন চলে না, গ্যাসের স্থান দখল করছে লাকড়ি, অসুস্থদের জন্য হাসপাতালে মেডিসিন নেই। এ রকম করুণ পরিস্থিতির জন্য জনগণ প্রস্তুত ছিল না। এটা এমন এক যুদ্ধক্ষেত্র, যেখানে নিজেরাই নিজেদের বিরুদ্ধে লড়ছে। তামিল বিদ্রোহ দমনের মধ্য দিয়ে মেজরিটি সম্প্রদায়ের মধ্যে যে প্রশান্তি এসেছিল আর সরকার নিজের ক্ষমতার স্বাদ আস্বাদনের জন্য যে বেপরোয়া উচ্চাভিলাষী হয়ে পড়েছিল, তার পরিণতি হলো সামষ্টিক অর্থনীতির এ বিপর্যয়। কীভাবে এই বিপর্যয় হলো?

অর্থনৈতিক সূত্র প্রাথমিকভাবে বিবেচ্য। কোনো দেশে বাণিজ্য ঘাটতি যত বেশি, সে দেশ তত বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে। আমদানিনির্ভরতা যখন রফতানির মাত্রা থেকে যোজন যোজন দূরে থাকে, তখন সে দেশ পররাষ্ট্রনীতিতে সহজেই পরাস্ত হয়। শ্রীলংকার অর্থনীতিতে প্রথম আঘাত এসেছে কৃষি খাতকে বিদেশী মুনাফা চক্রের হাতে সমর্পণ করে। হাইব্রিড পদ্ধতি গ্রহণ করে কৃষি খাতকে পরনির্ভরশীল করাই ছিল প্রথম কুঠারাঘাত। এর পরে সে দেশের উচ্চাভিলাষী সরকার কতগুলো মেগা হাইব্রিড প্রকল্প হাতে নেয়। উন্নয়নের নামে দৃশ্যমান এ প্রকল্প মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের জন্য আকর্ষণীয় হলেও সাধারণ নিম্নবিত্তের জনগণ ছিল নিগৃহীত। কারণ আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে মধ্যবিত্তের কিছু সুবিধা হলেও নিম্নবিত্তের অবস্থা হয় শোচনীয়। কৃষি আর শিল্পকে যখন পরনির্ভরশীল করা হয় তখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ভাটা পড়ে। এর সঙ্গে যখন যুক্ত হয় পাহাড়সম ঋণের বোঝা তখন ‘উন্নয়ন’ প্রকল্প থেকে অধিক অর্থ উদ্ধার করার যজ্ঞে নামতে হয়।

ঋণ শোধ করার চক্রে পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তলানিতে পড়ে যায়। চীনের কাছ থেকে ঋণ লোন থেকে যে বন্দর করা হলো, সেই বন্দরই চীনের কাছে লিজ দিতে বাধ্য হলো শ্রীলংকান সরকার। ঋণগ্রস্ত মানুষের মতো নিজের ভিটেমাটি বিক্রি করার অবস্থা হলো। প্রশ্ন হলো, কে শ্রীলংকাকে এ করুণ পরিণতির দিকে ঠেলে দিল? সহজ-সরল উত্তর: পরিবারকেন্দ্রিক রাজাপাকসের সরকারি নীতি। সরকারি রাজনীতিকে দায়ী করার মধ্যে আসল কারণ নিহিত নয়। একটা দেশের উচ্চশিক্ষিত সম্প্রদায় যদি রক্ত-মাংসে দুর্নীতিপ্রবণ হয় তখন সেই সরকার অভিজাত দুর্নীতিবাজদের ওপর আস্থা রেখে চলে।

কেননা দুর্নীতিবাজ মধ্যবিত্ত আর উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণীর কালচার ঘিরে যে ভোগ সংস্কৃতির জন্ম হয়, তা উচ্চাভিলাষী সরকারের জন্য আরামপ্রদ মনে হবে। শ্রীলংকার আমদানিনির্ভর অর্থনীতি আর দুর্নীতিনির্ভর ভোগ সংস্কৃতি সে দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দুরবস্থার জন্য দায়ী। দুর্নীতিনির্ভর ভোগ সংস্কৃতি জারি আছে বলেই একের পর এক উচ্চাভিলাষী প্রকল্প সরকারকে উপহার দিয়েছে সে দেশের আমলাতন্ত্র। বড় বড় অংকের বিদেশী ঋণের দিকে লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন এ উচ্চাভিলাষী আমলারা। এদের চোখে বর্তমানের ভোগই প্রধান, এরা পরিণতি নিয়ে ভাবেন না। কারণ উচ্চশিক্ষিত এ পেশাজীবীরা তাদের ব্যাংক ব্যালান্সকে সিকিউরিটি মনে করেন। আর সরকার নিজের সিকিউরিটির জন্য আমলা ও বিদেশী শক্তির ওপর নির্ভর করে। 

এর মানে যে দেশের প্রায় শতভাগ শিক্ষিত, সে দেশের উচ্চশিক্ষিতরা যদি দুর্নীতি আর লুটে জড়িয়ে পড়েন, আর সে দেশের সরকারও যদি একই প্রকৃতির হয় তাহলে জনগণের অধিকার পদদলিত হবে, এটাই স্বাভাবিক। এই অস্বাভাবিক পরিণতির স্বাভাবিক প্রকৃতির জন্য সিভিল সোসাইটির নিষ্ক্রিয় ও দুর্বল ভূমিকার দায় অনেক বেশি। একটা দেশে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন তখনই বাড়ে যখন সে দেশে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র সিভিল সোসাইটি গড়ে না ওঠে। এটা সত্য, শ্রীলংকার সরকার মিডিয়া থেকে শুরু করে সব প্রচারমাধ্যম অতিনিয়ন্ত্রণে রাখার ফলে স্বতন্ত্র সিভিল সোসাইটি মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেনি। সঙ্গে সঙ্গে এও বলা যায়, একটা শিক্ষিত সমাজে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য স্বকীয় বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর বিকাশ না হলে দুর্নীতিপ্রবণ শিক্ষিতরাই সরকারপক্ষীয় ডামি সিভিল সোসাইটির কাজ করবে।

শ্রীলংকায় যে একটা স্বতন্ত্র সিভিল সোসাইটির অভাব, তার প্রমাণ হলো এত মেগা প্রকল্প হাতে নিয়ে সরকার চলছে। এতে কৃষি খাত দুর্বল হয়ে কৃষকদের জীবন বিপন্ন হচ্ছে, আর সব প্রতিষ্ঠান দুর্নীতিতে ছেয়ে গেছে। এসবের পরিণতি চিহ্নিত করে এর প্রতিবাদে কোনো আন্দোলন ও প্রতিবাদ দানা বাঁধেনি। ছাত্রসমাজ এ আন্দোলনে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারত। এখন যে মুভমেন্ট হচ্ছে তা সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিলেও বুদ্ধিবৃত্তিক সংকট রয়েই গেছে।

এ অবস্থায় শ্রীলংকাকে সংকট থেকে উত্তরণের নিমিত্তে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দেয়। বিশ্বব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, দুর্দশাগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে আর্থিক সহায়তা, খাদ্যসামগ্রী ও মেডিসিন সরবরাহের জন্য আর্থিক সহায়তা দেয়া হবে। অনেকেই এ ধরনের উদ্যোগকে স্বাগত জানাতে পারেন। হয়তো সাময়িক দুরবস্থা কমে যাবে কিন্তু এতে দুর্নীতিগ্রস্ত পরিবারকেন্দ্রিক রাজাপাকসীয় রাজনীতি টিকে যাবে; অক্ষত রয়ে যাবে দুর্নীতিগ্রস্ত আমলাতন্ত্র। অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিত্জ বলেছেন, বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের কাছ থেকে সহায়তার ফলে কৃষি ক্ষেত্রে বিপর্যয় আসে, নিজে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা এমনকি দেশের সার্বভৌমত্ব দুর্বল হয়ে যায়। বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের কাছ থেকে পাওয়া আর্থিক প্যাকেজ থেকে যে মধু সংগ্রহ করবে না সেই একই দুর্নীতিবাজ আমলা শ্রেণী, তার কোনো গ্যারান্টি নেই। উপরন্তু, বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের কঠিন শর্তের জালে আটকে পড়তে পারে শ্রীলংকা।

এর মানে রাজনৈতিক সংস্কার ছাড়া শ্রীলংকাকে দুর্দশা থেকে টেনে তোলা কঠিন। শ্রীলংকার মতো কোনো রাষ্ট্রকে আর্থিক দেউলিয়া থেকে উদ্ধারের প্রাথমিক দায়িত্ব নিতে হবে জাতিসংঘের মাধ্যমে। জাতিসংঘের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ফান্ড সংস্কার করে বাস্তবায়ন করতে পারলে সাময়িক সুবিধা আসতে পারে। কিন্তু মূল দায়িত্ব নিতে হবে সিভিল সোসাইটিকে। উচ্চমানের সিভিল সোসাইটি গঠনের প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক সংস্কার বিনির্মাণ অতিজরুরি। জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে জনগণের ‘সিভিল সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠা ও কার্যকর করা অত্যাবশ্যক। সততা ও বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তিতে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারলে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠার কাজ সহজ হবে। এ পদ্ধতি বাংলাদেশসহ অন্যান্য রাষ্ট্রের জন্য অধিক উপযোগী। আমাদেরও সতর্ক থাকতে হবে, কারণ বিদেশী শক্তির প্রভাব আর দেশীয় দুর্নীতিবাজদের দৌরাত্ম্য থেকে আমাদেরও মুক্তি দরকার।

 

ড. আশেক মাহমুদ: সহযোগী অধ্যাপক

সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা