ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দিতে স্বীকৃত যত মাধ্যম আছে, তা সর্বোচ্চ ২০ সেকেন্ড থেকে মিনিটখানেক আগে জানাতে পারে। যার ফলে ধ্বংসলীলা যা হয় তা হঠাৎ করেই হয়ে যায়। ফলে ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কমানোর জন্য বস্তুত বিল্ডিং কোড মেনে ভবন নির্মাণ করা এবং দ্রুত সময়ে উদ্ধার তৎপরতার বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে আমাদের দেশ ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকার পরও দুর্যোগে দ্রুত সাড়া দেয়ার মতো উদ্যোগ এখনো নেয়া সম্ভব হয়নি।

২০১৫ সালে নেপালে ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর বাংলাদেশে ‘ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার’ স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হলেও সেটি এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। এর আগে ফায়ার সার্ভিসের উদ্যোগে ভূমিকম্প মহড়া হলেও সেটি আর অব্যাহত নেই। তাই সাধারণ মানুষের সচেতনতার ক্ষেত্রে যে বিস্তৃতি ঘটেনি, সেটি হলফ করেই বলা যায়। এমনকি ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এনডিএমআইএস) নামে যে ওয়েবসাইট নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়েছিল সেটিও আলোর মুখ দেখেনি।

প্রশ্ন হচ্ছে, ‘ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার’ কেন তৈরি করা গেল না? এটা সত্য, জীবন যখন স্বাভাবিকভাবে চলে তখন জীবন নিয়ে এত ভাবার প্রয়োজন হয় না। তাই নগরীর স্বাভাবিক জীবনযাপনে শঙ্কিত হওয়ার কারণ না থাকলেও ভূমিকম্প যদি এসেই যায়, তাহলে যে চোখের সামনে অবারিত ধ্বংসলীলা ছাড়া আর কিছুই দেখা যাবে না সেটি খুব সহজেই অনুমেয়। এজন্য আমাদের আদৌ কি কোনো শক্তিশালী প্রস্তুতি আছে?

২০১৭ সালের ১৯ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে ‘ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার’-এর কনসেপ্ট নোট চূড়ান্তকরণের লক্ষ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে আহ্বায়ক করে কমিটি করা হয়। অবিলম্বে কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও এ কমিটি আজ পর্যন্ত কনসেপ্ট নোট চূড়ান্ত করতে পারেনি। 

অথচ নেপালে ২০১০ সালের ১৭ ডিসেম্বর ‘ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার’ স্থাপন করা হয়েছে। যে পাকিস্তানের চেয়ে আমরা অর্থনীতিতে এগিয়ে আছি বলে তৃপ্তির ঢেকুর তুলি, সেই পাকিস্তানেও ‘ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার’ রয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধীনে ‘ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি রেসপন্স সেন্টার’ রয়েছে। উন্নত দেশগুলোর কথা এলে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সুইজারল্যান্ডসহ সলোমন দ্বীপপুঞ্জেও ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি সেন্টার আছে।

এই ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টারগুলো থেকে জনগণকে সতর্ক করার পাশাপাশি দুর্যোগের সময় কীভাবে দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা নিশ্চিত করা যাবে সেটির মডেল দাঁড় করানো হয়। পাশাপাশি জেলা ও রাজ্যভিত্তিক কার্যক্রমের পরিকল্পনাও সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটগুলোয় তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ওয়েবসাইটই এখনো তৈরি হয়নি, বরং পুরো বিষয়টি এখনো কনসেপ্ট নোটের মধ্যেই রয়ে গেছে। যেখানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সাচিবিক সহায়তা প্রদানসহ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার গঠনের প্রেক্ষাপটসহ লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও দুর্যোগকালীন কীভাবে কার্যক্রম প্রদান করবে সেটির রূপরেখা দেখানো হয়েছে। সার্বিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর তত্ত্বাবধানে ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার পরিচালিত হলেও জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা কাউন্সিলে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সমন্বয়ে সব মন্ত্রী এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় জরুরি সহযোগিতা সমন্বয় কমিটিতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিবের তত্ত্বাবধানে সব সচিবকে রাখার প্রস্তাব করা হয়। পলিসি লেভেলে প্ল্যানিং উইংয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, অপারেশন উইংয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, লজিস্টিক উইংয়ে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রী, ফাইন্যান্স উইংয়ে অর্থমন্ত্রী এবং মনিটরিং উইংয়ে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন সমবায় মন্ত্রীকে রাখা হয়েছে। 

ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টারের ওয়েবসাইটে গেলে এমন তথ্যই উঠে আসে। বস্তুত এভাবে দায়িত্ব ভাগ করে দিলেও সবকিছু এখনো কনসেপ্ট নোটের মধ্যেই রয়ে গেছে, যা আলোর মুখ দেখেনি। 

তুরস্ক ও সিরিয়ার ভূমিকম্পের খবর দেখে মনের ভেতর অজানা এক শঙ্কা তৈরি হয়, আমাদের শহরে কখনো এমনটা হবে না তো? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ছোট্ট এক শিশুর মুখের কাছে হাত তুলে স্রষ্টার কাছে আকুতি জানানো, ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়া মেয়ের হাত ধরে বাবার বসে থাকা, এক শিশুকে বোতলের ঢাকনায় পানি খাওয়ানো, তিনটি ভবনের মালিকের হাতে থাকা ত্রাণের শুকনো রুটি—এসব দৃশ্য সবার মনে আলাদা করে দাগ কেটেছে। সেই সঙ্গে ভেঙে যাওয়া বাড়িঘরের মধ্যে খুঁজে খুঁজে প্রয়োজনীয় জিনিস জোগাড় করার চিত্রটাও মর্মান্তিক। বস্তুত এমন দুর্যোগ বলেকয়ে আসে না, ক্ষতিটা বোঝা যায় ধ্বংসলীলা বয়ে যাওয়ার পর। 

বাংলাদেশ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে—এ কথা ভূতত্ত্ব বিশেষজ্ঞরা অনেক আগে থেকেই বলে আসছেন। এর মধ্যে যখন অল্প মাত্রার ভূমিকম্প নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে হচ্ছিল, তখন এ শঙ্কা আরো বেড়ে যায়। প্রশ্ন হচ্ছে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের পরিস্থিতি দেখে আমরা কি সতর্ক হচ্ছি? সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের ফায়ার সার্ভিস এবং সিভিল ডিফেন্সের কি সে রকম প্রস্তুতি আছে? আগুন লাগলেই ফায়ার সার্ভিসকে যেভাবে হিমশিম খেতে হয়, তাতে বড় ভূমিকম্প হলে উদ্ধার তৎপরতা চালানোর মতো সক্ষমতা ফায়ার সার্ভিসের আছে কিনা সেটি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় ঢাকায় অপরিকল্পিত নগরায়ণ হয়েছে। যার ফলে ভূমিকম্পের ঝুঁকি অনেক বেশি। বিল্ডিং কোড না মেনেই যেভাবে একের পর এক ভবন গড়ে তোলা হয়েছে, তাতে ভূমিকম্প হলে বিভীষিকাময় পরিস্থিতি তৈরি হবে। গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে, ঢাকায় ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে তিন লাখ মানুষ মারা যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর ক্ষয়ক্ষতির কথা না হয় বাদ থাকল।

বিশেষ করে পুরান ঢাকায় যেভাবে ভবনগুলো তৈরি হয়েছে তাতে উদ্ধার তৎপরতার অব্যবস্থাপনার দরুণই অনেক মানুষ মারা যাবে। বিশেষ করে চিপা গলি দিয়ে যেখানে ফায়ার সার্ভিসের গাড়িই প্রবেশ করতে বেগ পেতে হয়, সেখানে ভূমিকম্পের ধ্বংসস্তূপ থেকে মানুষকে উদ্ধার করা রীতিমতো দুঃস্বপ্নের বিষয়।

ভূমির শ্রেণীবিভাগ যাচাই না করেই আমরা ভূমির ওপর অনেক চাপ তৈরি করছি। অব্যাহতভাবে সুপেয় পানি উত্তোলন করায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। যেখানে খাল-বিল ছিল, সেখানে জমি ভরাট করে তিন তলার ফাউন্ডেশন করে পাঁচতলা বাড়ি বানানো হচ্ছে।

অন্য জেলায় মৃদু ভূমিকম্প হলে ঢাকায়ও সেটা অনুভূত হয়। ঢাকার বাইরে পাহাড় কেটে ফেলা হচ্ছে, সেখানে জনবসতি স্থাপন করায় একদিকে যেমন ভূমিধসের ঘটনা হচ্ছে, তেমনি সে অঞ্চলগুলোয় ভূমিকম্পের ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।

এভাবে অসচেতনতার মধ্য দিয়েই আমরা ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের মাঝে বসে দিনাতিপাত করছি। ঠিক যেন যা হওয়ার হবে, নিয়তিকেই মেনে নেয়া ছাড়া আমাদের বোধহয় আর গত্যন্তর নেই। ভবন নির্মাণে দুর্নীতি হবে, খাল-বিল ভরাট করে ভবন হবে, অবাধে পাহাড় কাটা হবে, আর পরিশেষে ভূমিকম্প হলে তখন দোষ হবে সরকারের। অবশ্য ভূমি মন্ত্রণালয় বা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) যে দায় নেই সেটি বলা যাবে না। এর সঙ্গে নাগরিকদের সচেতনতাও জরুরি। বাড়ি বানাতে গিয়ে আমরা যদি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ভূমিকম্পপ্রবণ ভবন তৈরি করে যাই, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। ভূমিকম্প প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এর ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ নেই, কিন্তু আমরা অন্তত ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পারব। এটিই আমাদের নিশ্চিত করা জরুরি। 


তৌফিকুল ইসলাম: সাংবাদিক