নিকট প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশ ও ভারত বহুমাত্রিক পারস্পরিক স্বার্থের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে আবদ্ধ। এ সম্পর্কের যাত্রা ঘোর দুর্দিনে, মুক্তিযুদ্ধের সময়। সে সময় ভারতের সর্বাত্মক সাহায্য-সহযোগিতার মধ্য দিয়ে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও বন্ধুত্ব দৃঢ় ভিত্তি পায় এবং অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশের। নানা বাঁক পেরিয়ে দেশের বয়স এখন ৫০। চলছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন। এ উপলক্ষে ১০ দিন ধরে চলছে নানা আয়োজন। রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণে একে একে এসেছেন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট, শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী, নেপালের প্রেসিডেন্ট এবং ভুটানের প্রধানমন্ত্রী। সর্বশেষ সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হয়ে এসেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আমাদের রাষ্ট্রীয় জীবনের এই ঐতিহাসিক ক্ষণে মোদির ঢাকা সফর উভয় দেশের বন্ধুত্বেরই উদযাপন বলা চলে। এর মধ্য দিয়ে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন মাত্রা পাবে বৈকি।
প্রকৃত প্রস্তাবে, গত বেশ কয়েক বছরে বাংলাদেশ-ভারতের বন্ধুত্ব আরো টেকসই, সম্প্রসারিত ও নতুন উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে। অর্থনীতি, বাণিজ্য, নিরাপত্তা প্রভৃতি ক্ষেত্রে গভীরতর হয়েছে পারস্পরিক সম্প্রীতি। বহুপ্রতীক্ষিত স্থলসীমা চুক্তির মাধ্যমে ছিটমহল সমস্যার সমাধান হয়েছে। বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে ট্রানজিট সুবিধা পেয়েছে ভারত। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণও ক্রমবর্ধমান—যদিও বাণিজ্যের ভারসাম্য অনেকটাই ভারতের অনুকূলে। বিদ্যুৎ আমদানি ও উৎপাদনে পারস্পরিক স্বার্থে উভয় দেশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সহযোগিতা চলমান আছে। ভারতীয় পণ্য আমদানির জন্য বেশকিছু ক্রেডিট লাইন বাংলাদেশকে দিয়েছে ভারত। সম্প্রতি ভারতের সাবরুমের সঙ্গে বাংলাদেশের রামগড়কে যুক্ত করা ফেনী নদীর ওপর নির্মিত মৈত্রী সেতু, নৌপথে ভারতে বাংলাদেশের খাদ্যপণ্য রফতানি শুরু এবং ঢাকা-নিউ জলপাইগুড়ি (শিলিগুড়ির কাছে) ট্রেন চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। চলমান কভিড-১৯ মহামারীর মধ্যে চালু করা ‘ভ্যাকসিন মৈত্রী’ (টিকা বন্ধুত্ব) ক্যাম্পেইনের আওতায় বাংলাদেশের মানুষের জন্য উপহার হিসেবে ২০ লাখ ডোজ টিকা পাঠিয়েছে ভারত সরকার। কোনো একক দেশকে তাদের দেয়া টিকার মধ্যে এটাই সবচেয়ে বড় চালান। দুই দেশের সম্পর্কের দিক থেকে এগুলো বিশেষ উৎসাহজনক। মোদির চলমান সফরে সাতটি সমঝোতা স্মারক সই এবং দুটি দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন অংশীদারি প্রকল্পের উদ্বোধনের বিষয় জানা গেছে। নিঃসন্দেহে এতে পারস্পরিক সহযোগিতা ও বন্ধুত্ব আরো সুদৃঢ় হবে।
তবে দুই দেশের সম্পর্কের ভারসাম্যের জায়গা থেকে কিছু অস্বস্তি এখনো তিরোহিত হয়নি। ভারতের চাওয়াগুলোর বেশির ভাগই পূরণ হলেও বাংলাদেশের কিছু অপ্রাপ্তি রয়ে গেছে। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পানির গুরুত্বপূর্ণ উৎস তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তির অনিশ্চয়তা দূর হয়নি। এক দীর্ঘসূত্রতার পাকে পড়ে গেছে এটি। আন্তর্জাতিক নদী হিসেবে ন্যায্য হিস্যা পাওয়ার অধিকার থাকলেও শুকনো মৌসুমে তিস্তার পুরো পানিই ব্যবহার করছে ভারত। ভারতীয় পণ্যের বিশাল বাজার বাংলাদেশ। কিন্তু বাংলাদেশী পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়েও আবার অশুল্ক বাধার বেড়াজালে বন্দি দেশটিতে আমাদের রফতানি বাণিজ্য। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলোর ট্রানজিট সুবিধা ভারত পেলেও নেপালে পণ্য পরিবহনে শিলিগুড়ি করিডোর সুবিধা এখনো পাইনি আমরা। রোহিঙ্গা সংকটে স্বাধীনতার পর সবচেয়ে গুরুতর সমস্যায় জর্জরিত বাংলাদেশ। এ ইস্যুতে যেভাবে ভারতের সমর্থন পাওয়ার কথা, ততটা পায়নি। বরং অপরাধী মিয়ানমারের প্রতি দেশটির পরোক্ষ সমর্থন অনেকটাই আশাভঙ্গ করেছে বাংলাদেশের জনগণকে। এছাড়া সীমান্ত হত্যা একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ সত্ত্বেও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ নিয়মিত বিরতিতে সীমান্তে হত্যা করে যাচ্ছে নিরস্ত্র মানুষকে। বাংলাদেশের স্বার্থের প্রেক্ষিত থেকে এসব বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। এগুলোর নিষ্পত্তি প্রয়োজন। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বর্তমান সফরে দুই নেতার দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের কথা জানা গেছে। এ শীর্ষ বৈঠকে বাংলাদেশের উদ্বেগের ক্ষেত্রগুলোর জুতসই সমাধানে ইতিবাচক অগ্রগতি ঘটবে বলে আশা করা যায়।
ভারতের কাছে বাংলাদেশের জন্মের ঋণ এবং দেশটি আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র। তবে সম্পর্ক যত গভীর হোক না কেন দুটো ভিন্ন রাষ্ট্র হওয়ায় স্বার্থগত টানাপড়েন থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু তার জন্য দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে প্রকাশ্যে কোনো রকম নেতিবাচক ছাপ যেন না পড়ে, সে ব্যাপারে উভয় রাষ্ট্রেরই সজাগ থাকাটা জরুরি। শীর্ষ পর্যায়ের ধারাবাহিক ও আন্তরিক সংলাপ, বিভিন্ন পর্যায়ে কূটনৈতিক উদ্যোগ, পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে অমীমাংসিত বিষয়গুলোর অর্থবহ অগ্রগতি সম্ভব, নিকট অতীতের অভিজ্ঞতা অন্তত তা-ই বলে। বিষয়টি আমলে নিয়ে উভয় দেশের সরকারের প্রয়াস জারি থাকবে এবং পারস্পরিক সম্প্রীতি আরো বাড়বে, এটিই প্রত্যাশা।










