আজ ১৭ মার্চ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন। তিনি ছিলেন এমন একজন নেতৃত্ব, যিনি তার সংগ্রাম ও দৃঢ়তা দিয়ে বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছেন। গত বছর জাতির জনকের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে শুরু হয় ‘মুজিব বর্ষ’ উদযাপন। ১৯৯৬ সাল থেকে প্রতি বছর জাতির জনকের জন্মদিন উপলক্ষে ১৭ মার্চ জাতীয় শিশু দিবস পালন করা হয়। নানা কারণেই তাই আজকের দিনটি বিশেষভাবে তাত্পর্যপূর্ণ। শেখ মুুজিবুর রহমান বাংলাদেশের মানুষকে ভালোবেসেছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন। পাকিস্তান আমলের ২৪ বছরের প্রায় অর্ধেক সময় কারাগারে কাটাতে হয়েছে তাকে। দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের পথ ধরে জাতিকে পৌঁছে দিয়েছেন স্বাধীনতার স্বপ্নপূরণের চূড়ান্ত পরিণতিতে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে দেশ গঠনে তার নীতি, পরিকল্পনা আর আদর্শই হোক আমাদের সামনে চলার দিকনির্দেশনা।
ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং স্বাধিকার ও স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর অবদান চিরস্মরণীয়। সত্তরের নির্বাচনে জাতির অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে অভিষিক্ত হয়ে গোটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেন। শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। এক পর্যায়ে আসে একাত্তরের ৭ মার্চ। সেদিন ঢাকার ঐতিহাসিক জনসমুদ্রে তার ঐতিহাসিক ভাষণ আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের অনন্য মাইলফলক। স্বাধীনতার পর মাত্র সাড়ে তিন বছর তিনি দেশ শাসনের সুযোগ পেয়েছিলেন। এ স্বল্প সময়ে তিনি ধ্বংসপ্রায় দেশটির পুনর্গঠনের কাজ সম্পন্ন করেছেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশে ছিল না অবকাঠামো ব্যবস্থা। অর্থনীতির অবস্থাও ছিল করুণ। তার দূরদর্শিতায় ১৯৭৪-এর প্রায় দুর্ভিক্ষ অবস্থা মোকাবেলাও আমরা করেছি।
বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র—এ চার নীতি নিয়ে গঠিত আমাদের সংবিধানের মূলনীতি। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক অঙ্গীকার। জাতীয়তাবাদ অর্থ সংকীর্ণ বোধ নয়, বরং যাবতীয় শোষণের বিরুদ্ধে জাতিসত্তার লড়াই। বঙ্গবন্ধুর কাছে ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মের বিরুদ্ধাচরণ নয়, বরং সবার ধর্মচর্চা ও পালনকে শ্রদ্ধা করা। সমাজতন্ত্র মানে প্রচলিত মার্ক্সবাদী দৃষ্টিভঙ্গি নয়, বরং কল্যাণকর রাষ্ট্র গঠনে বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে অবস্থান। আর গণতন্ত্র মানে সবার রাজনৈতিক ও বাক্স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়া। আজ স্বাধীনতার ৫০ বছর পর যখন দেশের বেশির ভাগ সম্পদ সমাজের উপরের দিকের মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তির হাতে কুক্ষিগত হয়ে থাকতে দেখা যায় কিংবা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের অভাব অনুভূত হয়, তখন নতুন করে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও নীতির অনুশীলন জরুরি হয়ে পড়ে।
১৯৭২—২০২১, দেশ গঠনের দীর্ঘ এ পরিক্রমায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, শিক্ষার হার বৃদ্ধিসহ বাংলাদেশের অর্জন অনেক। তবে এখনো কিছু ঘাটতি রয়ে গেছে। শেখ মুজিবুর রহমান শুধু একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেননি, অবদান রেখেছেন দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে। বৈষম্য দূর করতে তিনি ছিলেন প্রতিশ্রুতিশীল। শিল্প বিকাশে নতুন উদ্যোগ, ভূমি ব্যবস্থাপনায় সংস্কার, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা প্রদান, সমন্বিত কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষির আধুনিকায়নসহ গ্রহণ করেছিলেন বিভিন্ন কার্যক্রম। দারিদ্র্য দূরীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী দেশের নাজুক অর্থনীতি মজবুত করতে নিয়েছিলেন নানা পদক্ষেপ। মানুষের দোরগোড়ায় সরকারি সেবা পৌঁছে দেয়া, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, মানসম্পন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা, নারী জাগরণ কর্মসূচি ছড়িয়ে দিতে ছিলেন বদ্ধপরিকর। সাধারণ জনগণ, পিছিয়ে পড়া অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় আনতে শুরু করেন নানা উদ্যোগ। দেশ ও মানুষের সমন্বিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন করতে দৃঢ় সংকল্প ছিলেন বঙ্গবন্ধু। তাই বর্তমান উন্নয়ন পরিক্রমায় বঙ্গবন্ধুর নীতি-আদর্শ হোক আমাদের চলার পাথেয়।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে শূন্য থেকে শুরু করে বঙ্গবন্ধু সরকারকে যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের অগণিত সমস্যা মোকাবেলা করতে হয়েছিল। তার নেতৃত্বেই রাষ্ট্র ও জাতি গঠন কার্যক্রম শুরু হয়। আইন-শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসন, যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনর্নির্মাণ, লাখ লাখ ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য খাদ্য সংগ্রহ করা এবং আরো অনেক সমস্যার সমাধান তার সরকারের সামনে সুবিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তিনি কঠোর পরিশ্রম ও সততার সঙ্গে দেশের তরে, মানুষের তরে সব চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করেছেন। প্রতি বছর এ মহান নেতার জন্মবার্ষিকী নতুন প্রজন্মের জন্য ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা, দেশ গড়ার অনুপ্রেরণা নিয়ে আসে। জীবনের প্রতিটি ধাপেই বঙ্গবন্ধু বাঙালির সার্বিক মুক্তির জয়গান গেয়েছেন। বঙ্গবন্ধু তার নেতৃত্ব, ত্যাগ ও অধ্যবসায়ের গুণেই বাঙালি জাতির গর্বের প্রতীক। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও আত্মত্যাগ প্রতিফলিত হোক আমাদের চর্চা ও কর্মে। মুজিব বর্ষ ঘিরে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও স্বপ্নের যথাযথ বাস্তবায়নই হোক আমাদের নতুন অঙ্গীকার।










