অনেকদিন ধরে রফতানি বহুমুখীকরণ বিষয়ে বিভিন্ন ফোরামে আলোচনা হচ্ছে। খোদ প্রধানমন্ত্রীও এ বিষয়ে নানা সময় তাগিদ দিয়েছেন। রাষ্ট্রীয় নীতি এজেন্ডায়ও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে অঙ্গীভূত হয়েছে। সুনির্দিষ্ট প্রকল্প গ্রহণসহ এজন্য কিছু প্রচেষ্টা নেয়া হলেও এখন পর্যন্ত তাতে খুব একটা সুফল মেলেনি। সম্প্রতি বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণে জাতিসংঘের চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়ার পর রফতানি বৈচিত্র্যের বিষয়টি আবারো সামনে এসেছে। বলা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে রফতানি ক্ষেত্রে আমরা যেসব সুবিধা পাচ্ছি, উন্নয়নশীল দেশে পদার্পণ করলে সেগুলো সংকুচিত হয়ে আসবে। এতে দেশের রফতানি খাত বড় ধরনের হুমকিতে পড়তে পারে। এ প্রেক্ষাপটে এলডিসি উত্তরণের পর বিশ্ববাজারে রফতানি বহুমুখী করাই বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত এক ওয়েবিনারে বক্তাদের ভাষ্যেও বিষয়টি উঠে এসেছে। প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে তারা রফতানি বৈচিত্র্যের ওপর জোর দিয়েছেন। এটি বিবেচনায় নিয়ে এখন থেকে জুতসই পরিকল্পনা-কৌশল নেয়া জরুরি।

বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় কার্যকর অংশগ্রহণের জন্য রফতানি বহুমুখীকরণ ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেশের রফতানি ঝুড়ি এখনো গুটিকয়েক শিল্পপণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ। আমাদের রফতানি আয়ের প্রায় ৮২-৮৪ শতাংশই আসে পোশাক শিল্প থেকে। এরপর রয়েছে চামড়া, পাটজাত পণ্য ও ওষুধ পণ্য। অল্পকতক পণ্যের ওপর এই অতিনির্ভরতা রফতানি নৈপুণ্য এবং অর্থনৈতিক স্থায়িত্বশীলতা উভয় দিক থেকে দুশ্চিন্তার। কাজেই রফতানি ঝুড়িতে নতুন নতুন পণ্য সংযোজনের বিকল্প নেই। বাস্তবতা হলো, রফতানি বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা রয়ে গেছে। সেগুলোর মধ্যে আছে বর্তমান বাণিজ্য কাঠামোয় সমস্যা, বাণিজ্যনীতি ও প্রণোদনা ব্যবস্থা সম্পর্কিত সমস্যা, শুল্কায়ন পদ্ধতির জটিলতা, বিরাজমান বাণিজ্যনীতি ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধকতা এবং অবকাঠামো ব্যবহার (বন্দর, পরিবহন প্রভৃতি) সেবায় মাত্রাতিরিক্ত ব্যয়। রফতানি বৈচিত্র্য বেগবান করতে এগুলোর সমাধান এখন সময়ের দাবি।

বলা হচ্ছে, উন্নয়নশীল দেশে পদার্পণ করলে এবং বিদ্যমান সুবিধাগুলো সংকুচিত হলে দেশের রফতানি বাণিজ্য বছরে ৪-৫ বিলিয়ন ডলার কমে যাবে। তেমনটি হলে পুরো অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ পড়বে বৈকি। সুতরাং এটি বিবেচনা করে এখন থেকে প্রস্তুতি নিতে হবে। প্রচলিত পণ্যের বাইরে আরো কিছু পণ্যের রফতানির সম্ভাবনা রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে আছে গ্লাস, সিরামিকস, হালকা প্রকৌশল পণ্য, সিমেন্ট, আইটি পণ্য, কৃষি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, ছোট জাহাজ প্রভৃতি। আর কী কী পণ্যের রফতানি বাড়ানো যায়, সেগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় নীতি ও প্রণোদনা সমর্থন দেয়া যেতে পারে। শুধু পণ্য নয়, রফতানি গন্তব্যেও বৈচিত্র্য আনা প্রয়োজন। দেশের রফতানি বাজার প্রধানত ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক। মূলত বিভিন্ন ধরনের অগ্রাধিকারমূলক ও শুল্ক সুবিধার কারণে বাজার প্রবেশাধিকারে তুলনামূলক ভালো করেছে বাংলাদেশ। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর সেখানে বাজার ধরে রাখা কঠিন। তাই নতুন রফতানি গন্তব্যের অন্বেষণ দরকার। জাপান, রাশিয়া, ব্রাজিল, চিলি, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া, মেক্সিকো, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশ বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় রফতানি গন্তব্য হতে পারে। রফতানি বাড়াতে ওইসব দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদারের পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করা বেশ সহায়ক হবে। প্রতিযোগী দেশগুলো এভাবেই এগোচ্ছে। বিশেষ করে এক্ষেত্রে ভিয়েতনামের কথা উল্লেখ করা যায়। দেখা যাচ্ছে, পোশাক পণ্যের বাইরে দেশটি ইলেকট্রনিক পণ্য (মোবাইল), যন্ত্রপাতি ও ইলেকট্রিক্যাল পণ্য, পাদুকা পণ্য এবং কৃষিপণ্যের রফতানি বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নিজ অবস্থান টেকসই করছে। তদুপরি, তারা অনেক দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য করছে। প্রতিযোগী দেশগুলোর কৌশল অনুসরণ করে বাংলাদেশও রফতানি ক্ষেত্রে আরো ভালো করতে হবে। রফতানি বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় ইস্যু, পণ্যের আন্তর্জাতিক মান ও কমপ্লায়েন্স অর্জন। এজন্য ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আমরা যদি স্থানীয়ভাবে কাঁচামালের জোগান দিতে পারি, তাহলে উৎপাদন ব্যয় সাশ্রয় হবে। তাছাড়া মান ও খরচ বিবেচনায় প্রতিযোগিতামূলক না হলে বিশ্ববাজারে টিকে থাকা কঠিন হবে। তাই রফতানি বহুমুখীকরণকে একক বা বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে শিল্পনীতি, আমদানি নীতি, আর্থিক নীতি ও অন্যান্য নীতির সামঞ্জস্য রাখা জরুরি।

মনে রাখা চাই, অর্থনীতির জন্য রফতানি বহুমুখীকরণের সুফল অনেক। এটি রফতানি আয়ে অস্থিরতা কমায়, ব্যবসায়িক ঝুঁকি কমায়, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, কর্মীদের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ায়, সর্বোপরি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে। সুতরাং উদীয়মান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় রফতানি ঝুড়ি বৈচিত্র্যকরণে সরকারি-বেসরকারি যৌথ প্রয়াস কাম্য।