উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে চাইলে দুই ধরনের প্রতিষ্ঠানের দ্বার আমাদের সামনে, বাংলাদেশে খোলা আছে। সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। এই দুই ধরনের প্রতিষ্ঠান নিয়ে আমাদের সমাজে কিছু প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত ধারনা রয়েছে। আমাদের আলাপের বিষয় উচ্চ বিনিয়োগে উচ্চশিক্ষা প্রসঙ্গ। উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে হলে ব্যক্তিকে অর্থ খরচ করতে হয়, এই ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বা বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষায়ও বড় অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি রয়েছে, সেই অর্থ ব্যক্তিকে খরচ করতে হয় না, করে সরকার, আরো সহজ অর্থে রাষ্ট্র বা দেশের জনগণ কর প্রদানের মাধ্যমে। 

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কথাটি শুনলেই যে কথাটি সবার মাথায় আসে, তা হল- বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ব্যয়বহুল। এখানে উচ্চশিক্ষার খরচ বেশি বলে সকলের ধারণা। এই ধারণার মূলে রয়েছে ব্যক্তির ব্যক্তিগত অর্থব্যয় প্রসঙ্গ। ব্যক্তি এখানে নিজে শিক্ষার জন্য বিনিয়োগ করছেন। প্রকৃত হিসাব মিলিয়ে দেখলে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার ফি বাবদ অর্থ গ্রহণে সর্বদা নিবিষ্ট রাখতে হয় একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক জনবল যারা বিভিন্ন স্তরে সেবাদানে নিয়োজিত থাকেন। এভাবে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন থেকে শুরু করে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা প্রতিষ্ঠান বহন করে থাকে, স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্নখাতের এসব অর্থ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। 

অন্যদিকে দেশের প্রায় প্রতিটি শিক্ষার্থীর সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করার স্বপ্ন থাকে। এমন আকাঙ্খার একটি বড় কারণ হলো এখানে ব্যক্তিকে অর্থ খরচ করতে হয় না বললেই চলে। এ স্বপ্ন শুধু শিক্ষার্থীদের নয় বরং অনেকে শিক্ষক হওয়ার জন্যও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে বেছে নিতে উন্মুখ থাকেন। এখানেও ব্যতিμম নয়, এখানে রয়েছে বেতন-বোনাস, অবসরকালীন ভাতাসহ নানা সুবিধাদির হাতছানি। এইসব বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনে রাষ্ট্রের রয়েছে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ। অনুমান করা যায় যে, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিনিয়োগ অনেকক্ষেত্রে অর্ধেকও নয়। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এমন কিছু বিষয় পড়ানো হয় যার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা ওঠে। এই বিনিয়োগ রাষ্ট্রের অগ্রগতিতে কতটুকু ভূমিকা রাখছে সেই প্রশড়বটি রয়ে গেল। 

প্রতি বছর সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্যে যে পরিমান বাজেট বরাদ্দ করা হয়, সেই বাজেটের সাথে যদি শিক্ষার্থী সংখ্যা গড় করা হয়, তবে দেখা যাবে প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্যে সরকার যে বিনিয়োগ করে থাকে তা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে বেশি। কতগুন তা গবেষণার দাবি রাখে। এই অথচ প্রতিটি শিক্ষার্থীর অধিকার রয়েছে নিজদেশের অর্থ-সম্পদের ওপর। তবু বিনিয়োগের বেলায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে থাকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে। উচ্চশিক্ষার যে মান ও যে হিসাব রয়েছে সে বিষয়ে আমাদের পরিস্কার হওয়া জরুরি। উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য নিয়েও সচেতনতা প্রয়োজন, যাতে শিক্ষার মান যাচাইয়ের প্রশ্নটি সামনে আসতে পারে। রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের কার্যকারিতা পরীক্ষার দাবি রাখে। 

অন্যথায়, উদ্দেশ্যহীন শিক্ষায় বিনিয়োগ কেবল ব্যর্থতার গ্লানি তৈরি করে। কথায় আছে, যে জাতি যত শিক্ষিত, সে জাতি তত উন্নত। একটি রাষ্ট্র যখন সার্বিক দিক থেকে এগিয়ে যেতে চায়, তখন তার মূল চালিকা শক্তি হয়ে দাঁড়ায় শিক্ষা। কাজেই আমাদের এই যোগ-বিয়োগের শিক্ষাটা যদি না থাকে, তবে শিক্ষার পরবর্তী ধাপে যে গোলযোগ লাগবে তা সামাল দেওয়া কঠিন। 

উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে অনেক শিক্ষার্থী সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেলেই ভর্তি হয়ে যায়, সেখানে বিষয় যা-ই হোক, নিজের নামের পাশে বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের তকমা জুড়ে দিতে পারলেই হয়। একদল শিক্ষার্থী লক্ষ্যহীন শিক্ষায় পদার্পন করতে পিছ পা হন না শুধু বিশ্ববিদ্যালয়টি সরকারি বলে। দিনশেষে দেখা যায়, শিক্ষাবর্ষ শেষে বেকারত্ব কাঁধে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। একজন শিক্ষার্থীও তার জীবনের মূল্যবান সময় বিনিয়োগ করেন। এক্ষেত্রে অর্থনীতির ভাষায় ব্যক্তির বিনিয়োগ মাইক্রো অর্থনীতির অংশ। অন্যদিকে রাষ্ট্র যে বিনিয়োগ করেছিল, তার রিটার্ন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এক্ষেত্রে অর্থনীতির ভাষায় ম্যাক্রো বিনিয়োগ অকার্যকর হলো আর পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় কাজ হল শূন্য। একজন শিক্ষার্থী যখন শিক্ষা গ্রহণ করে, শিক্ষার উদ্দেশ্য ওই শিক্ষার্থীর কাছে স্পষ্ট থাকা দরকার। তেমনি যে প্রতিষ্ঠান শিক্ষা প্রদান করে তার উদ্দেশ্যও স্পষ্ট থাকা আবশ্যক। এই দুইয়ের মিশ্রণেই দেশ ও জাতি এগিয়ে যাবে, শিক্ষার্থীরা সফল হতে পারবে। 

সরকারি বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্থক্যের প্রশ্নটি প্রায়ই ঘুরপাক খায় ব্যক্তির অর্থ খরচের স্তরে এসে। সাধারণ দৃষ্টিতে, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থ খরচ কম, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশি। আদতে খরচ কিন্তু থেমে নেই। হয় ব্যক্তি খরচ করছেন বা রাষ্ট্র। সামগ্রিক বিবেচনায় খরচ কিন্তু খরচের খাতাতেই থেকে যাচ্ছে। উচ্চশিক্ষায় যে উচ্চবিনিয়োগ রয়েছে; তার সঙ্গে যদি ভালোমন্দের বোঝাপড়া তৈরি করা যায় তবে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নতুন আঙ্গিকে পরিচ্ছন্ন এক লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাবে। নির্মাণ করবে সুন্দর ভবিষ্যত।

 লেখক: ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট অ্যাফেয়ার্সের পরিচালক