বাংলাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ। প্রায়ই সংবাদপত্রের পাতায় শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম শিরোনাম হচ্ছে। এটা যে কেবল উচ্চশিক্ষার সর্বোচ্চ পাদপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে তা নয়, এ ধরনের অনিয়ম রাষ্ট্রবিধ্বংসী। একজন অযোগ্য বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক প্রায় ৪০টি বছর ধরে ছাত্রছাত্রী নষ্ট করেন। বিষয়জ্ঞান ও গবেষণায় দুর্বল হওয়ায় লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি হয়ে দাঁড়ায় এদের একমাত্র আশ্রয়স্থল। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করতে এ ধরনের শিক্ষক বড় ভূমিকা রাখেন।
শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম এখন একটি কাঠামোবদ্ধ চেহারা ধারণ করেছে। এর শুরুতেই আছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় উপাচার্য নিয়োগ প্রক্রিয়া। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা বিপুল ক্ষমতার অধিকারী। এ ধরনের ক্ষমতার ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায়সম্মত প্রয়োগের জন্য প্রয়োজন প্রজ্ঞা, সততা ও মেরুদণ্ড। বর্তমানে এই তিনেরই অভাব দেখা যাচ্ছে। সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বিবেচনায় উপাচার্য নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। এ ঘটনা অবশ্য আজকের নয়। এর ইতিহাস অনেক প্রাচীন। প্রায়ই দেখা যায় রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যরা ক্ষমতাসীনদের সব অন্যায় আবদার বিনা বাক্যে মেনে নেন। এটিই হয়ে দাঁড়ায় তাদের প্রধান কাজ। এখানে ক্ষেত্রবিশেষে দেয়া-নেয়ার একটা শক্তিশালী সম্পর্কে গড়ে ওঠে। প্রশাসন আবদার রক্ষা করতে গিয়ে যখন একজন অযোগ্য প্রার্থীকে নিয়োগ দেয় তখন প্রশাসনের কারো ব্যক্তিগত দুর্নীতির ব্যাপারে ক্ষমতাসীনরা চোখ বন্ধ রাখে। এভাবে সৃষ্টি হয় এক অশুভ চক্র। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এই অশুভ চক্রের এখন সীমাহীন দাপট। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সিলেকশন কমিটি গঠনের সঙ্গে দলীয় রাজনীতিকে জড়িয়ে ফেলা। এ অপকর্মের ইতিহাসও যথেষ্ট প্রাচীন। যেখানে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা হওয়া উচিত ছিল মূল নিয়ামক, সেখানে অনেক ক্ষেত্রেই সিলেকশন কমিটিতে এমন কেউ কেউ স্থান পাচ্ছেন, যারা বিষয়জ্ঞানে অত্যন্ত দুর্বল, যাদের গবেষণা রেকর্ড দেখলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হিসেবে লজ্জা পাওয়ার কথা। এসব তথাকথিত এক্সপার্টকে রাবার-স্ট্যাম্প এক্সপার্ট বলা যেতে পারে। অনিয়মকে কাগুজে বৈধতা দেয়া এদের প্রধান কাজ।
এই যেখানে প্রেক্ষাপট, সেখানে নিয়োগে অনিয়ম একটি সাধারণ ঘটনা। বহু যুগের সঞ্চিত জঞ্জাল রাতারাতি অপসারিত হবে তা আশা করা যায় না। তবে এটিও সত্যি, এ জঞ্জাল আর বাড়তে দেয়া যায় না। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চলে দেশের সাধারণ মানুষের করের টাকায়। এই দায়বদ্ধতা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না। অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দেশের মানুষের সঙ্গে প্রতারণা। এই অনিয়মে রাশ টানতে আমাদের কী করার আছে?
আমাদের দেশে কিছু আইন আছে, যা নিয়োগে অনিয়ম রোধে কার্যকর হতে পারে। যেমন তথ্য অধিকার আইন। আমার মনে হয়, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করতে আইনটির আশ্রয় নেয়া যেতে পারে। শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোথাও কোনো ধরনের রাখঢাকের অবকাশ নেই। এটা কোনো গোপনীয় বিষয় নয়। নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রতিটি পর্যায় যদি সবার সামনে উন্মুক্ত করে দেয়া যায়, তবে দুর্নীতির সুযোগ কিছুটা রুদ্ধ হতে পারে। যেমন প্রার্থীদের আবেদন অনলাইনে হতে পারে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ওয়েবসাইট থাকতে পারে, যেখানে শিক্ষক পদগুলো বিজ্ঞাপিত হবে এবং যেখানে প্রত্যেক আবেদনকারীর যাবতীয় একাডেমিক রেকর্ড সংরক্ষিত থাকবে। আবেদনকারীদের সব তথ্য হবে যে কারো জন্য উন্মুক্ত। যে কেউ চাইলেই প্রার্থীদের যোগ্যতা ও অযোগ্যতা সম্পর্কে জানতে পারবেন। এতে একাডেমিক দিক থেকে প্রথম স্থানে থাকা প্রার্থীটিকে বাদ দিয়ে ৪৯তম স্থানে থাকা প্রার্থীকে নিয়োগ দেয়া কিছুটা কঠিন হয়ে পড়বে (যদি সিলেকশন কমিটির বিন্দুমাত্র চক্ষুলজ্জা থাকে)। এমন ঘটনা কিন্তু ঘটেছে বলেই পত্রিকায় প্রকাশ। সেই সঙ্গে যেটা করা যেতে পারে তা হচ্ছে, বাধ্যতামূলকভাবে প্রতিটি মৌখিক পরীক্ষার অডিও-ভিজ্যুয়াল রেকর্ড সংরক্ষণ করা। এমন সুযোগ রাখতে হবে, যেখানে এই মৌখিক পরীক্ষার অডিও-ভিজ্যুয়াল রেকর্ড কেউ চাইলেই প্রশাসন সেটা দেখাতে বাধ্য থাকবে। তথ্য অধিকার আইন বোধহয় এ অধিকার দেশের সব নাগরিককেই দেয়। মৌখিক পরীক্ষা এভাবে রেকর্ড করা হলে ছাত্রদের সঙ্গে সঙ্গে সিলেকশন কমিটির সদস্যদের বিদ্যার দৌড় সম্পর্কেও একটি ধারণা পাওয়া যাবে। সবার সামনে তাদের জ্ঞান-গরিমা উন্মুক্ত হবে। এটা হওয়া উচিত। আমাদের জানার অধিকার আছে কোন ধরনের পণ্ডিত ব্যক্তি আমাদের ছাত্রদের যোগ্যতার যাচাই-বাছাই করছেন। অডিও-ভিজ্যুয়াল রেকর্ড সংরক্ষিত থাকলে আশা করা যায় ছাত্রছাত্রীদের উটকো এবং ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দসংক্রান্ত প্রশ্নের সামনে পড়তে হবে না। কয় ভাইবোন? এলাকার এমপির নাম কী? বাড়ি কোন গ্রামে? অমুককে চেনো কিনা বা মুখে দাড়ি কেন? এ ধরনের ফালতু প্রশ্ন প্রায়ই করা হয়।
যতদূর জানি, বর্তমানে সিলেকশন কমিটি শুধু নিয়োগের জন্য বাছাইকৃত প্রার্থীদের একটি তালিকা ঠিক করে তাদের কাজ শেষ করে। সিলেকশন কমিটির কাজের ব্যাপ্তি আরো বিস্তৃত হওয়া উচিত। যাদের উপযুক্ত বলে বিবেচনা করা হয়েছে, কোন কোন নিয়ামকের ভিত্তিতে তা করা হলো, সে বিষয়ে প্রত্যেক সদস্যের তরফ থেকে একটি করে রিপোর্ট দাখিল বাধ্যতামূলক করা উচিত। শুধু তাই নয়, যাদের নিয়োগের জন্য অযোগ্য বলে মনে করা হলো, তাদেরও জানার অধিকার আছে, তাদের কমতিটা কোথায় ছিল। এ ব্যাপারেও একটি রিপোর্ট থাকা প্রয়োজন। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এ ধরনের একটি প্রক্রিয়া দাঁড় করানো প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, কেউ জবাবদিহিতার বাইরে নয়। যোগ্য বা অযোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের সম্পূর্ণ দায়দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সিলেকশন কমিটির।
এক্সপার্ট কমিটির গঠন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ দায়িত্ব বিভাগের হাতে থাকা উচিত। বিভাগের সব শিক্ষকের সঙ্গে আলোচনা করে এক্সপার্ট কমিটি গঠন করা উচিত। কোনো একটি বিষয়ে প্রকৃতপক্ষে বিশেষজ্ঞ কারা, তা সংশ্লিষ্ট বিভাগের চেয়ে অন্য কারো ভালো জানার কথা নয়। প্রশাসনের উচিত বিভাগীয় কমিটির সিদ্ধান্তগুলোর ব্যাপারে শ্রদ্ধাশীল হওয়া। মায়ের থেকে মাসির দরদ বেশি দেখা গেলে বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলো নিলে শিক্ষক নিয়োগ কিছুটা স্বচ্ছ হতে বাধ্য। বর্তমান প্রেক্ষাপটে কাজগুলো সহজ হবে না। তবে আমি এখনো বিশ্বাস করি, বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকদের বড় অংশটি নিয়োগে যেকোনো ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কিছু পরিবর্তন অনিয়মকে কঠিন করে তুলতে পারে। এদিকে আমাদের নজর দেয়া প্রয়োজন। ক্ষুদ্র স্বার্থ ভুলে শিক্ষকদের ভেতর নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশটি সরব হলে অবশ্যই চলমান অনিয়ম অনেকটাই দূর করা সম্ভব হবে। শিক্ষকতা পেশাটির যথেষ্ট মর্যাদাহানি এরই মধ্যে হয়েছে। এটাকে আর বাড়তে দেয়া যায় না।
ড. সালেহ্ হাসান নকীব: অধ্যাপক
পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়










