উৎকণ্ঠাজনিত মানসিক অবসাদ (Hypocondria) এবং অমর্ত্য সেন দীর্ঘদিনের বন্ধু। কিন্তু তিনি জানতেন না যে সেই বন্ধুত্বই একদিন তার জীবন বাঁচাবে।  

১৯৫১ সালের নভেম্বরের ঘটনা। ১৮তম জন্মদিনে পা রেখে অমর্ত্য সেন লক্ষ করলেন তার মুখের ভেতর শক্ত তালুর ওপর এক টুকরো মটরের মতো একটা মসৃণ মাংসখণ্ড (লাম্প) গজাচ্ছে। ওটা ব্যথা কিংবা কষ্ট দিচ্ছিল না, তবে জীবনে এমনটি এর আগে চোখে পড়েনি বলে তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। তড়িঘড়ি কলকাতার ওয়াইএমসিএ হোস্টেলে ডাক্তারকে দেখালে তিনি আশ্বস্ত করে বললেন, ঘাবড়ানোর মতো তেমন কিছু নয়, এটা আপনাআপনি চলে যাবে।

ডাক্তারের নিরুদ্বেগ অমর্ত্য সেনের জন্য আরো বেশি উদ্বেগ নিয়ে হাজির হয়। কারণ মাংসপিণ্ডটি তাহলে কী এবং কেন এমন হলো, সে ব্যাখ্যা তিনি দেননি। দুশ্চিন্তা আরো গভীর হলো যখন তার সম্ভাব্য ব্যাখ্যা চাওয়ার বিপক্ষে ডাক্তার বললেন, ‘ভগবানসৃষ্ট পৃথিবীতে আমরা ডাক্তাররা অনেক সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম জিনিস বুঝি না কিন্তু তাই বলে এগুলো নিয়ে আতঙ্ক বোধ করি না।’ অমর্ত্য সেন এরই মধ্যে লোকায়তের পুরনো বস্তুবাদী দর্শন থেকে জেনেছিলেন, ‘বস্তুবাদী ঘটনার পেছনে বস্তুবাদী কারণ থাকে। এর বাইরে কোনোভাবে পৃথিবীর সন্ধানে যেও না।’ খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের সেই শিক্ষা অবজ্ঞা করার কোনো কারণ তরুণ অমর্ত্য তখনো খুঁজে পাননি।

দুই.

বড়দিনের ছুটি শেষে হোস্টেলে ফিরে তার মনে হলো, মুখের ভেতর গজে ওঠা মাংসপিণ্ডটা একটু বড় হয়েছে। ‘গ্রোথ’ শব্দটা সে সময় মাথায় চক্রাকারে আবর্তিত হতে থাকে এবং নিজের মনকে শান্ত করার জন্য তিনি লাইব্রেরি থেকে ক্যান্সারের ওপর লেখা জনপ্রিয় কিছু বই জোগাড় করে পড়াশোনায় যা পেলেন, তা হচ্ছে গজানো লাম্পটি ‘carcinoma’ নামে একটা অদ্ভুত জিনিস।

অমর্ত্য সেনের দায়িত্ব হয়ে দাঁড়াল এর রহস্যভেদ করা। সে সময় ব্যয়বহুল চিকিৎসার সামর্থ্য ছিল না (মা-বাবা দিল্লিতে কর্মস্থলে এবং তাদের জানানো হয়নি), তাই তিনি কারমাইকেল হাসপাতাল নামে কলকাতার একটা বড় সরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগে কয়েক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তবে ডাক্তারের দেখা পেলেন। ডাক্তার দেখতে আকর্ষণীয় এবং অমর্ত্যকে দেখে সুন্দর একটা হাসি উপহার দিলেন। অমর্ত্য সেন ডাক্তারকে বললেন, ‘আমার সন্দেহ হয় মুখের ভেতর মাংসপিণ্ডটি carcinoma হতে পারে।’ বিস্তৃত হাসি আর খুবই বন্ধুসুলভভাবে রসিকতা করে একজন আন্ডার গ্র্যাজুয়েট ইকোনমিকস ছাত্রের ডাক্তারি রোগ নির্ণয় উড়িয়ে দিতে উদ্যত হলেন সামনে বসা ডাক্তার। ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ বুঝতে পারছি। তুমি ভাবছ তোমার carcinoma আছে। ভালো কথা। আমি খুব যত্ন সহকারে এটা পরীক্ষা করব কিন্তু তার আগে আমাকে বলো, তুমি কি অন্য কোনো বড় ব্যাধি মনে মনে পুষছ?’

অমর্ত্য সেন দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন, ‘না, জাস্ট carcinoma।’ সুতরাং ডাক্তার তার মুখের ছাদে উজ্জ্বল আলো ফেলে পরীক্ষা শেষ করলেন। তিনি কিছুই বললেন না যতক্ষণ না অমর্ত্য সেন জানতে চাইলেন, ‘বায়োপসি করতে যাচ্ছেন কি?’ ডাক্তার বললেন, ‘না। পয়েন্টলেস। ওখানে ঘাবড়ানোর মতো কিছু নেই। এটা ছোট এক স্ফীতি, নিশ্চিতভাবে চলে যাবে। তবে  হ্যাঁ, তুমি যদি প্রক্রিয়া দ্রুত করতে চাও তাহলে অ্যান্টিসেপটিক দিয়ে জায়গাটা ভিজিয়ে দাও—ডেটল দিয়ে গারগল করতে পারো।’ একটু বিরতিতে ডাক্তার বললেন, ‘আরেকটা ভালো ভাবনা তোমাকে দিই। বিকাল পর্যন্ত যদি এদিক-সেদিক ঘোরাফেরা করে এখানে থাকতে পারো, পূর্বনির্ধারিত কিছু ছোট সার্জারি শেষে আমি স্থানিক অনুভূতিনাশক (লোকাল অ্যানেসথেসিয়া) দিয়ে লাম্পটা দূর করে দিতে পারি।  লাম্পটি তখন থাকবে না, তেমনি থাকবে না তোমার ভয় ও আতঙ্ক।’

ক্যান্সার নিয়ে যতটুকু পড়াশোনা করেছিলেন, তাতে অমর্ত্য সেন বুঝতে পেরেছিলেন যে ওটা হবে খুব একটা বাজে চিন্তা। কারণ এমন একজনকে দিয়ে লাম্পটি অযত্নে কাটা হবে, যিনি এমনকি চিন্তাও করেননি যে তিনি একটা সম্ভাব্য ক্যান্সার কেস হাতে নিতে যাচ্ছেন। সুতরাং ডাক্তারকে ধন্যবাদ জানিয়ে আশ্বস্তের জায়গায় বিমর্ষ হয়ে ফিরলেন অমর্ত্য সেন। তার ক্যান্সার আছে অথচ দৃঢ়ভাবে নির্ণয় করতে পারছেন না—এ ব্যাপারটা পড়াশোনার বাইরে এমনকি কফি হাউজের প্রশমিত আলাপচারিতায় বিঘ্ন ঘটাতে লাগল।

একবার অবাক হয়ে ভাবলেন, বোকামি করছেন না তো? কারণ দু-দুজন উপযুক্ত ডাক্তার সন্দেহ করার মতো কিছু পাননি। তিনি জানতেন যে তার এই সন্দিগ্ধচেতা মন অশোধনীয় এবং বন্ধুমহলে হাস্যকৌতুকের উৎস হতে পারে। একটা ঘটনা তার মনে পড়ল, যখন শান্তিনিকেতনে স্কুলের ডাক্তার তাকে ‘অসম্ভব রকম দুশ্চিন্তাগ্রস্ত  মানসিকতার’ মানুষ বলে অভিহিত করেছিলেন (Impossibly worry-minded)। এর পেছনের গল্পটা এ রকম: পেটের কিছু পীড়াজনিত লক্ষণ থেকে অমর্ত্য সেনের একবার মনে হয়েছিল যে তার কলেরা হয়ে থাকতে পারে—ব্রিটিশ  সাম্রাজ্যবাদীরা  যাকে বলত ‘দিল্লির পেট’ (Delhi belly)। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তার স্কুলের ডাক্তার বললেন, অমর্ত্য সেনের কলেরা হয়নি এবং তারপর তিনি এক মজাদার পর্যবেক্ষণ পেশ করলেন—তার ডাক্তারি পেশায় লক্ষ করেছেন যে কলেরা রোগীরা সাধারণত খুব আশাবাদী হয় এবং অমর্ত্য সেন যেহেতু খুব খুব আতঙ্কিত একজন মানুষ, তাই সেটা আরেকটা প্রমাণ যে তার কলেরা হয়নি।

অমর্ত্য সেনের কাছে সেই মুহূর্তে ডাক্তারের ওই মন্তব্য অত্যন্ত সান্ত্বনাদায়ক মনে হয়েছিল। সুতরাং তিনি আতঙ্কিত না হয়ে আশাবাদী হয়ে উঠলেন এবং তারপর অবশ্য অন্য একটা আতঙ্কের জালে আটকে গেলেন—ডাক্তারের কথায় আশাবাদী হওয়া মানে কলেরা থাকা, কলেরা না থাকা নয়। তার এ চিন্তা যখন ডাক্তারকে জানালেন তখন ডাক্তার ধৈর্য হারিয়ে বললেন, ‘অমর্ত্য, তোমাকে দৃঢ় আশ্বাস দিতে পারব না, তবে তোমাকে অবশ্যই দুশ্চিন্তার প্রবণতা পরিহার করতে হবে।’

পরবর্তী সময়ে কলকাতায় ডাক্তারের পরামর্শ স্মরণ করে ভেবেছিলেন মানসিক অবসাদই তার সমস্যা সমাধানে এগিয়ে এসেছিল। তিনি নিজেকে প্রবোধ দিলেন এই বলে যে, মুখে একটা বড় সমস্যা সন্দেহ করার কারণ ছিল, তা যত কম সম্ভাবনার হোক এবং এটার পেছনে দৌড়াতে হয়েছে, অন্য কিছু না হোক, অন্তত মন থেকে উদ্বেগ দূর করতেই।

তিন.

তারপর অনেক ঘটনা। একমাত্র ওয়াইএমসিএ হোস্টেলে এক স্মার্ট ও বন্ধুসুলভ  ডাক্তারি পড়ুয়া প্রতিবেশী অমর্ত্য সেনের সঙ্গে সহমত পোষণ করে বললেন, ‘যদিও আমার পড়া শেষ হয়নি, অনুমান করছি carcinoma tumor দেখতে যা, ওটা এ রকমই।’ শুধু তা-ই নয়, পরের দিন সকালে মেডিকেল কলেজ লাইব্রেরি থেকে carcinoma সংক্রান্ত কিছু বই এনে দিলেন সেই স্মার্ট প্রতিবেশী। সারা রাত জেগে বইগুলো পড়ে অমর্ত্য সেন নিশ্ছিদ্র নিশ্চিত হলেন যে মাংসপিণ্ডের রূপে তার মধ্যে squamous cell carcinomia আছে। খুব দ্রুত বিখ্যাত ডাক্তার অমিয় মামার সঙ্গে অত্যন্ত জরুরি আলাপ করে তিনি তাত্ক্ষণিক রওনা হলেন—‘সূর্যালোকিত কলকাতায় দোতলা বাসে চড়ে ডাক্তার অমিয় মামার উপদেশ নিতে ঝলমল চমত্কার দিনটায় হয়তো আমার জীবনের অপেক্ষমাণ অন্ধকার দিকটা নিশ্চিত করতে যাচ্ছি।’

অমিয় মামা লাম্পটা খুব গুরুত্ব সহকারে নিয়ে বললেন, বায়োপসির প্রয়োজন হতে পারে, তবে ক্যান্সার ছাড়াও অন্য কিছু বিবেচনার মধ্যে থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যাবে না। সুতরাং জায়গাটায় প্রথমে অ্যান্টিসেপটিক লাগানো যেতে পারে। এটা mercurochrome নামে একটা লাল রঙের তরল পদার্থ, যা মনে হয় মুখের ভেতর থেকে রঙ নির্গত করে ঠোঁট দুটোকে লাল করে দেয়।

কষ্টের মধ্যেও হাসির কারণ হয়ে দাঁড়ায় ঠোঁটের সেই লাল রঙ। বন্ধুরা ভাবতে শুরু করল যে যারা ভারি লিপস্টিক ব্যবহার করে, তিনি সেই মেয়েদের অব্যাহত চুমু খান বলেই তার ঠোঁট অত গভীর লাল। এক বন্ধু, যিনি রাজনীতিতে চরম অবস্থান পছন্দ করেন না, বলেই বসলেন, ‘আমার মনে হয় প্রতিদিন অন্তত একজনকে তো চুমু খায়ই।’ 

চার.

যা-ই হোক, সেই লাল তরল পদার্থ অমর্ত্য সেনের কোনো উপকারে এল না। অগত্যা অমিয় মামার উপদেশে এবং নিজ তত্ত্বাবধানে তিনি কলকাতার নতুন স্থাপিত চিত্তরঞ্জন ক্যান্সার হাসপাতালে স্থানীয় অ্যানেসথেসিয়ায় সার্জারি ও বায়োপসির জন্য একদিনের জন্য নিবন্ধিত হলেন। তখন মে মাসের শুরু এবং কলকাতা গ্রীষ্মের গরমের জন্য তৈরি হচ্ছিল। তার এ সার্জারি হয়েছিল লন্ডনে এক কনফারেন্সে যাওয়ার এবং ইংল্যান্ডে আরো কয়েক মাস অন্যান্য ব্যস্ততায় কাটাতে যাওয়ার ঠিক দুদিন আগে।

মা-বাবা দিল্লিতে ছিলেন এবং এ ব্যাপারে তাদের কিছুই জানানো হয়নি কিন্তু ইংল্যান্ড থেকে কলকাতায় এসে চাচা অশোক সেনের মাধ্যমে নিয়ে আসা রিপোর্ট অমর্ত্য সেনের আগেই তারা দেখে ফেললেন।

ক্লাস থেকে ফিরে বাড়িতে গিয়ে অমর্ত্য সেন দেখলেন মৃত্যুশোক পরিবেশ; মা কাঁদছিলেন, বাবা যেন এক বিষাদগ্রস্ত মূর্তি, ছোট বোন মঞ্জু অত্যধিক মনমরা এবং চিনিকাকা মুখ গোমড়া করে বসে আছেন। বাবা তাকে বললেন, দুঃখের সঙ্গে জানাতে হচ্ছে যে বায়োপসি রিপোর্ট বলছে squamous cell carcinoma। অমর্ত্য সেন ভয়ংকরভাবে ভেঙে পড়লেন আবার নিজেকে বিজয়ীও মনে করলেন; কিছুটা বৈজ্ঞানিক গর্ব নিয়ে তাদের বললেন, ‘আমি এটা জানতাম। আমি প্রথম রোগ নির্ণয় করেছি।’ তবে তিনি বিধ্বস্ত বোধ করছিলেন এবং পরের দিন বিস্তারিত আলাপের জন্য তার বাবার ক্যান্সার হাসপাতালে যাওয়ার কথা।

সেই রাতে বিছানায় শুয়ে অমর্ত্য সেন নিজেকে দুই সত্তা হিসেবে আবিষ্কার করলেন—এক. একজন রোগী, যে এইমাত্র কিছু অত্যন্ত ভয়ংকর খবর পেয়েছে এবং দুই. সে আবার রোগীর দায়িত্বে থাকা এজেন্টও, যে বই পড়ে সতর্কতার সঙ্গে রোগীর রোগটা ধরতে পেরেছে, বায়োপসি করানোর জন্য তাগিদ দিয়েছে এবং একটা ফলাফল পেয়েছে, যা ভাগ্যক্রমে রোগীকে বাঁচাতেও পারে। মনে মনে বললেন, ‘আমার মধ্যে থাকা এজেন্টকে একেবারেই ছাড়া যায় না—সম্পূর্ণভাবে সম্ভব ছিল না যে রোগী এজেন্টের ওপর কর্তৃত্ব করুক কিন্তু এটা ছিল একটা উদ্দীপক চিন্তা। বস্তুত, আসছে মাসগুলোয় পরবর্তী সময়ে যা কয়েক দশক—আমার সেই শক্তিটার দরকার ছিল।’ এজেন্ট রোগীকে বলল, প্রথম কাজ হচ্ছে সবচেয়ে ভালো চিকিৎসা কী হতে পারে এবং এ রোগীর কী ধরনের সুযোগ আছে তা খুঁজে বের করা। অমর্ত্য সেন বলছেন—

‘শেষমেশ যখন ঘুমিয়ে পড়লাম, ভোর হয়ে আসছিল। এরই মধ্যে এক দরিদ্র ফেরিওয়ালা সম্ভবত নিজ বাগানের সবজি বাড়ি বাড়ি বিক্রির জন্য হাঁকছিল। জীবনের সকল দুঃখ-যন্ত্রণা সত্ত্বেও সে খুব দৃঢ়সংকল্প ছিল। তার কণ্ঠস্বরের উপস্থিতি এবং বাঁচার জন্য লড়াকু মন আমাকে উৎসাহ দিল এবং দিল দৃঢ় সংকল্পের চেতনাও। নতুন রৌদ্রকরোজ্জ্বল অন্য একটা দিনের সূচনা নিয়ে সান্ত্বনাদায়ক আরো কিছু ছিল। আমার ঘুমের দরকার ছিল কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমি চাইনি এটা খুব লম্বা অথবা চিরস্থায়ী ঘুম হোক।’

পাঁচ.

১৯৫২ সালের ১৪ মে বায়োপসি রিপোর্ট বলেছিল, ‘Squamous Cell Carcinoma Grade II’। এরই মধ্যে অমর্ত্য সেন জেনে গেছেন যে গ্রেড ২ খুব সুখদায়ক সংখ্যা নয়; স্বয়ংক্রিয়ভাবে সর্বনাশ নয়, তবে অবশ্যই চিন্তা ও তাড়াহুড়ো করার প্রয়োজন আছে। চিত্তরঞ্জন হাসপাতাল থেকে বাবাকে বলা হয়েছে যত শিগগির সম্ভব রেডিয়েশন চিকিৎসা নিতে হবে। কিন্তু অমর্ত্য সেন বইতে পড়েছেন আগে সার্জারি তারপর রেডিয়েশন দেয়া হয় কিন্তু এখন দেখছেন সুপারিশ হচ্ছে প্রথমেই হেভি ডোজ রেডিয়েশন। তিনি চিন্তাক্লিষ্ট রইলেন এজন্যও যে তিনি সেখানে যাওয়ার মাত্র দুই বছর আগে হাসপাতালটি স্থাপিত হয়েছিল এবং ওটা উদ্বোধন করেছিলেন পদার্থ ও রসায়ন বিষয়ে দুই নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ম্যারি কুরি। এ খবর অমর্ত্যের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি দুই কারণে—প্রথম এবং অংশত কুলপরিচয় দক্ষ ডাক্তারি চিকিৎসায় রূপান্তরিত হয় না এবং দুই. ম্যারি কুরি এক ধরনের ক্যান্সারে মারা গিয়েছেন ১৯৩৪ সালে। সুতরাং ১৯৫০ সালে স্থাপিত হাসপাতাল কিংবা কলকাতায় অন্য কোনো কাজ করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। আরো একটু অনুসন্ধানে বেরিয়ে এল আসলে ম্যারি কুরির কন্যা আইরিন জলিয়ট কুরি, যিনি নিজে রসায়নে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত, তিনিই চিত্তরঞ্জন হাসপাতালটি উদ্বোধন করেছিলেন। 

ডাক্তারকে বিভিন্ন প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন অমর্ত্য সেন। যেমন তিনি চিকিৎসা থেকে আরোগ্যলাভের পরিসংখ্যান চাইলে ডাক্তার কিছুটা অনীহা প্রকাশ করলেন কিন্তু অমর্ত্যের চাপে বললেন, পাঁচ বছর বাঁচার সম্ভাবনা প্রায় ১৫ শতাংশ। এ পরিসংখ্যান ছিল খুব হতাশাজনক, যদিও ডাক্তার তাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, একেকটা ক্যান্সার কেস একেক রকম এবং অমর্ত্য সেনের ভালো হওয়ার সম্ভাবনা প্রদেয় পরিসংখ্যানের নিশ্চিতভাবে বেশি। মোট কথা, তাকে অনেক রেডিয়েশন নিতে হবে—৮০০০ র্যাড—যা ব্যতিক্রমধর্মী উচ্চমাত্রা।

‘আগামী সাতদিন রেডিয়েশনের পুরনো পদ্ধতিতে আমি, আমাকে নয়, বরং রোগটি মারতে যতটুকু দরকার ততটুকু নিতে প্রস্তুত ছিলাম। আমার চিকিৎসা হাসপাতালের জন্য এক নতুন অভিযাত্রা, কারণ আমি ছিলাম খুব বড়মাত্রায় রেডিওথেরাপি আদি গ্রহণকারীদের অন্যতম। তারা বলেছে তাদের নবলভ্য রেডিয়াম মাধ্যমে তারা সবাই খুব উত্তেজিত ছিল। এমনি করে অবশ্য আমিও।’

একরাশ বিষণ্নতা নিয়ে এক বর্ষায় কলকাতার চিত্তরঞ্জন ক্যান্সার হাসপাতালে ভর্তি হলেন অমর্ত্য সেন। সঙ্গে ছিল পিসিমার দেয়া স্বর্গীয় আশীর্বাদ। এর মধ্যে বিষাদ ও হতাশার ভার বৃদ্ধি করে দিল ঢাকা থেকে ক্যান্সারের ‘শেষ চেষ্টা’ চিকিৎসায় আসা এক দুর্বল রোগী, যে বস্তুত পরের দিন অমর্ত্য সেনের চিকিৎসা শুরুর আগেই মারা যায়। প্রথম সকাল কাটল ওয়ার্ড ঘুরে ঘুরে—অনেক যুব বয়সী রোগী—কি শিশু—নানা রকম ক্যান্সারে আক্রান্ত। আঠারো বছর বয়সে তার মনে হলো, তিনি অপেক্ষাকৃত পরিপক্ব মানুষ।

ছয়.

রেডিয়েশনের অভিজ্ঞতা অবর্ণনীয় এজন্য নয় যে এটা বেদনাবহুল—কোনো ব্যথা ছিল না—বরং এজন্য যে একটা ধাতব চেয়ারে একঘেয়ে বন্দিত্ব বেছে নিতে বাধ্য হওয়া—মুখ হা করে ঠায় বসে থাকা প্রতিদিন ৫ ঘণ্টা এবং মোট এক সপ্তাহ। একটু দূরে জানালা দিয়ে দেখতে পেতেন একটা নিরানন্দ জায়গা, যেখানে অনেক ময়লা ফেলার পাত্র এবং পাতাবিহীন একটা নির্জন গাছ। এ গাছটির জন্য তিনি কৃতজ্ঞ ছিলেন এবং স্মরণ করলেন তার কংকর মামাকে। ‘নিবৃত্তিমূলক নিরুদ্ধ ব্যক্তি’ (Preventive detainee) হিসেবে যখন তাকে ব্রিটিশ শাসকরা জানালাবিহীন এক জেল থেকে জানালাসহ বাইরে গাছ দৃশ্যমান এমন জেলে পাঠাতেন তখন তিনি প্রচণ্ড খুশি হতেন।

একনাগাড়ে ৫ ঘণ্টা বসে থাকার একঘেয়েমি দূর করতে তিনি অর্থনীতির বাইরে কিছু বই সঙ্গে রাখলেন। তার মধ্যে জর্জ বার্নার্ড শ লিখিত একটা ছোটগল্প এ রকম—

এক অখ্যাত গ্রামের ধর্মীয় লোকজন দাবি করছিল যে তারা এক পাপী মদ্যপকে গির্জার সন্নিহিত ফাঁকা জায়গায় সমাহিত করার পর এক রাতেই গির্জাটি পাপীকে ফেলে নদীর ওপারে চলে যায়। বার্নার্ড  শর গল্প বলছে, লন্ডন টাইমস পত্রিকার এক প্রতিবেদককে পাঠানো হয় নিরক্ষর গ্রামবাসীর মনে জেঁকে বসা কুসংস্কার নিয়ে লিখতে। কিন্তু সমস্যা হলো, প্রতিবেদক গিয়ে দেখতে পেলেন গ্রামবাসী যথার্থই বলেছে যে গির্জাটি নদীর ওপারে অবস্থান নিয়েছে।

সে সম্পাদকীয় দপ্তরে ব্যাপারটি জানালে তারা বলল, তাকে ওখানে পাঠানো হয়েছে গ্রামবাসী কী রকম অযৌক্তিক সেটা তুলে ধরতে, তাদের অসার বিশ্বাস নিশ্চিত করতে নয়। উপরন্তু, সে নিজে কুসংস্কারে আচ্ছাদিত হয়ে পুরনো চাকরিতে ফিরবে এমন প্রত্যাশা যেন না করে। চাকরি হারানোর এমন হুমকির মধ্যে প্রতিবেদক তার পক্ষে সম্ভব সবচেয়ে বুদ্ধিমান কাজটিই করলেন। মধ্যরাতে কবর খুঁড়ে গির্জার পুরনো স্থান থেকে—যেখান থেকে গির্জাটি অপসারিত হয়েছিল—পাপীটির কফিন তুলে নদীর ওপারে গির্জার নতুন অবস্থানে নিয়ে গেলেন। মদ্যপ পাপীটাকে যেই পুনরায় কবরস্থ করা হলো, অমনি গির্জাটি নদী পেরিয়ে আগের অবস্থানে চলে এল।

এবার পত্রিকার প্রতিবেদক সুন্দর বাচনভঙ্গিতে সম্পাদকীয় দপ্তরে লিখলেন, গির্জাটি নিশ্চিতভাবে যেখানে ছিল সে জায়গায়ই আছে এবং স্পষ্ট ভাষায় গ্রামবাসীর কুসংস্কারের নিন্দা জানালেন।

অমর্ত্য সেন থেরাপি নিতে নিতে ভাবলেন, এমন ছোটখাটো বিজ্ঞানবিরোধী অলৌকিক ব্যাপার এ মুহূর্তে ঘটলে মন্দ হতো না।

সাত.

জুলাইয়ের প্রথম দিকে সাতদিনের কষ্ট শেষে তিনি বাড়ি ফিরেছিলেন। খুব তাড়াতাড়ি প্রতিক্রিয়া না হলেও কিছুদিন পর বেশকিছু জটিলতা ধরা দেয়। তিনি বলছেন, ‘আমি সাত বছর আগে বোমায় বিধ্বস্ত হিরোশিমা ও নাগাসাকির ব্যাপারে অনেক শুনেছিলাম। আমি হঠাৎ নিজেকে এমনি আক্রান্ত এক জনগোষ্ঠীর অংশ ভাবা শুরু করলাম। বস্তুত, আঘাতপ্রাপ্ত জাপানিদের প্রতি যে সহমর্মিতা আগে ছিল তা আরো বেড়ে গেল। আমি চিন্তা না করে পারছিলাম না যে এটাই আমার শেষ।’

দুই সপ্তাহের মধ্যে ডাক্তার টিউমারটি সম্পূর্ণ অদৃশ্যমান দেখে উচ্ছ্বসিত হলেন, তিনি নিজেও তা-ই এবং মা-বাবা ও বোন যথাসাধ্য চেষ্টা চালালেন তাকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে এনে আশাবাদী করে তুলতে।

‘বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা—

বিপদে আমি না যেন করি ভয়।

দুঃখতাপে ব্যথিত চিতে নাই-বা দিলে সান্ত্বনা,

দুঃখে যেন করিতে পারি জয়\’ (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

 

আব্দুল বায়েস: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও অর্থনীতির অধ্যাপক; বর্তমানে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির খণ্ডকালীন শিক্ষক