‘আমাদের বাঁচিবার উপায় আমাদের নিজের শক্তি সর্বতোভাবে জাগ্রত করা। আমরা যে আমাদের পূর্বপুরুষদের সম্পত্তি বসিয়া বসিয়া ফুঁকিতেছি, ইহাই আমাদের গৌরব নহে; আমরা সেই ঐশ্বর্য বিস্তার করিতেছি, ইহাই যখন সমাজের সর্বত্র আমরা উপলব্ধি করিব, তখনই নিজের প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা সঞ্জাত হইয়া আমাদের মোহ ছুটিতে থাকিবে।’
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (স্বদেশী সমাজ)।
‘...মাঝে
মাঝেই আমরা প্রলুব্ধ হয়ে ভুল পথে এগিয়ে গেছি, কিন্তু তার মধ্যে ঠিক পথে যেটুকু এগিয়ে যাই তা যেন হারিয়ে না ফেলি। এখনও বহুপথ বাকি।’
অমর্ত্য সেন (জীবনযাত্রা ও অর্থনীতি)।
এক.
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মবার্ষিকী উদযাপন এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতির ৫০ বছরে পদার্পণ—এ বছরের স্বাধীনতা দিবসকে অন্য এক মাত্রিকতায় নিয়ে গেছে। স্বাধীনতার পরপর তাচ্ছিল্যের সুরে পাওয়া তকমা ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ থেকে আজকের অনুচ্চ অভিধা ‘উন্নয়ন ধাঁধা’র গল্প যেন সেঁটে আছে ৫০ বছরের উন্নয়ন ভ্রমণের প্রতি পাতায় পাতায়। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ দেবরাজ রায়কে টেনে বলি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন অনেকটা অনির্ভরযোগ্য রাস্তার মতো; এটা ভাগ করা হাইওয়ে নয়, যেখানে কেবল সুযোগপ্রাপ্ত সংখ্যালঘিষ্ঠই দ্রুত লেনে চলার ক্ষমতা রাখবে। অন্য এক দিকপাল মিলটন ফ্রিডম্যান বলতেন, একমাত্র একটা সংকট, কল্পিত কিংবা বাস্তব, প্রকৃত পরিবর্তন সৃষ্টি করে। বাংলাদেশ যেমন সংকটের দেশ, তেমনি সম্ভাবনারও। তা না হলে সব সংকট পেরিয়ে উন্নয়নের মহাসড়কে সে উঠল কী করে? তবে বর্তমানকে যেমন আলিঙ্গন করি, অতীতকেও যেন না ভুলি—যেমনটি জানিয়েছেন তারাপদ রায়:
গত জীবনের স্মৃতি কারো মনে থাকে না
কেউ জাতিস্মর নয়,
কোট-প্যান্ট পরে যে যার মতো এলিভেটরে
উপরের দিকে উঠে যায় নিঃশব্দ মসৃণতায়।
মনে পড়ে না কলাই-চটা থালা, ঠাণ্ডা ভাত,
অনায়াসে আস্তিন-ফাটা জামার বদলে
ইস্পাতের চামচ উঠে আসে ঝকঝকে টেবিলে।
দুই.
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর অনেকটা রূপকথার গল্পের মতোই।
‘এখনও এই অগ্রহায়ণের শেষেও প্রায় গোড়ালির উপর পর্যন্ত সেখানে কাদায় ডুবিয়া যায়। ধান পাকিতেছে, তাহার শীষগুলি নুইয়া পড়িয়াছে স্তবের মতো, অধিকাংশই লুটাইয়া পড়িয়াছে কাদার মধ্যে। মজা বিলের জমি—এমন হইবেই। কোনো বৎসরই লাভজনক ফসল এখান হইতে পাওয়া যায় না। পানি জমিয়াই প্রায় অর্ধেকেরও বেশি ফসল নষ্ট করিয়া ফেলে। ...গহুরালি
মনে মনে ভাবিল, আর কাঁহাতক এইভাবে দু’টি দু’টি ধান খুঁটিয়া জীবন চালানো যায় (শামসুদ্দিন আবুল কালাম, পথ জানা নাই)।’
তারপর আসে সবুজ বিপ্লব। ঘটে অ-কৃষি কর্মকাণ্ডের বিস্তার, গ্রাম ছেড়ে মানুষ যায় শহরে, বিদেশে। আয় বাড়ে, বাড়ে বিদ্যাবুদ্ধি, ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটে। নিম্ন আয়ের দেশে এখন মধ্যম আয়ের দেশের মহিমা অন্বেষিত:
‘সে কাল আর নাই। কালের অনেক পরিবর্তন ঘটিয়াছে। মাঠের বুক চিড়িয়া রেল লাইন পড়িয়াছে। তাহার পাশের টেলিগ্রাফ তারের খুঁটির সারি। বিদ্যুত্শক্তিবহ তারের লাইন। মেঠোপথ পাকা হইয়াছে। তাহার উপর দিয়া ঊর্ধ্বশ্বাসে মোটর বাস ছুটিতেছে। নদী বাঁধিয়া খাল কাটা হইয়াছে। লোকে হুক্কা ছাড়িয়া বিড়ি-সিগারেট ধরিয়াছে। কাঁধে গামছা, পরনে খাটো কাপড়ের বদলে বড় বড় ছোকড়ারা জামা, লম্বা কাপড় পরিয়া সভ্য হইয়াছে। ছ-আনা, দশ-আনা ফ্যাশনে চুল ছাঁটিয়াছে। ভদ্র গৃহস্থ ঘরের হাল-চাল বদলাইয়াছে (তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়—রাইকমল)।’
তিন.
স্নেহভাজন মিনহাজ মাহমুদের অশেষ কৃপায় খুব দ্রুত
একটা বই হাতে এসে পৌঁছে। বলা চলে, আশা এবং স্মৃতিজাগানিয়া একখান বই। বাংলাদেশ উন্নয়ন অধ্যয়ন প্রতিষ্ঠান (সংক্ষেপে বিআইডিএস) সম্প্রতি প্রকাশ করেছে Readings
in Bangladesh Development—সম্ভবত যার বাংলা ‘বাংলাদেশ উন্নয়ন অধ্যয়ন’। ঢাউস দুই খণ্ডে প্রায় ১ হাজার ৬০০ পাতায় বিবৃত আছে ১৯৭২ থেকে ২০২০ পর্যন্ত প্রকাশিত এ প্রতিষ্ঠানের একগুচ্ছ পিয়ার রিভিউড আর্টিকেলস। কেএএস মুরশিদ, মিনহাজ মাহমুদ এবং কাজী ইকবাল সম্পাদিত দুই খণ্ডে সংকলিত প্রায় ৫০ প্রবন্ধ এতে স্থান পেয়েছে। প্রথম খণ্ডে ১৯৭২-২০০০, প্রথম প্রজন্মের প্রতিভাবান অর্থনীতিবিদদের লেখার আধিক্য থাকলেও দ্বিতীয় খণ্ডে থাকছে পরবর্তী প্রজন্মের গবেষণার আলোকছটা তথা বাংলাদেশের কাঠামোগত রূপান্তর সম্পর্কিত প্রায়োগিক বেশকিছু লেখা। প্রথম দিকে ফোকাস ছিল খাদ্য, কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন
এবং সেই সঙ্গে ম্যানুফ্যাকচারিং, জনমিতিক অধ্যয়ন, অভিবাসন এবং অভ্যন্তরীণ ও বহিস্থ সম্পদ ব্যবস্থাপনা।
প্রসঙ্গত, বইটির মুখবন্ধ লিখেছেন বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক এবং সিপিডির চেয়ারম্যান প্রফেসর রেহমান সোবহান।
চার.
আমি বইটি রিভিউ করতে কলম হাতে নিইনি, কারণ তা করার ক্ষমতা আমার নেই; আর যেটুকু ছিল তা করোনা কেড়ে নিয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, এক-দেড় হাজার শব্দের এক প্রবন্ধে সব বিষয় নিয়ে আলোচনা লেখকের প্রতি সুবিচার করে বলে মনে হয় না। তবে নির্বাচিত কিছু প্রবন্ধ নিয়ে ভবিষ্যতে লেখার ইচ্ছা আছে।
বলতে বাধ্য হচ্ছি যে বাংলাদেশ উন্নয়ন অধ্যয়ন (Readings in Bangladesh Development) বইটির বিশেষত্ব এই যে এবং ভূমিকায় তার আঁচ লক্ষণীয়, এটা উৎসর্গ করা হয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মবার্ষিকীর স্মৃতির উদ্দেশে। এ অনুধ্যান প্রশংসার দাবি রাখে।
বিভিন্ন সংগঠন বিভিন্নভাবে মহান নেতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে আসছে সত্যি, তবে বিআইডিএস করল এক অভিনব পথে—নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ গবেষণা সংকলন উপহার দিয়ে। সত্যি কথা বলতে কি, একমাত্র বঙ্গবন্ধুর সংক্ষিপ্ত শাসনামলে এ প্রতিষ্ঠানের গবেষণার কার্যকর চাহিদা প্রান্তিক হলেও ছিল। তার কারণ একটা পরিকল্পিত অর্থনীতি বিনির্মাণে বিআইডিএসের বিদ্বজ্জনদের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক বিশ্লেষণের বিপরীত দাঁড়ানোর মতো কেউ ছিল না সে সময়।
তারপর আশির দশকে এ প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত গবেষণায় সরকারের উৎসাহ উবে যেতে থাকে। রেহমান সোবহানের ভাষায়, বিদেশী উপদেষ্টারা নিয়ে এলেন গ্রেশামস ল’, যেখানে
অপেক্ষাকৃত কম মেধাসম্পন্ন বিদেশীরা স্থানীয় (বিশেষত বিআইডিএসের) বেশি মেধাসম্পন্নকে বাজার ছাড়তে বাধ্য করে। অবশ্য পরবর্তীকালে দেখি যে শেখ হাসিনার শাসনামলে পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা দলিল প্রণয়নে এ প্রতিষ্ঠানটির ব্যাপক ভূমিকা স্বীকৃত। এমনি করে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সন্ধিক্ষণে থাকা বিআইডিএস গবেষণার কালপুরুষদের কালজয়ী রচনাসমগ্র সংকলন করে সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালন করেছে বলে অন্তত আমি মনে করছি।
অন্য এক দৃষ্টিকোণ থেকে এই বই প্রকাশে বিআইডিএস বিশেষ এক কৃতিত্ব দাবি করতে পারে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী সামনে রেখে তার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের কথা তো আগেই বলা হয়েছে। ‘তিনি এমন এক ব্যক্তি, যিনি একটা স্বাধীন, সমতাসম্পন্ন এবং ঐশ্বর্যশালী বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনি বেঁচে থাকলে গত ৫০ বছরে প্রতিটি ক্ষেত্রে ইতিহাস হতে পারত অন্য রকম।’ দ্বিতীয়, বাংলাদেশের ইতিহাসে উন্নয়ন অধ্যয়নে নিবেদিত মেধাগুলোকে এক ছাদের নিচে রাখার প্রচ্ছন্ন এক প্রয়াস দেখা যায় বইটি বা এর খণ্ড দুটি প্রকাশের মাধ্যমে। গেল ৫০ বছরে বিআইডিএস যে গবেষণা ক্ষমতা উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন করেছে, সেটা নিজেই স্বাধীন বাংলাদেশে তাত্পর্যপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক পুঁজি সঞ্চয়নের পরিমাপ হিসেবে বিবেচিত হবে বলে ধারণা। সব শেষে, এক অর্থে ভলিউম দুটো বাংলাদেশের উন্নয়ন ভ্রমণের একটা মূল্যায়ন বৈকি। বস্তুত, স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্নভাবে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পথে ৫০ বছরের অর্থনীতির একটা মূল্যায়ন তো বইটিতে আছেই।
পাঁচ.
ফরাসি বিপ্লবের ২০০তম বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে চীনের মহান নেতা চৌ এন লাইকে ১৭৮৯ সালের পৃথিবী কাঁপানো ঘটনার ঐতিহাসিক তাত্পর্য সম্পর্কে মন্তব্য করতে বলা হয়েছিল। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘Too soon to tell’ (এখনো সময় হয়নি)। একটা বিপ্লবের ২০০ বছর পরও যদি এর প্রভাব মূল্যায়নে যথেষ্ট সময় না হয়ে থাকে, তাহলে ১৯৭১ সালের বিপ্লবের প্রভাব মূল্যায়ন মাত্র ৫০ বছরে কী করে সম্ভব?
কিছুটা হলেও সম্ভব এবং বিআইডিএস প্রকাশিত Readings in Bangladesh Development বইটি এক্ষেত্রে একটু ব্যতিক্রম বৈকি। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার ওপর ১৯৭১ সালের বিপ্লবের প্রভাব বিভিন্ন লেখায় আকার-ইঙ্গিতে উঠে এসেছে বইটিতে—বিভিন্ন সূচকে পাকিস্তান ও ভারতের চেয়ে এগিয়ে থাকা, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও জনসংখ্যা হ্রাস করে ম্যালথুসিয়ান দুঃস্বপ্ন দূর করা, অব্যাহত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, নারীর ক্ষমতায়ন, দারিদ্র্য দূরীকরণ, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্বীকৃতি ইত্যাদি ইতিবাচক দিক গবেষণায় উঠে এসেছে।
কিন্তু খুব দ্রুতলয়ে লতিয়ে ওঠা অর্থনৈতিক বৈষম্য, কুশাসনের কুফল, আইনের শাসনের ঘাটতি, সন্ত্রাস ও দুর্নীতির আগ্রাসনে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্ন যে অধরা থেকে যাবে, সে সম্পর্কেও বইটি একেবারে নিশ্চুপ নয়।
ছয়.
বইটি বাংলা ভাষায় অনুবাদ হলে অনেক পাঠক হয়তো উপকৃত হতেন কিন্তু ‘তোরা যে যা বলিস ভাই, ইংরাজি আমার চাই’ যখন অবস্থা, তখন বলার কিছু থাকে না। যা-ই হোক, অর্থনীতির ছাত্র, শিক্ষক ও গবেষকের বইয়ের তাকে বিআইডিএস প্রকাশিত Readings
in Bangladesh Development শোভা পাবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। এটা কেবল বাংলাদেশ উন্নয়ন অর্থনীতির বই হিসেবে না দেখে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ভ্রমণের একটা ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে দেখলে পয়সা উসুল।
সুন্দর প্রচ্ছদ, পরিষ্কার ছাপা এবং শক্ত বাঁধুনি দিয়ে গ্রন্থিত বাংলাদেশের উন্নয়ন গল্প Readings in Bangladesh Development যেন রূপকথা নয় সে নয়।
আব্দুল বায়েস: অধ্যাপক ও সাবেক উপাচার্য
জাহাঙ্গীরনগর
বিশ্ববিদ্যালয়
ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির খণ্ডকালীন শিক্ষক










